নিউটনের তৃতীয় সূত্র মোতাবেক ‘প্রত্যেকটি ক্রিয়ারই সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে’। অনেক বিতর্ক এবং টানাপোড়নের পর ডাকসু-জাকসু নির্বাচন হয়ে গেল। নির্বাচনের ফল অনেকের কাছেই অপ্রত্যাশিত ছিল। যারা প্রত্যাশা করছিলেন এমন বিজয়, তাদের মধ্যেও দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল। বিশেষ করে সাধারণ মানুষের মধ্যে এই ফল বিরাট এক ঔৎসুক্য ও আগ্রহের সৃষ্টি করেছেÑএতে কোনো সন্দেহ নেই। মাঠে-ঘাটে-বাটে শুধুই ডাকসু-জাকসু নির্বাচন। চায়ের পেয়ালায় ঝড় তুলছেন অনেকেই। ফল ঘিরে যে প্রশ্নটি সবাই করছেনÑছাত্রদলের অনাকাঙ্ক্ষিত ভরাডুবি কেন হলো? কেউবা আগামী জাতীয় নির্বাচনে এই বিজয়ের ঘাত-প্রতিঘাত তথা ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া নিয়ে বিস্তর গবেষণা করছেন। দীর্ঘকাল পর এই দুটো নির্বাচন আসলেই যথার্থ মূল্যায়নের অপেক্ষা রাখে। এই নির্বাচনের ফল কি স্বাভাবিক? নাকি অস্বাভাবিক? এটি কি সত্যিকার অর্থে আপামর জনসাধারণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিধ্বনি করে? নাকি অন্যকিছু? ইত্যাকার প্রশ্ন জনসাধারণের মনোজগতে প্রশ্ন তুলছে বারবার।
প্রথমত, নির্বাচনের প্রেক্ষাপটটি বোঝা যাক। মনে রাখতে হবে, ২০২৪ সালের পরবর্তী পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে এই নির্বাচন দুটো হলো। আবার এটি কোনো দলীয় সরকারের আমলের গৃহীত ভোট নয়। সবাই জানে একটি নির্বাচিত সরকারের অধীনে এ ধরনের পরোক্ষ নির্বাচনেও তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশের ৫৪ বছরে দলীয় সরকারের আমলে যে কটি ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়েছে, কমবেশি সেখানে সরকারি প্রভাব অনুভূত হয়েছে। এ জন্যই হয়তো ডাকসু-জাকসু নির্বাচনের আগে কোনো কোনো ছাত্রসংগঠন জাতীয় নির্বাচনের পর ছাত্র সংসদের নির্বাচন দাবি করছিল। ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া এখনো ক্যাম্পাসগুলোকে তাড়িত করছে। দলীয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণের ফলে তাদের মধ্যে কিছুটা বিভাজন দেখা দিয়েছে বটে, কিন্তু সাধারণ ছাত্রসমাজের মধ্যে তাদের যে প্রভাব-প্রতিপত্তি রয়ে গেছেÑসেটি নির্বাচনি ফলকে প্রভাবিত করছে বলে অনুভূত হচ্ছে। রাজনৈতিক দলের সরাসরি প্রতিনিধিত্ব করে এমন সব রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠনগুলো নির্বাচনে ভালো করেনি। লক্ষণীয় যে ছাত্রশিবির তাদের একটি রাজনৈতিক পরিচয় সত্ত্বেও সাধারণ ছাত্রসমাজের ব্যানারে নানা পথ ও মতের শিক্ষার্থীদের একত্র করেই তারা ভোট প্রার্থনা করেছে। এতে তারা সফল হয়েছে। রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি নিয়ে অভ্যুত্থান-পরবর্তীকালে বড় ধরনের নেতিবাচক চিন্তা ছাত্রসমাজকে আকীর্ণ করে। ছাত্ররা লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি অবসানের জন্য আন্দোলনও করে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার ছাত্রদের এই সংবেদনশীল দাবিটি নিয়ে একদম নিশ্চুপ ও নিস্পৃহ থাকে। তার কারণ ওই একটি শব্দ ‘সংবেদনশীলতা’। অথচ এ সরকারের মতো দলীয় পরিচয়হীন ও দেশপ্রেমসঞ্জাত একটি সরকারের পক্ষেই সম্ভব ছিল ছাত্ররাজনীতিকে একটি সুশৃঙ্খল কাঠামোতে ধারণ করার। একটি আইনকানুন অধ্যাদেশ ও বিধিব্যবস্থা দ্বারা ছাত্ররাজনীতিকে সুন্দর এবং সুচারুভাবে পরিচিত ও পরিচালিত করার সুবর্ণ সুযোগ এই সরকারের ছিল। এই সুযোগটি তারা হেলায় হারালেন।
বাংলাদেশে অতীতের ছাত্রসংগঠনগুলোর গৌরবময় ইতিহাস আছেÑএতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু বিগত দেড় যুগ ধরে যে ছাত্ররাজনীতির অন্যায়, অত্যাচার, অনিয়ম, অবিচার ছাত্রসমাজ ভোগ করেছে, তা তাদের সরকারি ছাত্রসংগঠন সম্পর্কে ভীতির দিকে ধাবিত করেছে। জনসাধারণের মধ্যে বিএনপি এর অসম্ভব জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও ছাত্রসমাজের মধ্যে তাদের এই নেতিবাচক অবস্থানের প্রধান কারণই হলো ‘সরকারি ছাত্রসংগঠনভীতি’। বিএনপি ক্ষমতায় এলে তাদের ছাত্রসংগঠন ছাত্রদল ক্যাম্পাসে নিরঙ্কুশ আধিপত্যে এমনি এমনিতেই আসবেÑএটাই স্বাভাবিক ধারণা। আর তাই যদি হয়, তাহলে অতীতে ছাত্রলীগ যা করেছে, ছাত্রদলও তাই করবেÑএমন ভীতিই ছাত্রসমাজকে পেয়ে বসে।
তাছাড়া ছাত্রশিবির প্রচলিত ছাত্রসংগঠনগুলো থেকে ভিন্নতর একটি সংগঠন। তারা নিজেদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে দাবি করে। তাদের আবার সাংগঠনিক স্তরক্রম আছে। তাদের সাংগঠনিক ভিত্তি অত্যন্ত সুদৃঢ়। পুরো ছাত্রসমাজের মধ্যে ছাত্রকল্যাণমূলক কার্যধারা দ্বারা তারা ছাত্রসমাজের আস্থা অর্জন করেছে। ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে পর্দার অন্তরালে তাদের যে সুশৃঙ্খল ও সুপরিকল্পিত ভূমিকা ছিল, সেটি এখন তাদের পুঁজি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একটি জনপ্রিয় দৈনিকের রাজনৈতিক ভাষ্যে বলা হয়, গত এক বছরে জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্বের যে ন্যারেটিভ দাঁড় করানো হয়েছে, তা ভোটারদের প্রভাবিত করেছে। গণঅভ্যুত্থানের মালিকানা নিয়ে যে বাহাস ছিল, সেখানে শিবির বলেছে, গণঅভ্যুত্থানের মূল পরিকল্পনা থেকে আন্দোলনের নেতৃত্বের সবকিছুতে যেমনÑপ্রোফাইল লাল করা, এক দফার দাবি, স্লোগানÑসবকিছুর মূলে ছিল তারা। এটি গুরুত্বপূর্ণ যে, তারা তখন পরিচয় সামনে আনেনি। স্বাধীনতার পর থেকে যে ধারার রাজনীতি প্রচলিত, তার থেকে বর্তমান প্রজন্ম আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। নানা বৈষম্যের বিপরীতে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর নানা প্রতিশ্রুতিতে তাদের সুযোগ দেওয়ার কথা তরুণ প্রজন্ম বিবেচনা করেছে বলে মনে করেন সাবেক এক ছাত্রনেতা। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ইসলামপন্থীরা যে ভূমিকা পালন করেছেন, সেটা না হলে শেখ হাসিনার শক্তিশালী শাসনের হাত থেকে মুক্ত হওয়া যেতে না। এটি সিমপ্যাথি হিসেবে হয়তো কাজ করেছে বলে মনে করেন একজন সাবেক ছাত্রনেতা। তবে শিবিরও যদি ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী পথে যায়, তবে তাদের বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ সংঘটিত হতে বেশি সময় লাগবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি। কিন্তু এই দলটির রাজনৈতিক আদর্শের সঙ্গে ‘লিবারেল ডেমোক্রেটিক’ ধারার রাজনীতি যায় কি নাÑসে প্রশ্নও রয়েছে তার।
গত এক বছরে জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্বের যে ন্যারেটিভ দাঁড় করানো হয়েছে, তা ভোটারদের প্রভাবিত করেছে। গণঅভ্যুত্থানের মালিকানা নিয়ে যে বাহাস ছিল, সেখানে শিবির বলেছে, গণঅভ্যুত্থানের মূল পরিকল্পনা থেকে আন্দোলনের নেতৃত্বের সবকিছুতে যেমনÑপ্রোফাইল লাল করা, এক দফার দাবি, স্লোগানÑসবকিছুর মূলে ছিল তারা। এটা গুরুত্বপূর্ণ যে, তারা তখন পরিচয় সামনে আনেনি। স্বাধীনতার পর থেকে যে ধারার রাজনীতি প্রচলিত, তার থেকে বর্তমান প্রজন্ম আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। নানা বৈষম্যের বিপরীতে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর নানা প্রতিশ্রুতিতে তাদের সুযোগ দেওয়ার কথা তরুণ প্রজন্ম বিবেচনা করেছে বলে মনে করেন সাবেক এক ছাত্রনেতা। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে র্যাডিকেল ইসলামিস্ট শক্তি যে ভূমিকাটা নিয়েছে, সেটি না হলে শেখ হাসিনার শক্তিশালী শাসনের হাত থেকে মুক্ত হওয়া যেত না। এটি সিমপ্যাথি হিসেবে হয়তো কাজ করেছে বলে মনে করেন একজন সাবেক ছাত্রনেতা। তবে শিবিরও যদি ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী পথে যায়, তবে তাদের বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ সংঘটিত হতে বেশি সময় লাগবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি। কিন্তু এই দলটির রাজনৈতিক আদর্শের সঙ্গে ‘লিবারেল ডেমোক্রেটিক’ ধারার রাজনীতি যায় কি না, সে প্রশ্নও রয়েছে তার।
এসব তাত্ত্বিক কারণের বাইরেও ছাত্ররাজনীতি সম্পর্কে ধারণা ও অভিজ্ঞতা রাখেন এমন একজন বুদ্ধিজীবী বলেন, অভ্যন্তরীণ কোন্দল, সঠিক প্রার্থী বাছাইয়ে ব্যর্থতা এবং নেতিবাচক ইমেজের কারণে ডাকসু-জাকসুতে ছাত্রদল-সমর্থিত প্রার্থীদের ভরাডুবি ঘটেছে। ছাত্রলীগের স্থলে ছাত্রদলকে মনোজগতে স্থাপন করে সাধারণ ছাত্ররা সম্ভাব্য ভীতির অবসান চেয়েছে। ছাত্রদল এক বছরে যে ইমেজ তৈরি করেছে, সেটিও তাদের পক্ষে যায়নি। তারা ছাত্রসমাজের সামনে বিনয়ী, কর্তব্যপরায়ণ, ছাত্রবান্ধব ও কল্যাণকামী প্রমাণ করতে পারেনি। তাদের নেতিবাচক কর্মের একটি উদাহরণ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সঙ্গে এক ছাত্রদল নেতার বেয়াদবির তুলনা করা যেতে পারে। এ ধরনের আচরণ যে তারা নতুন করে করেছে তা নয়, অতীতেও এ ধরনের অনেক আচরণের জন্য তাদের দায়ী করা হয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল ভোটগ্রহণ চলা অবস্থায় নির্বাচন বর্জন করে তাদের প্রাপ্ত ভোট আরো কমিয়েছে। অন্যদিকে অন্যান্য প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠন ঐক্যের মাধ্যমে শিবিরকে মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়েছে। এরা সংখ্যায় যদিও কম, তাদের সবারই নিজস্ব ক্ষেত্রে বুদ্ধিবৃত্তিক ইমেজ রয়েছে। ছাত্রশিবিরের একক শক্তির মোকাবিলায় তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে লড়তে পারলে হয়তো নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে পারত। ছাত্রশিবির আত্মপ্রকাশের পরপরই সামাজিক ও শিক্ষাবান্ধব কর্মসূচি দিয়ে হলে হলে তাদের ভিন্নতর ইমেজ তৈরি করতে পেরেছে। ফলে জাতীয়তাবাদী শক্তির একটি গরিষ্ঠ ইমেজ থাকা সত্ত্বেও অবশেষে ছাত্রশিবিরের শিক্ষাবান্ধব রাজনীতির কাছে তারা পরাজিত হয়েছে। এছাড়া ছাত্রশিবির স্বনামে নির্বাচন না করে বিভিন্ন মত ও পথের যে সমন্বয় ঘটিয়েছে, তা ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। অনেকেই মনে করেন, এবারের ডাকসু-জাকসু নির্বাচনে দলের ইমেজের চেয়েও পৃথকভাবে ব্যক্তি ও নেতৃত্বের মূল্যায়ন করেছে ছাত্রসমাজ। ভোট গণনার ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দ্রুত ও পরিচ্ছন্ন সিদ্ধান্ত দিতে পেরেছে। অন্যদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ভোট দেওয়ার তৃতীয় দিনে ফল ঘোষণা করে তাদের ইমেজের ক্ষতি করেছে। যে ধরনের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তারা ফল ম্যানুয়ালি গণনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তা ছিল ঠুনকো ও হাস্যকর। তা সৎভাবে অতিক্রম করার সাহস প্রশাসনের দেখানো উচিত ছিল। ছাত্রশিবির সুবিধা পেয়েছে ছাত্রদল ও প্রগতিশীল ছাত্রদলগুলোর অনৈক্যের কারণে। অভিযোগ আছে, গণঅভ্যুত্থানের পর ছাত্রদল ও বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থীদের কিছু কিছু কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে ডাকসু ও জাকসু নির্বাচনে। এ ধারার ছাত্রনেতৃত্ব স্বীকার করে, শিক্ষার্থীদের নির্বাচনি মনস্তত্ত্বে বিরাট পরিবর্তন এসেছে। তারা আর গতানুগতিক ধারায় ছাত্ররাজনীতিকে দেখতে চাচ্ছে না। সাধারণ শিক্ষার্থীরা দেখছে, বড় বড় ছাত্রনেতৃত্বের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কোনো পরিবর্তন হয়নি। তারা ‘শিক্ষার্থীদের অধিকারের কথা বলে শিক্ষকদের সঙ্গে রূঢ় ও অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন’। বড় বড় ছাত্রনেতার বিরুদ্ধে বড় বড় চাঁদাবাজির অভিযোগ আছে। ডাকসু নির্বাচনের প্রাক্কালে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ছাত্রনেতারা একে অন্যের বিরুদ্ধে অযাচিত আস্ফালন করেছেন। সাধারণ ছাত্রসমাজ এটাকে ভালোভাবে নেয়নি।
এটা স্বীকার করতেই হবে, ডাকসু-জাকসু নির্বাচন সুষ্ঠু, সুন্দর ও নিরপেক্ষ হয়েছে। পরাজয়কে মানতে না পারার মানসিকতা থেকে ছাত্রনেতারা যা বলছেন, তা গ্রহণযোগ্য নয়। এ দুটো নির্বাচনে ৭৫ শতাংশ ভোট পড়েছে। সাধারণভাবে বলাই যায়, দীর্ঘকাল ধরে বঞ্চনার ফল তারা আশা আনন্দ দিয়ে উদযাপন করেছে। ভোটে যে দল নয় ব্যক্তি প্রাধান্য পেয়েছে, জাকসুতে ভিপি স্বতন্ত্র প্রার্থীর জয়লাভ করা তার প্রমাণ। একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক মন্তব্য করেন, ‘এই রায় যতটুকু না শিবিরের পক্ষে, তার চেয়ে বেশি আক্রমণাত্মক আচরণ ও বক্তব্যের বিপক্ষে’। এই নির্বাচনে ভোটের ব্যবধান এত বেশি যে, তা নিয়ে আর প্রশ্ন করার যৌক্তিকতা থাকে না।
ডাকসু-জাকসু নির্বাচন জাতীয় নির্বাচনের প্রতিফলন কি নাÑএ রকম কঠিন প্রশ্নের জবাব দেওয়া কঠিনই বটে। ডাকসু নির্বাচন বাংলাদেশ রাজনীতির ব্যারোমিটার বলা হয়, যা ঘটে এখানে তা ঘটবে সর্বত্রÑএ রকম সমীকরণ অনেকের। ডাকসুকে মিনি পার্লামেন্ট বলেও অভিহিত করা হয়। অতীতে ডাকসু নির্বাচনের ফল রাজনীতিকে প্রভাবিত করেছেÑএ রকম উদাহরণও আছে। আবার কোনোই প্রভাব ফেলেনি এ রকম উদাহরণ খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে না। ১৯৭২ সালে দেশের প্রথম নির্বাচনে ছাত্র ইউনিয়ন নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে। পরে বশংবদ আওয়ামী রাজনীতি অনুসরণ না করে তল্পিবাহক ভূমিকার কারণে তা আর চলমান রাজনীতিতে প্রভাব ফেলেনি। উল্টো আওয়ামীবিরোধী জাসদের রাজনীতি বিপুলভাবে জনপ্রিয়তা পায়। আবার ১৯৯০ সালে অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদল মনোনীত প্রার্থী আমান উল্লাহ আমান পরিষদ নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। ডাকসু নির্বাচন থেকে এ বিজয়ের আভাস পাওয়া যায়।
ডাকসু-জাকসু নির্বাচন অবশেষে জাতীয় নির্বাচন কতটা প্রভাবিত করবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে এই মুহূর্তে নিঃসন্দেহে এটি জামায়াত তথা ইসলামি রাজনীতির উৎসাহ-উদ্দীপনার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। আগামী জাতীয় নির্বাচনে তারা ঐক্যবদ্ধ হলে মাঠে-ময়দানে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় অর্জন করতে পারে। এ বিজয়কে সম্বল করে তারা যদি জনজোয়ার তুলতে পারে, তবে তারা চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করতে পারে। তবে প্রবীণ রাজনীতিবিদরা পুরাতনের পক্ষেই কথা বলছেন। তারা বলছেন, ডাকসু-জাকসুতে শিবিরের বিজয় ভবিষ্যৎ জাতীয় রাজনীতিতে তেমন প্রভাব ফেলবে না। তারা স্মরণ করিয়ে দেন, অতীতেও চাকসু, রাকসুসহ নানা প্রতিষ্ঠানে শিবিরের একক কর্তৃত্ব ছিল। ওইসব বিজয় রাজনীতিতে গুণগত কোনো পরিবর্তনের সূচনা করেনি। ছাত্রশিবিরের স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত শিক্ষামূলক কর্মসূচি, কল্যাণমূলক সেবা ও ব্যক্তিগত জীবন গড়ার মূল্যবান উপদেশনা শিবিরের এসব বিজয়ের কারণ। এটি হয়তো সুদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রব্যবস্থায় পলতে পলতে পরিবর্তন আনবে। মানুষ আশা করে, সমাগত নির্বাচনে যে শক্তিই বিজয় অর্জন করুক, তারা যেন ২০২৪ সালের গণবিপ্লবের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে এই প্রার্থনা সবার।
লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সাবেক অধ্যাপক সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

