২০২৫ সালের জুনে ইরানে ইসরাইলি হামলার সময় দেশটির প্রতিরোধ সক্ষমতা, বিশেষ করে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা অনেকটাই অকার্যকর হয়ে পড়েছিল। ইরানের এই নিরাপত্তা ব্যর্থতার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেশটির প্রতিরক্ষাসহ স্পর্শকাতর নিরাপত্তাব্যবস্থায় ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের এজেন্টদের ভূমিকাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। মোসাদের এই তৎপরতা মধ্যপ্রাচ্যে চীনের অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশ ইরানে চীনের স্বার্থকে হুমকির মুখে ফেলেছে। সংগত কারণেই চীন ইরানে মোসাদ এজেন্টদের অনুপ্রবেশের পরিমাণ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। বিশেষ করে, ইরানের অনেক অভ্যন্তরে ইসরাইলি যুদ্ধবিমানের হামলার পর দেশটির নিরাপত্তাব্যবস্থায় ব্যাপক ফাঁক থাকার চিত্রই উঠে এসেছিল।
চীনের মূল্যায়নে বিষয়টি প্রতিফলিত হয়েছে। চীনা পর্যবেক্ষক এবং সামরিক বিশ্লেষকেরা সতর্ক করে দিয়েছেন, ইরানি গোয়েন্দা সংস্থায় এবং দেশটির স্পর্শকাতর স্থাপনাগুলোয় মোসাদের এজেন্টদের অনুপ্রবেশের ক্ষেত্রে ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থাটির এই সাফল্য বিশ্বব্যাপী নিরাপত্তাঝুঁকির একটি প্যান্ডোরার বাক্স খুলে দিয়েছে। বেইজিং বিশ্বাস করে, ইরানে ইসরাইলের এজেন্ট স্থাপন এবং ভেতর থেকে দেশটির বিমান প্রতিরক্ষা এবং রাডার সিস্টেম নিষ্ক্রিয় করার ক্ষমতা গোয়েন্দা যুদ্ধের একটি নতুন ধরনকে সামনে এনেছে। এর বিরুদ্ধে সতর্কতা অবলম্বন এবং চীনা জাতীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা শক্তিশালী করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
এ কারণে ইরানে ইসরাইলি গোয়েন্দা অনুপ্রবেশ রোধ করা এবং দেশটিতে বর্তমানে মোসাদের যেসব এজেন্ট সক্রিয় রয়েছে, তাদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করতে প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বৃদ্ধি করেছে চীন। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের সরকারি ডেটাবেস এবং সফটওয়্যারে যে সিভিল রেজিস্ট্রি এবং পাসপোর্ট ডেটা অন্তর্ভুক্ত ছিল, তাতে ইসরাইলি এজেন্টরা কীভাবে ঢুকতে পেরেছে, তা তদন্ত করতে চীন ও রাশিয়া ইরানকে সহযোগিতার ইঙ্গিত দিয়েছে। এই সহযোগিতার লক্ষ্য হলো, মোসাদ যে প্রযুক্তিগত ফাঁকগুলো কাজে লাগিয়ে ইরানের স্পর্শকাতর সামরিক ও পারমাণবিক লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে পেরেছিল, সেসব ফাঁকফোকর বন্ধ করা।
এছাড়া, ইরানের প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা সক্ষমতা বাড়ানোর প্রতিও সমর্থন দিচ্ছে চীন। ইরানে চীনা নজরদারি উপগ্রহ সরবরাহের মাধ্যমে ইসরাইলি গোয়েন্দা অনুপ্রবেশ রোধ করার জন্য ইরানের সক্ষমতা বাড়াতে কাজ করছে বেইজিং। ইরান তার দূরবর্তী পর্যবেক্ষণ এবং গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের সক্ষমতা বাড়াতে চ্যাং গুয়াংয়ের মতো শীর্ষস্থানীয় চীনা কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে উন্নত প্রযুক্তি চেয়েছে, যাতে এর মাধ্যমে তারা ইসরাইলের গতিবিধি আরো সঠিকভাবে ট্র্যাক করতে পারে।
মার্কিন এবং পশ্চিমা জিপিএস সিস্টেমের ওপর নির্ভরতা কমাতে এর বিকল্প হিসেবে বেইডু নামে পরিচিত চীনা নেভিগেশন সিস্টেমে নিজেদের জিপিএস সিস্টেমকে রূপান্তরের পরিকল্পনা নিয়েছে ইরান। এই পদক্ষেপের লক্ষ্য হলো, পশ্চিমা প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা হ্রাস করা। কারণ পশ্চিমা প্রযুক্তি সবসময়ই হ্যাকিং বা ব্যাঘাতের ঝুঁকিতে থাকে। এর আগে ফাঁস হওয়া একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের প্রতিরোধ সক্ষমতা জোরদারে সামরিক সহায়তা দেবে চীন। এই লক্ষ্যে দেশটির ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র অস্ত্রাগার পুনর্নির্মাণ এবং ২০২৫ সালের ইসরাইলি হামলার পর কঠিন জ্বালানি উপাদান এবং নির্দেশিকা ব্যবস্থা সরবরাহে সহায়তার জন্য ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তিও করেছে বেইজিং।
ইরানে মার্কিন এবং ইসরাইলি হস্তক্ষেপের বিষয়ে চীনের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট। আর তা হচ্ছে, দুই দেশের মধ্যে ২৫ বছরের ব্যাপক কৌশলগত সহযোগিতা চুক্তির আলোকে ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যেকোনো বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরোধিতা অব্যাহত রাখবে চীন। কারণ তেহরানের স্থিতিশীলতাকে চীন তার একটি কৌশলগত স্বার্থ হিসেবে বিবেচনা করে। এই প্রেক্ষাপটেই ইসরাইল এবং ইরানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান গোয়েন্দা ও সামরিক সংঘাতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বেইজিং। তারা এই অঞ্চলে জ্বালানি ও বাণিজ্য রুট ব্যাহত না করার জন্য ধারাবাহিকভাবে সংযমের আহ্বান জানিয়ে আসছে ইসরাইলসহ সব দেশের প্রতি।
ইরানে চীনা গোয়েন্দা, সামরিক, প্রতিরক্ষা এবং নিরাপত্তা সহযোগিতার পাশাপাশি দেশটিতে মোসাদের অনুপ্রবেশ মোকাবিলা এবং বর্তমান শাসনব্যবস্থার স্থিতিশীলতাকে সমর্থন করার জন্য কয়েকটি চীনা কৌশলের কথা বলা হয়েছে। এই কৌশলগুলোর মধ্যে আছে সাইবার নিরাপত্তা এবং ‘সফটওয়্যার অস্ত্র’ বিচ্ছিন্ন করা, যার মাধ্যমে চীন ইরানে পশ্চিমা প্রযুক্তিগুলো নিজেদের তৈরি বিকল্প প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রতিস্থাপন করবে।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে চীন ইরানে মোসাদ এবং আমেরিকান কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) তৎপরতা ব্যর্থ করার লক্ষ্যে একটি কৌশল বাস্তবায়ন শুরু করে। এ জন্য তারা ইরানকে আমেরিকান এবং ইসরাইলি কোম্পানিগুলোর সফটওয়্যার ব্যবহার বন্ধ এবং সুরক্ষিত চীনা সিস্টেম দিয়ে এগুলো প্রতিস্থাপন করতে বলে। কারণ তাদের এই সিস্টেমে অনুপ্রবেশ করা কঠিন।
চীন ইরানের ডিজিটাল সার্বভৌমত্বকে সমর্থন করার জন্যও কাজ করছে। ১৫তম চীনা পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় (২০২৬-২০৩০) ইরানের সাইবারস্পেসকে ইসরাইলি এবং আমেরিকান আক্রমণ ও নাশকতা থেকে রক্ষার জন্য সাইবার নিরাপত্তা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ২০২৫ সালের জুন মাসে ১২ দিনের যুদ্ধের পর ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থা পুনর্নির্মাণেও কাজ করছে চীন। সেই যুদ্ধে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনাগুলো লক্ষ্যবস্তু করেছিল ইসরাইল।
ইরানের অস্ত্রাগার পুনর্নির্মাণ এবং সেনাবাহিনীর ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের জন্য স্পর্শকাতর উপাদান সরবরাহে সহায়তা করছে চীন। বিশেষ করে, তেহরানে সোডিয়াম পারক্লোরেটের মতো কঠিন রকেট জ্বালানি রাসায়নিক, নির্ভুল নির্দেশিকা ব্যবস্থা এবং মাইক্রোপ্রসেসর সরবরাহ করেছে তারা। ফলে ইসরাইলি গোয়েন্দাদের জন্য ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রগুলো প্রযুক্তিগতভাবে নিষ্ক্রিয় করা বর্তমানে কঠিন হয়ে পড়েছে।
ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা এবং রাডার ব্যবস্থা শক্তিশালী করার জন্যও কাজ করছে চীন। অ্যান্টি-স্টিলথ সিস্টেমের সাহায্যে ইরান তার ভূখণ্ডে ওয়াইএলসি-৮বি এবং জেওয়াই-২৭এ-এর মতো উন্নত চীনা রাডার ব্যবস্থা মোতায়েন করতে চাইছে। এগুলো একই চীনা রাডার সিস্টেম, যা ইসরাইলি স্টিলথ বিমান বা এফ-৩৫ যুদ্ধ বিমান শনাক্ত করতে সক্ষম।
মোসাদের আগে রাডার সিস্টেমে ইরানের এই দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে দেশটির অনেক গভীরে অভিযান চালাতে সক্ষম হয়েছিল। চীন ইরানের এই দুর্বলতা দূর করতে এবং সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি ইসরাইলের সামরিক সক্ষমতার সঙ্গে ব্যবধান কমাতে কাজ করছে। তারা মধ্যপ্রাচ্যে ‘শক্তির ভারসাম্য’ প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্য নিয়েছে, যা ইসরাইলকে ইরানের আকাশসীমার ওপর নিরঙ্কুশ শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করা থেকে বিরত রাখবে।
চীন ‘সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা’র (এসসিও) মধ্যে গোয়েন্দা ব্যবস্থার মাধ্যমে ইরানকে সহায়তা প্রদানে একটি সুগঠিত পরিকল্পনা তৈরি করেছে। এর মধ্যে আছে ‘এসসিও’র একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ নেওয়া। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ‘এসসিও’র সদস্যরাষ্ট্রগুলো (চীনের নেতৃত্বে) তথ্য সমন্বয়ের লক্ষ্যে ‘নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ এবং হুমকি মোকাবিলায় একটি বিস্তৃত কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠার চুক্তি স্বাক্ষর করে। বহিরাগত নাশকতামূলক কার্যক্রম বিশেষ করে, ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানগুলো প্রতিহত করার জন্য ইরানসহ সদস্যদেশগুলোর মধ্যে গোয়েন্দা সহযোগিতা বিদ্যমান রয়েছে। এছাড়া চীন ইসরাইলের সঙ্গে তার বাণিজ্যিক লেনদেনে ‘সামরিক কূটনীতি’র কৌশল অনুসরণ করছে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা আরো গভীর করা এবং গুপ্তচরবৃত্তি বিরোধী দক্ষতা হস্তান্তরের জন্য উচ্চপর্যায়ের চীনা কর্মকর্তাদের সফর বাড়ানো হয়েছে।
ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানোর জন্য মার্কিন-ইসরাইলি তৎপরতার বিরুদ্ধে তেহরানের গৃহীত পদক্ষেপগুলোর প্রতি সমর্থন অব্যাহত রেখেছে চীন। বেইজিং ইরানে মোসাদের অনুপ্রবেশের সাফল্যকে তার অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং নিজেদের আন্তঃমহাদেশীয় অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্প বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) জন্য সরাসরি হুমকি হিসেবে দেখে। কারণ ইসরাইলি গোয়েন্দা তৎপরতা লোহিত সাগর অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক প্রণালি, এডেন উপসাগর, বাব এল-মান্দেব প্রণালি এবং হরমুজ প্রণালির প্রবেশপথে চীনা বাণিজ্য ও সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করবে।
সংগত কারণেই চীন ইরানে ইসরাইলি গোয়েন্দা অনুপ্রবেশকে একটি ‘নিরাপত্তা শিক্ষা’ এবং তার কৌশলগত অংশীদার ইরানের জন্য একটি গুরুতর চ্যালেঞ্জ বলে মনে করে। এ জন্যই বেইজিং ইরানে তার প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি স্থানান্তরের গতি বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে ইরানে মোসাদের গোপন অভিযানের বিরুদ্ধে তেহরানের প্রতিরোধ সক্ষমতা বাড়াতে উন্নত নজরদারি সরঞ্জাম ব্যবহার করা হচ্ছে।
মডার্ন ডিপ্লোমেসি থেকে ভাষান্তর : মোতালেব জামালী
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

