শিক্ষকতা মহান পেশা। শিক্ষকতাকে বলা হয় ব্রত। প্রায় ৩৪ বছর এই পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। শত শত শিক্ষার্থীর হাসি-কান্না, সাফল্য-ব্যর্থতার সাক্ষী হয়ে অবসরে এসেছি। পেছনের দিকে ফিরে তাকালে মনে হয়, এ শিক্ষকতা শুধু পেশা নয়, সাধনা, ভালোবাসা আর দায়িত্ববোধের সমাহার।
প্রথম দিন শ্রেণিকক্ষে দাঁড়ানোর কথা এখনো মনে আছেÑউৎসাহ, ভয় আর আত্মবিশ্বাস মিলেমিশে এক অদ্ভুত অনুভূতি। ধীরে ধীরে বুঝেছি, বইয়ের পাতা পড়ানোই শিক্ষকতার সব নয়, বরং শিক্ষার্থীর মন বোঝা, তাদের স্বপ্ন দেখতে উদ্বুদ্ধ করা, তাদের মধ্যে কৌতূহল জাগ্রত করা, চরিত্র গঠন আর জীবনের পথে দিশা দেখানোই আসল দায়িত্ব।
নিজেকে প্রশ্ন করিÑঅবসর নিলেই কি শিক্ষকতা জীবনের পরিসমাপ্তি হয়? একজন শিক্ষার্থীবান্ধব শিক্ষকের অবসর নেওয়ার কি কোনো সুযোগ আছে? তার শিক্ষকতা আমৃত্যু চলতে থাকে। আমি হয়তো ক্লাসে নেই। এখনো অনেকে আমাকে ফোন করে। আমিও তাদের দু-চারজনকে ফোন করেছি। লেখাপড়া নিয়ে তাদের সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে আলোচনা হয়েছে। পাবলিক পরীক্ষার সময়ও ফোন করে কোনো কোনো শিক্ষার্থী জানতে চেয়েছেÑস্থগিত হওয়া পরীক্ষার তারিখ। জানতে চেয়েছে ব্যবহারিক পরীক্ষার জন্য কোন পরীক্ষণগুলো ভালো করে করতে হবে। ডিজিটাল যুগের সুবিধা ব্যবহার করে শিক্ষক-শিক্ষার্থী যোগাযোগ অব্যাহত রাখা সম্ভব।
শুধু নিজ বিভাগের শিক্ষার্থী নন, অন্যান্য বিভাগের শিক্ষার্থী ও অন্য কলেজের শিক্ষার্থীরাও আমার কাছে এসেছে। তারা শুধু লেখাপড়া নিয়ে আলোচনা করেনি, শিল্প, সাহিত্যসহ জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। অনেকে ব্যক্তিগত বিষয়ও শেয়ার করেছে। শিক্ষা সফরে যাবেÑটাকার সমস্যা, বইয়ের সমস্যা ইত্যাদি। এ কথা সত্য, সব ছাত্রছাত্রীর সব সমস্যার সমাধান করতে পারিনি। তবে চেষ্টা করেছি। পরীক্ষার খারাপ রেজাল্ট করে মনমরা-হতাশাগ্রস্ত শিক্ষার্থীকে কীভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে আবার নতুন করে ভালো করা সম্ভবÑসে বিষয়ে উৎসাহ দিয়েছি। কলেজে কেউ কিছু মনে করে এ কথা ভেবে কলেজের বাইরে গিয়ে কফি-শিঙাড়া খাইয়ে মনমানসিকতা বুঝে বন্ধুর মতো আচরণ করেছি। আমার বিশ্বাস হতাশাগ্রস্ত এই শিক্ষার্থীরা আমার সঙ্গ উপভোগ করেছে এবং ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
কলেজ জীবনটা যেন শিক্ষার্থীদের উপভোগ্য হয়, এটা আমাদের সবার চেষ্টা করা উচিত। এ কারণে শ্রেণিকক্ষের বাইরেও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মেশার চেষ্টা করেছি। কলেজের ভেতরে ও বাইরেও রাস্তায় চলাচল করার সময় পাশের শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলেছি। তাদের জানার ও বোঝার চেষ্টা করেছি। অনেককে কফি খেতে, গল্প করতে ডেকেছি। কেউ কেউ এসেছে। অনেকে আসেনি। ওদের সঙ্গে বন্ধুর মতো মিশতে পারলে বোঝা যায় ওদের ভেতরেও অনেক স্বপ্ন আছে। কিন্তু শিক্ষাহীন সনদনির্ভর লেখাপড়া ওদের স্বপ্নগুলো নিভু নিভু অবস্থা। এ স্বপ্নগুলো জাগ্রত করা আমাদের দায়িত্ব।
বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো আয়োজনে গেলে ওই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছিÑএকাডেমিকসহ জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে। চেষ্টা করেছি শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে যাওয়ারও। শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন, চিন্তার গভীরতা, কৌতূহল এগুলো বুঝতে চেয়েছি।
কলেজের প্রাক্তন ছাত্র দেশ ও বিদেশে উচ্চপদে অধিষ্ঠিত হয়ে কলেজকে একটি ঈর্ষণীয় অবস্থানে পরিচিত করেছে। এদের অনেকেই আমার ছাত্র। এ কথা ভাবতে ভালো লাগে। তিন দশকের বেশি সময় শিক্ষকতা নিষ্ঠার সঙ্গে অর্পিত দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট থেকেছি। সুস্থ শরীরে চাকরিজীবন শেষ করতে পারায় আল্লাহ সুবহানাল্লাহুতায়ালার কাছে কৃতজ্ঞতা জানাই। শিক্ষকতা জীবনে অনুজ সমকর্মীদের সঙ্গে আমি বন্ধুর মতো মিশেছি। শিক্ষার্থী ও সহকর্মীদের কাছ থেকে সমাদর ও সম্মান পেয়েছি, তার জন্য কৃতজ্ঞ। এখনো অবসর জীবনে শিক্ষার্থী ও সহকর্মীরা আমাকে দেখতে আসেন। ফোন করে আমার কুশল জিজ্ঞেস করেন। বলেনÑস্যার আমি আপনাকে মিস করছি। আপনাকে ভুলিনি। তাদের এমন কথায় আমার কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে। আমার ধারণা, যারা মনোযোগ দিয়ে ক্লাস করেছে, তারা আমাকে মনে রেখেছে। আমার মনে হয়, আমি এখনো অনানুষ্ঠানিক শিক্ষকতা করছি। বৈষয়িক ব্যস্ততার ফাঁকে লেখালেখি করছি, বই পড়ছি। কখনো লেখালেখির বিষয়বস্তু নিয়ে সহকর্মী ও শিক্ষার্থীরা ফোনে আলোচনা করেন, মতামত দেন। এভাবেই ব্যস্ততার সঙ্গে সময় কাটাচ্ছি। অবসর আমাকে চাকরি থেকে মুক্ত করেছে। কিন্তু শিক্ষক মন থেকে নয়।
আজ বাংলাদেশের প্রায় সর্বক্ষেত্রে ওপরে ওঠার মই রাজনীতি, সেখানে শিক্ষকতার মতো মহান পেশায়ও অনেক সময় টিকে থাকতে হয়েছে সংগ্রাম করে। শিক্ষকতা, বই পড়া ও লেখালেখি নিয়েই নিজেকে ব্যস্ত রেখেছি। মাঝে মাঝে মনে হয়েছে তাতে আমি কোনো ভুল করছি কি না?
একজন আদর্শ শিক্ষকের জীবন হবে শিক্ষার্থীর সামনে খোলা বইয়ের মতো। তাকে দেখেই শিক্ষার্থীরা অনেক কিছু শিখবে। শিক্ষক শব্দটির সঙ্গে জ্ঞান, দক্ষতা, সততা, নির্লোভ, নিরহংকার, নির্মোহ, আদর্শ, মূল্যবোধ শব্দগুলো ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই শিক্ষকতা এমন এক আলো, যা অবসরের পরও নিভে যায় নাÑশুধু নতুন পথেই আলো ছড়ায়।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত কলেজশিক্ষক, কলাম লেখক ও সংগঠক
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

