বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে অন্ধকারাচ্ছন্ন অধ্যায় চলছে। কখনো কখনো এই আঁধার আরো ঘনীভূত হচ্ছে। মনে হয়, যেকোনো সময় আছড়ে পড়বে দেশের সবখানে। চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদী সরকার ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা দেশ ছেড়ে পালিয়ে পাশের দেশে আশ্রয় নিয়ে নানা ষড়যন্ত্রের জাল বুনছে এবং তাদের মদত দিচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার ক্যানসার রাষ্ট্র ভারত। মূলত ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে নেহরু ডকট্রিন চলমান রেখে তাদের পক্ষে কোনো দিনই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সমমর্যাদা ও ন্যায্যতার সম্পর্ক স্থাপন সম্ভব নয়। কারণ নেহরু ডকট্রিনে বলা হয়েছে, ভারত দক্ষিণ এশিয়ায় তাদের ভূখণ্ড সম্প্রসারণের জন্য কাজ করবে। সেহেতু আমরা বলতে পারি, তাদের নেহরু ডকট্রিন বাংলাদেশ তো বটেই, সারা দক্ষিণ এশিয়ার জন্য ভয়াবহ ও সার্বভৌমত্বের ওপর হুমকিস্বরূপ। তাদের পররাষ্ট্রনীতিতে বাংলাদেশ আর পাকিস্তান নামক দুটি রাষ্ট্র সৃষ্টি ছাড়া আর কোনো জয় নেই।
পৃথিবীতে পরাশক্তির দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র ভারতেরই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত কোনো বন্ধু নেই। এমনি আশপাশের কোনো প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সুসম্পর্কও বিদ্যমান নেই। ভারতের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল বিজেপি দিন দিন রাজনীতির আড়ালে অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের হিন্দু জঙ্গি সংগঠন শিব সেনাসহ আরো কয়েকটি আঞ্চলিক জঙ্গি সংগঠন দিয়ে দমন করছে। এভাবে যদি দমন-পীড়ন চলতে থাকে, তাহলে একদিন ভারত দক্ষিণ এশিয়ার সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হয়ে দেখা দেবে। তারা শুধু বাংলাদেশ কিংবা পাকিস্তানের সঙ্গেই নয়Ñচীন, নেপাল, মালদ্বীপের সঙ্গেও এই সম্প্রসারণ নীতি ও সীমান্ত সংঘাতে লিপ্ত হয়েছে। তারা সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভাব হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ভারত সবসময়ই বন্ধুত্বের নামে প্রভুত্ব কায়েম করতে চায়। তাদের অবশ্যই বোঝা উচিত, তাদের প্রতিবেশী দুটি দেশ পারমাণবিক শক্তিধর দেশ এবং তাদের কৌশলগত মিত্র ও বন্ধুরাষ্ট্র ভারতের চেয়ে বেশি। এছাড়া বাংলাদেশের পাশেই রয়েছে তাদের চিকেন নেক। বাংলাদেশের সঙ্গে অতীতের তুলনায় পাকিস্তানের সঙ্গে উষ্ণ সম্পর্ক রয়েছে এবং চীন ও আমেরিকার সঙ্গে তাদের সম্পর্ক বেশ গভীর। আর বাংলাদেশের মানুষ এখন ভারত ও আওয়ামী লীগবিরোধী। চব্বিশের জুলাই আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের জনগণ আরো বেশি ভারতবিরোধী হয়েছে। কারণ বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদের সাহায্যকারী বাংলাদেশের চিরশত্রু রাষ্ট্র ভারত জড়িত ছিল। এছাড়া গণঅভ্যুত্থানের ফলে ফ্যাসিস্ট সরকার ও তার সাহায্যকারীদের ভিসা, পাসপোর্ট ছাড়াই অন্তত ত্রিশ হাজার নেতাকর্মীকে আশ্রয় দিয়েছে ভারত।
একটি দেশ কীভাবে ভিসা, পাসপোর্ট ছাড়া প্রায় ৩০ হাজার কর্মীকে ভারতে আশ্রয় দেয়, সেটিও প্রশ্নের?
এত বিশালসংখ্যক মানুষ সীমান্ত পাড়ি দিয়েছে অথচ ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর গুলিতে কেউ নিহত কিংবা আহত হলো না। কিন্তু বাংলাদেশের শহীদ ফেলানী সীমান্ত পাড়ি দিয়ে দেশে ফেরার সময় তাকে হত্যা করে তার লাশ সীমান্তের কাঁটাতারে ঝুলিয়ে রেখেছিল। শুধু তাই নয়, জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে শিশু স্বর্ণা দাস যখন তার মায়ের সঙ্গে সীমান্ত পাড়ি দিতে গিয়ে তাকে নির্মমভাবে শহীদ করা হয়েছে। সেখানে ভারত স্বর্ণা দাসের ধর্ম ও বর্ণ দেখেনি। শুধু দেখেছে সে বাংলাদেশি। শহীদ ফেলানী কিংবা স্বর্ণা দাস যদি অপরাধ করে থাকে, তাহলে তাকে গ্রেপ্তার করা যেত; কিন্তু তাদের হত্যা করা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এমনকি তাদের হত্যাকারী কারোর বিচার আজ পর্যন্ত ভারত করেনি। ভারত এ দেশে তাদের অনুগত সরকার চায়, যে সরকার ভারতের স্বার্থে কাজ করবে। নয়তো এ দেশের মাটি চায় কিন্তু মানুষের মানবিক মর্যাদা দিতে চায় না।
ভারত যখন তাদের দেশের আইপিএলে বাংলাদেশের ক্রিকেটার মুস্তাফিজকে একপ্রকার ডেকে নিয়ে ক্রীড়া থেকে যুক্তিযুক্ত কারণ ছাড়া তাকে বহিষ্কার করে, তখন প্রশ্ন জাগে ফ্যাসিবাদের দোসরদের তাহলে কোন যুক্তিযুক্ত কারণে ভিসা, পাসপোর্ট ছাড়া তাদের দেশে আশ্রয় দিয়েছে। তারা বারবার বলেছে, মোস্তাফিজুর রহমানের অর্থ ভারতবিরোধী কাজে ব্যয় হতে পারে; কিন্তু তাদের দেশের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে যখন বাংলাদেশের অভিনয় শিল্পীরা অভিনয় করে, তখন কি সেই অর্থ ভারতবিরোধী কাজে ব্যবহার হবে না তার কি কোনো নিশ্চয়তা আছে? মোস্তাফিজকে তারা বহিষ্কার করেছে, কারণ তিনি মুসলিম এবং বাংলাদেশি। এর বাইরে তাকে বহিষ্কারের আর কোনো যুক্তিযুক্ত কারণ নেই। ভারত যেন ধর্মীয় গোঁড়ামির দিক থেকে মধ্যযুগ কিংবা অন্ধকার যুগের আধুনিক রূপ। তারা জ্ঞান-বিজ্ঞানে এগিয়ে গেলেও তাদের স্বভাব ও আচরণ জাতিগতভাবে বিকৃত মস্তিষ্ক ও শত্রু সুলভ।
কিছুদিন আগে তারা বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের দোহাই দিয়ে দিল্লি ও কলকাতার হাইকমিশনারের কার্যালয় অর্থাৎ দূতাবাস ও কনসুলেটে হামলা চালিয়েছে। ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী দূতাবাসগুলো হবে স্বাধীন ও সংরক্ষিত এলাকা। সেখানে বারবার হিন্দু টেরোরিস্টরা হামলা চালালেও কোনো ধরনের শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি সে দেশের নিরাপত্তা বাহিনী। বলা যায়, এক ধরনের নিরাপত্তা বাহিনীর মদতে দূতাবাসের ভেতরে প্রবেশ করেছে হিন্দু টেরোরিস্টরা। তাহলে তারা কেন দূতাবাসগুলোকে ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী সুরক্ষা দিতে পারল না? মূলত তারা সুরক্ষা দিতে চায় না। যারা নিজ দেশে অন্য দেশের দূতাবাস এবং কনসুলেটগুলোকে সন্ত্রাসীদের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে না, বিগত ফ্যাসিস্ট আমলে সন্ত্রাসী ও জঙ্গি তকমা দিয়ে বাংলাদেশের আলেম-ওলামাদের দমন-পীড়নে ফ্যাসিস্টদের সাহায্য করেছে।
এমনি বাংলাদেশের জনপ্রিয় ও দেশপ্রেমিক আলেম মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলার অন্যতম মিথ্যা সাক্ষী মুক্তিযোদ্ধা সুখঞ্জন বালি যখন মাওলানা দেলাওয়ার হোসেন সাঈদীর মামলার বিষয়ে মিথ্যা সাক্ষী দিতে অস্বীকার করেছিল, তখন তাকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে আওয়ামী লীগ হাইকোর্ট চত্বর থেকে গুম করে ভারতীয় জেলে রেখেছিল। ভারত তাহলে তাকে কীভাবে তাদের নিজ দেশের অভ্যন্তরে কারাবন্দি করে রাখল? যখন তাকে কারাবন্দি করে রাখল, তখন সুখরঞ্জন বালির ধর্মীয় পরিচয় কেন দেখেনি? কারণ তারা বাংলাদেশে ভারতবিরোধীদের হিন্দু কিংবা মুসলিম হিসেবে দেখে না, তারা দেখে তার বাংলাদেশপন্থাকে। কারণ হিন্দু কিংবা মুসলিম তাদের আতঙ্ক নয়; বরং বাংলাদেশপন্থাই তাদের আতঙ্ক। জনপ্রিয় অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট পিনাকী ভট্টাচার্যকে যখন আওয়ামী লীগ দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছিল, তখন ভারতের কথিত সংখ্যালঘু সুরক্ষা ইস্যু কোথায় ছিল? কারণ তাদের কাছে ব্যক্তি পিনাকী ভট্টাচার্যের ধর্মপরিচয় মুখ্য বিষয় নয়, এখানে মুখ্য বিষয় পিনাকী ভট্টাচার্যের বাংলাদেশপন্থা। তারা মূলত বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ও দেশপ্রেমিক নাগরিকদের দেশপ্রেমকে ভয় পায় অর্থাৎ বাংলাদেশপন্থাই তাদের ভীতির অন্যতম কারণ। আর যারা দেশপ্রেমিক তাদের নির্যাতন-নিপীড়ন করে দেশত্যাগ, গুম কিংবা বিচারবহির্ভূত হত্যা করতে বিগত দশকে সহায়তা করেছে ভারত।
বিগত জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ রিয়া গোপ, যাকে তার নিজ বাসায় হত্যা করা হয়েছে। এছাড়া জুলাই আন্দোলনে অন্তত ৯ জন হিন্দু ধর্মাবলম্বীকে শহীদ করেছে ফ্যাসিস্টরা। তাদের বিষয়ে ভারতীয় মিডিয়াগুলোর ভূমিকাইবা কী? তারা তখন কেন হাইকমিশনারের কাছে জবাব চায়নি? কেন তৎকালীন সরকারকে কড়া প্রতিক্রিয়া দেখায়নি?
সংখ্যালঘু ইস্যু তাদের মূল বিষয় নয়, মূল বিষয় হলো এর আড়ালে তাদের দাশকে, বয়ানকে স্ট্যাব্লিস করা। এতে যে বা যারা বাধা সৃষ্টি করবে, তাদের ধর্ম, বর্ণ, ব্যক্তিপরিচয় মুখ্য নয়। তাদের নির্যাতন-নিপীড়ন করাই মূল উদ্দেশ্য।
তারা কথায় কথায় ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্যাতনের কথা বলে অথচ তাদের দেশে বর্বরতম হামলার শিকার হয়ে শুধু ইসলাম ধর্মাবলম্বীরাই নয়, গত খ্রিষ্টান ধর্মীয় উৎসব বড় দিনে তাদের উপাসনালয়ে হামলা চালিয়েছে হিন্দু টেরোরিস্ট গোষ্ঠী। তখন কি তারা সংখ্যালঘু নির্যাতন করছে না? এর উত্তর তাদের কাছে নেই। যারা নিজ দেশের সংখ্যালঘুদের ওপর বর্বরোচিত হামলা চালায় তারা আবার বাংলাদেশে অসাম্প্রদায়িক হওয়ার গল্প শোনায়। তাদের উচিত, আগে নিজ দেশে অসাম্প্রদায়িকতার জন্য ক্যাম্পেইন করা এবং সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা করা। সেই সঙ্গে শিব সেনসহ সব হিন্দু টেরোরিস্ট গোষ্ঠীগুলোকে সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে বিচারের মুখোমুখি করা। তারপর অন্য দেশকে অসাম্প্রদায়িকতার গল্প শোনানো উচিত।
সর্বোপরি আমাদের ভূখণ্ড ও অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে এবং ভারতীয় আধিপত্যবাদ রুখতে হলে এদের সব ন্যারেটিভ, মিডিয়া স্ট্যাব্লিশমেন্টের বিকল্প তৈরি করতে হবে। সেই সঙ্গে দেশ ও জাতিকে ভারতীয় আধিপত্যবাদবিরোধী করে তোলার পাশাপাশি যথেষ্ট সক্ষমতা বাংলাদেশের তৈরি করতে হবে। দেশ ও জাতিকে নিরাপদ করতে হলে প্রয়োজনে দক্ষিণ এশিয়ায় সব ভারতবিরোধী শক্তিকে নিয়ে অর্থনৈতিক এবং সামরিক জোট গঠনের উদ্যোগ নিতে হবে। যদি কোনোভাবেই একটি জোট গঠন করা যায়, তাহলে ভারত বিশ্ব মোড়ল হওয়া তো দূরের কথা, নিজ দেশের সীমান্ত ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষায় সবসময় চাপে থাকবে ফলে তাদের শক্তি দক্ষিণ এশিয়ায় আরো সংকুচিত হবে। তাদের সম্প্রসারণ নীতি ও অভ্যন্তরীণ হস্তক্ষেপ দমন করতে না পারলে ভবিষ্যতে অগণিত শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা ও সার্বভৌম সিকিমের মতো হারিয়ে যাবে আর আমরা তখন দাস হব।
লেখক : শিক্ষার্থী বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর
Email:mdhelalmiabrur@gmail.com
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

