আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ইরানে ইসরাইলি আগ্রাসন : কূটনীতির ওপর হামলা

জামাল কাঞ্জ

ইরানে ইসরাইলি আগ্রাসন : কূটনীতির ওপর হামলা
ছবি: সংগৃহীত

ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে গুঁড়িয়ে দিতে ইসরাইল সর্বশেষ যে হামলা করেছে, তাতে তেহরানের বেসামরিক পরমাণু কর্মসূচির বড় ধরনের কোনো ক্ষতি হয়নি। এ বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে, আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) পক্ষ থেকেও। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করছেন, ইরানে হামলার এ সময়টি ঠিক করা হয়েছিল ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে দেশটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য চুক্তি ঠেকাতেই দুই দেশের সর্বশেষ বৈঠকের দুদিন আগে ইরানে ব্যাপক হামলা করে ইসরাইল।

গত রবিবার (১৫ জুন) ওমানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এই বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আগাম হামলা করে সম্ভাব্য চুক্তিকে ঠেকিয়ে দিল ইসরাইল। আলোচনায় চুক্তির কাঠামো চূড়ান্ত হলে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি পরিচালনায় সব বাধা কেটে যেত। তখন আন্তর্জাতিক অর্থাৎ আইএইএর তত্ত্বাবধানে নির্বিঘ্নে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি চলতে আর কোনো বাধা থাকত না। কিন্তু আগেই হামলা করে কূটনৈতিক সমাধানের সব সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করে দিয়েছেন নেতানিয়াহু। তার এই পদক্ষেপকে কূটনীতির ওপর আগাম হামলা হিসেবেই বিবেচনা করছেন বিশ্লেষকরা।

বিজ্ঞাপন

অবশ্য এর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের দায়ও কম নয়। ট্রাম্প প্রশাসনের যেসব কর্মকর্তা ইরানের সঙ্গে গোপন আলোচনায় যুক্ত, তারাই বৈঠকে অগ্রগতির স্পর্শকাতর তথ্যগুলো ইসরাইলি কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন। তাদের এই গুরুতর ভুলই পরমাণু আলোচনাকে নস্যাতের পথ তৈরি করে দেয়। ইসরাইল চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাবনার কৌশলগত সময়টি জেনে তা কাজে লাগিয়ে ইরানে সামরিক আগ্রাসন চালিয়েছে। এই হামলা নিশ্চিতভাবেই কূটনৈতিক সমাধানের বিরুদ্ধে একটি অন্তর্ঘাতমূলক পদক্ষেপ।

নিরপেক্ষ কিছু সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, ওমানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান আলোচনায় তেহরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়মিত পরিদর্শনে আইএইএকে যুক্ত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া ইউরেনিয়াম-সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি সীমিত করার ব্যাপারেও সম্মত হয়েছিল ইরান। চুক্তির পর থেকে ইরানের তেল রপ্তানি আবার পুরোদমে শুরু করার সম্মতি দিতেও রাজি হয়েছিল ট্রাম্প প্রশাসন। কিন্তু ইসরাইল কোনোভাবেই চাচ্ছিল না ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কোনো চুক্তি হোক।

কারণ এ ধরনের চুক্তি হলে ইরানকে বাক্সবন্দি করে রাখার ইসরাইলের গত এক দশকের পরিকল্পনা কোনোই কাজে আসত না। চুক্তিটি চূড়ান্ত হয়ে গেলে তাতে ভেটো দেওয়ার কোনো ক্ষমতা নেই নেতানিয়াহুর। তিনি তার হাতে থাকা এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান ও ক্রুজ মিসাইল দিয়েও সম্ভাব্য চুক্তিকে ঠেকাতে পারতেন না। এ কারণেই চুক্তির আগেই ইরানে হামলা করে রোববারের বৈঠককে বানচাল করে দেন নেতানিয়াহু। এই হামলার প্রতি যুক্তরাষ্ট্রেরও সবুজসংকেত ছিল।

ইরানে এই হামলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হচ্ছে, পরমাণু প্রযুক্তিতে মধ্যপ্রাচ্যে নিজের একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখার যে কৌশল ইসরাইল দীর্ঘদিন ধরে অনুসরণ করে আসছে, সেটাকে সমুন্নত রাখা। এ জন্য মধ্যপ্রাচ্যেও কোনো দেশকেই পরমাণু মুক্তির অধিকারী হতে দিতে চায় না ইসরাইল। এ জন্য পরমাণু অবকাঠামো তৈরি দূরে থাক, এমনকি, মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশে পরমাণু কর্মসূচি সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ বা বৈজ্ঞানিক জ্ঞানসম্পন্ন লোকদেরও পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করে না ইসরাইল।

ইরানে ইসরাইলের হামলা শুরুর পর মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছেন, ‘এই হামলায় যুক্তরাষ্ট্র অংশ নেয়নি।’ কিন্তু তাদের এই অস্বীকৃতি কৌশলগত, নীতিগত অবস্থান থেকে নয়। ট্রাম্প প্রশাসন এভাবে ইসরাইলি হামলা থেকে নিজেদের দূরে রেখে ইরানের ওপর কৌশলগত চাপ অব্যাহত রাখতে চায়। অথচ হামলার পর ট্রাম্প নিজেই এই সামরিক অভিযানকে ‘চমৎকার’ বলে অভিহিত করেন। সামনের দিনগুলোয় আরো হামলা হতে পারেÑএমন হুমকি দিয়ে ট্রাম্প ইরানকে পরমাণু চুক্তি স্বাক্ষরের পথে হাঁটার আহ্বান জানান। অথচ ইসরাইলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করেই ইসরাইল ইরানে হামলার প্রতিটি ধাপ সম্পন্ন করেছে।

ইরানে হামলা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের কর্মকর্তাদের বক্তব্যে এই ফারাক সৃষ্টির যথেষ্ট কারণও আছে। যুক্তরাষ্ট্র হামলায় জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করলেও ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্রকে জড়িয়ে কথা বলে যাচ্ছে। ইসরাইল চাইছে ইরানকে উত্তেজিত করে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোয় হামলা করাতে। ইরান এ ধরনের কাজ করলে তা নিশ্চিতভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধে জড়াবে। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সেটাই চাইছেন। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে মধ্যপ্রাচ্যে তার মিত্রদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে, ওয়াশিংটন এই অঞ্চলে আরেকটি যুদ্ধ উসকে দিতে চায় না।

কিন্তু নেতানিয়াহু ইরানে হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের পরোক্ষভাবে জড়িত থাকার কথা বলে নিজ দেশের উগ্রপন্থি রাজনৈতিক দলগুলো এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের বৈরী দেশগুলোকে একই সঙ্গে এই বার্তা দিতে চাইছেন, এখনো যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ সমর্থন ভোগ করছে ইসরাইল। নেতানিয়াহু অনেক দিন থেকেই চেষ্টা করছেন মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের বিরামহীন যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে অংশীদার করতে। ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি করার ট্রাম্প প্রশাসনের কূটনৈতিক উদ্যোগ বানচাল করে দিয়ে নেতানিয়াহু এ ক্ষেত্রে অনেকটাই সফল হয়েছেন বলা যায়।

ইসরাইলকে হামলার জবাব দিতে গিয়ে ইরান প্রথমদিকে যেসব ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়, তাতে অন্যান্য টার্গেটের পাশাপাশি তেল আবিবে ইসরাইলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়কেও বেছে নেওয়া হয়েছিল। ইরানের এই হামলা দুই দেশের মধ্যে সংঘাতে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে। কারণ এর আগের কোনো সংঘাতেই ইসরাইল তার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে এ ধরনের হামলা দেখেনি। বিশ্বেও অন্যতম সেরা আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মোতায়েন থাকা সত্ত্বেও তা দিয়ে দেশের এত ভেতরে ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মতো একটি স্পর্শকাতর স্থাপনায় হামলা ঠেকাতে ব্যর্থ হলো ইসরাইল। এটি ইহুদি বর্ণবাদী দেশটির ৭৭ বছরের ইতিহাসে নতুন ও পীড়াদায়ক একটি অভিজ্ঞতা।

হামাস, হিজবুল্লাহ ও হুতি যোদ্ধাদের মতো সশস্ত্র সংগঠনের সঙ্গে সংঘাতের পর এবার সরাসরি একটি রাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়েছে ইসরাইল। আর এই যুদ্ধে স্পষ্টভাবেই হুমকির মুখে পড়েছে ইসরাইলের দীর্ঘদিনের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সমরাস্ত্র সম্পর্কে অতি উচ্চ ধারণা। তেল আবিব এখন ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের রেঞ্জের মধ্যে চলে আসায় এটি ইসরাইলের জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরান ইসরাইলে মুহুর্মুহু ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা করেছে আর যুক্তরাষ্ট্র দর্শক হয়ে তা দেখছে এ বিষয়টি ইসরাইলের জন্য একটি দুঃসংবাদ।

পরিশেষে এ কথা বলা যায়, নেতানিয়াহু ইরানের পরমাণু স্থাপনায় কতগুলো সেন্ট্রিফিউজ ধ্বংস করেছেন বা কতজন পরমাণু বিজ্ঞানীকে হত্যা করেছেন, সেটা তার জন্য সাফল্য হিসেবে দেখা হবে না। বরং ইরানের সঙ্গে সংঘাতে মধ্যপ্রাচ্যের আগামীর কোনো যুদ্ধে তিনি যদি যুক্তরাষ্ট্রকে ইসরাইলের পক্ষে মাঠে নামাতে পারেন, সেটাই হবে তার বড় সাফল্য। আর না পারলে সেটি হবে তার বড় ব্যর্থতা। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যিকার অর্থেই মধ্যপ্রাচ্যে আর কোনো যুদ্ধ না চায়, তাহলে সে কথা তাদের প্রকাশ্যে স্পষ্ট ভাষায় বলতে হবে। ইসরাইলকে দায়মুক্তি দেওয়ার নীতি থেকেও সরে আসতে হবে ওয়াশিংটনকে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন