ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২৪ সালে দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় আসার পর বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে। তিনি জো বাইডেন ও তার আগের প্রেসিডেন্টদের অনুসৃত পররাষ্ট্রনীতি থেকে সরে এসে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের ব্যাপারে নতুন পররাষ্ট্র ও বাণিজ্যনীতি অনুসরণ করছেন। নতুন এই নীতির লক্ষ্য বিভিন্ন দেশের খনিজ সম্পদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা। রাষ্ট্রীয় এই নীতির অনুসরণে কিছু ক্ষেত্রে ট্রাম্প যুক্ত করেছেন তার পারিবারিক ব্যবসা-বাণিজ্যকেও। মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণপূর্ব এশিয়া ও আফ্রিকায় এরই মধ্যে ট্রাম্পের এই নীতির প্রতিফলন ঘটতে শুরু করেছে। কোথাও শান্তি চুক্তি আবার কোথাও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের নামে ট্রাম্পের এই নতুন নীতির বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
গাজা উপত্যকাকে ফিলিস্তিনিমুক্ত করে সেখানে ইতালির উপকূলীয় বিনোদন কেন্দ্রের আদলে বিশ্বের অন্যতম সেরা বিনোদন ও পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার ট্রাম্পের অভিপ্রায় এখন আর গোপন কোনো বিষয় নয়। গাজা উপত্যকা নিয়ে ট্রাম্পের এই পরিকল্পনার কথা এর আগে প্রথম প্রকাশ করেছিলেন তার জামাতা জারেড কুশনার। ফিলিস্তিনিমুক্ত গাজায় বিরাট বাণিজ্যিক সম্ভাবনা দেখছে ট্রাম্প ফ্যামিলি। এজন্যই ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সমগ্র গাজা উপত্যকা দখল করার ঘোষণাকে সমর্থন করেছেন ট্রাম্প।
তিনি বলেছেন, ইসরাইল পুরো গাজা দখল করবে কি না, এটা একান্তই তাদের বিষয়, এখানে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু বলার নেই। ট্রাম্পের এ কথা বলার অর্থই হচ্ছে, গাজা দখলে ইসরাইলকে উৎসাহিত করা, যাতে আগামী দিনে সেখানে ট্রাম্প ফ্যামিলির পারিবারিক ব্যবসার ভিত্তি স্থাপন করা যায়।
অন্যদিকে দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশ মিয়ানমারের রেয়ার আর্থ মেটাল বা বিরল খনিজ সম্পদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দেশটির সামরিক জান্তা ও তার সহযোগীদের ওপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। সম্প্রতি এ ব্যাপারে মার্কিন ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট কার্যকর পদক্ষেপও নিয়েছে।
মিয়ানমারের চীন সীমান্তবর্তী কাচিন রাজ্যে বিপুল পরিমাণ বিরল বা দুষ্প্রাপ্য খনিজ সম্পদের বিশাল মজুত রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন চাইছে এই সম্পদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে। এজন্যই মিয়ানমারের জান্তা সরকার ও তাদের সহযোগীদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের উন্নতি ঘটাতে চায় ট্রাম্প প্রশাসন।
একই লক্ষ্য নিয়ে আফ্রিকা মহাদেশের দিকেও হাত বাড়িয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। তারা আফ্রিকার দুই প্রতিবেশী দেশ রুয়ান্ডা ও গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গোর (ডিআরসি) মধ্যে ‘শান্তি চুক্তি’ স্বাক্ষরে মধ্যস্থতা করেছে। একইসঙ্গে দেশ দুটিকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা দেওয়ার আশ্বাসও দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। কিন্তু বাস্তবে দুই দেশের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও আর্থিক সহায়তা প্রদান এখানে মূল বিষয় নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্রের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে কঙ্গোর তামা, কোবাল্ট, কোলটানসহ বিভিন্ন মূল্যবান খনিজ সম্পদের ওপর আমেরিকার করপোরেট নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।
অর্থনৈতিক সহযোগিতার নামে যে সামান্য অর্থ কঙ্গোকে দেওয়া হবে, খনিজ সম্পদ উত্তোলন করে তার চেয়ে কয়েকশ গুণ বেশি অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হবে দেশটি থেকে। এটা কি আসলে কূটনীতি, নাকি কূটনীতির খোলসে আফ্রিকার এই দেশটিতে মার্কিন উপনিবেশবাদ প্রতিষ্ঠা করা? গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গো (ডিআরসি) বিশ্বের মোট কোবাল্টের ৭০ ভাগ উৎপাদন করে থাকে। এছাড়া বিশ্বে তামা ও কোলটানের মোট উৎপাদনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশও সরবরাহ করা হয় কঙ্গো থেকে। মূল্যবান এসব খনিজ পদার্থ বৈদ্যুতিক গাড়ি ও অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র উৎপাদন ব্যবস্থায় ব্যবহার করা হয়।
কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, মূল্যবান এসব খনিজ সম্পদে ভরপুর থাকা সত্ত্বেও কঙ্গোর জনগণের জীবনমান উন্নয়নে এগুলোর কোনো ব্যবহার আজ পর্যন্ত করতে পারেনি দেশটির কোনো সরকার। এটা কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং সুচিন্তিত পরিকল্পনার মাধ্যমেই কঙ্গোর এসব সম্পদ দেশটি থেকে বের করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
আর এজন্য ব্যবহার করা হচ্ছে রুয়ান্ডা ও কঙ্গোর মধ্যে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি ও অংশীদারত্ব গড়ে তোলার জন্য দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত রিজিওনাল ইকোনমিক ইন্টেগ্রেশন ফ্রেমওয়ার্ক (আরইআইএফ) চুক্তিকে। এতে কঙ্গোর খনিজ সম্পদের সাপ্লাই চেইন ঠিক রাখার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকারীদের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। চুক্তিতে এ ধরনের ভাষা প্রয়োগের মধ্য দিয়ে আমেরিকার বিনিয়োগকারীদের বা পুঁজিকে কঙ্গোর খনি উন্নয়নের কাজে আমন্ত্রণ জানানো কার্যত বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। একইসঙ্গে কঙ্গোর খনি উন্নয়ন ও উত্তোলন প্রক্রিয়ায় স্থানীয় কোম্পানিগুলোর অংশগ্রহণের সুযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
আফ্রিকার মূল্যবান খনিজ সম্পদ পশ্চিমারা কীভাবে লুট করেছে, তার বিবরণ দিয়েছেন গায়ানার ইতিহাসবিদ ওয়াল্টার রডনির ১৯৭২ সালে প্রকাশিত ‘হাউ ইউরোপ আন্ডারডেভেলপড আফ্রিকা’ বইয়ে। তিনি এতে দেখিয়েছেন কীভাবে ঔপনিবেশিক শাসনামলে (১৮৮৫-১৯৬০) বেলজিয়ামের দুটো কোম্পানি কঙ্গোর মানুষকে নামকাওয়াস্তে গৃহায়ন ও মাতৃত্বকালীন সেবা দেওয়ার বিনিময়ে দেশটি থেকে তামা, রবার, হাতির দাঁতসহ মূল্যবান সম্পদ বছরের পর বছর লুট করেছে।
এখন পশ্চিমারা নতুন নাম নিয়ে (গ্লেনকোর, টেসলা, দ্য পেন্টাগন প্রভৃতি) আফ্রিকায় আসছে এই মহাদেশের খনিজ সম্পদ লুট করার জন্য। কিন্তু অঙ্কের কোনো পরিবর্তন হয়নি; বরং তা আগের মতোই আছে। খনিতে কঙ্গোর যেসব শ্রমিক কাজ করে, তাদের পরিবার যুগ যুগ ধরে গরিবই রয়ে গেছে। তাদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি।
সমরাস্ত্র উৎপাদনকারী ও খনিজ সম্পদ উত্তোলনকারী আমেরিকার কোম্পানিগুলোর অর্থে পরিচালিত থিংক ট্যাংক দ্য সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (সিএসআইএস) সম্প্রতি অভিযোগ করেছে, কঙ্গোর খনি সেক্টরে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে অ্যাংলো-সুইস কোম্পানি গ্লেনকোর। কোম্পানিটির বিরুদ্ধে কঙ্গোতে ব্যাপক দুর্নীতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও পরিবেশ ধ্বংসের গুরুতর অভিযোগও উঠেছে।
এমনকি গ্লেনকোর বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলের মানবাধিকার লঙ্ঘনে সহযোগিতা করার অভিযোগও করেছেন জাতিসংঘের স্পেশাল র্যাপোর্টিয়ার ফ্রান্সেসকা আলবানিজ। গ্লেনকোর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে নজর দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে থিংক ট্যাংক প্রতিষ্ঠানটি। এর অর্থই হচ্ছে মার্কিন কোম্পানিগুলোও এখন কঙ্গোর খনিজ সম্পদ থেকে মুনাফা করার সুবিধা পাবে। এ থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার, কঙ্গোর খনিজ সম্পদের সব সুবিধা ভোগ করবে পশ্চিমারা, কিন্তু দুর্ভোগ পোহাবে দেশটির দরিদ্র জনগোষ্ঠী। কঙ্গো, গাজাসহ গ্লোবাল সাউথ বা বিশ্বের দক্ষিণাঞ্চলের দেশগুলোর মানুষের জন্যই এই দুর্ভোগ প্রাপ্য।
কঙ্গো ও রুয়ান্ডার মধ্যে শান্তি ও সমঝোতা চুক্তির প্রক্রিয়া শুরু হয় গত এপ্রিল মাস থেকে। আর এতে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে যিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি কোনো কূটনীতিক নন, ট্রাম্পের মেয়ে টিফানির শ্বশুর ও বিলিয়নেয়ার ব্যবসায়ী মাসাদ বাউলোস। এ থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট, ট্রাম্প তার প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণের দায়িত্ব তার মিত্র ও মার্কিন করপোরেট স্বার্থের রক্ষক বিলিয়নেয়ার ব্যবসায়ীর হাতে তুলে দিয়েছেন। কঙ্গো-রুয়ান্ডার মধ্যে চুক্তি সম্পন্ন করার দায়িত্ব মাসাদ বাউলোসের ওপর ন্যস্ত করা এই প্রক্রিয়ারই অংশ। এর মাধ্যমে কঙ্গোতে মার্কিন কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগের পথ উন্মুক্ত করা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে ট্রাম্পের জামাতা জারেড কুশনারের চুক্তি করা থেকে শুরু করে রুয়ান্ডা-কঙ্গোর চুক্তি পর্যন্ত ট্রাম্পের কূটনৈতিক তৎপরতার সঙ্গে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমেরিকার করপোরেট স্বার্থ রক্ষার প্রতিভূ হিসেবে পরিচিত বিলিয়নেয়ার ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততাই বেশি পাওয়া যায়। বিশেষ করে ডানপন্থি মার্কিন ধনকুবের হিসেবে পরিচিতরাই ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণে ভূমিকা রাখছেন। কারণ বিলিয়নেয়ার ব্যবসায়ী প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠতা অনেক আগে থেকেই আছে।
এখন তারাই আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ভূরাজনৈতিক সংকটের সমাধানের ক্ষেত্রে নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থ ও বিনিয়োগের সুযোগকে প্রাধান্য দিয়ে চুক্তি স্বাক্ষরে মধ্যস্থতা করছেন। কঙ্গোর খনিজ সম্পদ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা শিল্পের লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত। তাই এই দেশটিতে তাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য যা করা প্রয়োজন তার সবই করছেন ট্রাম্প ও তার সহযোগী বিলিয়নেয়ার ব্যবসায়ীরা।
দ্য নিউ আরব থেকে ভাষান্তর : মোতালেব জামালী
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


হাসিনাকে ভারতের সুরক্ষা এবং বিশ্বাসঘাতকতা