গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৭৭ নম্বর অনুচ্ছেদে ন্যায়পাল (Ombudsman) নিয়োগের কথা বলা আছে। সংবিধানের, পঞ্চম ভাগ, আইনসভা, প্রথম পরিচ্ছেদ, ৭৭ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী-
১. সংসদ আইনের দ্বারা ন্যায়পালের পদ-প্রতিষ্ঠার জন্য বিধান করিতে পারিবেন।
২. সংসদ আইনের দ্বারা ন্যায়পালকে কোন মন্ত্রণালয়, সরকারি কর্মচারী বা সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষের যেকোনো কার্য সম্পর্কে তদন্ত পরিচালনার ক্ষমতাসহ যেরূপ ক্ষমতা কিংবা যেরূপ দায়িত্ব প্রদান করিবেন, ন্যায়পাল সেরূপ ক্ষমতা প্রয়োগ ও দায়িত্ব পালন করিবেন।
৩. ন্যায়পাল তাহার দায়িত্বপালন সম্পর্কে বাৎসরিক রিপোর্ট প্রণয়ন করিবেন এবং অনুরূপ রিপোর্ট সংসদে উপস্থাপিত হইবে।
ন্যায়পালের কার্যাবলির মধ্যে রয়েছে বেসামরিক প্রশাসন ও আদালতের কার্যক্রম তত্ত্বাবধান। তাকে বেআইনি কার্যকলাপ, কর্তব্যে অবহেলা ও ক্ষমতার অপপ্রয়োগের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের তদন্ত করতে হয়। বিশেষভাবে প্রতারণামূলক অপরাধ ও ক্ষমতার অপব্যবহার এবং ন্যায়বিচারের পরিপন্থী কার্যকলাপের প্রতি ন্যায়পালকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হয়। যেকোনো দায়িত্বশীল কর্মকর্তা সংবিধানের বিধি বা দেশের আইন লঙ্ঘন কিংবা প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ কর্তৃক বিধিবদ্ধ নিয়মকানুন ভঙ্গ করলে ন্যায়পাল তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করে। সাধারণভাবে ন্যায়পাল পদের মূল উদ্দেশ্য সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে কাজের সমতা ও সততা বিধান এবং সুনির্দিষ্টভাবে প্রশাসনের যেকোনো ক্ষেত্রে সরকারি কর্মকর্তাদের গতিবিধির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ। সব দেশেই ন্যায়পাল আইনসভা কর্তৃক নিযুক্ত হন। সাধারণত আইনসভায় রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা সর্বসম্মতিক্রমে ন্যায়পাল নির্বাচন করেন। রাজনৈতিক দলগুলোর সর্বসম্মত সিদ্ধান্তই ন্যায়পালকে যথাযথ নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। সাধারণত ন্যায়পাল কর্তৃক গৃহীত সিদ্ধান্ত ও সুপারিশ বাস্তবায়নের ক্ষমতা ন্যায়পালের থাকে না। সুপারিশ বাস্তবায়নের ক্ষমতা সরকারের অথবা আইনের দ্বারা নির্দিষ্ট অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের হতে পারে।
বিভিন্ন সময় গঠিত বিভিন্ন সংস্কার কমিটি ন্যায়পাল নিয়োগের প্রস্তাব করেছেন। যেমনÑ ১৯৯৭ এ টি এম শামসুল হকের নেতৃত্বে গঠিত জনপ্রশামন সংস্কার কমিশন তাদের সুপারিশের দ্বিতীয় খণ্ডে প্রতিবেদন নম্বর-৪-এর আওতায় ১৯ থেকে ২৮ পৃষ্ঠা ন্যায়পাল নিয়োগ ও তার কর্মপদ্ধতি, ক্ষমতা ইত্যাদি বিষয়ে খুবই স্পষ্টভাবে সুপারিশ প্রদান করেছে।
জনপ্রশাসন কমিশনের এই প্রস্তাবের ভিত্তিতে ন্যায়পাল নিয়োগ ও জনবল-সংক্রান্ত একটি আইন প্রণয়নের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনসহ সংসদ সচিবালয়ে পাঠানো হয়। কিন্তু সংসদ সচিবালয় ছয় মাস ফাইলটি আটকে রাখার পর আইন মন্ত্রণালয়ে ফেরত পাঠায়। সংসদ সচিবালয়ের তৎকালীন অতিরিক্ত সচিব ‘উল্লিখিত আইনটি প্রণয়নের উদ্দেশ্য ও কারণ-সংবলিত কোনো বিবৃতি নেই। আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং নেই। এমনকি মন্ত্রীর স্বাক্ষরও নেই। অতএব ফাইলটি ফেরত পাঠানো হলো।’ লিখে ফাইলটি ফেরত পাঠানো এরপর আর ন্যায়পাল নিয়োগ-সংক্রান্ত কার্যক্রম এগোয়নি।
স্বাধীনতার ৫৩ বছরে ইতিহাসে কী কারণে ন্যায়পাল নিয়োগ হচ্ছে না, তার কারণ সম্পর্কে সরকারের নীতিনির্ধারক, রাজনৈতিক দলগুলো, নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ ওয়াকিবহাল। কেউই চাইবে না জবাবদিহির একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান থাকুক।
৭২ সংবিধানের ৭৭ অনুচ্ছেদ বর্ণিত ন্যায়পাল নিয়োগ সরকারের বাধ্যতামূলক করা হয়নি। সেখানে বলা আছেÑ ‘সংসদ আইনের দ্বারা ন্যায়পালের পদ-প্রতিষ্ঠার জন্য বিধান করিতে পারিবেন।’ এই পারিবেন কথাটির সুযোগ নিচ্ছে বিভিন্ন রাজনৈতিক সরকার। এই ক্ষেত্রে সংবিধান সংস্কার কমিটি সংবিধানের ৭৭ নম্বর অনুচ্ছেদে ন্যায়পাল নিয়োগের বিষয়টি বাধ্যতামূলক করে দিতে পারে এবং আগামী সংসদ ন্যায়পাল নিয়োগ আইনে ন্যায়পালের সংজ্ঞা, কার্যপরিধি, কর্মপদ্ধতি, ক্ষমতা ইত্যাদি নির্ধারণ করে দিতে বাধ্য থাকবে।
বাংলাদেশ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান বা সংস্থাগুলো হলো-
১. নির্বাহী বিভাগ বা শাসন বিভাগ; ২. আইন বিভাগ; ৩. বিচার বিভাগ; ৪. নির্বাচন কমিশন; ৫. সরকারি কর্ম কমিশন; ৬. অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়; ৭. মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়। এর সঙ্গে ন্যায়পালকে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা যায়।
বাংলাদেশে সংবিধিবদ্ধ কোনো প্রতিষ্ঠানই চায় না তাদের কার্যক্রমের স্বচ্ছতা, যথার্থতা ও সেবার মান যাচাই করার মতো ন্যায়পালের মতো কোনো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান থাকুক। কারণ ন্যায়পাল নিয়োগে সংবিধানে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা থাকলেও স্বাধীনতার ৫৩ বছরেও এ দেশে ন্যায়পাল নিয়োগ হয়নি। তাই সংবিধানে ন্যায়পাল নিয়োগের বিষয়টি সাংবিধানিকভাবে বাধ্যতামূলক করা হোক।
অধ্যাপক, দর্শন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

