একটি দেশে গণঅভ্যুত্থান বা বিপ্লব কেন হয়? সহজ উত্তর। বিরোধী মতের প্রতি রাজনৈতিক দমন-নিপীড়ন, ব্যাপক মাত্রায় দুর্নীতি, সামাজিক বৈষম্য ও বেকারত্ব যখন চরম মাত্রায় পৌঁছায়; তখনই গণঅভ্যুত্থান বা বিপ্লব সংঘটিত হয়। এসব কারণে বাংলাদেশেও ২০২৪ সালে জুলাই-আগস্টে বিপ্লব সংঘটিত হয়। চব্বিশের ৫ জুনে হাইকোর্ট ২০১৮ সালে তৎকালীন সরকারের কোটা বাতিলের সিদ্ধান্তকে অবৈধ ঘোষণার পর থেকে শিক্ষার্থীদের কোটাবিরোধী আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। আর এই গণঅভ্যুত্থান ঠেকাতে পুলিশসহ সরকারদলীয় সশস্ত্র বাহিনীর আক্রমণে ৫ আগস্ট পর্যন্ত দেশে এক ধরনের গণহত্যা চালানো হয়।
জুলাই বিপ্লবের ভয়াবহ বর্ণনা পাওয়া যায় জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের তদন্ত প্রতিবেদনে। এই প্রতিবেদনে র্যাব-পুলিশসহ তৎকালীন সরকারদলীয় সশস্ত্র বাহিনী কর্তৃক প্রায় ১৪০০ ব্যক্তিকে হত্যার তথ্য তুলে ধরা হয়। এসব হত্যাকাণ্ডের শিকার হয় শিশু, শ্রমিক, পথচারী, স্কুল-কলেজ-মাদরাসার শিক্ষার্থীসহ সাধারণ খেটে যাওয়া শ্রমজীবী মানুষ। তবে ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৪ তারিখের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের স্বাস্থ্যবিষয়ক কেন্দ্রীয় উপকমিটির তথ্য অনুযায়ী, জুলাই বিপ্লবে শহীদের সংখ্যা ১৪২৩ জন। আর আহতের সংখ্যা ২২ হাজার এবং চিরতরে পঙ্গু বা অঙ্গহানি হয়েছে এমন ব্যক্তির সংখ্যা ৫৮৭ জন (কালের কণ্ঠ, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৪)। তবে প্রকৃতপক্ষে এই সংখ্যা আরো বেশি হবে বলে সবাই মনে করেন।
গণঅভ্যুত্থান বা বিপ্লব জাতির ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত, যা শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনই নয়, বরং জাতীয় ঐক্য ও জাতি গঠনের পথে নতুন পথ দেখায়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গণঅভ্যুত্থানের পর জনগণ ঐক্যবদ্ধ হয়ে জাতি গঠনের কাজে অংশ নিয়েছে। চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের পর বাংলাদেশেও সেই সুযোগ এসেছে। জুলাই সনদ তৈরির সুযোগ। কিন্তু বিপ্লবের প্রায় এক বছর হতে চলল এখনো এ বিষয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি চোখে পড়ছে না। তবে সুযোগ এখনো আছে। জুলাই সনদ কেন জরুরি? তা জানার জন্য নিচে তিনটি দেশের ঘটনা উল্লেখ করছি।
দক্ষিণ আফ্রিকার ১৯৬০ সালের শার্পভিল গণহত্যা এবং ১৯৭৬ সালের সোয়েটো বিদ্রোহ
১৯৬০ সালে এবং ১৯৭৬ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামের ইতিহাস আমাদের সচেতন মহলের সবারই জানা। ২১ মার্চ ১৯৬০ সালে শার্পভিল শহরে (জোহানেসবার্গের কাছে) হাজার হাজার কৃষ্ণাঙ্গ শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভে অংশ নেয়। কিন্তু পুলিশ এটি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়ে গুলি চালায়। এতে ৬৯ জন নিহত এবং প্রায় ১৮০ জন আহত হওয়ার তথ্য জানা যায়। এখনো ২১ মার্চ দক্ষিণ আফ্রিকায় মানবাধিকার দিবস হিসেবে পালিত হয়। ইতিহাস থেকে আরো জানা যায়, ১৯৫৩ সালের বান্টু শিক্ষা আইনের অধীনে কৃষ্ণাঙ্গ শিক্ষার্থীদের জন্য নিম্নমানের শিক্ষাব্যবস্থা চালু ছিল, যা তাদের শ্রমিক হিসেবে প্রস্তুত করার উদ্দেশ্য ছিল। ১৯৭৪ সালে সরকার ঘোষণা করে, কৃষ্ণাঙ্গ শিক্ষার্থীদের জন্য আফ্রিকান্স ভাষা (শ্বেতাঙ্গ শাসকদের ভাষা) মাধ্যম হিসেবে বাধ্যতামূলক হবে। এটি কৃষ্ণাঙ্গ শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করে, কারণ তারা আফ্রিকান্সকে দমনের প্রতীক হিসেবে দেখত।
বাংলাদেশে চব্বিশের জুলাই বিপ্লবে ১৬ জুলাই রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষার্থী আবু সাঈদকে পুলিশ সুপরিকল্পিতভাবে গুলি করে। পরে তার মৃত্যু হলে তার এই হত্যাকাণ্ডের ছবিটিও জুলাই বিপ্লবের আইকনিক ছবি হয়ে যায় এবং আন্দোলনের তীব্রতা বেড়ে যায়। শার্পভিল গণহত্যা এবং সোয়েটো বিদ্রোহ উভয়ই বর্ণবাদী শাসনের বিরুদ্ধে কৃষ্ণাঙ্গ জনগণের প্রতিরোধের প্রতীক।
বাংলাদেশের ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে ছাত্রদের নেতৃত্বে স্বৈরশাসনের পতন ঘটে, যা সোয়েটোর ছাত্র বিদ্রোহের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। উভয় দেশেই এই ঘটনাগুলো জাতীয় ঐক্য ও জাতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দক্ষিণ আফ্রিকার এই দুটি গণঅভ্যুত্থান কৃষ্ণাঙ্গ সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐক্য গড়ে তুলতে সহায়ক ছিল। উভয় ঘটনাই বর্ণবাদের অবসান এবং ১৯৯৪ সালে গণতান্ত্রিক দক্ষিণ আফ্রিকা প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখে। পরে, দক্ষিণ আফ্রিকার ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন (১৯৯৫) এই ঘটনাগুলোর সত্য উদঘাটন ও জাতীয় পুনর্মিলনের জন্য কাজ করে।
পোল্যান্ডের সলিডারিটি আন্দোলন
১৯৮০-এর দশকে পোল্যান্ডে কমিউনিস্ট শাসনের বিরুদ্ধে সলিডারিটি আন্দোলন একটি গণঅভ্যুত্থানের রূপ নেয়। এই আন্দোলনে শ্রমিক, বুদ্ধিজীবী, ছাত্র এবং সাধারণ মানুষও অংশ নেয়। এই গণঅভ্যুত্থান ১৯৮৯ সালে কমিউনিস্ট শাসনের পতন ঘটায় এবং পোল্যান্ডে গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। গণঅভ্যুত্থানের পর জাতি গঠনের কাজে পোলিশ জনগণ ঐক্যবদ্ধভাবে অংশ নেয়। অর্থনৈতিক সংস্কার এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গঠনের মাধ্যমে পোল্যান্ড একটি আধুনিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হয়। সলিডারিটি আন্দোলন শুধু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনই আনেনি, বরং পোলিশ সমাজের মানসিকতা ও সংস্কৃতিতেও গভীর প্রভাব ফেলেছে। সলিডারিটি আন্দোলনের চেতনা পোলিশ জাতীয়তাবাদকে শক্তিশালী করে এবং জনগণের মধ্যে ঐক্যের ভিত্তি স্থাপন করে।
তিউনিসিয়ার জুঁই বিপ্লব
২০১০-১১ সালে তিউনিসিয়ায় জুঁই বিপ্লব নামে পরিচিত গণঅভ্যুত্থান স্বৈরশাসক জিন এল-আবিদিন বেন আলির ২৩ বছরের শাসনের অবসান ঘটায়। এই আন্দোলন শুরু হয় মোহাম্মদ বুআজিজি নামে এক তরুণ ফল বিক্রেতার আত্মাহুতির মাধ্যমে, যা বেকারত্ব, দুর্নীতি এবং নিপীড়নের বিরুদ্ধে জনরোষের প্রতীক হয়ে ওঠে। এই গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র, শ্রমিক, নারী এবং সাধারণ মানুষ অংশ নেয়।
জুঁই বিপ্লবের পর তিউনিসিয়া গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করে। ২০১১ সালে স্বাধীন নির্বাচনের মাধ্যমে একটি গণপরিষদ গঠিত হয়। তিউনিসিয়ান ন্যাশনাল ডায়ালগ কোয়ার্টেট ২০১৩-১৪ সালের রাজনৈতিক সংকটে মধ্যস্থতার মাধ্যমে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে। যার ফলে ২০১৪ সালে একটি নতুন সংবিধান প্রণয়ন করা হয়। এই কোয়ার্টেট ২০১৫ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করে, যা তিউনিসিয়ার জনগণের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার প্রতীক।
সুতরাং আমরা বলতে পারি, চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের পর বাংলাদেশেও এই ঐক্য জাতি গঠনের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। এই বিপ্লবে নিপীড়ক শাসকগোষ্ঠীর পতনের পর বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন এবং সংস্কার প্রক্রিয়া শুরু হয়। সংস্কার নিয়ে বিতর্কও শুরু হয়েছে। এর মধ্যে বিভেদের বীজ বপনের চেষ্টাও লক্ষ করা যাচ্ছে। তারপরও আশাবাদী হওয়ার মতো বিষয় হচ্ছে, অন্তর্বর্তী সরকার ঐকমত্য কমিশন গঠন করেছে। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে প্রথম দফার আলোচনার পর দ্বিতীয় দফায় আলোচনা চলছে। তবে এসব আলোচনায় এখন পর্যন্ত উল্লেখ করার মতো কিছু চোখে পড়ছে না। বিপ্লবের প্রায় এক বছর হতে চলল। এখনো জুলাই সনদের উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। কালক্ষেপণ ভালো লক্ষণ নয়। জাতি হিসেবে আর আমরা পিছিয়ে থাকতে চাই না। ন্যায্যতা, ন্যায়বিচারসহ আত্মমর্যাদা, সম্মান আর উন্নতির দিকে এগিয়ে যেতে চাই। এ জন্যই জুলাই সনদের কোনো বিকল্প নেই।
ওপরের তিনটি দেশের গণঅভ্যুত্থান বা বিপ্লবের পর জাতীয় ঐক্য এবং জাতি হিসেবে উন্নতির দিকে এগিয়ে যাওয়ার আলোচনার পর আর বলার অপেক্ষা রাখে না যে, চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের পর বাংলাদেশে কেন জুলাই সনদ জরুরি। আমরা মোটা দাগে কয়েকটি কারণ উল্লেখ করতে পারিÑপ্রথমত, জুলাই সনদ হবে নতুন বাংলাদেশের জাতীয় ঐক্যের একটি ঐতিহাসিক দলিল। দ্বিতীয়ত, এই জুলাই সনদের ওপর ভিত্তি করেই পরিচালিতে এবং বাস্তবায়িত হবে যাবতীয় সংস্কার কার্যক্রম। তৃতীয়ত, জুলাই সনদ হবে নতুন বাংলাদেশের উন্নতির পথে পথচলার গাইডলাইন। চতুর্থত, এটি একটি রাজনৈতিক ঐকমত্যের দলিল হিসেবে পরিগণিত হবে। যাতে করে আরো কেউ স্বৈরাচারী না হয়ে ওঠে। পঞ্চমত, এই জুলাই সনদ হবে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ‘ম্যাগনাকার্টা। যার মূলনীতি হবেÑ১. জুলাই বিপ্লবের শহীদদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও যথাযথ মূল্যায়ন। ২. সমাজে সাম্য, ন্যায্যতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। ৩. আইনের শাসন সবার জন্য সমান নিশ্চিত করা। ৪. সমাজে-রাষ্ট্রে সব ক্ষেত্রে সব ধরনের বৈষম্য দূর করা। ৫. রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বৈরাচার ব্যবস্থার রোধ করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা ও ৬. কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়; তা নিশ্চিত করা।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১২১৫ সালে ইংল্যান্ডের রাজা জন ‘ম্যাগনাকার্টা’ নামক এই ঐতিহাসিক দলিলে স্বাক্ষর করেন। এটি ছিল রাজা এবং তার প্রজাদের মধ্যে একটি চুক্তি, যা রাজার ক্ষমতাকে সীমিত করে এবং কিছু নির্দিষ্ট অধিকার নিশ্চিত করে। এই দলিলের মাধ্যমে রাজার স্বেচ্ছাচারিতা রোধ করার চেষ্টা করা হয়েছিল।
বাংলাদেশের আপামর জনগোষ্ঠী তাই চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের পর এ রকম একটি জুলাই সনদের অপেক্ষায় আছে। অন্তর্বর্তী সরকার সেই প্রত্যাশা পূরণ করবে- এটাই প্রত্যাশা।
লেখক : লোকপ্রশাসন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাবেক সচিব, বাংলাদেশ সরকার ও প্রেসিডেন্ট, সেন্টার ফর পলিসি অ্যানালাইসিস অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

