মানবাধিকার কমিশনকে স্বাধীনতা দিয়ে তৈরি করা আইনটি বাতিলের আগে সংসদে চমৎকার যুক্তি দিয়েছেন আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান। তিনি বলেছেন, সরকারের ৪২ দিনের বয়সে কোনো গুম হয়নি! ক্রসফায়ার হয়নি! এই কথার মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, ৪২ দিনে যেহেতু এ রকম ঘটনা ঘটেনি, তাই আর ঘটবে না! তিনি হয়তো ভুলে গেছেন, আওয়ামী লীগের ৪২ দিনেও ক্রসফায়ার এবং গুমের নজির ছিল না। হানিমুন পিরিয়ড আওয়ামী লীগও এভাবেই পার করেছিল। গুমের সংস্কৃতি শুরু হয়েছিল আরো বছর দেড়েক পরে। চৌধুরী আলমকে দিয়ে শুরু হয়েছিল শেখ হাসিনা সরকারের গুমের সংস্কৃতি। ঢাকার তৎকালীন ওয়ার্ড কমিশনার চৌধুরী আলমকে ফার্মগেটের রাজাবাজারের বাসার সামনে থেকে তুলে নিয়ে যান আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। দিনটি ছিল ২০১০ সালের ২৫ জুন। এরপর থেকে চৌধুরী আলম নিখোঁজ।
এছাড়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্র অলিউল্লাহ ও মোকাদ্দেস ছিল গুমের শুরুর দিকের আলোচিত ঘটনা। দুই বন্ধু অলিউল্লাহ এবং মোকাদ্দেসকে গুম করা হয়েছিল ২০১২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি। একই বছরের ১৭ এপ্রিল নিয়ে গুম করা হয় সাবেক সংসদ সদস্য এম ইলিয়াস আলীকে। সুতরাং হানিমুন পিরিয়ডের ৪২ দিনে কোনো গুম, ক্রসফায়ার হয়নি বলে বাহাদুরির সুযোগ আছে কি না—তা নিয়ে সংশয় রয়েছে অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে।
মনে হচ্ছে মানবাধিকার কমিশনকে আওয়ামী লীগ আমলের মতোই ঠুঁটো জগন্নাথ বানিয়ে রাখতে চায় সরকার। ফ্যাসিবাদ আমলে শেখ হাসিনা একদিকে গুম-ক্রসফায়ারের নামে মানুষ হত্যা করেছেন। আবার তিনি দেশে প্রথমবারের মতো একটি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনও গঠন করেছিলেন। শেখ হাসিনা আমলে তৈরি করা আইনে গঠিত মানবাধিকার কমিশন হচ্ছে—‘ডাল নাই, তলোয়ার নাই, নিধিরাম সরদারের’ মতো। নামে আছে, কাজের স্বাধীনতা ছিল না। সবই সরকারের নিয়ন্ত্রণে। বিএনপি সরকারও চাচ্ছে এটা এভাবেই থাকুক। নতুবা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশে মানবাধিকার কমিশনকে তদন্তের স্বাধীনতা ও সার্চ কমিটি গঠনের মাধ্যমে নিয়োগের পদ্ধতি বাতিল করা হবে কেন?
এ রকম আরো কিছু যুক্তি খাড়া করে সুপ্রিম কোর্টে বিচারক নিয়োগের লক্ষ্যে তৈরি করা আইনটিও বাতিল করা হয়েছে। বাতিল করা হয়েছে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় আইন। এ দুটি তৈরি করার প্রতিশ্রুতি রয়েছে তারেক রহমানের ঘোষিত রাষ্ট্রসংস্কারের ৩১ দফায়। অথচ ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের জারি করা অধ্যাদেশ উল্টো বাতিল করে দেওয়া হয়েছে । বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে স্বাধীন করার ক্ষেত্রে এ দুটি আইন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বিচার নিয়োগের জন্য নীতিমালা তৈরি করার দাবি দীর্ঘদিনের। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় গঠনের জন্য খোদ সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা রয়েছে, যা ঝুলে আছে ২৭ বছর ধরে। সব সরকারের পক্ষ থেকে সময় চাওয়া হয়েছে সুপ্রিম কোর্টে। ২৭ বছর পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনার নিষ্পত্তি করেছিল।
একসময় সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদের মতো সাহসী নীতিবান বিচারক ছিলেন। তারা সরকারের চোখে চোখ রেখে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করার সাহস রাখতেন। ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকারের সময়ের ঘটনা। কয়েকজনকে হাইকোর্ট বিভাগে অস্থায়ী বিচারক নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারির পর বেঁকে বসেছিলেন বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ। তাকে পাস কাটিয়ে সরকারের নিজস্ব পছন্দের কয়েকজনকে বিচারক নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তিনি প্রকাশ্যে আইনজীবীদের একটি অনুষ্ঠানে বলেছিলেন—‘আই এম মিস্টার নো বডি’। শপথ দিতেও অনীহা জানিয়েছিলেন। এ নিয়ে তখন জটিলতা দূর করতে সিনিয়র আইনজীবীদের একটি প্রতিনিধিদল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করেন। তাকে বিচারক নিয়োগের প্রথা ও প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শের গুরুত্ব বুঝিয়ে বলেন। তিনি পরামর্শ গ্রহণ করেন এবং দলের গুরুত্বপূর্ণ পদধারী দুজনকে বাদ দিয়ে তাদের স্থলে প্রধান বিচারপতির পরামর্শ মোতাবেক দুজন দেন।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে বিচার বিভাগকে পুরোপুরি দলীয়করণের উদ্যোগ নেয়। শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, মরহুম বজলুর রহমান, খায়রুল হক, মোজাম্মেল হোসেন, সুরেন্দ্র কুমার সিনহা, সৈয়দ মাহমুদ হোসেনসহ বিতর্কিত অনেকে তখনই নিয়োগ পেয়েছিলেন। যারা শেখ হাসিনার একান্ত অনুগত হয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলসহ ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠায় প্রত্যক্ষ ভূমিকা রেখেছিলেন।
শেখ হাসিনার ক্ষমতার শেষদিকে আপিল বিভাগে বিচারক নিয়োগ নিয়ে তুমুল হইচই হয়েছিল। তৎকালীন সময়ে হাইকোর্ট বিভাগের সবচেয়ে সিনিয়র বিচারপতি কেএম হাসান ও বিচারপতি সৈয়দ জে আর মোদাচ্ছির হোসেনকে সুপারসিড করে আপিল বিভাগে নেওয়া হয়েছিল মো. রুহুল আমিন ও গোলাম রব্বানিকে। তাদের শপথের দিনে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি লাউঞ্জের সামনে স্মরণকালের বড় আইনজীবী বিক্ষোভ হয়েছিল। তখন সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতি ছিলেন ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা। তার নেতৃত্বে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, খন্দকার মাহবুব উদ্দিন আহমাদ, ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেনসহ অনেক সিনিয়র আইনজীবী বিক্ষোভে অংশ নেন। প্রধান বিচারপতি যাতে তার দপ্তর থেকে শপথের লাউঞ্জে যেতে না পারেন, এই লক্ষ্যে করিডোরে শুয়ে পড়ে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়েছিল। চরম প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে সেদিন প্রধান বিচারপতি লতিফুর রহমান শেখ হাসিনার পছন্দের দুই বিচারককে আপিল বিভাগে শপথ পাঠ করান। পরে এ ঘটনায় সিনিয়র-জুনিয়র মিলিয়ে ২৫ আইনজীবীর বিরুদ্ধে জননিরাপত্তা আইনে মামলা করা হয়েছিল। খুব সম্ভবত শেখ হাসিনার আমলে প্রণীত নিবর্তনমূলক জননিরাপত্তা আইনে এটি ছিল দ্বিতীয় মামলা।

এ ঘটনায় শেখ হাসিনাকে বোঝানোর জন্য ব্যারিস্টার সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদের নেতৃত্বে ছয় সিনিয়র আইনজীবী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। শেখ হাসিনা তার সিদ্ধান্ত থেকে একচুলও নড়েননি।
২০০১ সালে চারদলীয় জোট সরকারের সময় বিচারক নিয়োগ নিয়ে তুমুল হইচই করেছিলেন আওয়ামী লীগের আইনজীবীরা। একসঙ্গে ১৮ বিচারক নিয়োগ দিয়ে চরম বিতর্কের মধ্যে পড়েছিল চারদলীয় জোট সরকার। ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ তখন সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতি। বর্তমান আইনমন্ত্রী তখন ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদের সঙ্গে একই চেম্বারে বসেন। তারা দুজনই মূলত সৈয়দ ইশতিয়াক আহমদের জুনিয়র হিসেবে ছিলেন। রোকন উদ্দিন মাহমুদের মারমুখী নেতৃত্বে সুপ্রিম কোর্টে এক রকম অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল তখন। এই অচলাবস্থা কাটাতে হাইকোর্ট বিভাগের একটি বেঞ্চ স্বপ্রণোদিত হয়ে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে মিটিং-মিছিল নিষিদ্ধ করে রুল জারি করতে হয়েছিল। রোকন উদ্দিন মাহমুদের নেতৃত্বে আওয়ামী আইনজীবীরা সমাবেশ করে রুলের কপিতে আগুন দিয়েছিলেন।
বিচারক নিয়োগকে এ রকম বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখতে দীর্ঘদিন থেকে দাবি ছিল একটি নীতিমালা তৈরি করার। এ নিয়ে হাইকোর্ট বিভাগের একটি নির্দেশনাও রয়েছে। মইনুদ্দিন-ফখরুদ্দীনের সেনানিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক একটি নীতিমালা তৈরি করে অধ্যাদেশ জারি করেছিল। পরে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে সেটা বাতিল করে দেয়।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারও দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই একটি নীতিমালা তৈরি করে বিচারপতি নিয়োগ অধ্যাদেশ জারি করে। এই নীতিমালার অধীনে দুদফা নিয়োগও দেওয়া হয়। অধ্যাদেশ জারি করা আইন অনুযায়ী এ নিয়োগ কমিটির একজন সদস্য ছিলেন বর্তমান আইনমন্ত্রী। নিয়োগ কমিটির প্রধান হলেন প্রধান বিচারপতি নিজে। আপিল বিভাগের একজন বিচারক, আপিল বিভাগের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের একজন শিক্ষক ও অ্যাটর্নি জেনারেল এই কমিটির সদস্য। তারা বিজ্ঞপ্তি দিয়ে দরখাস্ত আহ্বান করে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে দুই দফা নিয়োগ চূড়ান্ত করেছেন। সবাই তখন মনে করেছিলেন মন্দের ভালো হিসেবে একটি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এখন এটাকে আরো স্বচ্ছতার সঙ্গে এগিয়ে নেওয়া যাবে, সেটি ভাবার কথা। অথচ বর্তমান সরকার এই অধ্যাদেশ বাতিল করে দিয়েছে। তার মানে পুরোনো আমলের মতোই নিজেদের পছন্দের লোকদের হাইকোর্ট বিভাগ ও আপিল বিভাগে বিচারক নিয়োগ দিতে চাচ্ছে সরকার। সরকারের এই সিদ্ধান্ত নির্বাচনের আগে বিএনপির ৩১ দফারও লঙ্ঘন। তাদের ৩১ দফা রাষ্ট্রসংস্কার প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, ক্ষমতায় গেলে বিচারক নিয়োগে জন্য নীতিমালা তৈরি করবে সরকার। তাদের ঘোষিত প্রতিশ্রুতির ব্যত্যয় ঘটিয়ে তৈরি করা নীতিমালা বাতিল করেছে।
১৯৯৯ সাল থেকে ঝুলে আছে আপিল বিভাগের নির্দেশনা
১৯৯৯ সালের ২ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের দেওয়া ১২ দফা নির্দেশনার একটি ছিল সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় গঠন করা। বহুল আলোচিত মাজদার হোসেন মামলার রায়ে এই ১২ দফা ঘোষণা করা হয়েছিল। ১৯৯৪ সালে মাজদার হোসেন ছিলেন জুডিশিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব। নিম্ন আদালতের বিচারকদের নানা বিষয়ে জটিলতা নিয়ে ১৯৯৪ সালে একটি রিট পিটিশন করেছিলেন তিনি। এ মামলায় রুল জারির পর শুনানি শুরু হয় ১৯৯৬ সালের ১৩ জুন। দীর্ঘ শুনানি শেষে রায় হয় ১৯৯৭ সালের ৭ মে। রায়ে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথককরণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। এ রায়ের বিরুদ্ধে তৎকালীন শেখ হাসিনার সরকার আপিল করেছিল। এই আপিলের রায় হয় ১৯৯৯ সালের ২ ডিসেম্বর। তখন আপিল বিভাগে প্রধান বিচারপতি ছিলেন মোস্তাফা কামাল। তাকে বলা হয়ে থাকে স্মরণকালে সবচেয়ে বিচক্ষণ ও তীক্ষ্ণ দৃষ্টিসম্পন্ন বিচারক। এছাড়া তখন আপিল বিভাগে তার সঙ্গে ছিলেন বিচারপতি লতিফুর রহমান, বিচারপতি মাহমুদুল আমিন চৌধুরী, বিচারপতি মাইনুর রেজা চৌধুরীসহ আরো দুজন। তাদের প্রত্যেকেই পরে প্রধান বিচারপতির দায়িত্বও পালন করেছেন। প্রত্যেকেই ছিলেন উঁচুমানের বিচারক। বিচার কার্যক্রম নিয়ে কোনো ধরনের বিতর্ক তাদের করতে পারেনি স্পর্শ।
হাইকোর্ট বিভাগের রায়ের পর্যালোচনা করেই বিচক্ষণ বিচারকদের সমন্বয়ে গঠিত আপিল বিভাগ ১২ দফা সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছিলেন। এই নির্দেশনার মধ্যেই অন্যতম ছিল বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় গঠন করা। ১৯৯৯ সালের ২ ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল মাস। ২৭ বছরের বেশি সময় পার হয়ে গেছে। এখনো বিচার বিভাগ পৃথককরণের লক্ষ্যে ১২ দফা নির্দেশনার অন্যতম সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় তৈরি হয়নি। ফ্যাবিসাদ তো করবেই না। বরং উল্টোপথে চলেছিল। সুপ্রিম কোর্টকে দলীয় ক্যাডার দিয়ে সাজিয়েছিল আওয়ামী লীগ নিজের মতো করে।
এখানে একটি বিষয় উল্লেখের দাবি রাখে। ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আইন উপদেষ্টা ছিলেন মরহুম সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ। তিনি আইন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। তার চেম্বারের জুনিয়র হিসেবে বর্তমান আইনমন্ত্রীর অবশ্যই জানা থাকার কথা। বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথককরণের লক্ষ্যে একটি অধ্যাদেশ জারির জন্য প্রস্তুতির খসড়া চূড়ান্ত করেছিলেন সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ। বিচারপতি লতিফুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার সেই অধ্যাদেশ জারির উদ্যোগ নিয়েছিল। ইতোমধ্যে নির্বাচন হয়ে যায়। তারপরও তারা অধ্যাদেশটি জারি করে দায়িত্ব থেকে বিদায় নিতে চেয়েছিলেন। তৎকালীন বিজয়ী দলের প্রধান খালেদা জিয়া ফোনে সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদকে অনুরোধ জানিয়েছিলেন অধ্যাদেশটি জারি না করার জন্য। বিচার বিভাগ পৃথককরণের সুযোগটি খালেদা জিয়া গ্রহণ করতে চান। তিনি দায়িত্ব নিয়ে বিচার বিভাগ পৃথককরণের আইন করবেন। এই কথায় আশ্বাস রেখে লতিফুর রহমানের সরকার অধ্যাদেশটি জারি করা থেকে বিরত থাকে। কিন্তু খালেদা জিয়ার পাঁচ বছরে বিচার বিভাগ পৃথককরণ আর হয়নি। দফায় দফায় সুপ্রিম কোর্টে সময় চেয়ে আবেদন করা হয়েছে।
আপিল বিভাগের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা প্রত্যেক সরকারের জন্য অবশ্য কর্তব্য। কিন্তু কোনো নির্বাচিত সরকারই তোয়াক্কা করছে না। আপিল বিভাগ সময় বেঁধে দিয়েছিল শুরুতেই। কিন্তু প্রত্যেক সরকারই আপিল বিভাগে আবেদন করে নানা অজুহাত দেখিয়ে সময় বাড়িয়ে নিতেন।
কেন এমন অনীহা? বিগত আওয়ামী ফ্যাসিবাদের সময় বিচার বিভাগের চরিত্র দেখলেই উত্তর পাওয়া যায়। বিচার বিভাগকে ব্যবহার করে একটি রাষ্ট্র কীভাবে ফ্যাসিবাদী হয়ে ওঠে, সেটির প্রমাণ শেখ হাসিনা আমলের বাংলাদেশ। সুপ্রিম কোর্ট থেকে শুরু করে ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট পর্যন্ত সবই ছিল শেখ হাসিনার নিয়ন্ত্রণে। বিচার বিভাগ স্বাধীন থাকলে এবং বিচারকদের চাকরি সরকারের মুখাপেক্ষী না থাকলে কোনো সরকারের পক্ষেই এমনটা করা সম্ভব নয়। সরকারের বেআইনি কাজ বিচার বিভাগেই চ্যালেঞ্জ হতো। বিচক্ষণ বিচারকরা বিচার বিশ্লেষণ করে সরকারকে জবাবদিহির আওতায় রাখতেন। বিচার বিভাগ স্বাধীন এবং বিচক্ষণ বিচারক থাকলে কোনো সরকারের পক্ষেই আইনের ঊর্ধ্বে উঠে কিছু করার সুযোগ থাকে না। তাই প্রত্যেক সরকারই চায় কমবেশি বিচার বিভাগ নিয়ন্ত্রণে থাকুক। বর্তমান সরকারও সেটাই চাচ্ছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা রাষ্ট্র মেরামত বা সংস্কারের তোয়াক্কা সরকার করছে না—এটাই স্পষ্ট করে দিলেন অধ্যাদেশগুলো বাতিল করার মাধ্যমে।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

