সাধারণ নাগরিক হিসেবে যেকোনো ব্যক্তি নিজেকে উন্নত দেশের বাসিন্দা কল্পনা করতে ভালোবাসবেন, এটিই স্বাভাবিক। কিন্তু বাংলাদেশকে উন্নত দেশের কাতারভুক্ত হতে হলে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে। বর্তমানে দেশটি স্বল্পোন্নত (এলডিসি) তথা নিম্ন-মধ্যম আয়ের। স্বল্পোন্নত থেকে উত্তরণ হলে বাংলাদেশ উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশ তথা উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে পরিচিতি পাবে। মাথাপিছু আয় প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার ডলার অতিক্রম করলে বাংলাদেশ উন্নত দেশের সারিতে পড়বে।
জাতিসংঘ-নির্ধারিত তিনটি মানদণ্ডের বিচারে এ বছরের ২৪ নভেম্বর স্বল্পোন্নত দেশের শ্রেণি অতিক্রম করে উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার কথা বাংলাদেশের। অনেকে শুনে অবাক হতে পারেন, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করা হয়েছে যেন বাংলাদেশকে আরো তিন বছর স্বল্পোন্নত দেশের শ্রেণিতে রাখা হয়। মূল কারণ হলো, বাংলাদেশ উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে পারেনি। বর্তমান সরকারের এমন আবেদন পতিত হাসিনা সরকারের বয়ানের সম্পূর্ণ বিপরীত।
২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে শেখ হাসিনা তার পিতার জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপন উপলক্ষে গণভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা দিয়েছিলেন, তার সরকারের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশে রূপান্তরিত হয়েছে—যা কি না জাতির জন্য এক গর্ব এবং অহংকারের ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণ। শেখ হাসিনার পরিকল্পনা ছিল ২০৪১ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখবেন এবং ওই সময়ের মধ্যে দেশকে উন্নত দেশ হিসেবে ঘোষণা করবেন। কিন্তু পরে দেখা গেল হাসিনা সরকার অর্থনৈতিক উন্নয়নের যেসব সূচক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে উপস্থাপন করেছিল, তার অধিকাংশই অসত্য।
জাতিসংঘের বিচারে একটি দেশ স্বল্পোন্নত থেকে উত্তরণের জন্য মাথাপিছু জাতীয় আয় টানা তিন বছর ১২৩০ ডলার, মানবসম্পদ সূচক ৬৬-এর বেশি এবং অর্থনৈতিক ঝুঁকি সূচক ৩২-এর কম হওয়া চাই। হাসিনা সরকার বরাবরই তথ্য জালিয়াতির মাধ্যমে জনগণকে ধোঁকা দিয়েছিল। জনগণের বাহবা অর্জনের জন্য বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য-উপাত্তকে বিভ্রান্তিকরভাবে উপস্থাপনে হাসিনা সরকার ছিল বেজায় পারদর্শী। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ হাসিনা সরকারের পরিসংখ্যান জালিয়াতিকে এক বিস্ময়কর ‘টপ টু বটম দুর্নীতির উন্নয়ন’ হিসেবে মন্তব্য করেছেন। তার মতে, বিগত দেড় দশকে আর্থিক খাতকে যেভাবে জালিয়াতিপূর্ণ তথ্যের ওপর দাঁড় করানো হয়েছিল, তা দেশের ইতিহাসে তো বটেই, দুনিয়াতেও বিরল।
স্বল্পোন্নত দেশ থেকে মসৃণ উত্তরণের কৌশল হিসেবে বাংলাদেশের পাঁচ বছরের (২০২১-২০২৬) মধ্যে রপ্তানি-সম্ভাব্য ১২টি অগ্রাধিকারমূলক খাতের বিকাশে মনোনিবেশ করার কথা ছিল। বর্তমানে রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস তৈরি পোশাকশিল্প। মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় শতকরা ৮২ ভাগ এ খাত থেকে আসে। কিন্তু এর বাইরে ওষুধ, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, জাহাজ নির্মাণ, প্লাস্টিক পণ্য, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, সফটওয়্যার ও আইটি সেবা, পর্যটন এবং ধাত্রীসেবার মতো খাতগুলোকে রপ্তানির উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও এসবের বিকাশে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এমনকি তৈরি পোশাক রপ্তানি খাতেও লেগেছে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ধাক্কা। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির সবচেয়ে বড় বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়ন। কিন্তু এই বাজারে দেশের অবস্থান নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে পোশাক রপ্তানিকারক ১০টি শীর্ষ দেশ যথাক্রমে চীন, বাংলাদেশ, তুরস্ক, ভারত, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, পাকিস্তান, মরক্কো, শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়া। ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান বছরের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি সর্বোচ্চ ১৯ শতাংশ কমেছে, যেখানে চীনের কমেছে মাত্র চার শতাংশ এবং ভিয়েতনামের দেড় শতাংশ।
এলডিসি থেকে উত্তরণ হলে বাংলাদেশ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শুল্কমুক্ত রপ্তানি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে, যার ফলে রপ্তানি আয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কমে যাবে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার প্রাক্কলন অনুযায়ী, বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল গোত্রভুক্ত হলে বার্ষিক গড়ে সাড়ে ১৭ বিলিয়ন ডলার মূল্যের রপ্তানি আয় হারাবে। তাছাড়া ‘ট্রিপস’-এর অধীনে বাংলাদেশ ওষুধশিল্পে যে সুবিধা ভোগ করে যাচ্ছে, উন্নয়নশীল দেশ হলে তাও বাতিল হবে। স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ দাতাসংস্থাগুলো থেকে বর্তমানে নিম্ন সুদে ঋণ পেলেও পরিবর্তিত অবস্থায় ওই সুযোগ থাকবে না এবং বৈদেশিক অনুদানও বন্ধ হয়ে যাবে।
শিগগিরই বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের শ্রেণিভুক্ত হলে ‘মধ্য-আয়-ফাঁদ’-এ পড়ার সম্ভাবনা খুব বেশি। এ ফাঁদের তাৎপর্য হলো, একটি দেশ নিম্ন-আয় পর্যায় থেকে মধ্যম-আয় পর্যায়ে পৌঁছালে আর অতি সহজে উচ্চ-আয়ের দেশে রূপান্তরিত হতে পারে না। এর কারণ, নিম্ন আয়ের দেশে সস্তায় শ্রমিক ও উৎপাদনের অন্যান্য উপকরণ পাওয়া যায় এবং কম খরচে দ্রব্য উৎপাদন করা সম্ভব হয় বলে দ্রুত প্রবৃদ্ধি ঘটে। মানুষের আয় বৃদ্ধি পেলে সস্তায় শ্রমিক পাওয়া যায় না। ফলস্বরূপ, উৎপাদন ও প্রবৃদ্ধি মন্থর হয়ে পড়ে এবং সংশ্লিষ্ট দেশ উচ্চ-আয় শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে না। প্রযুক্তিগত অনুন্নয়ন, অদক্ষ মানবসম্পদ, রপ্তানিতে বৈচিত্র্যহীনতা, আয়বৈষম্য এবং সুশাসনের অভাবে একটি দেশ মধ্য-আয় ফাঁদে আটকা পড়ে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রায় প্রতিটি কারণ প্রাসঙ্গিক। গত দেড় দশকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোয় পাইকারি হারে দলীয়করণ হয়েছে। সুশাসন এ দেশের মানুষের কাছে অধরাই রয়ে গেছে। নির্বাচিত সরকার আসার পরও উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন হয়নি; কারণ দীর্ঘ সময়ের অনিয়ম-বিশৃঙ্খলার যারা ক্রীড়নক, তাদের অধিকাংশই নিজ নিজ অবস্থানে বহাল আছে।
এই প্রেক্ষাপটে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের জন্য জাতিসংঘের কাছে বাংলাদেশ কর্তৃক আরো তিন বছর সময় চাওয়ার আবেদন যথাযথ। এ সময়ে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ রাজস্ব ও আর্থিক খাতে প্রয়োজনীয় সংস্কার করবে।
আওয়ামী আমলের রেখে যাওয়া বিভিন্ন স্তরের নৈরাজ্যের সঙ্গে বর্তমানে গভীর সঙ্কট দেখা দিয়েছে গ্যাস ও বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে। নতুন সরকারের আমলে একশ্রেণির অসাধু চক্র খোলস পাল্টিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করে চাঁদাবাজি ও দখল উৎসবে মেতে উঠেছে। এসবই অর্থনীতির সার্বিক উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির পথে বিরাট অন্তরায়।
স্বল্পোন্নত (এলডিসি) থেকে উত্তরণ হলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ও মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে, বৈদেশিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট হবে, ক্রেডিট রেটিংয়ে উন্নতির কারণে অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জন হবে এবং বৈশ্বিক চাকরির বাজারে বাংলাদেশিদের প্রবেশাধিকার বাড়বে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়িত হলে ২০২৯ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের পরিচিতি পরিবর্তন করে উন্নয়নশীল দেশের পরিচয়পত্র গ্রহণ করবে। পরিকল্পিত সংস্কার ও মেরামত কার্যক্রম টেকসই হলে এবং দুর্নীতি আর অপশাসন হ্রাস পেলে ২০৪১ সালে না হলেও আগে-পরে বাংলাদেশ উন্নত দেশ হিসেবে বিশ্বদরবারে স্থান করে নেবে—এমনটিই প্রত্যাশা।
লেখক : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

