আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

প্রাকৃতজন : লিপির যাত্রা ও বাংলা ভাষার বিতর্ক

অভীক সানোয়ার রহমান

প্রাকৃতজন : লিপির যাত্রা ও বাংলা ভাষার বিতর্ক

ভারতের বর্তমান কেন্দ্রীয় প্রশাসন, বিজেপি, সম্প্রতি একটি বিতর্কিত দাবি উত্থাপন করেছে যে বাংলা নাকি বাংলাদেশের ভাষা, ভারতীয় নয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে, বাংলাভাষী বহু মানুষ, বিশেষত মুসলমানদের ভারত থেকে বিতাড়িত করার পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই পদক্ষেপের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বহু ভারতীয় ব্যবহারকারী এই বিতর্কের তীব্র সমালোচনা করেছেন। কেউ কেউ দাবি করেছেন, পশ্চিমবঙ্গের বাংলা একেবারে আলাদা আর বাংলাদেশের ভাষা নাকি ‘ফারসি, আরবি ও অন্যান্য ভাষা দ্বারা প্রভাবিত,’ ফলে সেটি ‘আসল বাংলা’ নয়। অথচ ইতিহাস, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এবং ভাষাতত্ত্ব একেবারে উল্টো প্রমাণ তুলে ধরে।

প্রাচীন থেকে আধুনিক : লিপির দীর্ঘ যাত্রা বাংলা ভাষার শেকড় নিহিত প্রাকৃত বা পালি ভাষার ভেতরে, যা সম্রাট অশোক তার শিলালিপি ও স্তম্ভলিপিতে ব্যবহার করেছিলেন। ‘পলি ভাষাই ছিল সাধারণ মানুষের ভাষা, যেটির মাধ্যমে বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ ও আদর্শ সহজেই মানুষের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল’—এমনটি উল্লেখ করেছেন ভাষাতত্ত্ববিদ সুকুমার সেন (History of Bengali Language, পৃষ্ঠা ৫৪-৫৬)। এমনকি সিন্ধু ঘাঁটি সভ্যতার (২৬০০-১৯০০ খ্রিষ্টপূর্ব) ৪০০০টির বেশি লিপির মধ্যে অন্তত ১৫টি প্রতীক অশোকের ‘ধম্ম লিপি’র সঙ্গে আশ্চর্য মিল রাখে (Asko Parpola, Deciphering the Indus Script, পৃষ্ঠা : ৮৬-৯২)।

বিজ্ঞাপন

নাগরী ও গৌড়ী লিপির জন্ম গুপ্ত যুগে (চতুর্থ-ষষ্ঠ শতাব্দী) পালি-ব্রাহ্মী লিপি থেকে নাগরী লিপির উদ্ভব হয়। সীশ্নাগ রাজবংশের পৃষ্ঠপোষকতায় অজন্তা-ইলোরা গুহাচিত্রে প্রাথমিক নাগরী লিপির উদাহরণ দেখা যায় (K.V. Ramesh, Indian Epigraphy, পৃষ্ঠা : ১৯৮-২০১)। সেখান থেকে পূর্ব ভারতে গৌড়ী লিপির বিকাশ ঘটে, যা চর্যাপদের (৮ম-১২শ শতাব্দী) মতো বৌদ্ধ গানের ভাষা ছিল। সেনের মতে, ‘গৌড়ী লিপি ছিল বাংলা ভাষার প্রাক-মানক রূপ’ (পৃষ্ঠা : ৭২-৭৫)।

সুলতানি আমল থেকে ব্রিটিশ যুগ ১৪০০ শতাব্দীর বাংলা সুলতানি আমলে বাংলা লিপি একটি স্থায়ী রূপ পায়। তুর্কি শাসকরা স্থানীয় ভাষা সমর্থন করেছিলেন, আরবি চাপিয়ে দেননি। ইতিহাসবিদ সুনীতিকুমার ভট্টাচার্য বলেছেন, ‘এ সময়েই বাংলা লিপির প্রমিত রূপ গড়ে ওঠে, (Origin and Development of Bengali Language, পৃষ্ঠা : ৮৮-৯১)। ব্রিটিশ শাসন-পরবর্তী সময়ে (১৮৫৭-এরপর) শিক্ষানীতি সংস্কারের মাধ্যমে সংস্কৃত প্রভাব বৃদ্ধি করে, যা আজকের ‘সংস্কৃতমিশ্রিত বাংলা’র জন্ম দেয় (বিনয় ঘোষ, *Bengal’s Contribution to Sanskrit Literature*, পৃষ্ঠা : ১৩১-১৩৫)।

বাংলা ও সংস্কৃতের পার্থক্য সংস্কৃত প্রকৃতপক্ষে নাগরী লিপির ‘চর্চিত রূপ’, প্রাকৃতের সরাসরি উত্তরসূরি নয়। ‘নাগরী লিপি, অশোকের পালি শিলালিপির সঙ্গে সম্পর্কিত, পরে সংস্কৃতের বাহক হয়েছে’ (Richard Salomon, Indian Epigraphy, পৃষ্ঠা : ১৫৯-১৬২)।

ধ্বনিগত পার্থক্য : সংস্কৃত বনাম প্রাকৃত-পালি-বাংলা বাংলা ভাষার উচ্চারণে এখনো প্রাকৃত ও পালির প্রভাব রয়েছে। নিচের ছকে দেখানো হয়েছে কোন ধ্বনি সংস্কৃতে আছে, কিন্তু প্রাকৃত বা পালিতে অনুপস্থিত বা রূপান্তরিত :

ধ্বনি সংস্কৃতে আছে প্রাকৃত/পালিতে রূপ উদাহরণ

প্র ✓ প প্রথম → পথম

ছ ✓ নেই ছায়া → সা

শ ✓ স শান্ত → সান্ত

s (অনুস্বার) ✓ কম ব্যবহৃত সংগ → সঙ

t (বিসর্গ) ✓ নেই বা বিরল দুঃখ → দুক্ক

উপরের ধবনি বিন্যাস থেকে বোঝা যায় বাংলার অভিজাত শ্রেণির ভাষা অর্থাৎ উচ্চারণ যদিও সাংস্কৃতিক ধারায় চলছে, তবু বুহুজন সমাজে এ উচ্চারণ এখনো চালু হয়নি। যেমন : আমাদের এখানে অনেক শিক্ষিত লোকই ছ-এর বদলে স উচ্চারণ করেন এক্সেমন ‘ছাত্র’-এর জায়গায় ‘সাত্র’ উচ্চারণ করেন। উচ্চারণের প্রকারভেদ থাকলেও বাংলা লিপি কিন্তু স্বতন্ত্রতা নিয়েই এগিয়ে চলেছে সংস্কৃতি লিপি ‘দেব নাগরির’ সঙ্গে এর কোনো সামঞ্জস্য নেই।

উপসংহার : বাংলা ভাষা কোনো রাজনৈতিক সীমারেখায় বাঁধা নয়। এটি সিন্ধু ঘাঁটি সভ্যতা থেকে গৌড়ীয় কবি, সুলতানি দরবার থেকে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত এক দীর্ঘ সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের নাম। যেমন : সুকুমার সেন লিখেছেন : ‘বাংলা এক জনগণের প্রাণভাষা—যার শিকড় প্রাকৃতের মাটিতে এবং যার পত্রপল্লব সকল বঙ্গদেশের’। (পৃষ্ঠা : ১০২)।

লেখক : সাংবাদিক, যুক্তরাষ্ট্র থেকে

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন