দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে রাষ্ট্রসীমা নিছক দুটি দেশের ভৌগোলিক বিভাজনরেখা নয়; এটি একাধিক মাত্রার এক জটিল প্রতিফলন, যেখানে মিশে আছে ক্ষমতার দ্বান্দ্বিকতা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা জটিলতা, জাতিগত পরিচয়ের প্রশ্ন, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও কূটনৈতিক মনস্তত্ত্ব। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে আধুনিক রাষ্ট্রতত্ত্বের একটি কেন্দ্রীয় ধারণা হলো—রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষার নামে যদি সাধারণ মানুষের ‘মানবিক নিরাপত্তা’ (Human Security) ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়, তাহলে সেই সীমান্ত শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় সহিংসতার একটি উৎপাদনক্ষেত্রে পরিণত হয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ব্যারি বুজান তার নিরাপত্তাতত্ত্বে দেখিয়েছেন, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা তখনই অর্থবহ ও টেকসই হয়, যখন তা নাগরিকের জীবন, অর্থনৈতিক অধিকার ও মানবিক মর্যাদা রক্ষা করতে সক্ষম হয়। কিন্তু বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের বাস্তব চিত্র এর সম্পূর্ণ বিপরীত। এখানে সীমান্ত রক্ষার নামে বহু বছর ধরে একটি ঘোষিত ‘shoot-to-kill’ (দেখামাত্র গুলি) সংস্কৃতি সক্রিয় রয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতিমালা, দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ও প্রতিবেশীসুলভ কূটনীতির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত বিশ্বের পঞ্চম দীর্ঘতম আন্তর্জাতিক স্থলসীমান্ত। প্রায় ৪ হাজার ১৫৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সীমান্ত ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা ও মিজোরাম রাজ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের ভৌগোলিক সংযোগ রচনা করেছে। ইতিহাসের গভীরে তাকালে দেখা যায়, এই সীমান্ত ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় লর্ড র্যাডক্লিফের বিতর্কিত বিভাজনরেখার (Radcliffe Line) উত্তরাধিকার বহন করছে। তৎকালীন ব্রিটিশ উপনিবেশবাদীরা স্থানীয় মানুষের সামাজিক সম্পর্ক, ভাষাগত ঐক্য, চাষাবাদের জমি ও অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে শুধু মানচিত্রে কিছু দাগ টেনে দিয়েছিল। ফলে রাতারাতি একই সংস্কৃতি, একই ভাষা ও একই পারিবারিক ঐতিহ্যের মানুষ দুটি ভিন্ন রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এই কৃত্রিম ও অসম্পূর্ণ বিভাজনের মূল্য সীমান্তের দুই পাড়ের মানুষকে আজও রক্ত দিয়ে পরিশোধ করতে হচ্ছে।
সম্প্রতি লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, ঝিনাইদহ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে একের পর এক বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনা সীমান্ত পরিস্থিতিকে আবার উত্তপ্ত করে তুলেছে। বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এবং অধিকারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত দুই দশকে বিএসএফের হাতে সহস্রাধিক বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছেন। শুধু ২০২৫ সালেই বিএসএফের গুলি ও নির্যাতনে কমপক্ষে ৩৪ বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন এবং ২০২৬ সালের চলতি মাসগুলোয়ও এই হত্যাকাণ্ডের ধারা অব্যাহত রয়েছে। ২০১১ সালের জানুয়ারিতে কুড়িগ্রাম সীমান্তে কিশোরী ফেলানী খাতুনের কাঁটাতারে ঝুলে থাকা মরদেহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তকে ‘বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী সীমান্ত’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW) তাদের ‘ট্রিগার হ্যাপি’ (Trigger Happy) শিরোনামের বিখ্যাত প্রতিবেদনে প্রমাণ করেছে কীভাবে বিএসএফ সীমান্ত এলাকায় বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে আসছে। এত বছর আন্তর্জাতিক সমালোচনার পরও এই নির্মম বাস্তবতার কোনো টেকসই পরিবর্তন ঘটেনি।
এখানে সবচেয়ে মৌলিক প্রশ্ন হলো-দ্বিপক্ষীয় স্তরে এত উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক বৈঠক এবং ‘অস্ত্রহীন সীমান্ত’ (Non-lethal border management) গড়ার প্রতিশ্রুতি থাকা সত্ত্বেও কেন এই হত্যাকাণ্ড বন্ধ হচ্ছে না? এর কারণ শুধু চোরাচালান রোধের মতো সাধারণ সীমান্ত অপরাধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর পেছনে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক আদর্শ ও আঞ্চলিক আধিপত্যবাদের গভীর প্রভাব ক্রিয়াশীল। ভারত দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ থেকে তথাকথিত ‘অবৈধ অনুপ্রবেশ’ ইস্যুটিকে নিজেদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির একটি বড় অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। বিশেষ করে, ভারতে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) রাজনৈতিক উত্থানের পর ‘জনমিতিক হুমকি’র (Demographic Threat) আখ্যানটি অত্যন্ত আক্রমণাত্মক রূপ নিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরার রাজ্য নির্বাচনগুলোয় বাংলাদেশি মুসলিম অভিবাসনকে কেন্দ্র করে মেরূকরণের রাজনীতি করা হয়। ফলে, এই সীমান্ত এখন ভারতের কাছে শুধু একটি ভৌগোলিক নিরাপত্তারেখা নয়, বরং তাদের অভ্যন্তরীণ জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকে টিকিয়ে রাখার এক গুরুত্বপূর্ণ আদর্শিক ও রাজনৈতিক প্রকল্পে রূপান্তরিত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও জাতিসংঘের নীতিমালা অনুযায়ী, সীমান্তে প্রাণঘাতী শক্তি (Lethal Force) প্রয়োগ শুধু আত্মরক্ষার একান্ত বাধ্যবাধকতা ছাড়া সম্পূর্ণ অবৈধ। জাতিসংঘের ‘আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তাদের দ্বারা বলপ্রয়োগ ও আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের মৌলিক নীতিমালা’ (Basic Principles on the Use of Force and Firearms by Lwa Enforcement Officials)-তে স্পষ্ট উল্লিখিত আছে যে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর যেকোনো অভিযানে বলপ্রয়োগ হতে হবে আনুপাতিক (Proportional) এবং প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার হবে একেবারে শেষ বিকল্প (Last Resort)। কিন্তু বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফের কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারা প্রায়ই সন্দেহভাজন নিরস্ত্র চোরাকারবারি বা অনুপ্রবেশকারীর ওপর সরাসরি গুলি চালায়। নিহতদের অধিকাংশের পিঠে বা বুকে গুলির ক্ষত পাওয়া যায়, যা প্রমাণ করে তারা আক্রমণকারী ছিল না-বরং পেছন থেকে কিংবা দূর থেকে তাদের নিশানা করা হয়েছে। এদের মধ্যে অনেকেই সীমান্তসংলগ্ন জমির নিরস্ত্র কৃষক, অসচেতন শিশু বা অসচ্ছল গরু ব্যবসায়ী। আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইনের তোয়াক্কা না করে এই নির্বিচার গুলিবর্ষণ স্পষ্টতই আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের (IHL) লঙ্ঘন।
ভারতের পক্ষ থেকে প্রায়ই যুক্তি দেওয়া হয় যে, সীমান্ত এলাকায় মাদক পাচার, গরু চোরাচালান, জাল টাকা ও অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধে তাদের কঠোর পদক্ষেপ নিতে হয়। কিন্তু বিশ্বরাজনীতির দিকে তাকালেই দেখা যায়, মেক্সিকো-যুক্তরাষ্ট্র সীমান্ত কিংবা ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাহ্যিক সীমান্তগুলোয় এর চেয়েও বৃহৎ আকারে অবৈধ অভিবাসন ও ড্রাগ কার্টেলের চোরাচালান ঘটে। তথাপি সেখানে সীমান্তরক্ষীরা প্রতিদিন নির্বিচার গুলি চালিয়ে মানুষ হত্যা করে না; তারা আধুনিক প্রযুক্তি, আইনি প্রক্রিয়া এবং আটকের নীতি অনুসরণ করে। বাংলাদেশ সীমান্তে ভারতের এই আচরণ এক ‘ঔপনিবেশিক মনস্তত্ত্ব’র (Colonial Mindset) প্রকাশ, যেখানে তারা একটি সার্বভৌম প্রতিবেশী রাষ্ট্রকে পারস্পরিক মর্যাদার চোখে না দেখে শুধু আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টিতে দেখতে চায়।
তাছাড়া, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় রাতের অন্ধকারে ভারত থেকে ‘পুশইন’ (Push-in) করার প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। সীমান্ত দিয়ে জোরপূর্বক রোহিঙ্গা কিংবা অনথিভুক্ত মানুষদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা আন্তর্জাতিক আইনের ‘নন-রিফুলমেন্ট’ (Push-in)-শরণার্থীদের জোর করে ফিরিয়ে না পাঠানোর নীতির পরিপন্থী। ইতালীয় রাজনৈতিক দার্শনিক জর্জো আগামবেন তার ‘নগ্ন জীবন’ (Bare Life) ধারণায় দেখিয়েছেন কীভাবে আধুনিক রাষ্ট্র কিছু প্রান্তিক মানুষকে আইনের সুরক্ষার বাইরে ঠেলে দেয়, যেখানে তাদের হত্যা করলেও তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হয় না। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের দরিদ্র জনগোষ্ঠী আজ ঠিক সেই আইনি শূন্যতার শিকার। এই সহিংসতা এখন শুধু বুলেটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি মনস্তাত্ত্বিক ও জৈবিক নিষ্ঠুরতার নতুন মাত্রা পাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে নদীভিত্তিক ও দুর্গম সীমান্তগুলোয় নিরাপত্তা জোরদারের নামে বিষধর সাপ বা কুমির অবমুক্ত করার মতো অমানবিক কৌশল নিয়ে বিএসএফের অভ্যন্তরীণ আলোচনার খবর গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। যদি কোনো রাষ্ট্র সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় প্রকৃতির হিংস্র প্রাণীকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে, তবে তা হবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও পরিবেশগত নীতিমালার পরিপন্থী এক ভয়ংকর ও আদিম নজির। এটি প্রমাণ করে যে, সীমান্তকে একটি মানবিক অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলার পরিবর্তে ‘শত্রু দমনক্ষেত্রে’ পরিণত করা হচ্ছে।
এই সীমান্ত সংকটের একটি বড় দিক হলো অর্থনৈতিক বৈষম্য। বাংলাদেশের লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, সাতক্ষীরা ও চুয়াডাঙ্গার মতো সীমান্তবর্তী জেলাগুলো দীর্ঘকাল ধরে অর্থনৈতিকভাবে অনগ্রসর এবং কর্মসংস্থানহীন। গবেষণায় দেখা গেছে, সীমান্ত অঞ্চলের একটি বড় অংশ জীবন ও জীবিকার তাগিদে বাধ্য হয়ে অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য বা চোরাচালান সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদন ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্ত এলাকায় বৈধ ‘বর্ডার হাট’র (Border Haat) সংখ্যা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় আনুষ্ঠানিক বাণিজ্যের সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে প্রাণঝুঁকিপূর্ণ চোরাচালান অনেকাংশে কমে আসবে। অর্থাৎ, সীমান্ত সমস্যার প্রকৃত সমাধান শুধু কাঁটাতারের বেড়া বা সামরিকীকরণের (Militariæation) মধ্যে নিহিত নয়, বরং সীমান্তের দুই পাড়ের মানুষের জন্য টেকসই অর্থনৈতিক বিকল্প তৈরি করাতেই তা নিহিত।
বাংলাদেশ সরকার অতীতে বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে সীমান্ত হত্যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং বিএসএফও বহুবার ‘শূন্য মৃত্যু’র (Zero Casualty) প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কোনো জোরালো ও কার্যকর কূটনৈতিক চাপ তৈরি করা সম্ভব হয়নি। রুটিনমাফিক প্রতিবাদলিপি কিংবা বিজিবি-বিএসএফের পতাকা বৈঠক (Flag Meeting) সাময়িক শান্তি সমাবেশ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি কোনো সমাধান আনতে পারেনি। এখন বাংলাদেশের কূটনৈতিক কৌশলে বহুমাত্রিকতা আনার সময় এসেছে। এই দ্বিপক্ষীয় সমস্যাকে আন্তর্জাতিকীকরণের দিকে নিয়ে যেতে হবে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিল (UNHRC), ইউনিভার্সাল পিরিয়ডিক রিভিউ (UPR) এবং আন্তর্জাতিক আদালতের কাছে সীমান্তের এই মানবাধিকার লঙ্ঘনের সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ ও পরিসংখ্যান ধারাবাহিকভাবে উপস্থাপন করতে হবে।
একই সঙ্গে বাংলাদেশকে নিজস্ব অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থারও আত্মসমালোচনা করতে হবে। সীমান্ত চোরাচালানের পেছনে স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক গোষ্ঠী, সীমান্তরক্ষী বাহিনীর একাংশ এবং দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসনিক সিন্ডিকেটের সম্পৃক্ততা দীর্ঘদিনের একটি প্রকাশ্য রহস্য। সীমান্তে যারা বিএসএফের বুলেটের শিকার হয়, তারা মূলত এই সিন্ডিকেটের সবচেয়ে নিচের স্তরের দরিদ্র ‘বাহক’ মাত্র; কিন্তু মূল হোতারা সবসময় আইনের ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে। তাই অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি ও সীমান্ত অপরাধের সিন্ডিকেট ভাঙা বাংলাদেশের নিজের নিরাপত্তার জন্যই জরুরি।
বর্তমান সময়ে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে এক বড় ধরনের রূপান্তর ঘটছে। তিস্তা মহাপরিকল্পনায় চীনের সম্পৃক্ততার প্রস্তাব এবং ঢাকা-বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ঘনিষ্ঠতা নয়াদিল্লিকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ‘ক্ষমতার ভারসাম্য’ (Balance of Power) তত্ত্ব অনুযায়ী, বাংলাদেশের মতো উদীয়মান রাষ্ট্রগুলো তাদের অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বড় শক্তিগুলোর মধ্যকার প্রতিযোগিতাকে নিজেদের কৌশলগত সুবিধায় ব্যবহার করার চেষ্টা করে। বাংলাদেশ বর্তমানে ভারত ও চীনের মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখতে চায়। কিন্তু সীমান্তে ভারতের এই ধারাবাহিক নিষ্ঠুরতা বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে তীব্র ভারতবিরোধী জনমত তৈরি করছে। ভারত যদি বাংলাদেশকে তার দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত মিত্র হিসেবে দেখতে চায়, তবে এই সীমান্ত নীতি তাদের জন্যই আত্মঘাতী। কারণ ভয় ও রক্তের ভিত্তিতে কোনো টেকসই আঞ্চলিক সহযোগিতা কিংবা দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে না।
রাজনৈতিক দার্শনিক হান্না আরেন্ট তার বিখ্যাত উপলব্ধিতে বলেছিলেন, ‘Violence can destroy power; it can never create legitimacy.’ অর্থাৎ সহিংসতা ক্ষমতাকে ধ্বংস করতে পারে; কিন্তু তা কখনো বৈধতা তৈরি করতে পারে না। সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে এবং গুলি চালিয়ে সাময়িক আধিপত্য বা ভৌগোলিক নিয়ন্ত্রণ হয়তো বজায় রাখা যায়, কিন্তু তা কোনো অঞ্চলের মানুষের মনে আস্থা বা বন্ধুত্বের ভিত্তি গড়ে তুলতে পারে না। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে টেকসই শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার একমাত্র পথ হলো-সীমান্তকে ‘সামরিকায়নের’ দৃষ্টিতে না দেখে ‘মানবিক নিরাপত্তার’ দৃষ্টিতে দেখা। এর জন্য প্রয়োজন দুই দেশের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং সীমান্ত হত্যাকাণ্ডের আন্তর্জাতিক ও যৌথ জবাবদিহি নিশ্চিত করা। অন্যথা, কাঁটাতারের দীর্ঘ ছায়ার নিচে এই নৃশংসতার ইতিহাস শুধু দীর্ঘায়িত হতে থাকবে এবং সীমান্তবর্তী মানুষের জীবন থেকে রাষ্ট্র ও সার্বভৌমত্বের নামে মর্যাদা চিরতরে হারিয়ে যাবে।
লেখক: রাজনীতি বিশ্লেষক, সাবেক অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


