বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায় গভীর ও বহুমাত্রিক একটি সংকটের নাম বিচারহীনতা । অপরাধ করে শাস্তি না পাওয়া, অপরাধীর রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী পরিচয়ে মুক্তি পাওয়া, বিচারে দীর্ঘসূত্রতাসহ বিভিন্ন কারণে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে চলছে বিচারহীনতার সংস্কৃতি।
এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকারের মদতে বন্ধ হয়ে যায় বিচার। এক যুগ পরেও সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের বিচার না হওয়া তার প্রমাণ। এই সংস্কৃতি যখন প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন তা সমাজে ন্যায়বিচার, মানবাধিকার ও আইনের শাসনের প্রতি আস্থা নষ্ট করে দেয়।
বিচারহীনতা সংস্কৃতির অন্যতম উদ্বেগজনক দিক হলো রাজনৈতিক সহিংসতার ক্ষেত্রে বিচারহীনতা। এ ক্ষেত্রে অন্যতম উদাহরণ হতে পারে পিলখানা হত্যাকাণ্ড। অন্যদিকে, ধর্ষণ বা নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রে বিচারহীনতা এমন মাত্রায় পৌঁছেছে, অনেক ভুক্তভোগী বিচার চাওয়ার আগেই নিরুৎসাহিত হন।
বিচারহীনতা সৃষ্টি হওয়ার পেছনে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে, যেগুলো একে অন্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এর অন্যতম হলো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, যা বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। প্রভাবশালী ব্যক্তিরা অনেক সময় মামলার তদন্তে বাধা প্রদান করেন, সাক্ষীদের হুমকি দেন কিংবা বিচারকদের ওপর চাপ প্রয়োগ করে ন্যায়বিচারকে বাধাগ্রস্ত করেন। পাশাপাশি আমাদের দেশের তদন্ত সংস্থাগুলোর দক্ষতার অভাব, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কারণে অপরাধ প্রমাণ করা যায় না, ফলে অপরাধীরা সহজেই পার পেয়ে যায়। এ ছাড়া আরো বিভিন্ন কারণে বছরের পর বছর ধরে মামলা ঝুলে থাকা, বারবার শুনানি পিছিয়ে যাওয়া কিংবা মামলার তারিখ পরিবর্তনের ফলে বিচারপ্রার্থী হয়রানির শিকার হন এবং বিচার চাওয়া ও পাওয়ার ক্ষেত্রে নিরুৎসাহিত হয়ে পড়েন। দুর্নীতি বিচারব্যবস্থাকে আরো দুর্বল করে তোলে; বিচারক থেকে শুরু করে পুলিশ ও আইনজীবীদের মধ্যে অনিয়ম এবং স্বার্থপরতা বিচারহীনতাকে আরো পাকাপোক্ত করে। এসব কারণে অপরাধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার প্রবণতা কমে যাওয়া, ভুক্তভোগীকে সাহায্য না করা, সত্য সাক্ষ্য দিতে এগিয়ে না আসার মানসিকতা জন্ম নেয় সাধারণ মানুষের মধ্যে। এর ফলে বেড়ে যায় অপরাধীদের অপরাধপ্রবণতা এবং সাহস।
বিচারহীনতার সবচেয়ে ভয়ংকর ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব হলো অপরাধের পুনরাবৃত্তি এবং সমাজে অপরাধের প্রতি এক ধরনের সহনশীলতা গড়ে ওঠা। যখন একজন অপরাধী দেখে, তার কোনো শাস্তি হচ্ছে না বা রাষ্ট্র তাকে কোনোভাবে ছাড় দিয়ে দিচ্ছে, তখন সে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে এবং আবার অপরাধ করার সাহস পায়। শুধু তাই নয়, অন্যরাও এতে উৎসাহিত হয়। এতে সমাজে অনৈতিকতার প্রতি এক ধরনের স্বীকৃতি জন্ম নেয়, যেখানে ন্যায়-অন্যায় বা সত্য-মিথ্যার বিভাজন ধীরে ধীরে লুপ্ত হয়ে যায়।
বিচারহীনতা আইনের শাসন ও গণতন্ত্রের ভিত্তিকে দুর্বল ও প্রশ্নবিদ্ধ করে। ফলে সমাজে বিশ্বাস জন্মায়, ‘ক্ষমতার সঙ্গে থাকলে আইনের ঊর্ধ্বে থাকা যায়।’ এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় তরুণ প্রজন্ম। তারা যখন দেখে অন্যায় করে পার পাওয়া যাচ্ছে, তখন তাদের চোখে আইনের প্রতি শ্রদ্ধা কমে যায়। সৎ ও নৈতিক পথ অনুসরণ করার পরিবর্তে তারা চতুরতা হিসেবে ‘সিস্টেমকে বাইপাস’ করাকে গ্রহণযোগ্য মনে করে। এতে তারা হতাশ, ক্ষুব্ধ ও সংশয়গ্রস্ত হয়ে ওঠে, যা একসময় সামাজিক অস্থিরতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয়ের দিকে নিয়ে যায়। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি একটি জাতির নৈতিক ভিত্তিকে ভেঙে দেয় এবং দীর্ঘ মেয়াদে একটি অসৎ সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলে।
ভয়াবহ এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে মুক্তি পেতে হলে প্রয়োজন সম্মিলিত ও বহুমুখী উদ্যোগ, যা শুধু সরকারের ওপর নির্ভর করে নয়, সমাজের প্রতিটি স্তরের সক্রিয় অংশগ্রহণেই সম্ভব। প্রথমত, বিচারব্যবস্থাকে করতে হবে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও নিরপেক্ষ, যাতে কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ ছাড়া বিচারকরা তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারেন। এ জন্য বিচারকদের নিরাপত্তা, দায়িত্ব পালনের স্বাধীনতা এবং স্বচ্ছ নিয়োগ ও পদোন্নতির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি, পুলিশ ও তদন্ত সংস্থাগুলোর পেশাদারিত্ব বাড়াতে হবে; তাদের আধুনিক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশে কাজ করার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
দীর্ঘসূত্রতা বিচারপ্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা। তাই বিশেষ করে ধর্ষণ, গুম, খুন ও শিশু নির্যাতনের মতো সংবেদনশীল মামলায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার জন্য বিশেষ আদালত বা ফাস্ট ট্র্যাকব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। এ ছাড়া বিচারপ্রক্রিয়ায় সাক্ষীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায়, তাদের নিরাপত্তা, আর্থিক সহায়তা এবং আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করে একটি সাহসী ও সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে সময়োপযোগী ও আধুনিক আইনের প্রয়োজনও রয়েছে। সে জন্য পুরোনো আইনগুলো সংস্কার করে প্রযুক্তিনির্ভর, মানবাধিকারবান্ধব ও কার্যকর আইনপ্রণয়ন এবং কঠোরভাবে তা প্রয়োগ করতে হবে। বিচারহীনতার বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে সুশীল সমাজ, মানবাধিকার সংস্থা ও গণমাধ্যমের নিরপেক্ষ, জবাবদিহিমূলক এবং অনুসন্ধানী ভূমিকা অপরিহার্য। সর্বশেষ, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ন্যায়বিচারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল করে তুলতে শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিকতা, মানবিক মূল্যবোধ ও নাগরিক অধিকার সম্পর্কে শিক্ষা প্রদান নিশ্চিত করতে হবে। এসব পদক্ষেপ একত্রে বিচারহীনতার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।
বিচারহীনতার সংস্কৃতি গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং নাগরিক মর্যাদা সবকিছুকেই ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়। বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের পথে এগোলেও যদি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত না হয়, তবে এই উন্নয়ন টেকসই হবে না। তাই এখনই সময় বিচারহীনতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর, আইন ও মানবাধিকারের পক্ষে একসঙ্গে কাজ করার। আমাদের করণীয় একটাই—ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য নিরলস লড়াই চালিয়ে যাওয়া যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজে বেঁচে থাকতে পারে, যেখানে অপরাধী নয়, আইনের জয় হয়।
লেখক : শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

