আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

আধিপত্য থেকে বিচ্ছিন্নতা

মার্কিন-ইউরোপ সম্পর্কের অবনতি

মুহিত্তিন আতামান

মার্কিন-ইউরোপ সম্পর্কের অবনতি

সম্প্রতি অনেক রাজনীতিবিদ ও শিক্ষাবিদ বিশ্বব্যবস্থার বর্তমান অবস্থা এবং এর ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করছেন। কেউ কেউ দাবি করেন, পশ্চিমা অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যের অবসান ঘটেছে; আবার কেউ কেউ বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী আধিপত্য পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে।

বিজ্ঞাপন

যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষাবিদরা গত শতকের আশির দশকের গোড়ার দিক থেকেই বিশ্বে তাদের দেশের আধিপত্যের ক্ষয় নিয়ে আলোচনা শুরু করেছিলেন। উদাহরণস্বরূপ, রবার্ট কোহেন আশির দশককে ‘আধিপত্যের পরবর্তী সময়’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ সমস্যাসংকুল ও অপ্রতুল যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য শুধু টিকে আছে অন্য কোনো বৈশ্বিক শক্তি আধিপত্যের দায়িত্ব গ্রহণ না করার কারণে।

১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার পশ্চিমা মিত্রদের সঙ্গে মিলে বিশ্বব্যাপী আধিপত্য সুসংহত করার চেষ্টা করে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) এবং ইউরোপে নিরাপত্তা ও সহযোগিতা সংস্থা (ওএসসিই) প্রতিষ্ঠাকে পশ্চিমা-নিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উদারনীতির প্রধান ইঙ্গিত হিসেবে বিবেচনা করা হতো। তবে এটি স্বল্পস্থায়ী ছিল। ৯/১১-এর সন্ত্রাসী হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র একটি নতুন সংঘাতপূর্ণ বৈশ্বিক নীতি গ্রহণ করে।

বিশেষ করে একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকের শেষে অর্থনৈতিক সহায়তার পর যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বে কল্যাণমূলক কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়, যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে সর্বজনীন আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সিদ্ধান্ত ও আন্তর্জাতিক আইনের নীতিগুলোকে দুর্বল করতে শুরু করে।

ইসরাইলে হামাসের ৭ অক্টোবরের সামরিক অভিযান ‘অপারেশন আল-আকসা ফ্লাড’-এর পর যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বেশিরভাগ সিদ্ধান্ত লঙ্ঘন করতে থাকে এবং ইসরাইলি গণহত্যায় নিঃশর্ত সমর্থন প্রদান করে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার বেশিরভাগ পশ্চিমা মিত্র মানবিক আইন ও মৌলিক মানবাধিকারের নীতিগুলো লঙ্ঘন এবং ফিলিস্তিনে যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যায় সহায়তা করেছে, যা ইসরাইলের গণহত্যা নীতিতে নিঃশর্ত সমর্থন অব্যাহত রাখা যুক্তরাষ্ট্রকে বৈশ্বিক শক্তি থেকে বিচ্ছিন্ন করতে একটি বড় ভূমিকা রাখবে।

পশ্চিমা ফ্রন্টে বিভক্তি

বর্তমান মার্কিন সরকার চীন ও রাশিয়ার মতো কয়েকটি প্রতিদ্বন্দ্বী বৈশ্বিক শক্তির সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে কিছু আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছে। মনে হচ্ছে তারা ইউরোপীয় দেশগুলোসহ অন্যান্য রাষ্ট্রের পছন্দকে উপেক্ষা করতে বদ্ধপরিকর। ট্রাম্প প্রশাসন ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ ইস্যুতে তার ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে পরামর্শ করেনি, এমনকি এই সংঘাত বন্ধের জন্য আলোচনার টেবিলে ইউক্রেন সরকারকে আমন্ত্রণও জানায়নি।

সাম্প্রতিক মার্কিন সরকারগুলো ও বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসন একতরফা ও হস্তক্ষেপমূলক বৈশ্বিক নীতি অনুসরণ করে বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রকে আরো বিচ্ছিন্ন করার পথে নিচ্ছে। এটি দেখার বিষয় যে, যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে কেবল নিরপেক্ষ রাষ্ট্রগুলোকেই নয়, বরং তার মিত্রদেরও প্রান্তিক পর্যায়ে ঠেলে দিচ্ছে। এটি স্পষ্ট, এই প্রবণতা যত বেশি সময় ধরে চলবে, যুক্তরাষ্ট্র তত বেশি বিচ্ছিন্ন থাকবে এবং প্রতিদ্বন্দ্বী বৈশ্বিক শক্তিগুলো এর থেকে তত বেশি লাভবান হবে।

এর আগে যুক্তরাষ্ট্র তার বৈশ্বিক আধিপত্য বিস্তারের নীতি বাস্তবায়নে মিত্রদের সম্মতি আদায় করত। তবে সম্প্রতি তারা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে সব দেশকে তাদের ওপর নির্ভরশীল করার চেষ্টা করছে। তারা নির্লিপ্তভাবে সব রাষ্ট্রকে হুমকি দিচ্ছে। ন্যাটো জোটের ইউরোপীয় সদস্যদের প্রতিরক্ষা বাজেট তাদের নিজ নিজ জিডিপির পাঁচ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির জন্য অনুরোধ করার অর্থ হলো যুক্তরাষ্ট্রের ওপর তাদের নির্ভরতা বৃদ্ধি করা, কারণ তারা কেবল যুক্তরাষ্ট্র থেকে উচ্চ প্রযুক্তির অস্ত্র কিনতে বাধ্য। এর উদ্দেশ্য ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি করা নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর তাদের নির্ভরতা আরো বাড়ানো।

স্বাভাবিকভাবেই এসব দাবি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে অনাস্থার সৃষ্টি করে। বিশেষ করে ইউক্রেন প্রশ্নে ট্রাম্পের দৃষ্টিভঙ্গি ইউরোপীয় দেশগুলোকে দেখিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র সংকটের মাঝখানে তার যে কোনো মিত্রকে একা ছেড়ে দিতে পারে। ইউক্রেন হচ্ছে তার সর্বশেষ উদাহরণ। যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র হওয়া সত্ত্বেও দেশটিকে ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

প্রত্যাশিতভাবেই ইউরোপীয় দেশগুলো এখন মার্কিন নিরাপত্তা ছাতা সম্পর্কে আরো বেশি সন্দিহান হয়ে উঠছে। পশ্চিম ইউরোপীয় দেশগুলোকে অবশেষে তাদের নিজ নিজ জাতীয় নিরাপত্তার ভবিষ্যতের জন্য অন্য বিকল্প খুঁজে বের করতে হবে। তুরস্ক ক্রমবর্ধমান সামরিক ক্ষমতা, সক্ষমতা ও প্রতিরক্ষা শিল্পে কার্যকর বিনিয়োগের মাধ্যমে এমন একটি বিকল্প আঞ্চলিক শক্তি হয়ে উঠতে পারে, যা নিকট ভবিষ্যতে দেশটিকে নিজেদের প্রয়োজনের তাগিদেই স্মরণ করবে ইউরোপ।

তুরস্ক সম্পর্কে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সর্বশেষ ব্যাখ্যা বিবেচনা করে অন্য ইউরোপীয় দেশগুলোও তুরস্ক সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে পারে। জেলেনস্কি বলেছেন, তারা তার দেশ ও রাশিয়ার মধ্যে শান্তি আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী ভূমিকার জন্য তুরস্কের প্রতি কৃতজ্ঞ এবং তারা আশা করে তুরস্ক তাদের রাষ্ট্রের নিরাপত্তার গ্যারান্টার হবে। কিছু ইউরোপীয় দেশ এরই মধ্যে ইউরোপ ও এর আশেপাশের সম্ভাব্য নিরাপত্তা হুমকি নিয়ে তুরস্কের সঙ্গে ব্যাপক আলোচনা শুরু করেছে।

তুরস্ক ও ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে আগামী দিনে কী ধরনের সম্পর্ক গড়ে উঠবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। ধারণা করা হচ্ছে, তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইউরোপীয় দেশগুলো নতুন বাস্তবতা মেনে নেবে এবং সেই আলোকেই তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্কের মাত্রা নির্ধারণ করবে। অন্যথায় তারা অন্যান্য বিশ্বশক্তির সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও নিজেদের অবস্থান হারাতে থাকবে।

লেখক : আংকারার সোশ্যাল সায়েন্সেস ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক

ডেইলি সাবাহ থেকে অনুবাদ : আব্দুল্লাহ আল জাবের

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন