বৈষম্য নিরসন ও সামাজিক নিরাপত্তা বিধানে জাকাত

মোহাম্মদ-আইয়ুব-মিয়া
ড. মোহাম্মদ আইয়ুব মিয়া

বৈষম্য নিরসন ও সামাজিক নিরাপত্তা বিধানে জাকাত

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘোষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়, ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হচ্ছে।’ স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সংবিধানে সব নাগরিকের জন্য সমান সুযোগ, মানুষে মানুষে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসাম্য বিলোপ, নাগরিকদের মধ্যে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। এসব ঘোষণার মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি শোষণ ও বৈষম্যমুক্ত রাষ্ট্র হিসেবে গড়া তোলার বিষয়ে জনগণের অভিপ্রায় ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, ৫৪ বছরে বহু কিছুর উন্নতি ও পরিবর্তন ঘটলেও শোষণ এবং বৈষম্যের মাত্রা বহুগুণে বেড়ে গেছে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে বহু চেষ্টা করে দারিদ্র্যের হার কমিয়ে আনা সম্ভব হলেও এখনো প্রায় দুই কোটি মানুষ দরিদ্র এবং হতদরিদ্র অবস্থায় জীবন কাটাচ্ছে। এর প্রধান কারণ জনগণের সম্পদ বণ্টনে ন্যায্যতা নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে সমাজের কিছু লোকের হাতে সম্পদের সিংহভাগ পুঞ্জীভূত হয়েছে এবং অন্যদিকে, লাখ লাখ মানুষ মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে।

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী দেশের বিত্তবান ১০ শতাংশ মানুষ ৫৮ দশমিক ৫ শতাংশ সম্পদের মালিক। এ বৈষম্য রাতারাতি হয়নি। বিগত ৫৩ বছরে ক্রমপুঞ্জীভূত হয়ে বর্তমান আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ভয়াবহ দুর্নীতির কারণে বৈষম্যের মাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিজ্ঞাপন

যেসব কারণে বৈষম্য বৃদ্ধি পায়, সেগুলোর প্রতিকারের জন্য কার্যকর কর্মসূচির অভাব থাকলেও সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী কর্মসূচির আওতায় দেশে দীর্ঘদিন থেকে বিভিন্ন প্রকল্প চালু রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে—ভিজিডি, ভিজিএফ, কর্মসংস্থান প্রকল্প, ওএমএস, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, ত্রাণ ও পুনর্বাসন প্রকল্প, শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি ইত্যাদি। প্রতিবছরই বাজেটে এসব ভাতার পরিমাণ কিছুটা হলেও বৃদ্ধি করা হয়। বর্তমানে ৬১ লাখ ব্যক্তি বয়স্ক ভাতা (প্রতি মাসে ৬৫০ টাকা), ২৯ লাখ মহিলা বিধবা ভাতা (প্রতি মাসে ৬৫০ টাকা হারে), ৩৪ দশমিক ৫০ লাখ ব্যক্তি প্রতিবন্ধী ভাতা (প্রতি মাসে ৯০০ টাকা), ১৭ লাখ মা ও শিশু বেনিফিট (প্রতি মাসে ৮৫০ টাকা) পাচ্ছে।

সরকার ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচির জন্য বরাদ্দ দিয়েছিল ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা। সাধারণভাবে বলা হয়ে থাকে, সরকার এ খাতে মোট জিডিপির ২ থেকে ২ দশমিক ৫০ শতাংশ ব্যয় বরাদ্দ দিয়ে থাকে।

প্রকৃতপক্ষে এখানে শুভঙ্করের ফাঁক রয়েছে। সরকার সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী কর্মসূচির জন্য বরাদ্দের মধ্যে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীদের পেনশন, সঞ্চয় হিসাবের সুদ ও বিভিন্ন ধরনের সাবসিডিকে অন্তর্ভুক্ত করে থাকে।

সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী কর্মসূচির জন্য বরাদ্দের পরিমাণ এতটাই কম যে, তা দিয়ে ন্যূনতম চাহিদা পূরণ, এমনকি শুধু খাবারের ব্যবস্থা করাও সম্ভব হয় না। আবার যতটুকু দেওয়া হয়, তা যে সবসময় নিয়মিত পাওয়া যায়, তাও নয়।

সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী কর্মসূচির জন্য বরাদ্দের পরিমাণ বৃদ্ধির কথা বিবেচনা করতে গেলেই সরকারকে অন্য খাতের বরাদ্দ কমাতে হয়; কারণ দেশের রাজস্ব আয়ের পরিমাণ তেমন সন্তোষজনক নয়। এখানেই আমরা সরকারকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করতে পারি। সেটি হচ্ছে—ইসলামি সামাজিক অর্থায়নকে রাজস্বের একটি উৎস হিসেবে গ্রহণ করা। বিশেষ করে, নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা যেতে পারে—

ক. ২০২২ সালের এক সমীক্ষা অনুযায়ী বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম সমাজ থেকে প্রতিবছর কমপক্ষে ১.০০ (এক) লাখ কোটি টাকা জাকাত সংগ্রহ করা যেতে পারে। এ সংখ্যাটি সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী কর্মসূচির জন্য সরকারি বরাদ্দের সমান বা আরো বেশি। সরকার বাধ্যতামূলকভাবে জাকাত সংগ্রহের জন্য আইনপ্রণয়ন করতে পারে। মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া জাকাত এবং ইসলামি সামাজিক অর্থায়নে যে সফলতা লাভ করেছে, তা থেকে শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে। এই কর্মসূচির জন্য বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধির জন্য জাকাত তহবিল কাজে লাগানো যেতে পারে। জাকাতের মতো একটি সুপ্ত রাজস্ব খাতকে সক্রিয় করার জন্য সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন।

খ. সামাজিক কল্যাণ কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য সরকার বেসরকারি ও ব্যক্তিপর্যায়ের উদ্যোগকে উৎসাহিত করার জন্য ওয়াকফ এবং হেবা আইনকে সহজীকরণ করতে পারে। সরকারের এমন আইন ও নীতি প্রণয়ন করা উচিত, যাতে সমাজের বিত্তশালী ব্যক্তিরা মানবকল্যাণমূলক কাজে বেশি উৎসাহিত হয়। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় জাকাত, ওয়াকফ, সদকা প্রভৃতি ইসলামি সামাজিক অর্থায়নের সব ইনস্ট্রুমেন্ট সমন্বিতভাবে ব্যবহার করা হলে সমাজে এর ইতিবাচক ফল বয়ে আনবেই।

গ. আমাদের সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রধান শিকার হচ্ছেন নারীরা। উত্তরাধিকার সম্পদ বণ্টনে ন্যায্যতা নিশ্চিতকরণে আইন সংশোধন, বিশেষ করে মেয়েরা যাতে মা-বাবার সম্পত্তির অংশ ঠিকমতো পেতে পারেন, তা নিশ্চিত করা। এছাড়া মেয়েরা যাতে বিয়ের মোহরানা ঠিকমতো পান, তা আইনের দ্বারা নিশ্চিত করা হলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।

ঘ. বেকার যুবক ও যুব মহিলাদের আত্মকর্মসংস্থানের জন্য সুদমুক্ত ঋণ চালু করা যেতে পারে।

ঙ. কর সংগ্রহে দুর্নীতি দূর করা গেলে রাজস্ব ব্যবস্থাপনার উন্নতি ঘটবে। একই সঙ্গে যেসব করদাতা সমাজকল্যাণমূলক কাজে জাকাত ও অনুদান দিতে আগ্রহী তাদের জবাবদিহির সঙ্গে কর অব্যাহতি দেওয়ার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

চ. সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা, কারিগরি দক্ষতা অর্জন এবং নৈতিক শিক্ষা উন্নয়নের লক্ষ্যে শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কার করতে হবে। এর ফলে শিক্ষায় বৈষম্য হ্রাস পাবে।

ছ. শ্রমিকদের মজুরি ন্যায্যতার ভিত্তিতে নির্ধারণের জন্য শিল্প-মালিক, শ্রমিক ও সরকারের সমন্বয়ে নীতিনির্ধারণ করতে হবে।

ঝ. কৃষিকাজে নিয়োজিত শ্রমশক্তি যাতে ন্যায্য মজুরি ও পণ্যের ন্যায্য দাম পায়, সেজন্য বাজার ব্যবস্থায় নৈতিক ও কাঠামোগত সংস্কার করতে হবে। কৃষকদের বিনাসুদে ঋণ দিতে হবে।

ঞ. সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী কর্মসূচি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সঠিকভাবে সুবিধাভোগী নির্বাচন ও ব্যবস্থাপনা সেবায় অধিকতর স্বচ্ছতা এবং দক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সমাজনীতি পুরোপুরি বাজারভিত্তিক নয়; আবার এখানে সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে ইউরোপীয় কল্যাণ রাষ্ট্রের কিছু উপাদান অনুসরণের চেষ্টা করা হয়। এছাড়া এখানে তথাকথিত উন্নয়ন অর্থনীতির স্লোগানও দেওয়া হয়ে থাকে। উন্নয়ন অর্থনীতির প্রবক্তরা বলে থাকেন, পাশ্চাত্যের পুঁজিবাদী দেশগুলোর অনুসরণে দরিদ্র দেশগুলোর রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও আইনগত কাঠামোর সংস্কার করা না হলে উন্নয়ন সম্ভব নয়। বিশ্বব্যাংকের বিশেষজ্ঞদের মধ্যে এ ধারণাটি বেশ প্রবল। বাস্তবে বৈশ্বিক ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পুঁজিবাদী ও সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি একটি ন্যায্য এবং সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হয়েছে। এমনকি এর বিকল্প হিসেবে যে কল্যাণরাষ্ট্র ও উন্নয়ন অর্থনীতির কথা বলা হয়, এরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশের জন্য কী ধরনের অর্থনৈতিক বা উন্নয়ন কৌশল অনুসরণ করা দরকার, সেটিই প্রধান বিবেচ্য বিষয়।

বাংলাদেশের অর্থনীতি ও উন্নয়ন কৌশল যেহেতু বাজার অর্থনীতির ওপর চলছে, সেহেতু সেখানেও নৈতিক প্রশ্নটি উপেক্ষিত রয়ে গেছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, নৈতিকতার সংজ্ঞা কী? আরনল্ড টয়েনবি ও ডুরান্টের মতে, ‘ধর্মের সাহায্য ব্যতিরেকে কোনো সমাজ উচ্চ নৈতিক মান বজায় রেখেছে, ইতিহাসে এর কোনো উদাহরণ নেই।’ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট লিন্ডন জনসন প্রশাসনের অ্যাটর্নি জেনারেল রামজে ক্লার্ক যথার্থই বলেছেন, ‘ইসলামই হচ্ছে বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মনোযোগ আকর্ষণকারী আধ্যাত্মিক ও নৈতিক শক্তি।’

ওপরের আলোচনা থেকে এটি স্পষ্ট হয়েছে, কোনো অর্থনীতিতে নৈতিকতার বিষয়টি উপেক্ষিত হলে সেখানে ইনসাফ ও বৈষম্যমুক্ত সমাজ কায়েম করা যায় না। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এ সত্যটি দারুণভাবে প্রযোজ্য। সুতরাং বৈষম্য নিরসন ও দুর্নীতিকে প্রতিরোধ করতে হলে সমগ্র জনগোষ্ঠীর নৈতিকতার উন্নয়ন ঘটাতে হবে। নৈতিকতাসম্পন্ন রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব, তথা রাজনীতিবিদ, বিচারক, প্রশাসক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৈরি করা গেলে দুর্নীতি দূর করা সহজ হয়ে যাবে। আর ধর্মীয় নৈতিকতার বিষয়টি সমুন্নত রেখে জাকাত তথা ইসলামি সামাজিক অর্থায়নকে সরকারি রাজস্বের অন্যতম উৎস হিসেবে কাজে লাগানো এখন সময়ের দাবি।

লেখক : বাংলাদেশ সরকারের সাবেক সচিব ও বর্তমানে সিইও, সেন্টার ফর জাকাত ম্যানেজমেন্ট (সিজেডএম)

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন