আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ক্ষমতা বদলালে আনুগত্যেরও রঙ বদলায়

ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন

ক্ষমতা বদলালে আনুগত্যেরও রঙ বদলায়

রাষ্ট্র পরিচালনার ধারাবাহিকতায় রাজনৈতিক পরিবর্তন একটি স্বাভাবিক বিষয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ক্ষমতার পালাবদল হয়, নতুন নেতৃত্ব আসে, নতুন নীতি নির্ধারিত হয়। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো—এই পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অনেক সময় রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরেও আচরণগত পরিবর্তন দেখা যায়। বিশেষ করে, আমলাতন্ত্রের একটি অংশে। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলছি—১৮ মাস তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বহু আমলার সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল। দায়িত্ব পালনকালে তাদের সহযোগিতা, সৌজন্য ও আনুগত্যের বহিঃপ্রকাশ ছিল স্পষ্ট। কিন্তু গত মাসে ক্ষমতা হস্তান্তরের পর সেই সম্পর্কের চিত্রটি যেন হঠাৎ করেই বদলে গেছে।

ক্ষমতার করিডোরে একটি অদৃশ্য বাস্তবতা কাজ করে—ক্ষমতা যেখানে, আনুগত্যও অনেক সময় সেখানেই স্থানান্তরিত হয়। দায়িত্বে থাকাকালে যেসব কর্মকর্তা নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন, পরামর্শ চাইতেন, বিভিন্ন বিষয়ে আগ্রহ দেখাতেন—ক্ষমতা পরিবর্তনের পর তাদের অনেকেই যেন হঠাৎ করে দূরে সরে গেছেন। নতুন প্রভুর সন্তুষ্টি অর্জনের ব্যস্ততায় পুরোনো সম্পর্কগুলো যেন অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে।

বিজ্ঞাপন

এটি শুধু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বিষয় নয়; বরং রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামোর একটি পুরোনো সমস্যা। আমলাতন্ত্রের একটি অংশ মনে করে, তাদের প্রধান দায়িত্ব হলো ক্ষমতাসীন ব্যক্তির সন্তুষ্টি অর্জন করা। ফলে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অথচ একটি শক্তিশালী ও কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য প্রয়োজন এমন একটি পেশাদার আমলাতন্ত্র, যারা ব্যক্তি নয়—নীতি ও রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত থাকবে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় আমরা চেষ্টা করেছি ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়কে একটি সেবামুখী ও দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে। ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষা, হজ ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, মসজিদ-মন্দিরসহ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সুশাসন নিশ্চিত করা—এসব ক্ষেত্রেই আমরা নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছিলাম। সে সময় অনেক কর্মকর্তা আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করেছেন—এ কথা অস্বীকার করা যাবে না। তবে একই সঙ্গে এটাও সত্য, প্রশাসনের একটি অংশের আচরণে ক্ষমতাকেন্দ্রিক মনোভাব স্পষ্ট ছিল।

ক্ষমতা বদলের সঙ্গে সঙ্গে আচরণের এই দ্রুত পরিবর্তন আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়—আমরা কি সত্যিই একটি পেশাদার ও নীতিনিষ্ঠ প্রশাসন গড়ে তুলতে পেরেছি? নাকি এখনো ব্যক্তিনির্ভর আনুগত্যের সংস্কৃতিই প্রশাসনের একটি বড় অংশকে প্রভাবিত করে?

আমলাতন্ত্রের মূল শক্তি হওয়া উচিত তার নিরপেক্ষতা, পেশাদারিত্ব এবং নৈতিকতা। একজন কর্মকর্তা রাষ্ট্রের কর্মচারী; তিনি কোনো ব্যক্তি বা দলের কর্মচারী নন। ক্ষমতা যার হাতেই থাকুক, প্রশাসনের দায়িত্ব হলো একই নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে রাষ্ট্রের সেবা করা। যদি প্রশাসনের একটি অংশ প্রতিনিয়ত ক্ষমতার কেন্দ্রের দিকে ঝুঁকে পড়ে, তাহলে তা রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর হয়ে ওঠে।

তবে এই বাস্তবতার মধ্যেও হতাশ হওয়ার কারণ নেই। প্রশাসনের ভেতরে এখনো অনেক সৎ, দায়িত্বশীল এবং নীতিবান কর্মকর্তা রয়েছেন, যারা ব্যক্তিগত স্বার্থ বা ক্ষমতার প্রলোভনের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করার চেষ্টা করেন। রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এ ধরনের পেশাদারদের ওপরই।

এখন সময় এসেছে প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে একটি মৌলিক পরিবর্তন আনার। কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ, জবাবদিহি এবং নৈতিক মানদণ্ড শক্তিশালী করতে হবে, যাতে তারা ব্যক্তি নয়—রাষ্ট্র ও সংবিধানের প্রতি আনুগত্যকে সর্বোচ্চ মূল্য হিসেবে বিবেচনা করেন।

ক্ষমতা আসে এবং যায়। কিন্তু রাষ্ট্র এবং এর প্রতিষ্ঠানগুলো স্থায়ী। যদি আমরা সত্যিকার অর্থে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়ে তুলতে চাই, তাহলে আমাদের এমন একটি প্রশাসনিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে, যেখানে আনুগত্যের কেন্দ্র হবে নীতি, ন্যায় এবং জনগণের কল্যাণ—কোনো ব্যক্তিগত ক্ষমতার কেন্দ্র নয়।

প্রশাসনে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি : দক্ষতা ও সততার অবমূল্যায়নের ঝুঁকি

১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই প্রশাসনিক অঙ্গনে বেশ কিছু তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত দৃশ্যমান হয়েছে। বেশ কয়েকজন চুক্তিভিত্তিক সচিবকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে এবং কয়েকজন সচিবকে ওএসডি করা হয়েছে। এর মধ্যে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিবও রয়েছেন। প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস যেকোনো নতুন সরকারের জন্য স্বাভাবিক। কিন্তু এই পরিবর্তনের পেছনে যদি মূল বিবেচনা হয়ে দাঁড়ায় দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি, তবে তা রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য দীর্ঘ মেয়াদে উদ্বেগজনক হয়ে উঠতে পারে।

রাষ্ট্র পরিচালনার মূল শক্তি হচ্ছে একটি দক্ষ, পেশাদার ও নিরপেক্ষ প্রশাসন। রাজনৈতিক সরকার আসবে যাবে, কিন্তু প্রশাসনকে থাকতে হয় রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতার রক্ষক হিসেবে। তাই আমলাতন্ত্রের ক্ষেত্রে প্রধান বিবেচনা হওয়া উচিত দক্ষতা, সততা, অভিজ্ঞতা ও রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধতা। দলীয় আনুগত্যকে যদি প্রশাসনিক মূল্যায়নের প্রধান মানদণ্ডে পরিণত করা হয়, তবে তা শুধু ব্যক্তিগত অবিচারই নয়, বরং রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামোকেও দুর্বল করে দেয়।

ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিবের বিষয়টি এই প্রেক্ষাপটে বিশেষভাবে আলোচনার দাবি রাখে। তার দক্ষতা, সততা এবং প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন বলে প্রশাসনিক অঙ্গনে সুপরিচিত। এমন একজন কর্মকর্তাকে হঠাৎ করে ওএসডি করা হলে তা শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জন্যই নয়, পুরো প্রশাসনের জন্য একটি নেতিবাচক বার্তা বহন করে।

প্রশাসনের কর্মকর্তারা তখন একটি অদৃশ্য মানসিক চাপে পড়ে যান। তারা বুঝতে শুরু করেন যে, পেশাগত দক্ষতার চেয়ে রাজনৈতিক অবস্থানই হয়তো তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। এর ফলে প্রশাসনের ভেতরে স্বাভাবিক কর্মস্পৃহা কমে যায় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে নিরপেক্ষতার পরিবর্তে নিরাপদ অবস্থান নেওয়ার প্রবণতা বাড়ে। দীর্ঘ মেয়াদে এটি প্রশাসনের গুণগত মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

বাংলাদেশের প্রশাসনিক ইতিহাসে আমরা দেখেছি, প্রতিটি সরকার পরিবর্তনের পর কিছু প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস হয়েছে। কিন্তু যখন তা ব্যাপকভাবে দলীয় বিবেচনায় পরিচালিত হয়েছে, তখন প্রশাসনের ভেতরে বিভাজন সৃষ্টি হয়েছে। এতে প্রশাসনের নিরপেক্ষ চরিত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং রাষ্ট্র পরিচালনার দক্ষতাও কমেছে।

রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতৃত্বের অন্যতম বড় দায়িত্ব হলো প্রশাসনের ওপর আস্থা রাখা এবং তাদের পেশাগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। দক্ষ ও সৎ কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন করা হলে প্রশাসনের ভেতরে ইতিবাচক প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হয়। কিন্তু যদি বারবার এমন বার্তা যায় যে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিই প্রধান বিবেচ্য, তবে তা প্রশাসনের মনোবল ভেঙে দিতে পারে।

নতুন সরকারের সামনে বহু চ্যালেঞ্জ রয়েছে—অর্থনীতি, সামাজিক স্থিতিশীলতা, আন্তর্জাতিক সম্পর্কসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারের সবচেয়ে বড় সহায়ক শক্তি হতে পারে একটি দক্ষ ও পেশাদার প্রশাসন। তাই প্রশাসনে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে দলীয় বিবেচনার পরিবর্তে রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যে রাষ্ট্রগুলো তাদের প্রশাসনিক কাঠামোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখতে পেরেছে, তারাই দীর্ঘ মেয়াদে স্থিতিশীল ও কার্যকর রাষ্ট্র পরিচালনা নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই সত্য প্রযোজ্য।

সুতরাং প্রশাসনে পরিবর্তন আনতে হলে তা হওয়া উচিত স্বচ্ছ, যুক্তিসংগত এবং রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থ বিবেচনায়। দক্ষতা ও সততার মূল্যায়ন নিশ্চিত করা গেলে প্রশাসন আরো শক্তিশালী হবে এবং সরকারও তার নীতি বাস্তবায়নে অধিক সফলতা অর্জন করতে পারবে। অন্যথায় দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি প্রশাসনের ওপর প্রাধান্য পেলে তা শেষ পর্যন্ত সরকারের জন্যই অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।

প্রশাসনে দক্ষতার মূল্যায়ন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা

গত দেড় বছরের অভিজ্ঞতা আমাকে প্রশাসনের ভেতরের অনেক বাস্তবতা কাছ থেকে দেখার সুযোগ দিয়েছে। বিশেষ করে, আমলাতন্ত্রের পেশাদারিত্ব, সততা এবং একই সঙ্গে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে প্রশাসনিক আচরণের যে পরিবর্তন ঘটে—তা গভীরভাবে উপলব্ধি করেছি।

এই সময়কালে আমি তিনজন সচিবের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। আমার সৌভাগ্য যে তারা প্রত্যেকেই ছিলেন প্রো-অ্যাকটিভ, সৎ এবং পেশাদার কর্মকর্তা। প্রশাসনিক কাজে তাদের দক্ষতা, দায়িত্ববোধ এবং আন্তরিকতা আমাকে মুগ্ধ করেছে। একটি মন্ত্রণালয় সঠিকভাবে পরিচালিত হতে হলে মন্ত্রী বা উপদেষ্টার পাশাপাশি সচিবের পেশাগত যোগ্যতা ও উদ্যোগী মনোভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—এ সত্যটি তাদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়েই আরো স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করেছি।

মন্ত্রণালয় থেকে বিদায় নেওয়ার সময় যে সচিব দায়িত্বে ছিলেন, তার জীবন কাহিনি প্রশাসনিক বাস্তবতার একটি করুণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও তাকে ওএসডি করা হয়েছিল। টানা আট বছর তিনি সচিবালয়ে প্রবেশ করার সুযোগ পাননি। দীর্ঘ এ সময় একজন দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তাকে কার্যত প্রশাসনের বাইরে রাখা হয়েছিল। অথচ তার সততা ও দক্ষতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন ছিল না।

দুঃখজনকভাবে, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও তার ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটেনি। জাতীয়তাবাদী শক্তি ক্ষমতায় আসার পরও তিনি আবার ওএসডি হয়ে গেলেন। এটি শুধু একজন ব্যক্তির প্রতি অবিচার নয়; বরং প্রশাসনের জন্যও এক বড় ক্ষতি। কারণ একজন অভিজ্ঞ ও কর্মদক্ষ কর্মকর্তাকে কাজের সুযোগ না দেওয়া মানে রাষ্ট্রের মূল্যবান মানবসম্পদকে অব্যবহৃত রাখা।

আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, তাকে কাজ করার সুযোগ দেওয়া হলে মন্ত্রণালয়ের যে স্থবিরতা মাঝে মাঝে দেখা যায়, তা কাটিয়ে উঠতে পারত এবং প্রশাসনে নতুন প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসত। দক্ষ ও সৎ কর্মকর্তাদের সামনে রেখে কাজ করলে প্রশাসনের গতি ও মান দুটোই বৃদ্ধি পায়—এটি আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা।

এ প্রসঙ্গে আরেকটি স্মৃতি উল্লেখ করতে চাই। প্রধান উপদেষ্টা W. BDbym নিয়মিত আমাকে ডেকে আমার মন্ত্রণালয়ের খোঁজখবর নিতেন। তিনি জানতে চাইতেন—মন্ত্রণালয়ের কাজকর্ম কেমন চলছে, সচিব কেমন কাজ করছেন ইত্যাদি। আমি যখন সচিবদের পারঙ্গমতা ও কর্মনিষ্ঠার প্রশংসা করতাম, তখন তিনি মৃদু হাসি দিয়ে বলতেন, ‘একমাত্র তোমার মুখেই সচিবদের প্রশংসা শুনি।’ এই মন্তব্যের পেছনে একটি বাস্তবতা ছিল। অনেক উপদেষ্টা তাদের সচিবদের নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করতেন এবং বিভিন্ন অভিযোগ করতেন। প্রশাসনের ভেতরে সমন্বয়ের অভাব, আস্থার সংকট এবং পারস্পরিক সন্দেহ—এসব সমস্যার কথা প্রায়ই শোনা যেত।

কিন্তু আমার অভিজ্ঞতা ভিন্ন ছিল। আমি দেখেছি, যদি রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রশাসনের ওপর আস্থা রাখে এবং কর্মকর্তাদের কাজ করার স্বাধীনতা দেয়, তাহলে তারা নিষ্ঠা ও দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পারে। পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসের পরিবেশ তৈরি হলে প্রশাসনও কার্যকর হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রশাসনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে যদি প্রশাসনে প্রতিশোধ বা পক্ষপাতের সংস্কৃতি চালু হয়, তাহলে তার ক্ষতি শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকেই বহন করতে হয়। একজন কর্মকর্তার মূল্যায়ন হওয়া উচিত তার দক্ষতা, সততা ও পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে—রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়। রাষ্ট্রের স্বার্থে আমাদের এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। দক্ষ ও সৎ কর্মকর্তাদের যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারলে প্রশাসন আরো শক্তিশালী হবে এবং জনগণও তার সুফল পাবে।

সরকারি প্রশাসনে দক্ষতা, সততা ও পেশাদারিত্বের যথাযথ মূল্যায়ন একটি সুস্থ রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। যখন কোনো কর্মকর্তা দীর্ঘদিন নিষ্ঠা, সততা ও দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন এবং রাষ্ট্র সেই অবদানকে সম্মান জানায়, তখন তা শুধু ব্যক্তির জন্যই নয়, সমগ্র প্রশাসনের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করে।

প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস একটি এমন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, যা প্রশাসনে যোগ্যতার মূল্যায়নের উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

আমার এক সচিব ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী, কর্মনিষ্ঠ ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তা। তার কাজের ধরন ছিল অত্যন্ত প্রো-অ্যাকটিভ; তিনি শুধু নিয়মিত প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনেই সীমাবদ্ধ থাকতেন না, বরং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়ে মন্ত্রণালয়ের কাজকে আরো গতিশীল করে তুলতেন।

এই কর্মকর্তা দীর্ঘ কর্মজীবনে সততা, দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। সরকারি প্রশাসনে অনেক সময় নানা ধরনের চাপ ও প্রভাবের মধ্য থেকেও তিনি তার নৈতিক অবস্থান থেকে কখনো বিচ্যুত হননি। তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ছিল স্বচ্ছতা এবং দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে ছিল এক ধরনের নীরব নিষ্ঠা। ফলে সহকর্মী, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং নীতিনির্ধারকদের মধ্যেও তিনি একজন সম্মানিত ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

যখন তার অবসরের সময় ঘনিয়ে এলো, তখন অনেকেই মনে করেছিলেন যে তার দীর্ঘ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা এখানেই শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। সরকারপ্রধান প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস তার দক্ষতা, সততা ও অভিজ্ঞতায় মুগ্ধ হয়ে তাকে রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদে পাঁচ বছরের জন্য নিয়োগ দেন।

এই সিদ্ধান্ত শুধু একজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত স্বীকৃতি নয়; এটি প্রশাসনে মেধা ও সততার প্রতি রাষ্ট্রের আস্থার প্রতিফলন। অনেক সময় দেখা যায় যে অবসরের পর দক্ষ কর্মকর্তাদের অভিজ্ঞতা রাষ্ট্র যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারে না। কিন্তু এ ধরনের নিয়োগের মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে রাষ্ট্র চাইলে অভিজ্ঞ ও সৎ কর্মকর্তাদের জ্ঞান এবং দক্ষতাকে আরো বৃহত্তর পরিসরে ব্যবহার করতে পারে।

এ ধরনের সিদ্ধান্ত প্রশাসনের ভেতরেও একটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। তরুণ ও মধ্যমপর্যায়ের কর্মকর্তারা তখন বুঝতে পারেন যে নিষ্ঠা, সততা ও পেশাদারিত্ব শেষ পর্যন্ত মূল্যায়িত হয়। এতে প্রশাসনে দলীয় আনুগত্য বা ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়ে পেশাগত দক্ষতা ও সততার গুরুত্ব বাড়ে।

বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে প্রশাসনিক দক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নীতিনির্ধারণ, বাস্তবায়ন এবং জনসেবার প্রতিটি ক্ষেত্রে সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তাদের অবদান অপরিহার্য। তাই যখন রাষ্ট্র তাদের যথাযথ মর্যাদা দেয়, তখন তা শুধু একটি ব্যক্তিগত স্বীকৃতি নয়; বরং পুরো প্রশাসনিক সংস্কৃতিকে ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে।

পরিশেষে বলা যায়, অবসরপ্রাপ্ত এক সচিবকে তার যোগ্যতা ও দক্ষতার স্বীকৃতিস্বরূপ সাংবিধানিক পদে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রশাসনে মেধা এবং সততার মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে থাকবে। ভবিষ্যতেও যদি রাষ্ট্র এ ধরনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে, তবে তা প্রশাসনের পেশাদারিত্ব, নৈতিকতা এবং জনগণের আস্থাকে আরো শক্তিশালী করবে।

লেখক : সাবেক উপদেষ্টা, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ সরকার

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন