নির্বাচনি ডামাডোল শেষ হওয়ার পরপরই দুয়ারে হাজির হবে রমজান মাস। রাষ্ট্রক্ষমতায় তখন আসবে নতুন এক সরকার। কিন্তু সাধারণ মানুষের মনে আনন্দের চেয়ে এখন আশঙ্কাই বেশি কাজ করছে। নতুন সরকারের জন্য প্রথম এবং প্রধান অগ্নিপরীক্ষা হতে যাচ্ছে নিত্যপণ্যের আকাশচুম্বী বাজার নিয়ন্ত্রণ করা। অতীতে আমরা দেখেছি, রাজনৈতিক অস্থিরতা বা পালাবদলের সুযোগ নিয়ে একশ্রেণির অসাধু চক্র বাজারকে অস্থিতিশীল করে তোলে। এবারও সেই একই শঙ্কা জনমনে বিরাজমান।
রমজান আসার আগেই হু হু করে বাড়তে থাকে চাল, ডাল, তেল, চিনি ও সবজির দাম। নতুন সরকারের শপথগ্রহণ এবং প্রশাসনিক গুছিয়ে ওঠার মাঝখানের এই সময়টুকুকে ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট তৈরির মোক্ষম সময় হিসেবে বেছে নিতে পারেন। ফলে নতুন সরকারের জন্য এটি শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, বরং তাদের জনপ্রিয়তার প্রথম বড় পরীক্ষা।
বাংলাদেশে রমজান মানেই যেন পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির উৎসব। বছরের অন্য সময় যে কাঁচামরিচ ৫০ থেকে ১০০ টাকা কেজি থাকে, রোজা শুরুর সঙ্গে সঙ্গে তা ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা ছাড়িয়ে যায়। লেবুর হালি হয়ে যায় আকাশচুম্বী। চিনি, ছোলা, ডাল এবং ভোজ্যতেলের দাম প্রতি কেজিতে ২০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। এমনকি রান্নার কাজে ব্যবহৃত সিলিন্ডার গ্যাসের দামও সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য রমজানের ইফতার ও সাহরি জোটানো তখন একপ্রকার দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
দেশের অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড হলো চট্টগ্রাম বন্দর। বর্তমানে সেখানে ২১ লাখ টন খাদ্যপণ্য আটকে থাকার খবর অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সময়মতো এই বিশাল পরিমাণ পণ্য খালাস করতে না পারলে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হওয়া অনিবার্য। পর্যাপ্ত লাইটার জাহাজের অভাব এবং অনেক ব্যবসায়ীর নিজস্ব গুদাম না থাকায় পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হচ্ছে।
রমজানের আগে চট্টগ্রাম বন্দরের এই অচল অবস্থা দ্রুত নিরসন করা না গেলে বাজারে পণ্যের সরবরাহ কমে যাবে এবং সুযোগসন্ধানী ব্যবসায়ীরা এর পূর্ণ ফায়দা লুটবে।
বাজার অস্থিতিশীল হওয়ার মূল কারণ পণ্যের অভাব নয়, বরং ‘দুষ্টচক্র’ বা সিন্ডিকেট। অসাধু ব্যবসায়ীরা পণ্য গুদামজাত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে। স্থানীয় প্রশাসন ও বাজার মনিটরিং সেলের শিথিলতার সুযোগে এরা সাধারণ মানুষের পকেট কাটে।
সিন্ডিকেট চক্রের হোতাদের চিহ্নিত করে এখনই তাদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান চালানো অপরিহার্য। পুলিশ ও প্রশাসনকে এই চাঁদাবাজি কঠোর হাতে দমন করতে হবে।
রমজান পবিত্রতার মাস, ত্যাগের মাস। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমাদের দেশের ব্যবসায়ীদের একটি বড় অংশ এই মাসকেই অধিক মুনাফা লাভের হাতিয়ার হিসেবে দেখে। অথচ পৃথিবীর অন্য মুসলিম দেশগুলোয় রমজান উপলক্ষে পণ্যের দাম কমিয়ে দেওয়া হয়। ব্যবসায়ীদের বুঝতে হবে, মাপে কম দেওয়া বা ভেজাল পণ্য বিক্রি করা ইসলামের দৃষ্টিতে কঠিন অপরাধ। অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থে ইফতার বা সাহরি করে কোনো আত্মিক তৃপ্তি বা পুণ্য লাভ সম্ভব নয়। ব্যবসায়ীদের উচিত মানবিক হওয়া এবং সাধারণ মানুষের কষ্টের কথা বিবেচনা করে ন্যায্য মুনাফায় পণ্য বিক্রি করা।
রমজান আসার আগেই সরকারকে কোমর বেঁধে নামতে হবে। যদি বন্দরে পণ্য আটকে থাকে, যদি সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকে এবং যদি প্রশাসন নিষ্ক্রিয় থাকে—তবে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের শেষ থাকবে না। আমরা এমন একটি দেশ চাই, যেখানে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের মুখে হাসি থাকবে। সিন্ডিকেটের কালো হাত ভেঙে দিয়ে বাজার পরিস্থিতি সহনীয় পর্যায়ে রাখা নতুন সরকারের জন্য প্রথম ও সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। শুধু রমজানেই নয়, সারা বছরই যেন নিত্যপণ্যের দাম মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকে—এটাই সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমাদের প্রত্যাশা। ছিন্নমূল ও শ্রমজীবী মানুষও যেন ডাল-ভাত খেয়ে শান্তিতে রোজা পালন করতে পারে, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করাই হোক নতুন সরকারের প্রধান লক্ষ্য।
লেখক : শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

