দিল্লিতে পলাতক শেখ হাসিনা কোনো স্বাধীন মানুষ নন। তিনি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন করছেন। তার প্রতিটি পদক্ষেপ ভারত সরকারের অনুমোদনের বাইরে ঘটার কোনো সুযোগ নেই। জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বিএনপির নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর দেশের ভেতরে থাকা আওয়ামী লীগের সফট পাওয়ারগুলো বেশ সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এদের অনেকে ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সখ্যও গড়ে তুলেছে। শেখ হাসিনার শাসনামলে গড়ে ওঠা দেশের লুটেরা ব্যবসায়ী শ্রেণির নিয়ন্ত্রণে থাকা গণমাধ্যমে তারা আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে ফেরানোর পক্ষে জনমত গঠনের চেষ্টা করে যাচ্ছে। গণঅভ্যুত্থানে হত্যাকাণ্ড নিয়ে নানা ধরনের বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চলছে। মূলধারার গণমাধ্যমসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নানা আউটলেটে মিথ্যা তথ্য ও প্রোপাগান্ডা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এর সঙ্গে সম্প্রতি রয়টার্সকে দেওয়া শেখ হাসিনার টেলিফোন সাক্ষাৎকার বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এতদিন শেখ হাসিনা ইমেইলে সাক্ষাৎকার দিতেন। এবার রয়টার্স দাবি করেছে, তারা টেলিফোনে শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকার নিয়েছে। রয়টার্সের সঙ্গে হাসিনার টেলিফোনে কথা বলার সুযোগ যে ভারত সরকারের ইচ্ছাতে হয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। অর্থাৎ রয়টার্সের এই সাক্ষাৎকার প্রচার ভারত সরকারের পরিকল্পনার অংশ মাত্র। মোদির সুতার টানে হাসিনা নাচছে।
শেখ হাসিনার পতনের পর ১৫ আগস্ট ফ্রান্সের বিখ্যাত সংবাদপত্র লা মদেঁ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল, যার শিরোনাম ছিল ‘শেখ হাসিনা : ভারতের দুর্বহ ভার’। এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, কখনো কখনো বন্ধুও বোঝা হয়ে যায়। ভারতের জন্য এখন শেখ হাসিনা ঠিক তেমনই একটি দুর্বহ ভার। যতই দিন গড়াচ্ছে, ততই ভারতের পক্ষে শেখ হাসিনাকে বহন করা কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে যাচ্ছে। ভারত শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে রেখেছে। হাসিনাকে এখন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ব্যবহারের নানা চেষ্টা করবে। এই সাক্ষাৎকার তার অংশমাত্র। আর যদি সত্যিই দিল্লি ঘাড় থেকে এই বোঝা নামাতে চায়, তাহলে আইনি প্রক্রিয়ায় হস্তান্তরকে এ দেশের মানুষ স্বাগত জানাবে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে একাধিকবার আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে প্রত্যর্পণের দাবি করা হয়েছে। একজন গণহত্যাকারী শাসকের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা একটি জাতির সামনে এগিয়ে চলার জন্য অত্যন্ত জরুরি।
শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে দেশে আসার ঘোষণা আসলে যে স্টান্টবাজি, তা বোঝা কোনো কঠিন বিষয় নয়। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দিল্লিতে থাকা অবস্থায় তিনি বলেছিলেন, সীমান্তের কাছাকাছি আছেন, টুপ করে ঢুকে পড়বেন। দেশে ফেলে যাওয়া মনোবল হারানো কর্মীদের আস্থা ফেরানোর জন্য তিনি পলায়নের নতুন গল্প বানিয়েছিলেন। তিনি নাকি গোপালগঞ্জে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বোনকে নিয়ে হেলিকপ্টারে উঠেছিলেন। কিন্তু সেই হেলিকপ্টার থেকে নেমে সি-১৩০ পরিবহন বিমানে করে দিল্লির হিন্দন সামরিক ঘাঁটিতে নেমেছিলেন। তার কিছুই তিনি জানেন না। এমন বোকাসোকা শেখ হাসিনাকে শুধু ভুল বুঝিয়ে স্বৈরিণী বানানো হয়েছে। আহ! তার জীবনটাই যে ভুলে ভরা!
প্রশ্ন হলো, দিল্লিতে শেখ হাসিনা আর দেশের ভেতর থাকা তার অনুগত প্রচারবিদরা হঠাৎ কেন সরব হয়ে উঠেছে? এর প্রধান কারণ দিল্লির হতাশা। জাতীয় নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের পলাতক ও দেশে থাকা নেতারা ভেবেছিলেন, বিএনপি সরকার গঠনের পর তাদের রাজনীতিতে ফিরে আসার সুযোগ সৃষ্টি হবে। ভারতের পক্ষ থেকেও ইউনূস সরকারের কঠোর সমালোচনা করে বিএনপির প্রতি নমনীয়তা দেখানো হয়েছিল। বিএনপির নেতারা ভোটের রাজনীতির কৌশল হিসাবে বিষয়টি বেশ ভালোভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। এ কারণে নির্বাচনের আগে বিএনপির নেতারা আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ এবং বিচারের ব্যাপারে এক ধরনের ধোঁয়াশাপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছিলেন। কিন্তু নির্বাচনের পর ভোটের হিসাব ও আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফিরে আসার ব্যাপারে ছাত্র-জনতার কঠোর অবস্থানের কারণে বিএনপি তার অবস্থান স্পষ্ট করেছে।
নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি জোটের ভোট পেয়েছে প্রায় ৩৮ শতাংশ, যা প্রমাণ করে তরুণ ও দীর্ঘদিন ধরে বিএনপিকে ভোট দেয় এমন ভোটারদের বড় একটি অংশ জামায়াত-এনসিপিকে ভোট দিয়েছে। অপরদিকে সংখ্যালঘু ও আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ভোটের বড় অংশের ভোট পেয়েছে বিএনপি। এমন পরিস্থিতিতে রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের ফিরে আসার অর্থ হলো বিএনপির ভোটব্যাংকে ভাগ বসানো। এছাড়া আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতা কিংবা নমনীয় অবস্থান দেশের তরুণদের বিক্ষুব্ধ করে তুলতে পারে। ফলে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে পুনর্বাসনের যেকোনো পদক্ষেপ যে বিএনপির জন্য আত্মঘাতী হবে, তা বোঝার জন্য রকেট সায়েন্স বিদ্যার দরকার নেই। স্বাভাবিকভাবে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরার ব্যাপারে কঠোর অবস্থান নিয়েছে বিএনপি। এর অংশ হিসেবে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তকে জাতীয় সংসদে আইনি রূপ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মানবতাবিরোধী অপরাধে দল হিসাবে আওয়ামী লীগের বিচারের ব্যাপারে সরকারের অবস্থানও বেশ স্পষ্ট। বিচার প্রক্রিয়ার ধীরগতি নিয়ে অনেকের অসন্তোষ থাকলেও আওয়ামী লীগের বিচার যে হবে, তা নিয়ে সংশয় অনেকটা কেটে গেছে। এ বিষয়ে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের মধ্যে ঐক্য আছে।
শেখ হাসিনার পলাতক জীবনের ইতিহাস নতুন নয়। ৫ আগস্টে পলায়নের কয়েক দিন আগে নিজে সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, শেখ হাসিনা পালায় না। এই সংবাদ সম্মেলনের তিন দিনের মাথায় তিনি পালিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি কখনোই সাহসী ছিলেন না। শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুর পর আওয়ামী লীগের নেতারা দেশে থেকেই রাজনীতি করেছেন। কিন্তু শেখ হাসিনা জার্মানি থেকে দিল্লিতে স্বেচ্ছা নির্বাসনে ছিলেন প্রায় ছয় বছর। জিয়াউর রহমান তাকে দেশে ফিরিয়ে এনেছিলেন। কিন্তু তিনি সাহস করে দেশে আসেননি। ওয়ান-ইলেভেনের সময় তিনি মইনউদ্দিন-ফখরুদ্দীন সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করে কানের চিকিৎসার নামে বিদেশ চলে গিয়েছিলেন। যদিও সে সময় বেগম খালেদা জিয়াকে দেশত্যাগের চাপ প্রয়োগ করা হলেও তিনি দেশত্যাগে রাজি হননি। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছিলেন, ‘এ দেশ ছেড়ে, এ দেশের মানুষকে ছেড়ে আমি কোথাও যাব না। এ দেশই আমার একমাত্র ঠিকানা। বিদেশে আমার কোনো প্রভু নেই, এ দেশের মাটি ও মানুষই আমার আপনজন।’
শেখ হাসিনার রাজনীতি হচ্ছে সমঝোতা, ষড়যন্ত্র ও নিপীড়নের রাজনীতি। তিনি কখনোই দেশের মানুষের ওপর ভরসা করেননি। তার ভরসা ছিল দিল্লির ওপর। এমনকি দলের নেতাকর্মীদের ওপর তার কোনো আস্থা ও বিশ্বাস ছিল না। তিনি নিজে সংসদে বলেছিলেন, তাকে ছাড়া আওয়ামী লীগের সবাইকে কেনা যায়। অথচ তার অফিসের পিয়ন ৪০০ কোটি টাকার মালিক বনে গিয়েছিল, সে কথা আবার তিনি নিজেই গর্বভরে বলেছিলেন। ৫ আগস্ট দেশত্যাগের আগে তিনি শেখ পরিবারের প্রত্যেকটি সদস্যকে নিরাপদে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছেন। শেখ পরিবারের একজন সদস্যও গ্রেপ্তার হননি। এমনকি দূরতম আত্মীয়তার সম্পর্ক আছে যাদের, তাদের দেশত্যাগ তিনি নিশ্চিত করেছেন। আসলে শেখ হাসিনা ছিলেন ক্ষমতার বিকারগ্রস্ত এক নারী, যিনি তার পরিবার ও আত্মীয়স্বজন ছাড়া কাউকে বিশ্বাস করতে পারেননি। একমাত্র মেয়ে ছাড়া তার ও তার পরিবারের কোনো সদস্য এ দেশের মানুষের সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্কে গড়ে তোলেননি। মেয়ের সম্পর্ক টেকসই হয়নি। শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যরা স্বদেশ নয়, বিদেশ ভালোবেসেছেন। বিশেষ করে দিল্লির প্রতি তার আনুগত্য ছিল সীমাহীন। ফলে তার নিয়তি বাঁধা রয়েছে দিল্লির সঙ্গে।
বাংলাদেশের ওপর অন্যায্য চাপ সৃষ্টির জন্য হাসিনা ও আওয়ামী লীগকে দিল্লি ব্যবহারের চেষ্টা করবে, তা অস্বাভাবিক কিছু নয়। জুলাই-আগস্টে হত্যাকাণ্ডে জড়িত আওয়ামী লীগ নেতা ও দলটির বিচারের ব্যাপারে সরকার ও বিরোধী দলের ঐক্য দিল্লির হতাশা যেন বাড়িয়ে তুলেছে। আগামী দিনগুলোয় অস্থিরতা সৃষ্টির জন্য দেশের ভেতরে বড় কোনো বিশৃঙ্খলার পরিকল্পনাও হয়ে থাকতে পারে। এখন আওয়ামী লীগের অনুগত প্রচারবিদদের দিয়ে হয়তো তার ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হচ্ছে।
আমাদের মনে রাখতে হবে এখন পর্যন্ত সরকারের পররাষ্ট্রনীতিতে দিল্লি যে সন্তুষ্ট নয়, তা খুবই স্পষ্ট। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফরের পর সরকারের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতিতে কিছু পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। ভারতের গণমাধ্যমে তাকে উদ্বেগজনক হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য ভারত এখন নানা কার্ড খেলার চেষ্টা করবে। শেখ হাসিনাও ভারতের একটি কার্ড মাত্র। তবে সেটি খুবই দুর্বল কার্ড। দিল্লি যতই এই কার্ড ব্যবহারের চেষ্টা করবে, এ দেশের মানুষ ততই বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠবে।
হাসিনা ও তার দলের নেতারা দল বেঁধে পালিয়ে দিল্লিতে আশ্রয় নেওয়ার মধ্য দিয়ে প্রমাণ করেছেন আওয়ামী লীগ মূলত ভারতের একটি রাজনৈতিক দল, যার হেডকোয়ার্টার্স দিল্লিতে, যে দলের বড় একটি অংশ বসবাস করে কলকাতায়। অতীতে এ দলটি ভারতের ইচ্ছাপূরণের রাজনীতি করেছে, ভবিষ্যতেও তা-ই করার চেষ্টা করবে। এমনকি ভারতের পরিকল্পনায় সন্ত্রাসী তৎপরতায় লিপ্ত হলেও অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না। ’৭৫-এর পর এই দলের একাংশ দিল্লির উসকানিতে কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছিল। জিয়াউর রহমান কঠোরভাবে তাদের দমন করেছিলেন।
চব্বিশের জুলাই-আগস্টে কমপক্ষে দেড় হাজার মানুষের হত্যাকাণ্ড নিয়ে এখন পর্যন্ত হাসিনা থেকে শুরু করে দলের নেতাকর্মী ও প্রচারবিদদের মধ্যে কোনো অনুশোচনা নেই। বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেন, সাপকে বিশ্বাস করা যায়, আওয়ামী লীগকে নয়। ফলে বাংলাদেশের তরুণসমাজ রাজনীতির এই কালো সাপকে পুনর্বাসন করার চেষ্টা কখনোই মেনে নেবে না। দিল্লির পুতুল হিসেবে হাসিনা যত সরব হওয়ার চেষ্টা করবেন, বাংলাদেশের মানুষকে গণঅভ্যুত্থানের রক্তাক্ত স্মৃতি তত বেশি আলোড়িত করবে।
লেখক : সহযোগী সম্পাদক, আমার দেশ
alfaz@dailyamardesh.com
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন



আড়াই শতকের স্বাধীনতা, অর্ধশতকের বন্ধুত্ব এবং নতুন সময়ের বাস্তবতা