পরাশক্তির প্রতিযোগিতা ও বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ

পরাশক্তির প্রতিযোগিতা ও বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ

আন্তর্জাতিক রাজনীতির নির্মম বাস্তবতা হলো, পরাশক্তিগুলো কখনোই ছোট বা মাঝারি শক্তির রাষ্ট্রগুলোর প্রতি নিছক সৌজন্যবশত আগ্রহ দেখায় না। তাদের আগ্রহের কেন্দ্রে থাকে নিজস্ব অর্থনৈতিক, কৌশলগত, সামরিক কিংবা রাজনৈতিক স্বার্থ। কোনো বৃহৎ শক্তি যখন কোনো অপেক্ষাকৃত ছোট রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করতে চায়, তখন সেই সম্পর্কের পেছনে অবশ্যই তার নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ, আঞ্চলিক হিসাব-নিকাশ এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত লক্ষ্য কাজ করে। একইভাবে ছোট বা মাঝারি রাষ্ট্রের জন্যও অন্য কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের মূল্য নির্ধারিত হওয়া উচিত, সেই রাষ্ট্রের প্রতি আবেগ, ঐতিহাসিক ঘনিষ্ঠতা কিংবা সাময়িক রাজনৈতিক সুবিধার ভিত্তিতে নয়; বরং নিজের রাষ্ট্রীয় স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত ও অগ্রসর হচ্ছে, এর ভিত্তিতে। ফলে কোনো রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হলো অন্যদের স্বার্থের সংঘর্ষের মধ্যে নিজের জাতীয় স্বার্থকে কীভাবে সংরক্ষণ, সম্প্রসারণ এবং অগ্রসর করা যায়। আজকের বাংলাদেশও ঠিক এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে।

বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক রাজনীতি এখন এমন একপর্যায়ে প্রবেশ করেছে, যেখানে কোনো রাষ্ট্রের জন্য শুধু একটি শক্তির ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করা ক্রমেই জটিল এবং কঠিন হয়ে উঠছে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় দক্ষিণ এশিয়া ও বঙ্গোপসাগর অঞ্চল পরাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশের গুরুত্ব এখানে শুধু তার জনসংখ্যা, বাজার কিংবা অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কারণে নয়; এর ভৌগোলিক অবস্থানও তাকে এই প্রতিযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত করেছে। ভারত মহাসাগরীয় সামুদ্রিক যোগাযোগব্যবস্থা, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সম্ভাব্য স্থল এবং নৌসংযোগ, বঙ্গোপসাগরের সামুদ্রিক সম্পদ, আঞ্চলিক সরবরাহ শৃঙ্খল ও চীনের সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার যোগাযোগ—সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশের ভূকৌশলগত গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি এখন শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পরিচালনার বিষয় নয়; বরং পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী বৃহৎ শক্তিগুলোর স্বার্থের মধ্য দিয়ে নিজের জন্য সর্বোচ্চ কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিসর তৈরি করার একটি জটিল রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। বাংলাদেশের জন্য এই বাস্তবতা একই সঙ্গে সুযোগ এবং চ্যালেঞ্জ। সুযোগ এই কারণে যে, বহু শক্তির আগ্রহ একটি রাষ্ট্রকে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক দরকষাকষির ক্ষেত্র তৈরি করে দেয়। যখন একাধিক শক্তি কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করতে আগ্রহী হয়, তখন সেই রাষ্ট্রের সামনে বিভিন্ন অংশীদারের কাছ থেকে উন্নয়ন সহযোগিতা, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, বাজারসুবিধা, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং কূটনৈতিক সমর্থন আদায়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়।

কিন্তু এই সুযোগ তখনই জাতীয় সম্পদে পরিণত হয়, যখন রাষ্ট্র তার নিজস্ব অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে পারে এবং প্রতিটি অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ককে সেই অগ্রাধিকারের আলোকে পরিচালনা করে। আবার চ্যালেঞ্জ এই কারণে যে, ভুল পদক্ষেপ রাষ্ট্রকে অন্যের প্রতিযোগিতার বলি বা প্রক্সিতে পরিণত করতে পারে। বৃহৎ শক্তির দ্বন্দ্বে ছোট রাষ্ট্র যদি নিজের নীতিগত স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলে, তাহলে তার ভূখণ্ড, অর্থনীতি কিংবা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান অন্যের কৌশল বাস্তবায়নের ক্ষেত্র হয়ে ওঠার ঝুঁকি থাকে। অতএব বাংলাদেশের জন্য মূল প্রশ্ন কোনো পরাশক্তির পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া নয়; বরং কীভাবে পরাশক্তিগুলোর পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও প্রতিযোগিতাকে নিজের জাতীয় স্বার্থে কাজে লাগিয়ে ফায়দা অর্জন করা যায় এবং একই সঙ্গে তাদের সংঘাত থেকে নিজেকে নিরাপদ রাখা যায়।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাস্তববাদী তত্ত্ব (রিয়েলিজম) রাষ্ট্রকে মূলত স্বার্থসর্বস্ব ও নিরাপত্তাকেন্দ্রিক সত্তা হিসেবে বিবেচনা করে। বাস্তববাদীদের মতে, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় কোনো কেন্দ্রীয় বিশ্ব সরকার নেই; ফলে প্রতিটি রাষ্ট্রকে নিজের নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব এবং স্বার্থ নিজেকেই নিশ্চিত করতে হয়। এই ‘আন্তর্জাতিক নৈরাজ্য’র (ইন্টারন্যাশনাল অ্যানার্কি) অর্থ বিশৃঙ্খলা নয়; বরং রাষ্ট্রগুলোর ওপর বাধ্যতামূলক কর্তৃত্ব প্রয়োগ করার মতো কোনো বৈশ্বিক সর্বময় কর্তৃপক্ষের অনুপস্থিতি। ফলে বন্ধুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রও তার নিজস্ব স্বার্থের বাইরে গিয়ে অন্য রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা করবে—এমন নিশ্চয়তা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নেই। এ কারণেই পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে স্থায়ী আবেগের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থ, রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা এবং কৌশলগত হিসাব-নিকাশকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।

এই বাস্তবতায় ছোট রাষ্ট্রগুলোর সামনে সাধারণত তিনটি পথ খোলা থাকেÑ‘কোনো পরাশক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ জোটে আবদ্ধ হওয়া’ (ব্যান্ডওয়াগনিং), ‘প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির বিরুদ্ধে ভারসাম্য তৈরি করা’ (ব্যালান্সিং), অথবা ‘পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর সঙ্গে একই সময়ে সম্পর্ক বজায় রেখে নিজের ঝুঁকি কমানো’ (হেজিং)। বাস্তবে কোনো রাষ্ট্র সবসময় একই কৌশল অনুসরণ করে না। আন্তর্জাতিক পরিবেশ, নিরাপত্তা পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক প্রয়োজন এবং নেতৃত্বের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের সঙ্গে কৌশলও পরিবর্তিত হতে পারে। তবে ছোট ও মাঝারি শক্তির রাষ্ট্রগুলোর জন্য অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা এড়িয়ে একাধিক শক্তির সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখা অনেক সময় তুলনামূলক বেশি নিরাপদ ও লাভজনক পথ হয়ে ওঠে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো অন্যের প্রতিযোগিতার অংশ হওয়া নয়, বরং প্রতিযোগিতার মধ্যেও নিজের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখা।

পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ (স্ট্র্যাটেজিক অটোনমি) পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। অর্থাৎ কোনো শক্তির শিবিরে সম্পূর্ণভাবে অন্তর্ভুক্ত না হয়ে স্বাধীনভাবে জাতীয় স্বার্থ অনুসরণ করার সক্ষমতা। কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন মানে সবার থেকে দূরে থাকা নয়, আবার সবার সঙ্গে সমান দূরত্ব বজায় রাখাও নয়। বরং এর অর্থ হলো প্রতিটি সম্পর্ককে তার নিজস্ব মূল্য ও রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনের ভিত্তিতে বিচার করা এবং কোনো অংশীদারের সঙ্গে সহযোগিতা যেন অন্য অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করার বাধ্যবাধকতায় পরিণত না হয়, তা নিশ্চিত করা। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এর অর্থ হতে পারে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা যেমন থাকবে, তেমনি ভারতের সঙ্গে প্রতিবেশীসুলভ ও পারস্পরিক স্বার্থভিত্তিক সম্পর্ক, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্য ও প্রযুক্তি সহযোগিতা, জাপানের সঙ্গে উন্নয়ন অংশীদারত্ব এবং রাশিয়া ও অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে প্রয়োজনভিত্তিক সহযোগিতাও অব্যাহত থাকবে। সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের অন্যান্য রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের এই বহুমাত্রিকতা কোনো দুর্বলতার চিহ্ন নয়; বরং আমাদের রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা ও নীতিগত স্বাধীনতার ভিত্তি হতে পারে।

তবে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো রাষ্ট্রকে নিজের স্বার্থ নিজেকেই সংজ্ঞায়িত করতে হবে। অন্য শক্তিগুলো বাংলাদেশের জন্য কী চায়, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বাংলাদেশ নিজে কী চায়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, রপ্তানি সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক শান্তি—এসবকে জাতীয় অগ্রাধিকারের সুস্পষ্ট কাঠামোর মধ্যে এনে তার ভিত্তিতে পররাষ্ট্রনীতির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। কারণ যে রাষ্ট্র নিজের জাতীয় অগ্রাধিকার স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে পারে না, তার পররাষ্ট্রনীতি সহজেই অন্যের অগ্রাধিকারের প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে পড়ে। আর যে রাষ্ট্র নিজের স্বার্থের ভিত্তিতে অংশীদার নির্বাচন করতে পারে, সে তুলনামূলক ছোট হলেও আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় নিজের জন্য কার্যকর কৌশলগত পরিসর তৈরি করতে সক্ষম হয়।

বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের চারপাশে অন্তত চারটি বড় শক্তির স্বার্থ সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। চীন বাংলাদেশকে তার আঞ্চলিক সংযোগ, বাণিজ্য ও অবকাঠামো কৌশলের অংশ হিসেবে দেখে। ভারতের কাছে বাংলাদেশ তার নিরাপত্তা, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ এবং বঙ্গোপসাগরীয় কৌশলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে একটি উন্মুক্ত, অবাধ ও স্থিতিশীল সামুদ্রিক পরিবেশ প্রতিষ্ঠার বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে। অন্যদিকে জাপানও মাতারবাড়ীসহ বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্প, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের মাধ্যমে এই অঞ্চলে তার উপস্থিতি জোরদার করছে। এর বাইরে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অন্যান্য শক্তিরও বাংলাদেশের বাজার, বাণিজ্য, জলবায়ু, শ্রম, মানবিক নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ রয়েছে। ফলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির পরিসর এখন শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি বৃহত্তর এশিয়া-প্যাসিফিক ভূরাজনীতির একটি জটিল বহুপক্ষীয় সমীকরণের অংশ হয়ে উঠেছে।

এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের সামনে মৌলিক প্রশ্ন হলো আমরা কি কোনো একটি শক্তির দিকে অতিরিক্ত ঝুঁকব, নাকি সবার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করব? প্রশ্নটি নিছক কূটনৈতিক পছন্দের নয়; এর সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি সার্বভৌমত্ব, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং নীতিনির্ধারণী স্বাধীনতা সরাসরি যুক্ত। কোনো একটি বৃহৎ শক্তির ওপর অতিরিক্ত অর্থনৈতিক, সামরিক, প্রযুক্তিগত কিংবা কূটনৈতিক নির্ভরতা তৈরি হলে সেই রাষ্ট্রের নীতিগত প্রভাবও ক্রমে বৃদ্ধি পেতে পারে। তখন সহযোগিতা ও নির্ভরতার মধ্যকার সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। আবার সব শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার নামে যদি বাংলাদেশের নিজস্ব নীতিগত অবস্থান অস্পষ্ট হয়ে যায়, তাহলেও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন দুর্বল হতে পারে। অতএব ভারসাম্য মানে মাঝামাঝি অবস্থান নেওয়া নয়; বরং জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে সুস্পষ্ট অবস্থান রেখে বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে প্রয়োজনভিত্তিক ও পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক পরিচালনা করা।

সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতা এখানে বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে শিক্ষণীয়। ভৌগোলিকভাবে ছোট এই রাষ্ট্রটি চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপানসহ বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে একই সময়ে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রেখেছে। কোনো একটি শক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে অন্য শক্তির সঙ্গে বৈরিতার সমার্থক হতে দেয়নি।

বাংলাদেশের জন্যও তাই কূটনৈতিক ভারসাম্যের অর্থ হওয়া উচিত ‘সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক, কারো কাছে নতজানু হওয়া নয়’। চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা যেমন জাতীয় উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, তেমনি ভারতের সঙ্গে সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ও প্রযুক্তি সহযোগিতা, জাপানের সঙ্গে উন্নয়ন অংশীদারত্ব এবং ইউরোপের সঙ্গে রপ্তানি ও বিনিয়োগ সম্পর্কও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এসব সম্পর্ককে পরস্পরের বিকল্প হিসেবে না দেখে একটি বৃহত্তর রাষ্ট্রীয় কৌশলের পরিপূরক হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রের সামগ্রিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জাতীয় পর্যায়ে একটি সুস্পষ্ট ‘কৌশলগত কাঠামো’ (স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্ক)।

কোন ক্ষেত্রে কোন দেশের সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন, কোন সহযোগিতার সঙ্গে কী ধরনের ঝুঁকি রয়েছে, কোন প্রকল্প জাতীয় সক্ষমতা বাড়াবে এবং কোন নির্ভরতা ভবিষ্যতে কৌশলগত দুর্বলতা তৈরি করতে পারে—এসব প্রশ্নকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। তখন কূটনীতি ব্যক্তিনির্ভর বা তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক প্রয়োজনের প্রতিক্রিয়া না হয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় নীতির অংশে পরিণত হবে। আর এভাবেই বাংলাদেশ পরাশক্তির প্রতিযোগিতার দর্শক বা প্রক্সি না হয়ে নিজস্ব স্বার্থের ভিত্তিতে সেই প্রতিযোগিতা থেকে সর্বোচ্চ জাতীয় সুবিধা আদায় করতে পারবে।

কোনো রাষ্ট্র বাইরে থেকে যতই স্বাধীনতার কথা বলুক, তার অর্থনীতি যদি অতিরিক্তভাবে একটি বা কয়েকটি উৎসের ওপর নির্ভরশীল হয়, তার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা যদি সীমিত থাকে, তার জ্বালানি ও খাদ্যনিরাপত্তা যদি দুর্বল হয় এবং তার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিষ্ঠানগুলো যদি অকার্যকর হয়, তাহলে বাস্তবে তার কূটনৈতিক স্বাধীনতার পরিসরও সংকুচিত হয়ে যায়। অর্থাৎ পররাষ্ট্রনীতির স্বায়ত্তশাসন শেষ পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার ওপরও নির্ভরশীল। একটি রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক দরকষাকষিতে যত বেশি সক্ষম, তার অর্থনীতি ও প্রতিষ্ঠান তত বেশি শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন।

এর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে শক্তিশালী ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান, নীতির ধারাবাহিকতা এবং তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা। কারণ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দরকষাকষির ক্ষমতা শুধু কূটনৈতিক ভাষা বা রাজনৈতিক বক্তব্য থেকে আসে না; এর পেছনে থাকে একটি রাষ্ট্রের বাস্তব সক্ষমতা। যে রাষ্ট্র বিকল্প অংশীদার তৈরি করতে পারে, নিজস্ব প্রযুক্তি ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে পারে, দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে পারে এবং সংকটের সময়ে নিজের প্রয়োজনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নিজেই পূরণ করতে পারে, সে রাষ্ট্রই বহিঃচাপ মোকাবিলায় তুলনামূলকভাবে বেশি স্বাধীন।

তাই কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের প্রকৃত ভিত্তি বিদেশের সঙ্গে দূরত্ব নয়; বরং দেশের ভেতরে এমন সক্ষমতা তৈরি করা, যার ফলে বাংলাদেশ সহযোগিতা বেছে নিতে পারে প্রয়োজনের কারণে, নির্ভরতার কারণে নয়। এ কারণেই জাতীয় স্বার্থভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি এবং অভ্যন্তরীণ উন্নয়ননীতিকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই।

একটি শক্তিশালী অর্থনীতি শক্তিশালী কূটনীতির ভিত্তি তৈরি করে; একটি দক্ষ মানবসম্পদভিত্তিক সমাজ প্রযুক্তিগত নির্ভরতা কমায়; একটি কার্যকর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে ন্যায্য চুক্তি করার সক্ষমতা বাড়ায়; আর একটি সুসংহত জাতীয় ঐকমত্য পররাষ্ট্রনীতিকে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে অতিরিক্তভাবে দোদুল্যমান হওয়া থেকে রক্ষা করে। বাংলাদেশের কৌশলগত স্বাধীনতা তাই শেষ পর্যন্ত বিদেশি শক্তিগুলোর সদিচ্ছার ওপর নয়, নিজেদের রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা কতটা শক্তিশালী করতে পারি, তার ওপরই নির্ভর করবে।

শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের কূটনৈতিক সাফল্য নির্ভর করবে আমরা পরাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতাকে কীভাবে দেখি তার ওপর। যদি নিজেদের শুধু তাদের প্রতিযোগিতার একটি ভূখণ্ড হিসেবে দেখি, তাহলে অন্যের কৌশলই আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। কিন্তু যদি নিজেদের একটি স্বাধীন রাষ্ট্র, সক্রিয় অর্থনৈতিক অংশীদার এবং নিজস্ব স্বার্থসম্পন্ন আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারি, তাহলে একই প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। সেই সুযোগ কাজে লাগানোর পূর্বশর্ত হলো দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে জাতীয় স্বার্থকে স্থান দেওয়া এবং সরকার পরিবর্তনের ঊর্ধ্বে রাষ্ট্রীয় নীতির প্রয়োজনীয় ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা। কারণ শক্তিশালী পররাষ্ট্রনীতি শুধু শক্তিশালী কূটনীতিক দিয়ে তৈরি হয় না; তার ভিত্তি তৈরি হয় একটি আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্র, সুস্পষ্ট জাতীয় অগ্রাধিকার এবং সেই অগ্রাধিকারের প্রতি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অঙ্গীকারের মাধ্যমে। এজন্য প্রয়োজন স্থিতিশীলতা, সরকারের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে যেন পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন না ঘটে, সেজন্য রাজনৈতিক ঐক্য।

একবিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশ যদি সত্যিকার অর্থে আঞ্চলিক শক্তি ও অর্থনৈতিক সংযোগকেন্দ্রে পরিণত হতে চায়, তাহলে তাকে আবেগনির্ভর পররাষ্ট্রনীতি থেকে বেরিয়ে এসে স্বার্থভিত্তিক, বাস্তববাদী এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত চিন্তার ওপর দাঁড়াতে হবে। এখানে বাস্তববাদ মানে নীতিহীনতা নয়; বরং নীতিকে বাস্তব সক্ষমতা ও জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলা। সার্বভৌমত্ব, পারস্পরিক সম্মান, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও আন্তর্জাতিক আইন—এসব নীতিকে অক্ষুণ্ণ রেখেই বাংলাদেশকে তার কূটনৈতিক দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়াতে হবে।

চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান এবং অন্যান্য শক্তি নিজেদের জাতীয় ও কৌশলগত স্বার্থে আমাদের এ অঞ্চলে সক্রিয় থাকবে। এই প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের জন্য যেমন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, তেমনি সৃষ্টি করতে পারে অবকাঠামো, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, বাণিজ্য, মানবসম্পদ ও আঞ্চলিক সংযোগ সম্প্রসারণের অভূতপূর্ব সুযোগ। কিন্তু সেই সুযোগকে জাতীয় সম্পদে পরিণত করার জন্য প্রয়োজন একটি আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্র, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, সুস্পষ্ট জাতীয় অগ্রাধিকার এবং ধারাবাহিক পররাষ্ট্রনীতি। অন্যরা বাংলাদেশের জন্য কী পরিকল্পনা করছে, এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বাংলাদেশ নিজের ভবিষ্যতের জন্য কী পরিকল্পনা করছে। পরাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা চলমান থাকবে; কিন্তু জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব বাংলাদেশেরই।

লেখক: ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য

mahruf@ymail.com

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন