বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের হস্তক্ষেপ

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের হস্তক্ষেপ

আমাদের ভৌগোলিক, রাষ্ট্রীয় এবং সমষ্টি আমানতদারি, স্বশাসন, কর্তৃত্ব এবং সর্বোপরি আমাদের স্বাধীনতা রক্ষার অন্যতম উপায় বৈদেশিক নীতির প্রশ্নে পারস্পরিক সমান মর্যাদাপূর্ণ পথে নিজস্ব স্বার্থ, প্রয়োজন, সুযোগ, সম্ভাবনা, ভূ-রাজনীতি, অর্থনীতিসহ যাবতীয় বৈষয়িক বিষয়কে সমাধা করার জন্য পলিটিক্যাল প্র্যাগমেটিজম ও ভিশনারি লিডারশিপ হাসিল করা। সবচেয়ে জরুরি হচ্ছে অভ্যন্তরীণ ও বিদেশনীতি প্রশ্নে ব্যালেন্সড অবজেকটিভিটি বা ভারসাম্যমূলক বাস্তববোধ। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ যিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা রক্ষা করতে চেয়েছিলেন এবং নিজে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন, সেক্টর কমান্ডার ছিলেন, নিজে জেড ফোর্সের প্রধান ছিলেন এবং তার শত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তিনি কিন্তু বাংলাদেশকে সম্মানের জায়গায়, মর্যাদার জায়গায় নিয়ে যেতে পেরেছিলেন। এটা তখন ভারতকে এক ধরনের সমতার জায়গায় আসতে বাধ্য করে। ফারাক্কা চুক্তির ব্যাপারে, গঙ্গার পানি ন্যায্য বণ্টনের প্রশ্নে গ্যারান্টি ক্লজ এবং আরবিট্রেশন ক্লজ নিশ্চিত করতে পেরেছিলেন।

গ্যারান্টি ক্লজ হচ্ছে বছরের কোন সময় কতটুকু পানি দেবে ভারত বাংলাদেশকে। আর আরবিট্রেশন ক্লজ হচ্ছে যদি তুমি গন্ডগোল করো, তাহলে আমরা জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক আদালত বা আমাদের বন্ধুস্থানীয় অন্যদের কাছে যেতে পারব। আরেকটা কৌশল তিনি গ্রহণ করেছিলেন। সেটি হচ্ছে সার্কের মাধ্যমে। সার্কের সত্যিকারের চিন্তাটি হচ্ছে জিয়াউর রহমানের, যদিও এরশাদের সময় এই সংগঠন কার্যকর হয়েছিল। জিয়াউর রহমানের মাথায় এটি এসেছিল কেন? তিনি ভেবেছিলেন স্টেটসম্যান হিসেবে। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, হাঙররূপী ভারতকে মোকাবিলা করা ছোট বাংলাদেশের পক্ষে কষ্টকর। তাহলে কী করতে হবে? বাংলাদেশকে অন্য ভাই-ব্রাদার, প্রতিবেশী ও বৈশ্বিক পর্যায়ে বন্ধুদের সঙ্গে নিতে হবে, যাতে করে নিছক বাইলেটারালিজমের বাইরে গিয়ে মাল্টিলেটারালিজমের ছাতার নিচে পৌঁছে একদিকে ভারতকে কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা যায় এবং অন্যদিকে পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে আঞ্চলিক শক্তি বৃদ্ধি ও উন্নয়ন সাধন করা যায়। এভাবেই দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলো, পরে যেটা আফগানিস্তানে সম্প্রসারিত হয়েছে, তা সম্ভব হয়। সবাইকে নিয়ে একটা মাল্টিল্যাটারালিজমের ভিত্তিতে কাজ করার চিন্তাটি ছিল এক ধরনের দূরভিসারী দৃষ্টির পরিচায়ক। যেমন ভারত আমাদের ভুটান বা নেপালে যেতে দেয় না; আটকে দেয়। আমাদের এখান থেকে ভারতের সব মালামাল নিয়ে শত শত ট্রাক আসছে। কিন্তু প্রথম যেদিন নেপাল থেকে আসছিল, তার ১৭ মিনিটের মাথায় ভারত বন্ধ করে দিল। তাদের ইচ্ছা যেতে দেবে না।

বিজ্ঞাপন

ভারতের বাজারে আমাদের কোনো মালামাল যায় না, খুব কম; কিন্তু ভারত থেকে আসে সব মালামাল। ফলে বাণিজ্যে একটা প্রবল অসাম্য তথা অসম বাণিজ্য দেখা দিয়েছে। দ্বিতীয়ত, ডাউনস্ট্রিম বা ভাটির বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক ট্রান্সবর্ডার নদীগুলোর আপস্ট্রিম বা উজান থেকে নেমে আসা নদীগুলোর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ আটকানো সব আন্তর্জাতিক আইনে অবৈধ। অথচ কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে ভারত ব্যারাজ, ড্যাম, গ্রোয়েন প্রভৃতির মাধ্যমে রিজার্ভার ও বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ নিজ ভূখণ্ডের ভেতর সংযোগ খালের মাধ্যমে একতরফা পানি প্রত্যাহার করে চলেছে এবং নদীগুলোর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ও গতি আটকে দিয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে ২০-ঊর্ধ্ব জেলায় সেচ, চাষাবাদ, কৃষি উৎপাদন, মৎস্যসম্পদ, বৃক্ষরাজির মারাত্মক ক্ষতিসহ কয়েক কোটি মানুষের জীবিকা নির্বাহ ভয়ানক বিপদে পড়েছে। এটা আমাদের দেশে বৃষ্টি, তাপমাত্রাসহ বন ও পশুসম্পদকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এতে করে আমাদের প্রাণ-প্রকৃতিতে তথা পুরো ইকোলজিক্যাল ভারসাম্য প্রচণ্ড ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। পানির স্তর ১২০ থেকে ১৫০ ফুট নিচে নেমে গেছে। ফলে আর্সেনিক কন্টামিনেশন বা দূষণের ফলে মানবদেহে এর প্রবল স্বাস্থ্যগত অসুস্থতা ও স্থায়ী বিনাশক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। মৎস্য ও কৃষি ফসলের ক্ষতিকর প্রভাব অত্যন্ত বেশি হওয়ায় আমাদের মানুষদের ফুড চেইন বা খাদ্যচক্র বিরাট হুমকির সম্মুখীন। কিন্তু হিন্দু আধিপত্যবাদী ভারত তা অগ্রাহ্য করছে, আমলে নিচ্ছে না বাংলাদেশকে চাপে ও কব্জাকৃত রাখার জন্য। বিশাল সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়াসহ এক্ষেত্রে পানি না দিয়ে মারা এবং পানিতে ডুবিয়ে মারার জন্য তাদের সাংবৎসরিক পৌনঃপুনিক কালকূট অপকৌশল একমাত্র ঘৃণিত ইহুদি সন্ত্রাসী ইসরাইলের সঙ্গেই তুলনীয়। তারা দক্ষিণ এশিয়ায় মুসলিম নিধনে উন্মাদ হয়ে অসভ্য দিগম্বর নৃত্য প্রদর্শন করছে। আন্তর্জাতিক ট্রান্সবর্ডার নদী গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও বরাক নদীর পানি আটকে দিয়ে বাংলাদেশের পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, সুরমাসহ পুরো রিভার সিস্টেমকে ধ্বংস করে ফেলছে। আমাদের এখানে প্রতিবছর দুবার বন্যায় ডুবিয়ে মেরে ফেলা এবং দুবার খরায় শুকিয়ে মেরে ফেলার ঘৃণ্য অসূয়া ও হীন মতলবি সংকীর্ণ স্বার্থে ভারত উপরোক্ত কুকাজ করে চলেছে।

হিন্দুত্ববাদী হিন্দুস্তান বাংলাদেশের প্রতি নিত্যদিন অসভ্য আচরণ করে যাচ্ছে। উত্তরবঙ্গের নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, রংপুরসহ বিশাল অঞ্চলে তিস্তা অববাহিকার করুণ হালের প্রকৃত চিত্র দৃশ্যমান। স্বাধীনতার পরপরই সর্বগ্রাসী শোষণের মাধ্যমে ভারত বাংলাদেশকে যে দুর্বল অবস্থানে নিয়ে যায়, সেখান থেকে উত্তরণের জন্য ভাসানী, ফারাক্কা কমিটি এবং জনগণের সমর্থনে কিছু পাবলিক ইন্টেলেকচুয়াল তাদের ক্ষেত্রে নিজ নিজ প্রচেষ্টা, উদ্যোগ, লেখালেখি, সেমিনার, প্রতিবাদ, মিটিং-মিছিল ও লং মার্চ করেছিলেন আল্লাহর রহমতে। আরো একজন চেষ্টা করেছিলেন। তার নাম জিয়াউর রহমান। ভারতের মুরারজি দেশাইয়ের সঙ্গে গ্যারান্টি ক্লজ ও আরবিট্রেশন ক্লজসহ গঙ্গার পানির বণ্টন চুক্তি করেছিলেন, যেটা হাসিনার প্রথম শাসনকাল ও দ্বিতীয় ফ্যাসিবাদী শাসনের দীর্ঘকালে শেষ পর্যন্ত হিন্দু আধিপত্যবাদী দাদাদের শুভেচ্ছার মাঝেই একেবারে সীমিত হয়ে গিয়েছিল। জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তিনি যেটা করেছিলেন, তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্র চাইতে গিয়ে যতখানি উদার হয়েছিলেন, তাকে ততখানি প্রত্যাঘাত করা হয়েছিল। তিনি শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করেন। এর আগে পিপিআর বা রাজনৈতিক দলবিধি ১৯৭৬ অনুযায়ী মুজিব কর্তৃক বিলুপ্ত আওয়ামী লীগ এবং মোশতাক কর্তৃক নিষিদ্ধ বাকশালকে আস্তাকুঁড় থেকে মুচলেকাসহ তুলে এনে পুনর্বাসিত করেছিলেন। আদতেই ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি মাত্র ১৩ মিনিটের মাথায় ডিক্টেটর ও ফ্যাসিস্ট মুজিব কলমের এক খোঁচায় দলদাসদের কণ্ঠভোটে আওয়ামী লীগকে বাতিল করে একদলীয় বাকশাল কায়েম করেন হিটলারি কায়দায়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট গোষ্ঠীসহ তিরোধানের পর ওই তারিখেই খন্দকার মোশতাক বাকশাল বাতিল করে দেন এবং সামরিক আইন জারি করেন। অর্থাৎ আওয়ামী লীগ ও বাকশাল বাতিল হয়েছে তাদের নিজেদের দ্বারাই। আর মুচলেকা দিয়ে পুনর্বাসিত হয়েছে জিয়াউর রহমানের দ্বারা ১৯৭৬ সালের পিপিআরের মাধ্যমে। শেখ মুজিবের মন্ত্রিসভার সদস্য খন্দকার মোশতাকের ক্যাবিনেটে ১৫ আগস্ট সন্ধ্যার সময় মুজিবের লাশ ৩২ নম্বরের সিঁড়িতে পড়ে থাকা অবস্থাতেই তার পতিত স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে শপথ নিয়েছিলেন। নতুন বাংলাদেশ গড়ার জন্য অভ্যুত্থানের নায়ক সামরিক অফিসারদের, সূর্যসন্তানদের অভিনন্দন জানিয়ে বঙ্গভবনে আওয়ামী নেতারা শপথ গ্রহণ করেছিলেন গণভাবে মন্ত্রী হয়ে। সেখানে অন্য দলের কেউ ছিল না। শুধুই ছিল হস্তকর্তিত কৃষ্ণ কোটধারী মুজিবের চামচারা, যারা মুহূর্তের মধ্যে ভোল পাল্টে ফেলেছিল।

আওয়ামী-বাকশালীরা দুর্বৃত্ত ও দখলদারির আচরণ করেছে, কয়েক লাখ দুর্ভিক্ষে মেরেছে। নজিরবিহীন লুটপাট, মজুতদারি, ব্যক্তিগত আখের গোছানো, দলদাসদের সম্পদ বৃদ্ধি, চোরাকারবারের মাধ্যমে হিন্দুস্তানে পাচার এবং দল, সরকার, প্রশাসন, কাঠামো, বিধি-বিধান ও কার্যকারিতা প্রভৃতি সব ক্ষেত্রে অত্যন্ত নিচু মান এবং নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনার লজ্জাজনক ব্যর্থতার ফলেই দুর্ভিক্ষ হয়েছিল ১৯৭৪ সালে এবং কয়েক লাখ বনিআদম মৃত্যুবরণ করেছিল। খাবার থাকা সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রে পৌঁছায়নি। আওয়ামী ক্ষমতাধর ও দলদাস মস্তানদের লুটপাটের ফলে অগ্নিমূল্য হয়ে গিয়েছিল জিনিসপত্রের দাম। যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স ফাইনালে অধ্যয়নরত ছিলাম, তখন ঢাকার রাস্তায় রাস্তায় নিজেই দেখেছি, কীভাবে লাশের পর লাশ উলঙ্গ পড়ে আছে; কঙ্কালসার দেহ, মাছি ভনভন করছে। এ রকম একটা অবস্থায় ৩০ হাজারের ওপরে বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীকে মুজিব সরকার হত্যা করেছে, ধর্ষণ চলেছে নিত্যদিন। নববধূ, বয়স্ক নারী অনেকেই রক্ষা পায়নি। এটার পুনরাবৃত্তি আমরা দেখি হাসিনার প্রথম স্বেচ্ছাচারী আমলে এবং পরবর্তী দীর্ঘ প্রলম্বিত নিকৃষ্টতম ফ্যাসিবাদ চলাকালে। হাসিনার সময় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের সোনার ছেলে তৎকালীন প্রক্টরের শ্যালক বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক জসীম উদ্দিন বীরদর্পে ধর্ষণের সেঞ্চুরি পূর্ণ করে ভোজ অনুষ্ঠান করেছিল। কয়েক দফা গণহত্যার পর শেষ গণহত্যাটি হাসিনা সংঘটিত করে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান ও বর্ষাবিপ্লবের সময়।

তাহলে দেখা যাচ্ছে, পিতা ও কন্যা দুজন দুটো কাজ করেছেন একইভাবে। একদিকে দেশের মধ্যে ফ্যাসিবাদী শাসন কায়েম করেছেন, যেটা চরম বর্বরতম রূপে এসেছে পিতা থেকে শুরু করে। এই তো হলো আমাদের স্বাধীনতা হরণকালের প্রকৃত ইতিহাস এবং সেইসঙ্গে আমাদের রাজনীতির প্রেক্ষাপট ও সীমান্তের ওপারের হিন্দু আধিপত্যবাদী দাদাবাবুদের দাদাগিরির মধ্যকার নেক্সাস।

এই ফ্যাসিবাদকে টিকিয়ে রাখার জন্য যা যা করা হয়েছে, সে ব্যাপারে আমরা কিছু ভুল হিসাব করি। আমরা ২০০৮ সালের নির্বাচনটা দেখি না, যেটা ফ্যাসিস্ট হাসিনার প্রিয় এবং ঘোষিত কাকাবাবু তথা প্রণব মুখার্জীর ‘কোয়ালিশন ইয়ারস’ বইতে তিনি নিজেই স্পষ্ট করেছেন; বলেছেন, হাসিনাকে জেতানোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল। খালেদা জিয়াকে সরানোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল। মইন ইউ আহমেদকে তার অপরাধ ঢেকে ফেলার পাশাপাশি একইসঙ্গে সেফ এক্সিট দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এসব কিছুর বিনিময়ে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় আনা হয়েছিল। এভাবেই ১৩৩টি কনস্টিটুয়েন্সির ডেলিমিটেশন এমনভাবে করা হয়েছিল; যেগুলোতে বিএনপি জিততে পারত, সেগুলোতে বিএনপিকে হারানো হয় এবং হাসিনা ও আওয়ামী লীগ সরকারে বসে যায়। এভাবেই দাদাগিরির দাপট ও দস্যুতা বাংলাদেশের ওপর চেপে বসে। হিন্দুস্তানি হিন্দুত্ববাদী হেজেমনির ঐতিহাসিক প্রকল্প এভাবে বাংলাদেশের বুকে বাস্তবের পাটাতনে নেমে পড়ে। ’২৪ ছিল এর বিরুদ্ধেই বিদ্রোহ। কিন্তু জুলাইয়ের বর্ষাবিপ্লবের প্রায় দুই বছর হতে চলল, গণমানুষের যে প্রত্যাশা ছিল, পুরোনো ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা বদলে দিয়ে রাষ্ট্র সংস্কারের যে প্রত্যাশা ছিল, তার কতটুকু বাস্তবায়িত হলো? বাস্তবে আছে শুধু লোকরঞ্জক গালভরা বুলি। তরুণরা, জেন-জি গেল বিভ্রান্তিতে পড়ে বিভক্ত হয়ে। কে হবে ভ্যানগার্ড? তাই ’৭১-এর নামাবলি জপে ’৭২-এর দিল্লি কর্তৃক প্রেসক্রাইবড সংবিধান ও গঠনতন্ত্র রয়েই গেল। এস্টাব্লিশমেন্ট, স্ট্যাটাসকো, অলিগার্ক, লুম্পেন নেতৃত্ব, আমলাতন্ত্র, পুলিশ-র‍্যাব-গোয়েন্দা-সেনাবাহিনী সবই রয়ে গেল আগের মতো; পলেস্তারা আর প্রোপাগান্ডা দিয়ে ঢাকা গেল না। ডিকনস্ট্রাকশন করে রিকনস্ট্রাকশন করার পথে এগুনো গেল না। দৃষ্টিভঙ্গি, সংস্কৃতি, আচরণ, নিয়ম-বিধান, কাজকর্ম, অফিস-আদালত, দুর্নীতি, লুচ্চামি, বখরার কাড়াকাড়ি ও দখলি স্বত্ব অক্ষত থাকল।

নির্বাচিত সরকারকে অবশ্যই দ্রুততম সময়ের মধ্যে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে। মানুষ দেখতে চায় বর্তমান নির্বাচিত সরকার জুলাই চেতনা ধারণ করে গণরায়কে বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। আমরা ফ্যাসিবাদের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য গণঅভ্যুত্থান সফল করে একটা নতুন বন্দোবস্ত আনার সুযোগ পেয়েছি। এই প্রথম একাত্তরের পথ ধরে চব্বিশে এসে আমরা নতুন করে স্বাধীন হয়েছি, দ্বিতীয় স্বাধীনতা পেয়েছি—ফ্যাসিবাদের হাত থেকে মুক্ত হয়ে এবং হিন্দুস্তানি রাজরাজত্বের কাল্পনিক আধিপত্যবাদকে তাড়িয়ে দিয়ে। কোনোভাবেই এই সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করা উচিত নয়। সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। এবারের গণঅভ্যুত্থান ও বিপ্লব ঘটেছে সামন্ত রাজনৈতিক মাতব্বর চক্রের ইচ্ছার বাইরে গিয়ে। এটা ঘটেছে স্বাধীনভাবে ছাত্র-জনতার দ্বারা—প্রথমবারের মতো ভারতের সাহায্যে নয়, চীনের সাহায্যে নয়, কিংবা আমেরিকার সাহায্যে নয়। শুধু বাংলাদেশের জনগণ আল্লাহর প্রতি ভরসা করে, আল্লাহরই সাহায্যে, আল্লাহরই অপার অনুগ্রহে নিজেদের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার মাধ্যমে ফ্যাসিবাদকে উৎখাত করতে পেরেছে।

তাই বাংলাদেশে আবার ফ্যাসিবাদ পুনঃপ্রতিষ্ঠার কোনো স্পেস রাখা যাবে না। জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে শেখ হাসিনাকে ইন্ডিয়ান স্যাংচুয়ারি থেকে দেশে আসার অনুমতি দিয়ে যে ভুল করেছেন, সেটি কোনোভাবেই দ্বিতীয়বার করা যাবে না।

লেখক: প্রফেসর (অব.), রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন