আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

বিপ্লবের পথই মুক্তির পথ

তারেকুল ইসলাম

বিপ্লবের পথই মুক্তির পথ

গত বছর ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পতনের দিনটি ছিল ঈদের দিনের মতো। সারা দেশের মানুষ আনন্দে রাস্তায় নেমে এসেছিল। আপ্লুত অনেকে সিজদায় অবনত হয়ে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেন। এমনকি কোথাও কোথাও দেখেছি, রাস্তায় ভিড় সরিয়ে জামাতে নামাজ পড়ে খুশিতে কান্নারত হয়ে মুনাজাত করছিলেন বিপ্লবী ছাত্র-জনতা। একই চিত্র দেখা যায় গণভবনের প্রাঙ্গণেও। ঠিক সেই দিনটি যেন অন্যরকমভাবে আবারও ফিরে আসে গত ৫ ফেব্রুয়ারিতে। বিপ্লবী ছাত্র-জনতা ঐক্যবদ্ধভাবে বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিল ধানমন্ডি ৩২ নম্বর রোডের আওয়ামী ফ্যাসিবাদের জনক শেখ মুজিবর রহমানের বাড়ি।

তারই অনুগামী কন্যা হাসিনার শাসনামলে এই বাড়িটি হয়ে উঠেছিল মুজিববাদের কেবলা—আওয়ামী ধর্মের তীর্থস্থান। উল্লসিত সাধারণ জনতাকে স্মারক হিসেবে মুজিবের ভাঙা বাড়ির ইট, রড ও বিভিন্ন জিনিস সংগ্রহ করতেও দেখা গিয়েছিল। এ ঘটনার ‘নিন্দা’ জানাতে মোটেও দেরি করেনি ভারত।

বিজ্ঞাপন

গত বছরের জুলাইজুড়ে হাসিনার খুনি বাহিনী ছাত্র-জনতার ওপর যখন গণহত্যা চালাচ্ছিল, তখন দেশটি বলেছিল এটি বাংলাদেশের ‘অভ্যন্তরীণ ব্যাপার’। কিন্তু এবার মুজিবের বাড়ি ভাঙা ইস্যুতে ‘নিন্দা’ জানিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে নাক গলাতে বিন্দুমাত্র লজ্জা হলো না ভারতের। তবে এটা বোঝা গেল, আমাদের বিপ্লবী ছাত্র-জনতার এমন সাহসী উদ্যোগ অত্যন্ত সঠিক ছিল।

এ ঘটনা আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনেও লক্ষণীয় পরিবর্তন এনেছে। আওয়ামী লীগ ইস্যুতে কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের বয়ান ও অবস্থান রাতারাতি বদলে গেছে। এটা পরিষ্কার, রাজনৈতিক দলগুলো বুঝে গেছে, ভারতের তালে চললে এদেশের জনগণ তা মানবে না।

আওয়ামী ফ্যাসিজমের দলীয় রূপ মুজিববাদ। বলা যায়, মুজিববাদের পুনরুজ্জীবন ও চূড়ান্ত সম্প্রসারণ ঘটেছিল হাসিনার হাতে। বাকশালী পিতাকেও ছাপিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন এশিয়ার ‘আয়রন লেডি’। প্রভাবশালী ব্রিটিশ ম্যাগাজিন দি ইকোনমিস্ট ২০২৩ সালের মে মাসে এক প্রতিবেদনের শিরোনামে তাকে এই কলঙ্কজনক উপাধি দেয়, যদিও তখন আওয়ামী লীগের লোকজন এই উপাধিকে ‘গৌরব’ হিসেবে প্রচার করার চেষ্টা করে। এ ধরনের উপাধি কোনো প্রকৃত গণতান্ত্রিক শাসকের জন্য যে দেওয়া হয় না, সেই বোধটুকুও তাদের লোপ পেয়েছিল।

বস্তুতপক্ষে, দি ইকোনোমিস্ট যে তাকে ইতিবাচক অর্থে এই উপাধি দেয়নি, তা প্রতিবেদনেই স্পষ্ট ছিল। ম্যাগাজিনটি বলেছিল, ‘…the de facto one-party state that Sheikh Hasina, fulfilling one of her father’s ambitions, has made.’ অর্থাৎ, একদলীয় শাসন কায়েম করেছেন হাসিনা, যা ছিল তার পিতার অন্যতম একটি উচ্চাভিলাষ বা স্বপ্ন। সন্দেহ নেই, পিতার ফ্যাসিবাদী মতাদর্শ ও পদাঙ্ক অনুসরণ করেই হাসিনা তার একদলীয় শাসনব্যবস্থা জায়েজ করে নিয়েছিলেন। স্বৈরাচারী মুজিবও একদলীয় শাসন (বাকশাল) কায়েম করে আজীবন ক্ষমতায় থাকার বন্দোবস্ত করেছিলেন, কিন্তু অচিরেই তার করুণ পরিণতি হয়েছিল। হাসিনাও যে সেই একই পথে হেঁটেছেন, তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে।

অন্যদিকে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর সুবিধাবাদী বাম ও তথাকথিত প্রগতিশীল ব্যক্তিরা কেঁদে-কেটে বলার চেষ্টা করছেন যে, হাসিনা খারাপ ঠিক আছে, কিন্তু তার কৃতকর্মের দায় তার পিতার নয়। অথচ হাসিনা তার পিতার ফ্যাসিবাদী বাকশালী আদর্শ ও ট্র্যাজেডি ব্যবহার করেই তার পুরো শাসনামলকে ভিত্তি দিয়েছিলেন। মানুষের সহানুভূতি অর্জনের লক্ষ্যে হাসিনা তার পিতার ট্র্যাজেডি যত্রতত্র ব্যবহার করতেন। ভিকটিম কার্ড খেলে রাজনৈতিক ফায়দা তুলতেন। এমনকি কতটা নির্লজ্জ হলে ইকোনমিস্টের ওই সাংবাদিককে তার উপদেষ্টারা বলেছিলেন, হাসিনাকে তার পিতার ট্র্যাজেডি নিয়ে প্রশ্ন করতে।

ওই সাংবাদিক প্রতিবেদনটিতে সেটা ফাঁস করে দিয়ে মন্তব্য করেছিলেন, পিতার ট্র্যাজেডির ওপর শেখ হাসিনা একটি আরোপিত ব্যক্তিক কাল্ট (an imposing personality cult) নির্মাণ করেছেন। সুতরাং, ফ্যাসিবাদ প্রশ্নে হাসিনাকে তার পিতার কাছ থেকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। কিন্তু ফ্যাসিবাদের আঁতুড়ঘর ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাড়ির শোকে হতবিহ্বল হয়ে যারা বিপ্লবী ছাত্র-জনতাকে ‘মব’ বলে অপবাদ দেওয়ার চেষ্টা করছেন, তারা হয় জুলাই বিপ্লবের শত্রু, অথবা বিপ্লবের চেতনা ধারণ করেন না। বিপ্লব কখনো আইন মেনে নিয়মতান্ত্রিকভাবে হয় না। বরং প্রচলিত কাঠামো ও স্ট্যাটাস-ক্যু ভেঙে দিয়ে বিপ্লবীদের ভিশন ও আদর্শ অনুসারেই নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত তৈরি হয় এবং সেটা কর্তাগুণেই বৈধতাসিদ্ধ।

বিপ্লবীরা নিজেরাই বৈধতার চাবিকাঠি। বৈধতার প্রশ্নে তারা বিদ্যমান সংবিধানের মুখাপেক্ষী নয়। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান প্রচলিত সংবিধান বা আইন মেনে হয়নি। এটি নিছক গণ-অভ্যুত্থান ছিল না, এর স্পষ্ট বিপ্লবী স্পিরিট ও ক্যারেক্টার রয়েছে। ফলে জুলাই বিপ্লবের দাবি হলো, নতুন সংবিধান গঠন ও তার ভিত্তিতে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তকরণ। গণ-অভ্যুত্থানের স্টেকহোল্ডার সব পক্ষের সাথে মিলে রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে অবিলম্বে জুলাই বিপ্লবের দাবিকে বাস্তবে রূপ দিতে হবে। তা না হলে আমরা আবারো পুরোনো ব্যবস্থার মধ্যে পড়ে যাব এবং আগের মতো খাবি খেতে থাকব।

বাহাত্তরের সংবিধান মানে আওয়ামী ধর্মগ্রন্থ। সেখানে হাত দেওয়া যেন মহাপাপ! কিন্তু চব্বিশের বিপ্লবী ছাত্র-জনতা স্পষ্টভাবেই বাহাত্তরের সংবিধানের লিগ্যাসি প্রত্যাখ্যান করে নতুন গণসংবিধান চায়। বাহাত্তরের সংবিধান এ জাতির আত্মগ্লানি হয়ে উঠেছে। কারণ এটি গঠনকালে এদেশের আপামর মানুষের আকাঙ্ক্ষা ও ভাবধারা ধারণ না করে ভারতের সেক্যুলার প্রেসক্রিপশন গিলেছিল, যার ফলে গত পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে গোটা জাতি একের পর এক ক্রান্তিকাল পার করেও কোনো সফল রাজনৈতিক মীমাংসার দিকে এগিয়ে যেতে পারেনি।

এমনকি নব্বইয়ের এরশাদবিরোধী গণ-অভ্যুত্থানও কোনো কার্যকর রাজনৈতিক বন্দোবস্তের দিশা দিতে ব্যর্থ হয়েছিল। তাই আমাদের এখন করণীয় হলো, অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংবিধানসভা বা গণপরিষদ (constituent assembly) গঠন করে নতুন সংবিধান প্রবর্তন এবং তার ভিত্তিতে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের মাধ্যমে রাষ্ট্রের পুনর্গঠন করা। একটি ফ্যাসিবাদমুক্ত নতুন রাষ্ট্রকাঠামো ও রাজনৈতিক বন্দোবস্তের মধ্যে আমাদের অতিসত্বর ঢুকে যেতে হবে। তা না হলে আওয়ামী ফ্যাসিবাদ ও ভারতীয় আধিপত্যবাদ মিলিতভাবে বারবার আমাদের দংশন করবে এবং ক্ষত-বিক্ষত করে যাবে।

সিরিয়ায় বিপ্লবীরা একনায়ক আসাদকে উৎখাত করার পর আসাদের বার্থ পার্টি নিষিদ্ধ করেছে এবং আসাদের কয়েক ডজন দোসরকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। বিপ্লবীদের ক্ষমতা অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে তাদের চিহ্নিত শত্রুকে নির্মূল বা ডিজআর্ম করতে হয়। না হলে প্রতিবিপ্লবের ষড়যন্ত্র ধেয়ে আসে একের পর এক, যা ৫ আগস্ট থেকে আমাদের এখনো মোকাবিলা করতে হচ্ছে। আমাদের ছাত্র-জনতার বিপ্লব অনেকটা বেহাত হয়ে গেছে বলে অনেকের আশঙ্কা। কিন্তু ভারত থেকে হাসিনার বক্তব্য প্রদানকে কেন্দ্র করে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়ার প্রেক্ষাপটে ছাত্র-জনতার ঐক্য ও বিপ্লবী চেতনা আবারও সুসংহত হয়েছে বলা যায়। এই সুসঙ্ঘবদ্ধ ঐক্য ধরে রাখতে হবে।

এ মুহূর্তে কেবল ঐক্যই জুলাই বিপ্লবকে সুরক্ষা দিতে পারে। ক্ষমতাচ্যুত ফ্যাসিস্ট হাসিনা তার প্রভু ইন্ডিয়ার কোলে বসে যতবার মাথা তুলে দাঁড়ানোর চেষ্টা করবেন, বিপ্লবী ছাত্র-জনতা ততবার দ্বিগুণ শক্তিতে আওয়ামী ফ্যাসিবাদের অবশিষ্ট নিশানাগুলোও নির্মূল করবে। গত ১৬ বছর ধরে ভারতের বশংবদ হাসিনাকে উৎখাতে প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলো যখন একের পর এক আন্দোলনে ব্যর্থ হচ্ছিল, তখন ছাত্র-জনতা এদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের নয়া অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে আবির্ভূত হয়।

তাদের গড়ে তোলা দুর্বার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ভারতে চোরের মতো পালিয়ে গেলেও গণহত্যাকারী হাসিনা, তার দোসার ও দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে এখনো কোনো অনুতাপের লক্ষণ নেই। বরং এখনো গলাবাজি ও মিথ্যাচারপূর্বক উসকানি দিয়ে বাংলাদেশে অস্থিতিশীলতা তৈরির ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছেন। এক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের দায় রয়েছে। হাসিনার সহযোগী খুনিদের বিচারকাজ এখনো দৃশ্যমান নয়। বরং তার দোসরদের অনেককে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে।

দেশজুড়ে চিহ্নিত আওয়ামী কালপ্রিটদের ধরপাকড় করা হচ্ছে না। এ সুযোগে আওয়ামী লীগের পতিত কর্মীরা আবারও ঘুরে দাঁড়ানোর দুঃসাহস দেখাতে পারছেন। বিপ্লবী ছাত্রনেতাদের জীবনের নিরাপত্তা আরো ঝুঁকিতে পড়েছে। এ নিয়ে ছাত্র-জনতার মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। রাষ্ট্র চালানোর দায়িত্ব নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ। তা হলে ছাত্রদের এখনো কেন পড়ার টেবিল থেকে বারবার রাজপথে ফিরে আসতে হচ্ছে? গণ-অভ্যুত্থানের সরকার হয়েও আওয়ামী ফ্যাসিবাদকে এখনো কেন নিষিদ্ধ করা হচ্ছে না?

বিপ্লবের চেতনা রক্ষায় অন্তর্বর্তী সরকারকে দুটি বিষয় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। এক. গণহত্যাকারীদের দ্রুত বিচার; দুই. জনপ্রশাসন ও আমলাতন্ত্রের ত্বরিত সংস্কার তথা বি-আওয়ামীকরণ। এ দুটি কাজ অনেক সমস্যার সমাধান করে দেবে সন্দেহ নেই।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক

Email: tareqislampt@gmail.com

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন