অপপ্রচার, ফ্যাসিবাদ ও ইতিহাসের সতর্কবার্তা

সরদার ফরিদ আহমদ

অপপ্রচার, ফ্যাসিবাদ ও ইতিহাসের সতর্কবার্তা

ফ্রান্স ও নেদারল্যান্ডস সফর শেষে দেশে ফিরেছেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ও অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। কিন্তু তার সফরের সময় একটি গুজব পরিকল্পিতভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল—তিনি নাকি দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন। দেশে ফেরার মধ্য দিয়ে সেই প্রচার মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। প্রশ্ন হলো—এমন অপপ্রচার কেন?

এটি শুধু একজন ব্যক্তিকে ঘিরে রাজনৈতিক বিদ্বেষ নয়। এটি একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক কৌশলের অংশ। ক্ষমতাচ্যুত কোনো গোষ্ঠী যখন জনসমর্থন হারায়, তখন তারা প্রায়ই তথ্যযুদ্ধের পথ বেছে নেয়। বাস্তবতার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে তারা বিকল্প বাস্তবতা তৈরি করার চেষ্টা করে। গুজব, বিভ্রান্তি, অর্ধসত্য ও অপপ্রচার তখন তাদের প্রধান রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে ওঠে।

বিজ্ঞাপন

জার্মান-আমেরিকান রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক তাত্ত্বিক হান্না আরেন্ট তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘The Origins of Totalitarianism’-এ লিখেছিলেন, ‘সর্বগ্রাসী প্রচারণার লক্ষ্য মানুষকে সত্যে বিশ্বাস করানো নয়; বরং এমন এক পরিবেশ সৃষ্টি করা, যেখানে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্যই অর্থহীন হয়ে পড়ে।’

ফ্যাসিবাদী রাজনীতির একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো—বাস্তবতাকে অস্বীকার করা। তারা পরাজয়কে বিজয় বলে। গণঅভ্যুত্থানকে ষড়যন্ত্র বলে। গণহত্যাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বলে। আর জনগণের রায়কে বিদেশি চক্রান্ত বলে চালানোর চেষ্টা করে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে আমরা এই প্রবণতা বহুবার দেখেছি।

১৫ বছরের শাসনামলে রাষ্ট্রের বহু প্রতিষ্ঠান প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়া, দুর্নীতি ও অর্থ পাচার নিয়ে বিস্তর অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের বিচার ও তদন্ত হওয়া একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্বাভাবিক দায়িত্ব। কিন্তু বিচার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অপপ্রচারের মাত্রা বাড়তে দেখা যায়। কারণ ইতিহাস বলছে, জবাবদিহি এড়ানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা।

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্টিভেন লেভিটস্কি এবং ড্যানিয়েল জিবল্যাট তাদের আলোচিত গ্রন্থ ‘How Democracies Die’-এ দেখিয়েছেন যে আধুনিক যুগে অনেক কর্তৃত্ববাদী শক্তি সরাসরি ট্যাংক নামিয়ে নয়, বরং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের ভেতর থেকেই গণতন্ত্রকে দুর্বল করে। তারা নিয়মকানুন ব্যবহার করে নিয়মের চেতনাকে ধ্বংস করে। তারা আরো সতর্ক করেছেন যে গণতন্ত্র টিকে থাকে শুধু সংবিধানের ওপর নয়; রাজনৈতিক শক্তিগুলোর পারস্পরিক সহনশীলতা এবং গণতান্ত্রিক নীতির প্রতি ন্যূনতম অঙ্গীকারের ওপরও।

এখানেই বাংলাদেশের বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। যে রাজনৈতিক শক্তি গণঅভ্যুত্থানকে বৈধ বলে মানে না, যে শক্তি জনগণের আন্দোলনকে সন্ত্রাসবাদ বলে অভিহিত করে, যে শক্তি অতীতের কর্মকাণ্ড নিয়ে আত্মসমালোচনা করতে অস্বীকার করে—তাদের গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে ভূমিকা কী হবে, সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রশ্ন। এই প্রশ্নের উত্তর আবেগ দিয়ে দেওয়া যাবে না। আবার প্রতিহিংসা দিয়েও দেওয়া যাবে না। উত্তর দিতে হবে আইন, বিচার এবং গণতান্ত্রিক নীতির আলোকে।

অনেক লেখক ও কলামিস্ট আজ আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন নিয়ে উদ্বেগ বা আগ্রহ প্রকাশ করছেন। সেটি তাদের অধিকার। গণতান্ত্রিক সমাজে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকতে হবে। কিন্তু একটি বিষয় লক্ষণীয়। এসব আলোচনার একটি অংশে অতীতের অভিযোগ, মানবাধিকার প্রশ্ন, প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের অভিযোগ কিংবা জবাবদিহির প্রয়োজনীয়তা প্রায় অনুপস্থিত। যেন ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়টি বাদ দিয়েই ভবিষ্যতের রাজনীতি লেখা সম্ভব। তা সম্ভব নয়। গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত হলো সত্যের মুখোমুখি হওয়া।

জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এ ঘটনার মূল্যায়ন ইতিহাস করবে। কিন্তু যেকোনো গণঅভ্যুত্থানের ক্ষেত্রেই একটি বিষয় সত্য, তার কারণ, প্রেক্ষাপট ও মানবিক মূল্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনা জরুরি। রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে সেই স্মৃতি সংরক্ষণ প্রয়োজন। কারণ স্মৃতি হারালে সমাজ একই ভুল বারবার করে।

বিশ্ব ইতিহাসে অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে, যেখানে কর্তৃত্ববাদী শক্তি সাময়িকভাবে পরাজিত হওয়ার পর আবার সংগঠিত হয়েছে। তারা নতুন ভাষা ব্যবহার করেছে, নতুন মুখ সামনে এনেছে, কিন্তু পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি বজায় রেখেছে। ফল কখনোই সুখকর হয়নি। জার্মানির ওয়েইমার প্রজাতন্ত্রের দুর্বলতা, লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা কিংবা সমসাময়িক বিশ্বের বহু উদাহরণ দেখায়—গণতন্ত্রের শত্রুরা প্রায়ই গণতন্ত্রের সুযোগ নিয়েই ফিরে আসে।

সুতরাং নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ দুটি। প্রথমত, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা রক্ষা করা। এ দুইয়ের কোনোটিই বাদ দেওয়া যাবে না। যদি বিচার না হয়, তাহলে দায়মুক্তির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হবে। আর যদি আইনের শাসনের পরিবর্তে রাজনৈতিক প্রতিশোধের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, তাহলে গণতন্ত্র দুর্বল হবে।

তবে আরেকটি বিপদও আছে। সেটি হলো অতীতের কর্তৃত্ববাদী শক্তিকে জবাবদিহি ছাড়া পুনর্বাসনের চেষ্টা। যে রাষ্ট্র অপরাধের বিচার সম্পন্ন হওয়ার আগেই রাজনৈতিক সমঝোতার নামে দায়মুক্তি দেয়, সে রাষ্ট্র ভবিষ্যতের সংকটকে আমন্ত্রণ জানায়। কারণ তখন বার্তা যায়—ক্ষমতা থাকলে সবকিছু করা যায় আর ক্ষমতা হারালেও শেষ পর্যন্ত কোনো মূল্য দিতে হয় না। এ ধরনের বার্তা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে না। বরং দুর্বল করে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থান শুধু একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়। এটি রাষ্ট্র, সমাজ এবং মানুষের আত্মত্যাগের ইতিহাস। সেই ইতিহাস বারবার বলতে হবে। রাষ্ট্রীয়ভাবে বলতে হবে। সামাজিকভাবে বলতে হবে। ব্যক্তিগতভাবেও বলতে হবে। কারণ স্মৃতি হারালে জাতি ভুল করে। একই ভুল বারবার করে।

১৫ বছরের স্বৈরাচারী শাসন, দমন-পীড়ন, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং জুলাইয়ের রক্তাক্ত ঘটনাগুলো আড়াল করার চেষ্টা চলছে। ইতিহাসকে মুছে ফেলার এই প্রবণতা নতুন নয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হান্না আরেন্ট সতর্ক করেছিলেন, সর্বগ্রাসী রাজনীতির অন্যতম কৌশল হলো সত্য ও মিথ্যার সীমারেখা মুছে দেওয়া। আর রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্টিভেন লেভিটস্কি এবং ড্যানিয়েল জিবল্যাট দেখিয়েছেন, গণতন্ত্র অনেক সময় বাইরে থেকে নয়, ভেতর থেকেই ধ্বংস হয়।

জুলাইয়ের ঘটনাবলি নিয়ে জাতিসংঘের প্রতিবেদন তাই শুধু একটি নথি নয়। এটি ভবিষ্যতের জন্য সতর্কবার্তা। সেই প্রতিবেদন পড়া উচিত। আলোচনা হওয়া উচিত। নতুন প্রজন্মকে জানানো উচিত।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, নতুন সরকার কী করবে? ইতিহাস বলে, বিচারহীনতা কখনো স্থিতিশীলতা আনে না। জবাবদিহিহীন পুনর্বাসন গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে না। বরং ভবিষ্যৎ সংকটের বীজ বপন করে। যে শক্তি অতীতের ভুলের দায় স্বীকার করে না, তাকে দায়মুক্তির সুযোগ দেওয়া মানে একই বিপদকে আবার আমন্ত্রণ জানানো। সত্যকে স্মরণ করতে হবে। বিচারকে এগোতে দিতে হবে। কারণ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—ফ্যাসিবাদকে ভুলে গেলে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসে।

বাংলাদেশের সামনে আজ সুযোগ আছে একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি নির্মাণের। সেই সংস্কৃতির ভিত্তি হতে হবে সত্য, জবাবদিহি, আইনের শাসন এবং জাতীয় স্বার্থ।

অপপ্রচার দিয়ে সত্যকে দীর্ঘদিন ঢেকে রাখা যায় না। গুজব দিয়ে ইতিহাস বদলানো যায় না। ফ্যাসিবাদী রাজনীতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা এখানেই। তারা সত্যকে ভয় পায়। তাই তারা তথ্যকে আক্রমণ করে। তারা ইতিহাসকে আক্রমণ করে। তারা স্মৃতিকে আক্রমণ করে।

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে আমরা সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে পারি কি না—ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে পারি কি না এবং আইনের শাসনকে রাজনৈতিক সুবিধার ঊর্ধ্বে রাখতে পারি কি না, এর ওপর— এটাই সময়ের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

লেখক : সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...