গণতন্ত্রে দলীয় রাজনীতি গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি যখন জাতীয় স্বার্থের চেয়ে দলীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়, তখন তা রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। বর্তমান বাংলাদেশে দলীয় রাজনীতি যেন সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্ষমতা ধরে রাখার প্রতিযোগিতা এবং দলীয় আনুগত্যের সংস্কৃতি প্রশাসনিক কার্যক্রম থেকে শুরু করে বিচারব্যবস্থা, শিক্ষা খাত, এমনকি গণমাধ্যমের নিরপেক্ষতাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে চলেছে।
সুশাসন মানে শুধু ভালো প্রশাসন নয়, এটি একটি দেশ পরিচালনার এমন পদ্ধতি, যেখানে আইনের শাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং নাগরিকদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা হয়। বাংলাদেশে সুশাসনের অভাবের পেছনে বড় কারণ হলো দলীয় রাজনীতির প্রভাব। যখন প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে দলীয় আনুগত্য স্থান পায়, তখন ন্যায়বিচার এবং সমতা নিশ্চিত করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। আমাদের দেশের বাস্তবতায় দলীয় রাজনীতি কীভাবে সুশাসনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ।
প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা এবং নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়া প্রায়ই দলীয় স্বার্থের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে, যেখানে যোগ্যতা ও সততার চেয়ে দলীয় আনুগত্য এবং লেজুড়বৃত্তি বেশি গুরুত্ব পায়। ক্ষমতাসীন দল প্রশাসনকে তাদের নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। ফলে প্রশাসনিক দক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হয়ে পড়ায় ন্যায়বিচারপ্রাপ্তি অনেক ক্ষেত্রে নির্ভর করে রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপর, যা জনগণের ন্যায্য অধিকার এবং আইনের শাসনের জন্য হুমকিস্বরূপ। দলীয় রাজনীতির এই প্রবণতা সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করে, দুর্নীতি বাড়ায় এবং যোগ্য ও নিষ্ঠাবান ব্যক্তিদের নেতৃত্বে আসার পথ রুদ্ধ করে। তাই, জাতির উন্নতির জন্য দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে ওঠে যোগ্যতা, ন্যায়বিচার এবং সুশাসনের ভিত্তিতে একটি কার্যকর প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। ক্ষমতাসীন দল নিজের স্বার্থে প্রশাসন পরিচালনা করে, যেখানে যোগ্যতার চেয়ে লেজুড়বৃত্তিক আনুগত্যকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
আমাদের প্রশাসনিক কাঠামোয় দলীয় রাজনীতির প্রভাব এতটাই প্রবল, নিয়োগ থেকে পদোন্নতি পর্যন্ত প্রায় সব ক্ষেত্রে যোগ্যতার বদলে দলীয় আনুগত্যই প্রধান বিবেচ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। দলীয় রাজনীতি এমন বিভাজন সৃষ্টি করেছে, জাতির বৃহত্তর স্বার্থে রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হচ্ছে। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়েও দলীয় স্বার্থের কারণে বিরোধ সৃষ্টি হয়ে আসছে, যা দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে প্রতিনিয়ত ব্যাহত করে চলেছে ।
সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রথমে দলীয় রাজনীতির প্রভাব কমাতে হবে। এটি একটি কঠিন কাজ হলেও পুরোপুরি অসম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা, রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি এবং সচেতন নাগরিক সমাজ। এ জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সব প্রতিষ্ঠানকে সত্যিকার অর্থে শক্তিশালী ও স্বাধীন করা।
রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সব নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রধান বিবেচ্য বিষয় হতে হবে মেধা ও যোগ্যতা। থাকতে হবে উন্নত সিস্টেম এবং জবাবদিহির ব্যবস্থা। যে দেশগুলো গণতন্ত্রচর্চার ক্ষেত্রে উদাহরণ সৃষ্টি করেছে, সেসব দেশেও আছে নানা অনিয়ম-দুর্নীতি। কিন্তু তারপরও সেসব দেশ নির্বাচন কমিশনকে এমন শক্তিশালী অবস্থায় নিয়ে যেতে পেরেছে, যেখানে দলীয় সরকার ক্ষমতায় থেকেও নিরপেক্ষ নির্বাচনের আয়োজন করছে এবং বিরোধী দল তা মেনে নিচ্ছে। কিন্তু আমরা আজ পর্যন্ত এ ক্ষেত্রে চূড়ান্ত ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছি, যা এ দেশের অনেক নৈরাজ্যের মাতা।
স্বাধীন বিচার বিভাগ, স্বাধীন নির্বাচন কমিশন, স্বাধীন সরকারি কর্মকমিশনসহ এ ধরনের আরো শক্তিশালী স্বাধীন নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান গঠনের জন্য যে ধরনের দেশপ্রেম, সাহস, সততা আর নীতিনৈতিকতা থাকা দরকার, তার প্রকট অভাব পরিলক্ষিত আমাদের রাজনীতিবিদদের মধ্যে, যা খুবই দুর্ভাগ্যজনক জাতির জন্য।
শিক্ষার্থী
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

