আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন এখন ভারতের গলার ফাঁস

মকবুল শাহ

কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন এখন ভারতের গলার ফাঁস

কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বা স্ট্র্যাটেজিক অটোনমি হচ্ছে কোনো বহিরাগত চাপ বা সামরিক জোটের বাধ্যবাধকতা মেনে চলা ছাড়াই স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ এবং প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ব্যবহার করা। এটি জোটনিরপেক্ষ নীতি থেকে উদ্ভূত এবং বর্তমানে মাল্টি-অ্যালাইনমেন্ট বা বহুপক্ষীয় সম্পর্কের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে চলার একটি কৌশল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বাধীন দুটি জোটের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারের লড়াই শুরু হলে মধ্যমপর্যায়ের কিছু দেশের নেতৃত্বে গড়ে উঠে জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন বা নন-অ্যালাইন মুভমেন্ট (ন্যাম)।

এই সংগঠনের লক্ষ্য ছিল কোনো জোটেই না গিয়ে নিরপেক্ষ অবস্থান বা নিজেদের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখা। এটি ছিল বিদেশি চাপ মোকাবিলা করার একটি কৌশল। ভারত এই জোটের সদস্য হিসেবে দীর্ঘদিন এই নীতি অনুসরণ করে এসেছে। যেমনÑযুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা, রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি এবং চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে দিল্লি। কিন্তু বর্তমানে বিশ্বে যখন দ্রুত মেরূকরণ ঘটছে, তখন ভারসাম্য রক্ষা করা বা এটি বজায় রেখে চলা ক্রমেইই কঠিন হয়ে পড়ছে এবং অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক ড়্গেত্রে ব্যয়ের পাল্লা দিন দিন ভারী করে তুলছে।

বিজ্ঞাপন

ভারতের দীর্ঘদিনের লালিত কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের মতবাদ ঔপনিবেশিক শাসন-পরবর্তী সময়ে দেশটির স্বাধীনতার প্রতীক ছিল। কিন্তু এখনো তা নানাভাবে সংকুচিত হচ্ছে। বিভিন্ন ড়্গেত্রে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনকে ছাড় দিয়ে নমনীয়তার পরিচয় দিতে হচ্ছে ক্রমাগত। একসময় কৌশলের জন্য জায়গা সংরক্ষণ করতে যা তৈরি করা হয়েছিল, তা এখন অর্থনৈতিক, সামরিক এবং কূটনৈতিকভাবে ভারতের ব্যয়ের পাল্লা ভারী করে দিচ্ছে ক্রমাগত। কিন্তু এই নমনীয়তার বিনিময়ে সামঞ্জস্যপূর্ণ সুযোগ তৈরি হচ্ছে না ভারতের সামনে। দ্রুত মেরূকরণের দিকে এগিয়ে যাওয়া বিশ্বে এই ভারসাম্যহীনতা পরিস্থিতিকে ক্রমেই কঠিন করে তুলছে ভারতের জন্য।

স্নায়ুযুদ্ধের সময়ে কোনো জোটে না গিয়ে ভারতকে নিরপেক্ষ অবস্থানে রাখতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর সময়ে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের এই ধারণা গ্রহণ করা হয়েছিল। এর লক্ষ্য ছিল উভয় জোটের কাছ থেকে উন্নয়নমূলক সহায়তা লাভ করা। সে সময়ের প্রেক্ষাপটে এটি ছিল একটি বাস্তববাদী প্রচেষ্টা। কিন্তু পরে এটিকে ‘বহু-জোটবদ্ধতা’ হিসেবে পুনঃনামকরণ করা হয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেÑযুক্তরাষ্ট্র ও তার অংশীদারদের সঙ্গে ভারতের প্রতিরক্ষা এবং প্রযুক্তিগত সম্পর্ক গভীর করা, রাশিয়ার সঙ্গে উত্তরাধিকার সূত্রে সামরিক ও জ্বালানি সম্পর্ক এবং চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা।

বিশ্ব বর্তমানে তত্ত্বগতভাবে এক মেরু থেকে ক্রমেই বহু মেরুর বিশ্ব ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাওয়ার ফলে ভারতেরও উচিত ছিল তার বিকল্পগুলো সর্বাধিক করা। কিন্তু বাস্তবে, ভারতের কৌশলটি তার সামঞ্জস্য হারিয়ে ফেলেছে। রাশিয়ার ওপর আরোপিত পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা না মেনে পশ্চিমাদের এই পদক্ষেপের সমর্থন দিতে স্পষ্টই অস্বীকৃতি জানিয়ে ভারত রাশিয়া থেকে ছাড়মূল্যে জ্বালানি আমদানির সুযোগ কাজে লাগিয়েছে। এর ফলে ভারতকে ওয়াশিংটনের দিক থেকে বাড়তি নজরদারি এবং কঠোর শুল্ক চাপের মুখোমুখি হতে হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য এবং নিরাপত্তা সম্পর্কে মারাত্মক বিরূপ প্রভাব ফেলছে।

একই সময় চীনের সঙ্গে বারবার সীমান্ত সংঘাত সত্ত্বেও দেশটির সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যিক সম্পর্ক অব্যাহত রয়েছে। ইলেকট্রনিকস পণ্য, ওষুধ এবং পুনঃনবায়নযোগ্য জ্বালানির মতো গুরুত্বপূর্ণ ড়্গেত্রে চীনের ওপর ভারতের কাঠামোগত নির্ভরতা কাটিয়ে ওঠা সহজ নয়। এই পরিস্থিতি ভারতের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ঘাটতিকে জোরদার করেছে এবং বর্তমানে তা ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে।

এর ফলে ভারতের ব্যয় এবং লাভের মধ্যে ব্যবধান বাড়ছে। রাশিয়া দীর্ঘদিন থেকেই ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহকারী দেশ এবং এই সম্পর্ক এখনো টিকে আছে। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়া নিজেই তার সরবরাহ এবং রক্ষণাবেক্ষণ শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। রাশিয়ার এই সীমাবদ্ধতা ভারতের সশস্ত্র বাহিনীর ওপর অপারেশনাল এবং আর্থিক বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র এবং তার অংশীদারদের সঙ্গে দিল্লির গভীর সহযোগিতার সম্পর্ক তৈরি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু মিত্র দেশ হিসেবে তাদের প্রযুক্তি ড়্গেত্রে ভারতের প্রবেশাধিকার এখনো সীমিত। যদিও ভারত নিজেকে পশ্চিমাদের একটি অপরিহার্য অংশীদার হিসেবে নিজেকে তুলে ধরে, কিন্তু পশ্চিমারা ভারতকে নিজেদের দেওয়া শর্তসাপেক্ষ অংশীদার হিসেবে ভারতকে বিবেচনা করে। ভারত ও পশ্চিমাদের মধ্যে বর্তমান অর্থনৈতিক সম্পর্কই এই কৌশলগত অসামঞ্জস্যকে প্রতিফলিত করে। অন্যদিকে, সীমান্ত নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনা দ্বন্দ্ব সত্ত্বেও চীনা মধ্যবর্তী পণ্যের ওপর ভারত তার নির্ভরতা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। ফলে ভারতে চীনের এসব পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি সব সময় থেকেই যাচ্ছে।

বর্তমানে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখায় চীন ও ভারত তাদের সেনাবাহিনীকে কিছুটা হলেও সংযত রাখায় তাৎক্ষণিক সংঘাত হ্রাস পেয়েছে। তবে ভারত এই সুবিধার অন্তর্নিহিত ভারসাম্যে কোনো পরিবর্তন করতে পারেনি বা বিরোধপূর্ণ এলাকায় চীনের অবকাঠামো নির্মাণ বন্ধ করতে পারস্পরিক সমঝোতায় আসতে পারেনি। ফলে সীমান্তের এই সাময়িক স্থিতিশীলতা ভারতের জন্য লাভজনক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে না।

কূটনৈতিকভাবে, ভারতের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন তার মিত্রদের তুষ্ট করতে পারছে না। ফলে ভারত বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করেছে। প্রধান বৈশ্বিক সংঘাতগুলোর ক্ষেত্রে ভারতের সতর্ক অবস্থান দেশটির পশ্চিমা অংশীদারদের সমালোচনার মুখে পড়েছে। সংগত কারণেই ভারত মিত্রদের কাছ থেকে বাজারে প্রবেশাধিকার, নিষেধাজ্ঞা থেকে অব্যাহতি বা প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অর্থপূর্ণ ছাড় পেতে ব্যর্থ হয়েছে।

বহুপক্ষীয় বা আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে ভারতের কণ্ঠস্বর জোরদার থাকলেও এগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভারতের জন্য বস্তুগত লাভে রূপান্তরিত হয় না। এখানে ঝুঁকি হলোÑকৌশলগত স্বায়ত্তশাসন ভারতের জন্য উৎপাদনশীল একটি হাতিয়ার হিসেবে এখন আর কাজ করছে না। তবে, স্বায়ত্তশাসন নিজেই মূল সমস্যা নয়, বরং এখানে মূল সমস্যা হচ্ছে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করার ঘাটতি। নমনীয়তা শুধু তখনই সুবিধা তৈরি করে, যখন এটি বিশ্বাসযোগ্য বিকল্পগুলো দ্বারা সমর্থিত হয়।

বর্তমানে, ভারতের সামনে থাকা বিকল্পগুলো দীর্ঘদিনের পরনির্ভরতা এবং অমীমাংসিত দুর্বলতা দ্বারা সীমাবদ্ধ। দেশটির অর্থনৈতিক সক্ষমতা এখনো দরকষাকষির ক্ষমতায় এবং কৌশলগত অংশীদারত্বগুলো প্রয়োগযোগ্য প্রতিশ্রুতিতে রূপান্তরিত হয়নি। কোনো কিছু নতুন করে সাজানো বা পছন্দের ক্রমানুসারে তালিকা তৈরির জন্য আনুষ্ঠানিক জোটের প্রয়োজন হয় না, বরং বাস্তবে এটি তীক্ষ্ণ পছন্দ নির্ধারণ করা একটি বিষয়। ভারতকে তার প্রতিরক্ষার স্থানীয়করণকে অবশ্যই বাগাড়ম্বরের বাইরে রাখতে হবে, একক-সরবরাহকারীর ওপর নির্ভরতার ঝুঁকি হ্রাস করতে হবে। বাণিজ্য বৈচিত্র্যকে শুধু অর্থনৈতিক নয়, একটি কৌশলগত বাধ্যবাধকতা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

যুক্তরাষ্ট্র, জাপান এবং ইউরোপের সঙ্গে ভারতের অংশীদারত্বকে সদিচ্ছার উপজাত হিসেবে ধরে না নিয়ে প্রযুক্তিগত প্রবেশাধিকার এবং সরবরাহ-শৃঙ্খলের স্থিতিস্থাপকতার জন্য স্পষ্টভাবে ব্যবহার করা উচিত। অন্যদিকে, রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক দুই দেশের মধ্যকার পুরোনো সম্পর্কের সেন্টিমেন্টের মধ্যে সীমিত রাখার পরিবর্তে স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত সীমার মধ্যে পরিচালনা করা উচিত।

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কঠোর পরিবেশে অস্পষ্টতাকে নানাভাবে মূল্য দিতে হয়। ভারতের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন কখনোই নিজের লক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত হয়নি, বরং এটি ছিল সুবিধা লাভের মাধ্যমে সার্বভৌমত্ব সুরক্ষিত রাখার একটি উপায় বা পন্থা। কিন্তু যখন এই পন্থাগুলো শেষকেও ক্ষয় করতে শুরু করে, তখন এর সংশোধন অনিবার্য হয়ে ওঠে। ভারত যদি তা বুঝতে ব্যর্থ হয়, তাহলে দেশকে মূল্য দিতে হবে। কারণ স্বায়ত্তশাসনের অপপ্রয়োগ ভারতের জন্য আর ঢাল হিসেবে কাজ করছে না, বরং বড় ধরনের দায় বা গলার ফাঁস হয়ে উঠছে, যা শেষ পর্যন্ত বহন করা দেশের পক্ষে সম্ভব হবে না।

এশিয়া টাইমস থেকে ভাষান্তর : মোতালেব জামালী

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন