মিয়ানমার নীতিতে ভারতের ভুল কৌশল

নেইন চ্যান আয়ে

মিয়ানমার নীতিতে ভারতের ভুল কৌশল
ছবি: সংগৃহীত

মিয়ানমারের নতুন ‘প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইং যখন তার প্রথম সরকারি বিদেশ সফরে ৩০ মে ভারতে পৌঁছান, তখন ছবি তোলার সুযোগটি ঠিক তেমনটিই ছিল, যেমনটি তিনি চেয়েছিলেন। যে ব্যক্তি অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল, নির্বাচিত নেতাদের কারারুদ্ধ ও দেশব্যাপী বিদ্রোহ দমন করেছিলেন এবং মিয়ানমারকে আগের চেয়েও গভীর গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েছিলেন, তাকে নয়াদিল্লিতে একজন বিচ্ছিন্ন জেনারেল হিসেবে নয়, বরং একজন সম্মানিত প্রেসিডেন্ট হিসেবেই গ্রহণ করা হয়েছিল। বছরের পর বছর ধরে চলা রক্তপাত ও কূটনৈতিক প্রত্যাখ্যানের পর বৈধতার সন্ধানে থাকা একজন শাসকের জন্য ৩ জুন শেষ হওয়া পাঁচ দিনের সফরটি একটি মূল্যবান উপহারের চেয়ে কম কিছু ছিল না।

তবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্য হিসাবটা ছিল ভিন্ন। ১ হাজার ৬৪৩ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তবিশিষ্ট প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মণিপুর ও মিজোরামের জন্য দীর্ঘদিন ধরেই অস্থিতিশীলতার একটি উৎস। একই সঙ্গে এটি একটি কৌশলগত ক্ষেত্র, যেখানে চীন বছরের পর বছর ধরে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছে ও নানা অবকাঠামো গড়ে তুলেছে।

বিজ্ঞাপন

সমস্যাটি এই নয় যে ভারত মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছে এবং ভৌগোলিক অবস্থানই তাকে তা করতে বাধ্য করেছে। বরং সমস্যাটি হলো, মোদি সরকার এমন একজন ব্যক্তির ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব দিচ্ছে, যিনি নয়াদিল্লিতে এসে চুক্তি স্বাক্ষর করতে পারলেও সেই চুক্তি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ভূখণ্ড দিল্লিকে এনে দিতে পারবেন না।

মিন অং হ্লাইংয়ের এই সফর দ্বিপক্ষীয় কূটনীতির সেই পরিচিত ভাষাই তুলে ধরেছে, যাতে আছে বন্ধুত্ব, ভূখণ্ডের অখণ্ডতা, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং কালাদান মাল্টি-মোডাল ট্রানজিট ট্রান্সপোর্ট প্রকল্প ও ত্রিমুখী মহাসড়কের মাধ্যমে সংযোগের প্রতিশ্রুতি। কাগজে-কলমে এটি একটি বাস্তবসম্মত কর্মসূচি। কিন্তু বাস্তবে এর বেশির ভাগই বিদ্রোহী-নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের মধ্য দিয়ে গেছে, যা সামরিক জান্তার নিয়ন্ত্রণে নেই।

এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো মিয়ানমারে ভারতের কালাদান প্রকল্প। এ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের রাজধানী কলকাতাকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের সিত্তওয়ে বন্দরের সঙ্গে সংযুক্ত করা, কালাদান নদীপথে চীন রাজ্যের পালেটওয়া পর্যন্ত পণ্য পরিবহন এবং উত্তর-পূর্ব রাজ্য মিজোরামের সঙ্গে সড়কপথে সংযোগ স্থাপন করা। দিল্লির এই উদ্দেশ্য সাধনে পরিকল্পিত এই পথটি ভারতের ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতির একটি ভিত্তিপ্রস্তর। এর লক্ষ্য হলো ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অস্থিতিশীল রাজ্যগুলোর স্বাধীনতাকামী সংগঠনগুলোর সশস্ত্র তৎপরতা হ্রাস করা এবং বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে যাতায়াত এড়িয়ে যাওয়া।

কিন্তু সেই কৌশলগত পথটি মিয়ানমারের নতুন করে আঁকা পশ্চিম মানচিত্রের মাঝখান দিয়ে গেছে। বিদ্রোহী আরাকান আর্মি এখন রাখাইন রাজ্যের বেশির ভাগ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে। একইভাবে প্রতিবেশী চীন রাজ্যের পালেটওয়া ও এর আশপাশের এলাকাও আর জান্তা সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেই। চীন রাজ্যের বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর একটি মিশ্র জোট বর্তমানে ভারতের সীমান্ত বরাবর গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো দখল করে রেখেছে। রাখাইনের রাজধানী সিত্তওয়ে বন্দর হিসেবে এখনো গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কিন্তু এর চারপাশের রাস্তা, নদী এবং সীমান্ত এলাকা সামরিক জান্তার নিয়ন্ত্রণে নেই। মোদি কালাদান প্রকল্প শেষ করার জন্য চাপ দিতে পারেন এবং মিন অং হ্লাইংও সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিতে পারেন, কিন্তু প্রস্তাবিত এই পথের নিচের ভূমির নিয়ন্ত্রণ দুজনের কারো হাতে নেই। মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোই এই পথ নিয়ন্ত্রণ করে।

একই সঙ্গে, নয়াদিল্লি চায় সামরিক জান্তা যেন ভারতীয় স্বার্থ রক্ষা করে। কিন্তু ভূখণ্ড ‘সুরক্ষিত’ করার জন্য জান্তার পদক্ষেপগুলো হচ্ছে বিমান ও কামান হামলা, বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ এবং পোড়ামাটি নীতি অনুসরণ। কিন্তু এটি ভারতের সীমান্তকে স্থিতিশীল করে না, করবেও না। বরং এটি মিয়ানমারের শরণার্থীদের মিজোরাম ও মণিপুরে যেতে বাধ্য করে, সীমান্ত অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষোভ আরো বাড়িয়ে দেয় এবং ভারতকে একটি লোভী সামরিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বেঁধে ফেলে, যা এ সংকটের মূল কারণ।

ভারত আগেও এ ধরনের পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে। ১৯৪৯ সালে যখন বিদ্রোহের মুখে তৎকালীন বার্মার ইউ নু-এর স্বাধীনতা-পরবর্তী সরকার পতনের দ্বারপ্রান্তে ছিল, তখন জওহরলাল নেহরু রেঙ্গুনের কেন্দ্রীয় সরকারকে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা প্রদান করেছিলেন। কিন্তু ২০২৬ আর ১৯৪৯ সাল এক নয়। ইউ নু ছিলেন একজন ভঙ্গুর বেসামরিক নেতা, যিনি সদ্য গঠিত একটি উপনিবেশ-পরবর্তী রাষ্ট্রকে একত্র রাখার চেষ্টা করছিলেন।

কিন্তু মিয়ানমারের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য দায়ী হলেন মিন অং হ্লাইং। তিনি অং সান সু চির নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে সামরিক অভ্যুত্থান-পূর্ববর্তী রাজনৈতিক ব্যবস্থা ধ্বংস করেছেন এবং এখন প্রতিবেশীদের কাছে অনুরোধ করছেন, যেন তারা তাকেই একমাত্র ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করে, যিনি এটি ঠিক করতে পারেন।

মিন অং হ্লাইংয়ের ভারত সফর ছিল রাষ্ট্রকৌশলের ছদ্মবেশে তার একটি মরিয়া পদক্ষেপ। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য তিনি মিয়ানমারের সব সম্পদ এমন যে কারো কাছে নিলামে তুলছেন যে তাকে জীবনরক্ষাকারী সহায়তা দিতে ইচ্ছুক। তিনি চীনের কাছে কিয়াউকফিউ সমুদ্রবন্দর এবং বিতর্কিত মিতসোন বাঁধ, রাশিয়ার কাছে দাওয়েই গভীর সমুদ্রবন্দর এবং ভারতের কাছে সীমান্ত নিরাপত্তা, কালাদান এমনকি দুর্লভ খনিজসম্পদ উত্তোলনের চুক্তি তুলে ধরছেন।

কিন্তু যখন তিনি মোদিকে আশ্বাস দেন যে, মিয়ানমারের ভূখণ্ড ভারতের নিরাপত্তা স্বার্থের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হবে না, তখন তিনি এমন একটি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, যা তার সামরিক বাহিনী রক্ষা করতে পারবে না। তিনি কাগজে-কলমে প্রবেশের সুযোগ দিতে পারেন, কিন্তু তা বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা দিতে পারেন না। ভারতে এই সফর তাকে চীনের সর্বব্যাপী প্রভাব থেকেও মুক্ত করবে না।

বেইজিং বোঝে যে, মিয়ানমারে ভারতের স্বার্থ অছে, কিন্তু রাখাইনে গুরুত্বপূর্ণ খনিজসম্পদে বা সীমান্ত ব্যবহারের মাধ্যমে নয়াদিল্লি যদি সুবিধা অর্জন করে, তবে বেইজিং তা কড়া নজরে রাখবে। ভারত যদি শুধু নেপিডোর মাধ্যমে কালাদান সুরক্ষিত করার চেষ্টা করে, তবে তা ব্যর্থ হবে। ভারত যদি আরাকান আর্মির ওপর প্রভাব বিস্তার করে, তবে বেইজিং পাল্টা চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে এর জবাব দিতে পারে। বক্তৃতায় ভারত ও চীনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টি কার্যকর শোনালেও বাস্তবে তা সামরিক জান্তার কোনো সমস্যারই সমাধান করে না।

ভারত এখন চীনের মিয়ানমার নীতির সবচেয়ে খারাপ যে দিকটির পুনরাবৃত্তির ঝুঁকিতে রয়েছে, তা হলো, কেন্দ্রীয় সামরিক কর্তৃপক্ষকে দেশের বৈধ সার্বভৌম শক্তি হিসেবে গণ্য করা। বেইজিং মিয়ানমারে বিপুল বিনিয়োগ করেছে, কিন্তু তারপরও সম্পদেও সুরক্ষা ও সুযোগের জন্য তাকে এখনো জাতিগত সশস্ত্র সংগঠন এবং প্রতিরোধ বাহিনীর সঙ্গে আলোচনা করতে হয়।

চীনের ভুলের পুনরাবৃত্তি করা ভারতের উচিত নয়। ভারতের আছে যুক্তরাষ্ট্রীয় গণতন্ত্রের অভিজ্ঞতা, যা চীন দিতে পারে না। মিয়ানমারের সামরিক জান্তাবিরোধী শক্তি, জাতিগত সংগঠন এবং নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলো যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা এবং একটি ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমাধান নিয়ে সক্রিয়ভাবে আলোচনা করছে। ভারত সেই আলোচনাকে গণতান্ত্রিক বিশ্বাসযোগ্যতা দিয়ে সমর্থন করতে পারে। কিন্তু ভারত তা করবে কি না¬—সেটিই বড় প্রশ্ন।

মিন অং হ্লাইংয়ের ভারত সফরের বাহ্যিক দিকটি একটি ক্ষতিকর বার্তা দিয়েছে। এটি মিয়ানমারের জনগণকে বলছে, ভারতের গণতান্ত্রিক ভাষা সীমান্তে এসে থেমে যায়। এটি মিয়ানমারের জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে বলছে, নয়াদিল্লি এখনো তাদের নিজের অবকাঠামোর পথে বাধা হিসেবেই দেখে, কোনো রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নয়, যারা ভারতের জন্য প্রয়োজনীয় পথগুলো নিয়ন্ত্রণ করে। ভারত সফর মিন অং হ্লাইংকে অভ্যন্তরীণ প্রচারণার সুযোগ এনে দিয়েছে, কিন্তু এর বিনিময়ে তিনি ভারতকে সামান্যই আশ্বাস দিয়েছেন। ভৌগোলিক কারণে জান্তা সরকারের সঙ্গে ভারতের কথা বলা উচিত। কিন্তু পাশাপাশি আরাকান আর্মি, চীন বিদ্রোহী গোষ্ঠী, সামরিক জান্তাবিরোধী জাতীয় ঐক্য সরকার এবং সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠীর সঙ্গেও বাস্তবসম্মত সম্পৃক্ততা গভীর করতে হবে দিল্লিকে।

দেশের সর্বত্র না হলেও বেসামরিক সুরক্ষা, সীমান্ত পারাপারে সহায়তা এবং সীমান্তের কাছাকাছি এলাকায় বিমান হামলা বন্ধে জান্তাকে ভারতের চাপ দেওয়া উচিত। প্রস্তাবিত পথের পাশে বসবাসকারী মানুষদের লাশের ওপর দিয়ে কোনো সংযোগ প্রকল্প নির্মাণ করা যায় না বা করা উচিত নয়। কিন্তু মোদির হিসাব হলো, মিন অং হ্লাইংকে চুক্তিতে সম্পৃক্ত করলে ভারতের নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থ সুরক্ষিত হবে। অন্যদিকে, মিন অং হ্লাইংয়ের হিসাব হলো, মিয়ানমারে গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারির প্রহসনমূলক নির্বাচনের পর মোদির এই অভ্যর্থনা তার বৈধতা ও স্বীকৃতির দাবিকে আরো জোরালো করবে। কিন্তু উভয় হিসাবই ত্রুটিপূর্ণ এবং তা ত্রুটিপূর্ণই থাকবে, যতক্ষণ না মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী দেশের বেশির ভাগ এলাকা নিয়ন্ত্রণকারী বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে ন্যায়সংগত সমাধানের আলোচনায় বসবে।

এশিয়া টাইমস অবলম্বনে মোতালেব জামালী

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন