আল্লামা আযীযুর রহমান নেছারাবাদী (কায়েদ সাহেব হুজুর) (রহ.) ১৯১৩ সালে ঝালকাঠীর বাসন্ডা (বর্তমান নেছারাবাদ) গ্রামে সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ক্ষণজন্মা এই গুণী ব্যক্তিত্ব আমরণ দেশ ও জাতির খেদমত করে গেছেন। তার কর্মজীবন শুরু শিক্ষকতার মহান পেশা দিয়ে। ১৯৪২ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত ২৫ বছর তিনি ছারছীনা দারুচ্ছুন্নাত আলিয়া মাদরাসায় শিক্ষকতা ও ভাইস প্রিন্সিপাল হিসেবে কর্মরত ছিলেন। বিদগ্ধ এই গুণী শিক্ষকের ছোঁয়ায় অসংখ্য গুণী তৈরি হয়েছে। যাদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক মরহুম ড. মু. মুস্তাফিজুর রহমান, অধ্যাপক ড. আ. র. ম আলী হায়দার মুর্শিদী, প্রফেসর এমএ মালেক, ছারছীনা দারুচ্ছুন্নাত আলিয়া মাদরাসার সাবেক অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুর রব খান, মরহুম মাওলানা মো. আমজাদ হোসাইন, প্রখ্যাত মুফাসসিরে কোরআন মাওলানা মরহুম দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী, দৈনিক সংগ্রামের সাবেক সম্পাদক মরহুম অধ্যাপক আখতার ফারুক, দৈনিক ইনকিলাবের নির্বাহী সম্পাদক মাওলানা কবি রুহুল আমীন খান ও ইসলামি সমাজকল্যাণ পরিষদ চট্টগ্রামের সাবেক সভাপতি মরহুম মাওলানা শামসুদ্দিন উল্লেখযোগ্য। তিনি শিক্ষকতা থেকে অবসরে যাওয়ার পর দক্ষিণাঞ্চলের আনাচে-কানাচে শত শত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেছেন। পশ্চাৎপদ নারী সমাজের উন্নয়নের জন্যও তিনি অনেক অবদান রেখেছেন। তার নিজ বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত কামিল মাদরাসাকে তিনি বহুমুখী কমপ্লেক্সে পরিণত করেছেন। ৪২টি প্রতিষ্ঠান এ কমপ্লেক্সের অন্তর্ভুক্ত। হুজুর কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ঝালকাঠি এনএস কামিল মাদরাসা এখন বাংলাদেশের সেরা আদর্শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
হজরত কায়েদ হুজুর (রহ.)-এর কাছে ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে কাঙ্ক্ষিত মর্যাদা পেতেন। ঝালকাঠী অঞ্চলের হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকরা তাঁকে দেবতাতুল্য মর্যাদা দিতেন। হুজুর যখন ঢাকায় কমফোর্ট হাসপাতালে অসুস্থাবস্থায় চিকিৎসাধীন ছিলেন, তখন ঝালকাঠীর সব মন্দিরে তার জন্য বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হয়েছিল। হুজুর ভালো জিনিস যে কারো থেকে গ্রহণ করতে দ্বিধা করতেন না। স্রষ্টাকে নিবেদিত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘তোমার প্রেম যে বইতে পারি এমন সাধ্য নাই...’ গানসহ অনেক গানই হুজুর নিজে গাইতেন। বাদ্যযন্ত্র ছাড়া ক্যাসেট তৈরি করে শুনতেন ও বিক্রি করার আদেশ দিতেন। নকুল কুমার বিশ্বাসের অনেক সমাজ-সংস্কারমূলক গানই হুজুর পছন্দ করতেন। হুজুর ছিলেন কর্মবীর। লোকজনকে কাজ করার উৎসাহ দিতেন। নিজের পয়সায় মাল কিনে বেকার লোকদের ব্যবসা করতে দিতেন। হুজুরের মুখে সবসময় ধ্বনিত হতো—‘ওগো মুসলমানের ছেলে কাজ করিলে মান যাবে তোর কোন হাদিসে পেলে’।
ক্ষণজন্মা এই মহাপুরুষ তার কর্মময় জীবনের ইতি টেনে ২০০৮ সালের ২৮ এপ্রিল ইন্তেকাল করেন। তার ইন্তেকালের খবর শুনে সারা দেশ থেকে লাখ লাখ মানুষ ভিড় জমান ঝালকাঠীর নেছারাবাদে। তার জানাজায় ১০ কিলোমিটারজুড়ে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের সমাগম ঘটেছিল।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

