জনপ্রতিনিধিরাও না হয় ছদ্মবেশ ধারণ করুন

জনপ্রতিনিধিরাও না হয় ছদ্মবেশ ধারণ করুন

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী যখন ‘অনুপ্রবেশকারী’দের বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার কৃতিত্বে তার কাঁধ জড়িয়ে থাকা গেরুয়া চাদরখানা আরো খানিকটা জড়িয়ে নিয়ে গর্বিত চোখে ক্যামেরায় তাকাচ্ছেন, তখন কাছাকাছি সময়ে ভারতের কর্ণাটকের পরিবহনমন্ত্রী বাইরাথি ক্যামেরায় ধরা পড়লেন একেবারে সাধারণ বাসযাত্রী হিসেবে।

বিজ্ঞাপন

মাস্ক পরিহিত বাইরাথির চোখ দেখে অন্য সবার মতো বাস কনডাক্টরও ভুল করল। তাই যাত্রীদের সঙ্গে প্রতিদিনকার অন্যায় আচরণ বাইরাথির সঙ্গেও করে ফেলল। ১০০ রুপির নোটের ভাঙতি দিতে না পারায় ছদ্মবেশে থাকা মন্ত্রীকে কনডাক্টর নির্দেশ দিল বাস থেকে নেমে যাওয়ার। জুলাই মাসের কোনো এক শনিবার সন্ধ্যা ৭টা ১০ মিনিট থেকে রাত ৯টা ১০ মিনিট পর্যন্ত প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে এই পরিবহনমন্ত্রী একাধিক রুটের একাধিক গণপরিবহনে ছদ্মবেশে আরোহণ করেছেন।

উদ্দেশ্য ছিল যাত্রীদের সঙ্গে বাস ড্রাইভার-কনডাক্টরদের আচরণ দেখা এবং গণপরিবহনের যাত্রী হিসেবে অভিজ্ঞতা অর্জন। বলা বাহুল্য, গণমাধ্যমে শুভেন্দু ও তার পূর্বপুরুষদের দাপাদাপি ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ হুমকি-ধমকি দেখে আমাদের কতিপয় পেশিবহুল রাজনৈতিক নেতা যে শিক্ষা গ্রহণ করেন, প্রায়ই তার চর্চাও করে থাকেন বাস্তবে। কিন্তু এই ভারতে যে বাইরাথির মতো মন্ত্রী আছেন, তা আমাদের অজানা রয়ে যায়। প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে যে ভারতের নীতি হলো নীতিবহির্ভূত আচরণ করা, সে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়াদি দেখাশোনায় বাইরাথির মতো নিবেদিত কিছু জনপ্রতিনিধি আছেন বলেই ভারত টিকে রয়েছে। আমাদের পেশি-মেদসর্বস্ব এবং প্রায় মস্তিষ্কবিহীন কতিপয় জনপ্রতিনিধির শুভেন্দুনামা অনুসরণের বদলে বাইরাথিদের রথ অনুসরণে অসুবিধা কোথায়?

অসুবিধা দুটো জায়গায়।

প্রথমত, আমরা আমজনতা হবু জনপ্রতিনিধিদের কাছ থেকে প্রাকনির্বাচনি লম্বা-চওড়া প্রতিশ্রুতি শুনতে ভালোবাসি এবং দ্বিতীয়ত, নির্বাচনের পর প্রতিশ্রুতি রক্ষায় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের ইচ্ছাকৃত কিংবা অনিচ্ছাকৃত অক্ষমতাকে আমরা মেনে নিই। ক্ষমা করতে পারি না, কারণ তাদের আচরণ আমাদের কষ্ট দেয়। আর প্রতিবাদ করতে পারি না, কারণ তাহলে হাদির মতো প্রাণ সংহরণ করা হবে। ফলে বৃষ্টির মৌসুমে বৃষ্টি হওয়ার মতো সহজাত স্বাভাবিক ব্যাপারকে আমরা দোষ দিই জনদুর্ভোগ সৃষ্টির জন্য। মৃদুস্বরে এদিক-সেদিক থেকে নগরপিতাদের নর্দমা পরিষ্কারের ব্যর্থতা নিয়ে আওয়াজ শোনা গেলেও তা শিগগিরই হারিয়ে যায় বর্ষা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে।

কিন্তু ছদ্মবেশ আমাদের জনপ্রতিনিধিরাও ধারণ করেন। আমাদের সৌভাগ্য যে, আমরা স্বনামধন্য, অনেক বুদ্ধিধর, অনেক মেধাবী, ভীষণ চৌকস, অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ ও দেশবরেণ্য কিছু উপদেষ্টা পেয়েছিলাম বিগত সরকারের আমলে। তারা বিদায় নেওয়ার পর আমাদের বোধোদয় হয়েছে, তারা আসলে ছিলেন ছদ্মবেশী। কেউ কেউ পলিথিন সমূলে উৎপাটন ও পাটজাত দ্রব্যের বিপণনের জন্য দেশপ্রেম-মাখা অনেক বক্তব্য দিয়েছেন; কিন্তু কূলকিনারা ঠিক করতে না পারায় শেষমেষ তাদের উত্তরসূরিদের পাটজাত পণ্যের ব্যবসা পাইয়ে দেওয়ায় মনোনিবেশ করেছেন। আবার প্লাস্টিকজাত জলপানের সরঞ্জাম, অর্থাৎ বোতল ও ওয়ানটাইম গ্লাস নির্বাসনে পাঠানোর জন্য কাচের বোতলে পানি পান করা শিখিয়েছেন তাদের কেউ কেউ। এর পর থেকে অফিস-আদালতে কাচের বোতল-কাচের গ্লাস শোভা পেয়েছে বেশ কিছুদিন এবং তার পরের অবস্থা সবারই জানা আছে।

কেউ কেউ উপদেষ্টার আসন অলংকৃত করার আগে পরিবেশ বিষয়ে আমাদের সচেতনতার তালিম দিয়েছিলেন। গাছের গায়ে কেউ পেরেক ঠুকলে তা তুলে নেওয়ার জন্য রাজপথে আন্দোলন করেছেন, গাছকে পরম মমতায় জড়িয়েও রেখেছেন যেন না কাটা হয়, যানবাহনের কালো ধোঁয়া বন্ধের জন্য অগ্নিঝরা বক্তব্য দিয়েছেন, নিজের গাড়ির চালককে একটুও হর্ন না বাজিয়ে উত্তরবঙ্গ থেকে ঢাকায় গাড়ি চালিয়ে আসা শিখিয়েছেন। এরপর তারা উপদেষ্টার আসনে আসীন হওয়ার পর অবশ্য অনেক গাছ উৎপাটন করা হয়েছে, গাড়ির কালো ধোঁয়ায় আমাদের গোলাপি ফুসফুস কালো হয়ে চলেছে, হর্নের শব্দে কান ঝালাপালা হয়েছে। আর এতে বিরক্ত হয়ে অবশেষে তারা বুদ্ধিদীপ্ত স্বীকারোক্তি দিয়েছেন, আসলে এসব সমস্যা সমাধানেরই অযোগ্য। তাই তাদের কিছু করার নেই এবং আমরা তা মেনেও নিয়েছি নিপাট ভদ্রলোকের মতো। শুধু মনে মনে জেনেছি, তারা ছদ্মবেশী ছিলেন। কেবল বাইরাথির ছদ্মবেশের উদ্দেশ্যের সঙ্গে পার্থক্যটা বিস্তর ছিল।

রাজদরবারে পট পরিবর্তন হলো ২০২৬ সালের শুরুতে। কিন্তু আমাদের ভাগ্য তথৈবচ। আমরা খলিফাদের নামে নিরাপত্তবাহিনীর নামকরণ করতে পারি, কিন্তু খলিফাদের কেউ কেউ যে রাতের মদিনায় ছদ্মবেশে নিজের চোখে মানুষের অবস্থা দেখার জন্য বের হয়ে পড়তেন, তা জানতে ও মানতে ভীষণ আপত্তি। অবশ্য বের হওয়ার উপায় কতটুকু আছে, তাও প্রশ্ন। সরকারপ্রধানকে যদি নিরাপত্তাজনিত কারণে ঢাকার বাইরে রাত না কাটানোর জন্য পরামর্শ দেওয়া হয়, তবে বুঝতে হবে রাষ্ট্রের সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তা কতটা প্রশ্নবিদ্ধ। সেক্ষেত্রে জনপ্রতিনিধিদের বাইরাথির ফর্মুলা অনুসরণের তো প্রশ্নই আসে না।

আমাদের জনপ্রতিনিধিদের কেউ কেউ অবশ্য বিনা নোটিশে ইদানীং বিভিন্ন কর্মস্থল পরিদর্শনে যাচ্ছেন। কিন্তু দীর্ঘ প্রায় দু’দশকের নৈরাজ্যের মাঝে বসবাসের যে সুখ, সেখানে প্রকৃত পরিচয়ে পরিদর্শনে গেলে কর্মীরা ঝটপট সব পরিপাটি করে ফেলবেন, তেমনটাই স্বাভাবিক। তাতে পরিদর্শনই হবে শুধু, পরিবর্তন হবে না। অপরদিকে হাতেনাতে একবার ধরা খেয়ে এক রাতেই আচরণ শুধরে যাবে, তেমনটি আশা করাও অনুচিত। যেমনটি ঘটছে ভ্রাম্যমাণ মোবাইল কোর্টের পরিদর্শনে। দোকানি জরিমানা দিচ্ছে তার ‘ভুলের’ জন্য; কিন্তু পরের সপ্তাহেই আবারও মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বিক্রি, দাম তিনগুণ, অথবা ভেজাল পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসে যাচ্ছে।

চার খলিফার নামে নিরাপত্তা বাহিনীর নামকরণ করলেও আমরা জানি না, চার খলিফার একজন হজরত উমর বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য কেমন যোগ্যতাসম্পন্ন বাজার পরিদর্শক নিয়োগ দিয়েছিলেন। তার নিয়োগকৃত মদিনার মার্কেট ইন্সপেক্টর আল শিফা বিনতে আবদুল্লাহ কিংবা মক্কার মার্কেট ইন্সপেক্টর সামারা বিনতে নুহায়েকের মতো আমাদের পরিদর্শকরা চাবুক নিয়ে না যেতে পারেন, অন্তত ছদ্মবেশ ধারণ করে যেতে পারেন প্রকৃত অবস্থা দেখার জন্য। আর মোবাইল কোর্ট পরিচালনার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তার যদি ছদ্মবেশে দোকান পরিদর্শনে যেতে আইনগত নিষেধাজ্ঞা থাকে, তবে সে আইনও সংশোধনের সময় এসেছে। কারণ উদ্দেশ্য কিন্তু পরিদর্শনে যাওয়ার সংখ্যা বাড়ানো নয়, উদ্দেশ্য হতে হবে অবস্থার উত্তরণ ঘটানো। সেজন্য ম্যাজিস্ট্রেটকে যদি ছদ্মবেশ নিয়ে ক্রেতা সাজতে হয়, তিনি তাই করবেন।

বাজারের বাইরেও নগরজীবনের বিড়ম্বনাগুলোর পরিধি কত ব্যাপক, সে সম্পর্কে বাস্তব ধারণা কি আদৌ আমাদের জনপ্রতিনিধিদের থাকে? পরিতাপের বিষয়, আমাদের জনপ্রতিনিধিদের কেউ সম্ভবত ভুল করেও ভাবেন না, ছদ্মবেশে একটু সাধারণ মানুষের ভোগান্তির জায়গাগুলো স্বচক্ষে চিহ্নিত করলে কেমন হয়? ভাঙা রাস্তায় রিকশার ঝাঁকি খেয়ে দীর্ঘ পথ পার হতে, কিংবা বর্ষায় চিরাচরিত সড়ক খনন কর্ম উপলক্ষে সুয়্যারেজের পাইপ ফেটে যা যা বের হয়ে দিনের পর দিন পথে বিছিয়ে থাকে, তার পাশ দিয়ে হেঁটে আসতে কেমন লাগে? কেমন লাগে বর্ষায় রাস্তায় জমে থাকা হাঁটু অবধি জলের ধারে দাঁড়িয়ে রিকশার জন্য অপেক্ষা করতে? বা নির্দিষ্ট সময়ের এক ঘণ্টা পরও ট্রেন ছাড়ার অপেক্ষায় ট্রেনে বসে থাকতে? কিংবা ভীষণ প্রতিকূল আবহাওয়ায় নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে উত্তাল ঢেউ পেরিয়ে চলা লঞ্চের উপচেপড়া যাত্রীদের একজন হতে? অথবা দুবাই থেকে ঢাকায় রওনা দেওয়া এমিরাটসের ইকোনমি ক্লাসে রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের পাশে বসে আসতে আসতে দেখা এয়ারলাইনসের স্টাফরা কতটা অসৌজন্যমূলক আচরণ করে আমাদের বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে?

আমাদের জনপ্রতিনিধিরা অনেক ব্যস্ত থাকেন। অবশ্য জনপ্রতিনিধি হলে ব্যস্ত থাকতেই হবে। তা না হলে হয় বয়স্কভাতা গ্রহণ বা এরকম কোনো কার্যক্রমের আওতায় থেকে নির্ঝঞ্ঝাট জীবনযাপন করতেন। প্রত্যেক দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী কিংবা প্রত্যেক নির্বাচনি এলাকার জনপ্রতিনিধি প্রত্যেক সপ্তাহে অন্তত একবার তার দপ্তরে/এলাকায় সেবাগ্রহীতার ছদ্মবেশে যাওয়াও তার ব্যস্ততার অংশ হওয়া উচিত নয় কি? অন্তত পরিবহন ক্ষেত্র ও বাজার ব্যবস্থার বেহাল অবস্থা খুব সহজেই ছদ্মবেশে শনাক্ত করা সম্ভব। এতে রাতারাতি আমাদের দুর্দশা হয়তো শেষ হবে না, কিন্তু লাগামহীন দুরবস্থার লাগাম কিছুটা অন্তত টেনে ধরা যাবে।

লেখক : সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষক, নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন