মুসলমানদের বাংলা বিজয় এ দেশের অধিবাসীদের কাছে ছিল আশীর্বাদ। এ বিজয় শুধু বাঙালিদের একটি রাজনৈতিক মঞ্চে ঐক্যবদ্ধ করেনি, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবন গঠনে সহায়তা করেছে। এছাড়া অর্থনৈতিক জীবনেও উন্নতি ও সমৃদ্ধির পথ প্রশস্ত করেছে। পলিমাটির প্রাচুর্যে বাংলার ভূমি ছিল উর্বরা। এখানকার নারী-পুরুষ উভয়েই ছিল পরিশ্রমী।
মুসলমান শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতা ও উৎসাহে বাংলার অর্থনৈতিক অবস্থা দ্রুত সমৃদ্ধি লাভ করে। অত্যল্পকালের মধ্যে পৃথিবীর একটি সম্পদশালী দেশ হিসেবে পরিচিত হয় এবং কৃষি ও বাণিজ্য অভূতপূর্ব উন্নতি করে। বাংলার মাটির উর্বরতা, প্রচুর কৃষি ও শিল্পজাত দ্রব্য বিদেশি বণিক ও পর্যটকদের বিস্ময় ও প্রশংসার উদ্রেক করে। তারা দেশটিকে একটি উদ্যান, এমনকি একটা স্বর্গ বলতেও কসুর করেননি।
পহেলা বৈশাখ বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন। দিনটি কেবল ক্যালেন্ডারের পাতা পরিবর্তনের দিন নয়, বরং বাঙালির প্রাণের উৎসব, চেতনার জাগরণ এবং সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের প্রতীক। পহেলা বৈশাখ উৎসবের অন্তর্নিহিত প্রেরণা আজও সমুজ্জ্বল।
মুসলমান শাসকদের বিচক্ষণতা ও ঔদার্যের ফলে বাংলার ভাগ্যাকাশে সমৃদ্ধির সুবাতাস প্রবাহিত হয়। কৃষি ও শিল্পজাত দ্রব্যের প্রাচুর্যে অর্থনীতির চাকা ঘুরতে থাকে। অসংখ্য নদীর কল্যাণে এবং ঋতুমাফিক বৃষ্টিপাত ও প্রাকৃতিক সেচব্যবস্থার ফলে বহু শতাব্দীকালব্যাপী বাংলার সমতল ভূমি পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে উর্বর অঞ্চল ছিল। ভ্রমণকারীরা বাংলাদেশের মাটির অসাধারণ উর্বরতা লক্ষ করেছেন।
শ্রীহট্ট থেকে নৌকাযোগে ভ্রমণের সময় চৌদ্দ শতকের প্রখ্যাত পরিব্রাজক ইবনে বতুতা মেঘনার উভয় পাশে মাঠের পর মাঠ শস্য ও ফুল-ফলের গাছ দেখে এত বেশি মুগ্ধ হন যে, তিনি লিখেছেন—নদীপথে মিসরের নীলনদের মতো ডানে ও বাঁয়ে ছিল অসংখ্য চাকা, উদ্যানরাজি এবং গ্রামের পর গ্রাম। এসব পরিবর্তন ও উন্নয়নের পেছনে ছিল মুসলিম শাসক সুলতানদের আগ্রহ ও উদ্দীপনা।
কোনো কাজ শুরুর ক্ষণের প্রতি মানুষের আগ্রহ ও উদ্দীপনা চিরন্তন। প্রতি বছর পহেলা বৈশাখে তেমনি একটা দিনক্ষণ আমাদের কাছে সমুপস্থিত হয়। সে কারণে পহেলা বৈশাখ শুধু একটি দিন নয়, এটি বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাস, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের মিলনক্ষেত্র। এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও তাৎপর্য বাঙালির প্রতিটি যুগপর্বে ভিন্নভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। কিন্তু কেন্দ্রীয় সত্তা এক নবজাগরণ ও সম্প্রীতির বাণী।
১৩৪২ খ্রিষ্টাব্দে সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ লখনৌতি, সোনারগাঁও ও সাতগাঁওকে একত্রীভূত করে সারা বাংলাদেশের সুলতান হন। এর আগে কেউ সমগ্র বাংলাদেশের সুলতান ছিলেন না। ইলিয়াস শাহই সর্বপ্রথম এই তিন অংশের সুলতান হন। এ কারণেই ঐতিহাসিক আফিফ ইলিয়াস শাহকে শাহ-ই-বাঙালি, শাহ-ই-বাঙালিয়ান বা সুলতান-ই-বাঙালি উপাধিতে ভূষিত করেন। এখানে বাঙালি জাতিসত্তার বীজ তপ্ত হয়। পরবর্তী সময়ে হোসেন শাহী আমলে তা পল্লবিত হয়ে বিশাল মহিরুহে পরিণত হয়।
সম্রাট আকবরের আমলে পহেলা বৈশাখ থেকে শুরু হতো নতুন ফসলি বছর। প্রজাদের কাছ থেকে খাজনা আদায় ও হালখাতা খোলার রীতি চালু হয়। তখন থেকেই দিনটি অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশ শুরুর দিন হিসেবে গুরুত্ব পায়। এই প্রথা পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ আমলেও টিকে থাকে; কারণ ব্রিটিশরাও প্রথম দিকে বাংলা সন অনুযায়ী রাজস্ব আদায় করত।
ব্রিটিশ সরকার ১৮৩০ সালের দিকে ইংরেজি সনকে আনুষ্ঠানিকতা দেয়। বাংলা সনের গুরুত্ব কমতে থাকে। কিন্তু জনমানসে পহেলা বৈশাখ টিকে যায়। জমিদার ও ব্যবসায়ীরা তখনো হালখাতা রাখতেন। গ্রামীণ মেলা, লাঠিখেলা ও নৌকা বাইচের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ সোৎসাহে উৎসব পালন করত। আমাদের ধারণা, এটি ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে একটি নীরব সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ।
পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী ভুল করে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে দমন করতে চেয়েছিল। উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার অপচেষ্টা, বাংলা নববর্ষ পালনে বাধা—সব মিলিয়ে পহেলা বৈশাখ তখন প্রতিবাদে রূপ নেয়।
বাঙালি জীবনে পহেলা বৈশাখের সম্পর্ক বহুমাত্রিক। পহেলা বৈশাখ বসন্ত নয়, গ্রীষ্মের শুরু। কৃষির ভাষায় এটি ফসল তোলার পর খালি জমিতে নতুন বীজ বপনের সময়। তাই দিনটি পুরোনো ভুলে নতুন স্বপ্ন দেখার প্রতীক। বছর ঘুরে এই উপলক্ষে গ্রামে এখনো মেলা বসে, নগরে হয় অনুষ্ঠান। আত্মীয়-বন্ধুদের বাড়ি ঘুরে দেখা, নতুন পোশাক পরা, মিষ্টি বিনিময়—এসব সামাজিক বন্ধনকে দৃঢ় করে। পহেলা বৈশাখ একমাত্র দিন যখন ধর্ম, বর্ণ, বয়স নির্বিশেষে সব বাঙালি একই সুরে, ছন্দে ও লহমায় মেতে ওঠে।
পহেলা বৈশাখ যেন ব্যবসায়ী সমাজকে নৈতিকতা ও জবাবদিহিতার শিক্ষা দেয়। দিনটির শুভাগমনের প্রতীক্ষা যেন ব্যবসায়িক নীতির প্রতীক। পুরোনো বকেয়া ও খেলাপি হিসাব বন্ধ করে নতুন করে শুদ্ধ ও সৎ ব্যবসার অঙ্গীকার ব্যক্ত হয় দিনটিতে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


মাসিকের ছন্দেই লুকিয়ে থাকে গর্ভধারণের হিসাব