আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

বাংলার নির্বাচন ঐতিহ্য

ড. আহমদ আনিসুর রহমান

বাংলার নির্বাচন ঐতিহ্য

যা ভাবে বাংলা আজ, বিশ্ব ভাবে ‘আগামীকাল’। ১৯০৫ সনে যখন প্রথম পূর্ববঙ্গ আর আসামকে এক করে আজকের বাংলাদেশের সীমানা নির্ধারণমূলক প্রথম পদক্ষেপ নিয়ে বাংলার নিপীড়িত কৃষকদের মুক্তির প্রথম পদক্ষেপ নেওয়া হয়, সে সনেই ভারতীয় কংগ্রেসের সভায় মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর রাজনৈতিক গুরু গোপালকৃষ্ণ গোখলের বলা একটি বাক্যকে সামান্য একটু সম্পাদনাপূর্বক আমাদের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য জুতসই করে নিয়ে উদ্ধৃত করে ওরকম বলা এখানে। প্রায় সোয়া শতাব্দী পরের আজকের প্রেক্ষিতেও তা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।

বাংলার নির্বাচিত সরকারের প্রাচীন ঐতিহ্য

বিজ্ঞাপন

নির্বাচিত সরকারের ধারণা এসেছে পাশ্চাত্যে ৭৫০ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশে নির্বাচিত রাজা গোপালের সরকার প্রতিষ্ঠার অনেক শতাব্দীর পর।

এই অনন্য ঘটনার আগে শত খানেক বছর ধরে বাংলাদেশে চলে আসছিল এমন এক অরাজকতার অবস্থা, যাকে ‘মাৎস্যন্যায়’ বলা হয়। ৫৯০ খ্রিষ্টাব্দে মূলত ও প্রধানত অনার্য শ্যাম-বংশীয়, সে সময় প্রধানত প্রায় সর্বাংশেই বৌদ্ধ ‘বঙ্গ’ তথা বাঙালি জাতির নিবাস বঙ্গের পশ্চিম প্রান্তের গৌড় এলাকা দখল করে শশাঙ্ক দেব নাম নিয়ে ‘রাজা’ সেজে বসা আর্য ইয়াফেস-বংশীয়, মগধী অর্থাৎ বিহারি আর্যাবর্তীয় সামন্ত, বঙ্গের প্রতিবেশী সমতট ও কামরূপ তথা ‘আসাম’সহ আজকের বাংলাদেশের সবটাই দখল করে এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। তার সহায়তার জন্য সে আর্যাবর্ত থেকে বুদ্ধি দিয়ে দিকনির্দেশনা দেওয়া ব্রাহ্মণদের আমদানি করে। স্থানীয় বৌদ্ধ জনগণ ও বুদ্ধের অহিংসার বাণী প্রচার করে প্রজন্ম-প্রজন্মান্তরে তাদের হিংসার প্রতিরোধে দরকার হলে সহিংস প্রতিরোধে অসমর্থ করে তোলা বৌদ্ধ পণ্ডিতদের নৃশংসভাবে নিধন ও দমন করে। অনার্য শ্যামল সংস্কৃতি ও সভ্যতার মূলমন্ত্র—বুদ্ধিচর্চাজাত প্রজ্ঞার আলোকে সাম্য, মৈত্রী ও জন্মভিত্তিক বর্ণবৈষম্যগত হিংসা ও সহিংস দমন-দলনের প্রতিপক্ষে বুদ্ধের শেখানো মূল্যবোধ ‘সর্বে সত্তা সুখী হন্তু’ (‘সকল সত্তা সুখী হোক’), শিক্ষা দানকারী শিক্ষাকেন্দ্র ‘মঠ’ করে একের পর এক।

‘মঠ’ শব্দটি সম্ভবত শাম-বংশীয় অনার্যদের আরব্যোপদ্বীপের প্রাচীন ভাষা, প্রাচীন আরব্য ভাষার শব্দ ‘মহত্ত’ থেকে উদ্ভূত—অর্থ, কোনো বিশেষ উদ্দেশ্যে সীমা দিয়ে ঘিরে দিয়ে আলাদা করে উৎসর্গিত নির্দিষ্ট এলাকা। আজও আরবে পেট্রল পাম্পের জন্য নির্দিষ্ট জায়গাকে ‘মহত্ত’ বলে—যেমন একইভাবে আলাদা করে নির্দিষ্ট করে দেওয়া এলাকাকেও ‘মহত্ত’ বলে। সম্ভবত কালে ‘জম্বুদ্বীপ’ উপদ্বীপ, যাকে অনেক পরে কখনো কখনো ভারতবর্ষ বা উপমহাদেশও বলা হয়, সেখানে চলে এসে বসত করা শ্যামল অনার্যদের উচ্চারণাভ্যাসের স্থানীয় বিবর্তনে ‘ত’-‘থ’, ‘ট’-‘ঠ’-তে রূপান্তরিত হয় প্রায়ই। এখনো মূলত অনার্য দ্রাবিড় ভাষার দক্ষিণ ভারতীয় বিবর্তিত রূপসমূহে ‘ত’, ‘থ’, ‘ট’, ‘ঠ’, এমনকি ‘দ’ ও ‘ধ’-ও প্রায়ই পারস্পরিক বিকল্প হিসেবে উচ্চারিত আর লিখিত হয়। এভাবেই সম্ভবত অনার্য শ্যামল সংস্কৃতি ও সভ্যতার মূলমন্ত্র—বুদ্ধিচর্চাজাত প্রজ্ঞার আলোকে সাম্য, মৈত্রী ও জন্মভিত্তিক বর্ণবৈষম্যগত হিংসা ও সহিংস দমন-দলনের প্রতিপক্ষে শেখানো মূল্যবোধ ‘সর্বে সত্তা সুখী হন্তু’ (‘সকল সত্তা সুখী হোক’), শিক্ষাদানকারী জ্ঞানপণ্ডিতদের সাধনা ও শিক্ষাকেন্দ্র ‘মঠ’ নামে পরিচিত হয়। অনার্যবিদ্বেষে অনার্য বঙ্গ জাতির বঙ্গদেশ দখলদারি আধিপত্যবাদী আর্যাবর্তীয়, নিজেকে আর্য ‘শশাঙ্ক দেব’—‘চন্দ্র-দেবতা’ বলে জনগণের উপাসনা দাবি করা দখলদার ওই মগধী বা বিহারি ব্রাহ্মণ্যবাদী সামন্ত যে এই মূল্যবোধ শিক্ষাদানকেন্দ্র ধ্বংসে বিশেষভাবে আগ্রহী হবে, তা বোঝাই যায়। তার এই চরম বিদ্বেষের প্রকাশ ঘটে—যে বোধিবৃক্ষের নিচে বসে সাধনার মাধ্যমে তার শেখানো শিক্ষার উৎস বোধিলাভ করেন, সেই বোধিবৃক্ষটিও কেটে ফেলে। প্রাণহীন একটি বৃক্ষের প্রতিও এমন বিদ্বেষ!

এমন বিদ্বেষপ্রসূত যে সমাজ-মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া এসব কর্মকাণ্ডে সূচিত হয়, তাতেই সারা বাংলাদেশ শত বছরের অরাজকতা-সূচক এমন ‘মাৎস্যন্যায়’-এ নিমজ্জিত হয়, যাতে অতিষ্ঠ হয়ে আর্যাবর্তীয় আধিপত্যবাদী আর্য উচ্চবর্ণ অত্যাচারী স্বৈরাচারী শাসকশ্রেণিকে উৎখাত ও ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত করে নিজেদেরই ‘গোপাল’ বলে পরিচিত একজন রাখালকে শ্রেণি-বর্ণের বিচার না করে তার প্রজ্ঞা ও চরিত্র বিচারে নির্বাচিত করে নিজেদের শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

‘গোপাল’-এর ‘গো’

তার কী গুণ ছিল, যার জন্য তার ওপর জনগণের এমন অগাধ আস্থা? তিনি ছিলেন ‘গোপাল’। ‘গোপাল’ বলতে আজকাল ‘গো’ মানে ‘গরু’র ‘পাল’ বা ‘দল’ মনে করে কেউ কেউ মনে করে ওই গোপাল এক দল গরুর রাখাল ছিলেন তিনি—বা তিনি এক পাল গরুর মালিক হয়ে থাকবেন—এই আশা করে তার জন্মলগ্নে নাম রাখা হয়েছিল গোপাল। পুরো বঙ্গ জাতির নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য একজন রাখালই যদি জনগণ বা তাদের নেতৃস্থানীয়রা চেয়ে থাকতেন, তাহলে গরুর রাখাল তো আরো লাখে লাখে ছিল—তাদের অন্য যেকোনো এক রাখালও হতে পারত। আর যে জাতির প্রায় সকলেই রাখাল ছিলেন, অতি সাম্প্রতিক কাল পর্যন্তও—সেখানে গরুর রাখাল হওয়ার কারণে কাউকে শাসক হিসেবে বেছে নেওয়ার কোনো কারণ হওয়ার কথা নয়। আর যদি তারা কাউকে অন্য কোনো কারণে পুরো জাতির নেতৃত্বের জন্য বেছে নেন আর তিনি ঘটনাচক্রে দেশের আর প্রায় সকলের মতোই গরুর রাখাল হয়ে থাকেন, তাহলেও তাকে তো আর সেই প্রেক্ষিতে ‘গরুর রাখাল’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বিশেষায়িত করার কোনো কারণ থাকতে পারে না। বিশেষায়িত করতে হলে তা করার কথা তার এমন কোনো পরিচয় দিয়ে, যাতে অন্য সকলের থেকে তাকে আলাদা করে দেখানো যায়—দেশের আর সকলেরই মতো ‘গরুর রাখাল’ হওয়ার মতো সাধারণ একটি কিছু দিয়ে নয়। তাই ‘মাৎস্যন্যায়’-সম অরাজকতা থেকে উদ্ধারকারী জনগণের বেছে নেওয়া মহান নেতাকে ‘গরুর রাখাল’ অর্থে ‘গোপাল’ বলা হয়, তা ঠিক মনে হয় না।

বরং ‘গো’ শব্দটি ছিল সম্ভবত প্রাচীন সেমিটিক ভাষার ‘ক্বো’, যা সব ভাষার মতোই তার উৎস ওই ভাষারও আদি উৎস; মধ্যপ্রাচ্যের অনেক জায়গার লোকের উচ্চারণ অভ্যাসে কিঞ্চিৎ পরিবর্তিত হয়ে হয়ে পড়ে ‘গ্ব’ও, এবং তারপর ‘গো’। এ ‘গো’-এর মূল ‘ক্বো’ ছিল সম্ভবত ‘কোম’-এর সংক্ষেপিত রূপ ‘কো’; ওইভাবে উচ্চারণ অভ্যাসে ‘গো’ হয়ে যায়। ওই ‘ক্ব’-এরও মূল সম্ভবত ছিল ‘কোম’ বা ‘কৌম’, যা সংক্ষেপিত হয়ে ‘কৌ’, ‘কো’, এবং অবশেষে ‘গো’। এভাবেই সম্ভবত ‘গো’ হয়ে পড়ে। মূলত ও প্রধানত সেমিটিক অনার্য বাঙালির ভাষা বাংলার আদি ভাষারূপ ওই প্রাচীন সেমিটিক তথা ‘নবতীয়’ বা ‘প্রাচীন আরব্য ভাষা’র ‘গো’-এর মূল ওই ভাষার ‘কোম’ বা ‘কৌ’-এর অর্থ ছিল ‘জাতি’। ওই একই প্রাচীন অনার্য সেমিটিক ‘নবতী’ বা প্রাচীন ‘আরব্য’ ভাষার আধুনিক রূপ আরবিসহ তার অন্যান্য বিবর্তিত রূপ ও তাদের দ্বারা প্রভাবিত আর্য-অনার্য অনেক ভাষায়ই আজও কওম অর্থ ‘জাতি’-ই রয়ে গেছে। খোদ বাংলাতেও আজও ‘জাতি’র একটি প্রতিশব্দ হিসেবে ‘কওম’-ও ব্যবহৃত হয়। বিশেষ করে জগতের সমগ্র বাঙালি জনসাধারণের বিশালতর গরিষ্ঠ অংশ পূর্ববঙ্গ ও আসামের বাঙালিদের ভেতর, পশ্চিমবঙ্গেরও অনেক এলাকার সংখ্যাগরিষ্ঠদের মাঝেও। বহু পরে মধ্য এশিয়া থেকে অনার্য উত্তর ভারতে এসে সেখান থেকে বাঙালিসহ পরে ভারতবর্ষ বলে ডাকা উপমহাদেশের প্রাচীনতর বিভিন্ন জাতিসত্তার আদিপুরুষ, সেমিটিক অনার্য দ্রাবিড়দের পূর্বে আজকের বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দিকে ঠেলে দেওয়া আর্যেরা নিজস্ব ‘আর্যাবর্ত’ অর্থাৎ ‘আর্য-দেশ’ বানিয়ে সেখান থেকে নিজস্ব সাম্রাজ্য বিস্তারের এক পর্যায়ে তাদের ভাষায় ‘গো’ বলতে যে ‘গরু’ বোঝায়, সে অর্থেও শব্দটিকে বাংলায় প্রচলিত করে। অন্তত বঙ্গে এসে আর্য উপনিবেশ প্রতিষ্ঠাকারী আর্য ব্রাহ্মণ ও তাদের অনুসারী ক্ষুদ্রতর সংখ্যালঘিষ্ঠের ভেতর। সে অর্থে ‘গো’ এসেছে উত্তর-ভারতীয় আর্য ভাষা থেকে, তার মূল ‘গাভ’ বা ‘গাভী’ থেকে—পশ্চিমে আজকে ইরান বলে ডাকা পারস্যের উত্তরাংশে একইভাবে উপনিবেশ স্থাপনকারী মধ্য এশীয় আর্যদের ভাষা ‘পারসি’ বা ‘ফারসিতে’ যেমন আজও গরু বোঝাতে ‘গাভ’ বা ‘গাও’ বলা হয়, আর সুদূর ইউরোপের বিলাতে প্রচলিত আর্য ভাষা ‘ইংরেজি’তে ওই গরু বলতে ওই একই ‘গাও’কে ‘কাও’, তথা ‘cow’ বলে। প্রাচীন বাংলার ওই জননির্বাচিত শাসকের পরিচয়মূলক নাম বা উপাধি ‘গোপালের’ ‘গো’ এই বহু পরে আর্য ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের প্রচলিত করা গরু অর্থের ‘গো’ থেকে তা আধুনিক কালে আর্য ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসক আর তাদের পালিত দেশীয় ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের ‘পাণ্ডিত্য’-পূর্ণ দেখানো প্রচারণাতে তেমনটি চালিয়ে দেওয়ার বিদেশি সরকার আনুকূল্যধন্য প্রচেষ্টা সত্ত্বেও। এই ‘কওম’ থেকে ‘কৌ’ হয়ে ‘কো’ থেকে হওয়া ‘গো’ থেকেই সম্ভবত আবার ‘গোত্র’ শব্দেরও উৎপত্তি হয়, কওম বা তার সংক্ষেপিত রূপ ‘কো’-এর সঙ্গে অনার্য প্রাচীন আরব্য ভাষার ‘ত্রহ’ বা ‘ত্রঃ’ অর্থাৎ ‘মতো’-এর যোগ হয়ে—‘জাতির মতো’ অর্থাৎ ‘জাতির মতো জনগোষ্ঠী’ এই অর্থ নিয়ে।

মূলত ও প্রধানত সেমিটিক অনার্য বাঙালির নিজেদের অনার্য আদি ভাষামূল প্রাচীন আরব্য ভাষার কওম থেকেই খুব সম্ভবত উদ্ভূত ‘জাতি’ অর্থজ্ঞাপক ‘গো’-এর সঙ্গে বাংলার ওই একই প্রাচীন ভাষামূল আরব্য ভাষার আরেক শব্দ ‘কূ’-এর সঙ্গে একীভূত হয়ে বাঙালির গোপালের ওই ‘গো’ আরো তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে পড়ে। এই ‘কূ’ ক-এ দীর্ঘ ঊ দিয়ে, স্বর-উ দিয়ে, ‘কু’ নয়। বাংলার অনার্য সেমিটিক প্রাচীন আরব্য শব্দমূলে তার অর্থ ‘রক্ষা’। উদাহরণস্বরূপ, কোরান-কেতাবে বলা হয়েছে, ‘কূ আনফুসিকুম ওয়া আহলিকুম নারা’, অর্থ—‘নিজেদের আর তোমাদের পরিবারদের আগুন থেকে ‘কূ’—মানে, ‘রক্ষা’ করো।’

এসব মিলিয়ে মূলত ও প্রধানত সেমিটিক অনার্য দ্রাবিড় বাঙালির নিজস্ব প্রাচীন ভাষামূলমতে ‘গো’-এর অর্থ দাঁড়ায়—‘জাতি ও গোত্র রক্ষা’।

‘গোপাল’-এর ‘পাল’

‘পাল’ সম্ভবত বাংলার প্রাচীন উৎস আরব্য ভাষার ‘ফায়ল’, সংক্ষেপিত রূপে ‘ফা’ল’ অর্থাৎ ‘কারক’ থেকে এসেছে। প্রাচীন ভাষামূলে যা ছিল ‘ফ’, তা কালে ওই ভাষার ভাষাভাষীদের উচ্চারণ অভ্যাসের ক্রমবিবর্তনে অনেক জনগোষ্ঠী ও ভাষা-বিবর্তনে উদ্ভূত তাদের ভাষায় কখনো কখনো ‘প’ বলে উচ্চারিত হতে শুরু করে। উদাহরণস্বরূপ, প্রাচীন আরব্য থেকে উদ্ভূত হিব্রুতে ‘ফ’ অনেক সময়ই ‘প’ বলে উচ্চারিত হয়। পারসি, তুর্কি, মালয় ও ইন্দোনেশীয় ভাষায়ও তেমনই অনেক সময়ই ‘প’ বলে উচ্চারিত হয়; উদাহরণস্বরূপ খোদ ফারসি ভাষায় ভাষাটির নামটিই উচ্চারিত হয় অনেক সময় ‘পারসি’ রূপে।

এই ধারাতেই বাংলার প্রাচীন অনার্য সেমিটিক ভাষামূল আরব্য ভাষার ‘ফা’ল’, বাংলা ভাষার বিবর্তনের একপর্যায়ে পালি ভাষায় রূপান্তরিত ‘পা’ল’ বা ‘পাল’-এ রূপান্তরিত হয়। অনার্য সেমিটিক গোপালের মূলত ও প্রধানত অনার্য সেমিটিক বাঙালি জাতির জননির্বাচিত শাসক হিসেবে নির্বাচনের সময় বাঙালিরা প্রায় সর্বাংশেই ছিলেন অনার্য সেমিটিক শাক্যমুনি সিদ্ধার্থ গৌতম বা ‘গো-তম’ বুদ্ধের অনুসরণে বৌদ্ধ। আর বৌদ্ধ ধর্ম ও সে সময়ের জনগণের প্রচলিত ভাষা পালিতেই জননির্বাচিত শাসকের নাম বা উপাধি ‘গো’-‘ফাল’ শব্দটিকে পালির ধারায়ই ‘গো’-‘ফাল’ রূপে উচ্চারিত হয়। ওপরের বিশ্লেষণের আলোকে এই ‘গো’-‘ফাল’-এর অর্থ হবে—‘জাতি ও গোত্র-রক্ষক’।

বঙ্গ জাতির সকল গোত্রই তাদের যার যার গোত্রপ্রধানের মাধ্যমে যে একজন গোত্রপ্রধানকে বঙ্গ জাতি ও তার সকল গোত্রকে—মাৎস্যন্যায়ের ভয়ংকর অবস্থা, সে অবস্থায় তাদের নিজেদের পারস্পরিক সংঘাত, নিজেদের উচ্চবর্ণ করে দাঁড় করানো জাতি ও শ্রেণি-নিপীড়নমূলক বিদেশি উত্তর-ভারতীয় আর্য আগ্রাসন ও দেশের ভেতরে থেকে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত সেই বহিরাগত আর্য ‘উচ্চবর্ণ’ ঔপনিবেশিক বসতকারীদের ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষার জন্য—গোত্রপ্রধান সকলের ঐকমত্যে নির্বাচিত করেন, তাকে যে তারা তাদের নিজেদের ‘জাতি ও গোত্র-রক্ষক’ হিসেবে দেখে, ওই অর্থে ‘গো-পাল’, বা ‘গোপাল’ বলে আখ্যায়িত করে থাকবেন, তাই স্বাভাবিক। এরকম একজন মহান সর্বজনপ্রিয় জননেতা গোত্রপ্রধানকে ‘গরু-রাখাল’ মাত্র হিসেবে দেখে সেরকম অর্থে তাকে ‘গোপাল’ বলে ডাকার চেয়ে।

দেড় হাজার বছর পূর্বে, সপ্তম শতাব্দীতে, জাতি হিসেবে বাঙালির রাজনৈতিক ঐতিহ্যে নির্বাচন এবং নির্বাচনের পদ্ধতি ও নির্বাচনযোগ্যতার মাপকাঠির ঐতিহ্য নির্ধারিত হয় বঙ্গ জাতির নিজেদের শাসক হিসেবে তাদের সকল গোত্রপ্রধানদের পারস্পরিক পরামর্শভিত্তিক ঐকমত্যে গোপালের নির্বাচনের মাধ্যমে। দুনিয়ার প্রায় অন্য কোথাওই জননির্বাচিত জাতীয় সরকারের কোনো ধারণারই উন্মেষের বহু আগে।

অনার্য সেমিটিক ঐতিহ্য

এই ধারণাটি মাত্র ২০ বছর আগে অনার্য শ্যামল সেমিটিক বঙ্গ জাতির আদি নিবাস আরব উপদ্বীপে তাদেরই পূর্বপুরুষ সাম বা শ্যামের সন্তান, অনার্য সামি বা শ্যামল বা সেমিটিক মহাজাতির অন্য এক শাখা আরবদের ভেতর মদিনায় ‘খেলাফত’ নামক শাসন ব্যবস্থার সূচনায় হজরত আবু বকর নামে খ্যাত হয়ে পড়া আবদুল্লাহ বিন উসমান (রা.)-এর অনেকটা একই রূপ জননির্বাচনে শাসক হিসেবে বরণের ভেতর দিয়ে। ঘটনাচক্রে ‘আবু বকর’ শব্দ সমন্বয়ের অর্থও মূলত এক ধরনের ‘পাল’—সাধারণত মনে করা হয় ‘উষ্ট্র-পাল’। ‘আবু’ শব্দের বিবিধ সম্ভাব্য অর্থের একটি হলো ‘পালক’ বা ‘পালনকর্তা’, আর এই মূলার্থ থেকেই ‘আবু’-এর একটি অর্থ হয় ‘আব্বা’ বা ‘বাবা’ বা ‘পিতা’—কেননা বাবা সন্তান পালন করেন। আর ‘বকর’-এর এক অর্থ ‘বাচ্চা উট’, আর সেই সুবাদেই কেউ কেউ মনে করেন তিনি খুব ধনী ছিলেন; আর আরবদের কাছে উটের মালিকানা ছিল ধনাঢ্যতার প্রতীক, তাই তাকে ‘আবু বকর’ বলা হতো। এই ‘আবু বকর’-কে ‘উট-রাখাল’ মনে করা সম্ভবত ‘গোপাল’-কে ‘গরু-রাখাল’ মনে করার মতোই হলো একটি সরল ভুল। ‘বকর’-এর ‘বাচ্চা উট’ হয়ে ওঠে ‘বকর’ শব্দের মূল অর্থ, ‘ভোর’ থেকে এসেছিল। ‘বাচ্চা’ তথা ‘শিশু’-এর শৈশবকাল যেহেতু জীবনের ‘ভোর’, সেহেতু ‘বকর’ বলতে ‘বাচ্চা’—উটের বাচ্চাও—বোঝাতে শুরু করে। সেকালে মেয়েরা শৈশব পেরিয়ে ‘বালিকা’ হতেই বিবাহিত হয়ে কৌমার্য হারাত, সেহেতু বাচ্চা মেয়ে বলতে কুমারী মেয়ে বোঝাত; আর সেখান থেকেই নারীজীবনের ‘ভোর’-রূপ ‘কুমারী’কেও আরব্য ভাষায় ‘বিকর’ বা ‘বকর’ বলে। এজন্য ‘আবু বকর’-এর অর্থ হলো ভোর (‘বকর’) বা ‘সূচনা’-এর অধিপতি (‘আবু’) বা অগ্রণী। তার যৌবন থেকেই তিনি তার অগ্রজপ্রতিম বন্ধু হজরত মোহাম্মদ (সা.)-এর সঙ্গে ও অনুকরণে সব মঙ্গলময় বিশ্বাস ও কর্মেই ছিলেন নেতৃত্ব, অগ্রণী—তাই তাকে ‘আবু বকর’ বলা হয় সম্ভবত।

হজরত মোহাম্মদের (সা.) উদ্যোগ ও নেতৃত্বে মঙ্গলময় বিশ্বাসের ভিত্তিতে মঙ্গলময় শাসনব্যবস্থার প্রতিষ্ঠার মহাসংগ্রামের মহাযাত্রা ‘হিজরতেও’ হজরত আবু বকর (রা.) ছিলেন তার অনুগমন, অনুসরণ ও সহায়তায় ভোরের মতো প্রথম, নেতৃত্বশীল ও অগ্রণী। হজরত মোহাম্মদ (সা.)-এর তিরোধানের পর তাঁরই নির্দেশে তৎপরবর্তী শাসনব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা আর সূচনালগ্নে তাঁর স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতেও এই আবু বকর (রা.)-ই আবার ভোরের মতোই আলোক প্রসারণকারী নেতৃত্বদানকারী অগ্রণীর ভূমিকা পালন করে জননির্বাচিত শাসকের নেতৃত্বে ‘খেলাফত’ বলে পরিচিত হয়ে পড়া শাসনব্যবস্থার সূচনা ও রক্ষার জন্য সফল সংগ্রাম করেন। তিনি নিজে এই শাসনব্যবস্থায় নেতৃত্ব নিতে চাননি—তিনি সেই জননির্বাচিত শাসনব্যবস্থার ধারণা দিলেও তার নেতৃত্বের জন্য নবীজির নিজের বেহেশতবাসী হিসেবে ঘোষণা করা দশজনের ভেতর জ্যেষ্ঠদের ভেতর থেকে দুজন—ওমর বিন খাত্তাব (রা.) আর উবায়দুল্লাহ বিন আল-জাররাহ (রা.)-এর নাম প্রস্তাব করেন। কিন্তু জনগণ সকলেই খোদ আবু বকরকেই তাদের প্রধানদের মাধ্যমে নির্বাচিত করে তার ওপর সেই দায়িত্ব চাপিয়ে দেন।

হজরত মোহাম্মদ (সা.)-এর পার্থিব জীবদ্দশায়ই তাঁর শিক্ষার প্রতিনিধিত্বকারী কিছু সঙ্গী বাংলায় আসতে শুরু করেন—প্রথমে তাঁর (সা.) মামা হজরত আবু ওয়াক্কাস (রা.)-এর নেতৃত্বে। তাই মদিনা শরিফে হজরত মোহাম্মদের (সা.) মনোনয়নের ভিত্তিতে জনগণের স্বীকৃত প্রধানদের মাধ্যমে নিজেদের শাসক নির্বাচনের যে শাসনব্যবস্থা সূচিত হয়, তার খবর বাংলায় এসে থেকে থাকবে। অনার্য সেমিটিক দ্রাবিড়, সে সময়ের বৌদ্ধপ্রধান বাংলায় নৃশংস বৌদ্ধ নিধনকারী আর্য ভারতীয় ব্রাহ্মণ-প্রাধান্য প্রয়োগকারী বর্ণপ্রথার প্রতিষ্ঠা ও রক্ষাকারী ঔপনিবেশিক শাসনের নিপীড়নে ততদিনে অরাজকতাময় মাৎস্যন্যায়ে নিমজ্জিত বাংলার জনগোষ্ঠী-প্রধানরা তাঁদেরই জ্ঞাতিভাই অনার্য সেমিটিক আরবদের মদিনা শরিফে সূচিত শান্তি প্রতিষ্ঠাকারী শাসনব্যবস্থায় আকৃষ্ট হয়ে থাকবেন, তা-ই স্বাভাবিক। সেই সেকালীন প্রভাবেই হোক বা প্রাচীনতর উভয়েরই সাধারণ পূর্বসূরি সামীয় অনার্যদের ঐতিহ্যগত সামাজিক-রাজনৈতিক সংস্কৃতির উত্তরাধিকারের কারণেই নিজেরা চিন্তা করে হোক—বাংলার গোত্রপ্রধানরা তখনো আরবদের মতো ইসলাম গ্রহণ না করে থাকলেও আরবদের মদিনা শরিফে সূচিত শাসনব্যবস্থারই মতো একটি জননির্বাচিত শাসকের শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন; জাতির পালনকর্তা তথা সংক্ষেপে ‘পাল’ হিসেবে একজনকে ‘গো-পাল’ হিসেবে নির্বাচিত ও বরণ করেন।

গোপালই সুলতান, সুলতানই নবাব!

শ’ পাঁচেক পরে বাংলার জনগণ আরেকবার আর্য ভারতীয় আধিপত্যবাদী ঔপনিবেশিক শাসকদের খপ্পরে পড়া বাংলার জনগণ আরেকবার আর্য রাজনৈতিক সংস্কৃতির শ্রেণিবিভেদমূলক বর্ণবাদী নিপীড়নের প্রতিপক্ষে জনগণমন-নন্দিত সমতাভিত্তিক জননির্বাচিত শাসক-শাসিত ‘খেলাফত’-ভিত্তিক ‘সুলতানি’ শাসনব্যবস্থা গ্রহণ ও বরণ করেন। এই ব্যবস্থার ভিত্তিতেই একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি-রাষ্ট্র হিসেবে ‘বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠা করেন বাংলার প্রথম স্বাধীন সুলতান, সোনারগাঁর সুলতান হাজি শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহের নেতৃত্বে, ১৩৪২ সনে।

আজকাল যেকোনো আরবি শব্দ দেখলেই তাকে ধর্মীয় কোনো কিছু আর ধর্মের ধারে কিছু দেখলে তাকে ‘সেকেলে’, ‘গ্রাম্য’ বা—আরো ভয়ংকর—‘সাম্প্রদায়িক’ মনে করার মানসিক রোগ হীনম্মন্যতাগ্রস্ত কারো কারো ভেতর জলাতঙ্ক রোগের মতো ছড়িয়ে পড়েছে ঔপনিবেশিক শাসকদের করা মগজ-ধোলাইর কারণে; তার বিবেচনায় এখানে কিছু পরিষ্কার করা দরকার। ‘খেলাফত’ শব্দটি নানাধর্মীয় প্রেক্ষিতে ব্যবহৃত হলেও তার আক্ষরিক অর্থ ‘প্রতিনিধিত্ব’—সাধারণত জ্ঞানদান বা সামাজিক পর্যায়ে জ্ঞান প্রয়োগের ক্ষেত্রে জ্ঞানের মূল উৎসের প্রতিনিধিত্ব। ‘সুলতান’ বলতে ‘মুসলমান রাজা’ বলে একটি ভুল ধারণা প্রচলিত হয়ে পড়লেও তার অর্থ সামাজিকভাবে করা দরকার এমন সব মঙ্গলকর্ম যথার্থ দায়িত্বপ্রাপ্তির ভিত্তিতে করেন যিনি—তিনি একই সঙ্গে যুগপৎ তিন রাজ্যের জেরুজালেম মুক্তকারী সেই দরিদ্র সুলতান সালাহউদ্দিনই হোন, যার মৃত্যুর সময় নিজের সম্পদ থেকে নিজের কাফনের খরচটা রেখে যেতে পারেননি, বা তিনি আরাকানের বৌদ্ধ সুলতান নরমেখলাই হোন। আর ‘নবাব’ শব্দটির অর্থ হলো তেমন দায়িত্বপ্রাপ্ত জনের প্রতিনিধি—‘নায়েব’—হিসেবে তার পক্ষে সেই দায়িত্ব পালনে নিযুক্ত ব্যক্তি। ঐতিহাসিক কারণেই প্রচুর আরবি-ফারসি শব্দে সমৃদ্ধ পূর্ববঙ্গীয় তথা বাংলাদেশের গ্রামবাংলার আপন যে ভাষা—যাতে ঐতিহ্যমণ্ডিত পুঁথি, জারি-সারি, মুর্শিদি গান ইত্যাদি রচিত— তাতে এই শব্দগুলিই ঐতিহ্যগতভাবে প্রচলিত বলেই এখানে তার ইতিহাস ও ঐতিহ্য বর্ণনায় তারই ব্যবহার সমীচীন মনে হয়েছে—ঐতিহ্যের প্রতি যথার্থ সম্মানপূর্বক।

অনার্য সেমিটিক আরব্য সন্তদের দ্বারা মদিনা শরিফে সূচিত ‘খেলাফত’ যেভাবে একসময় সুলতানি শাসনব্যবস্থা বলে পরিচিত হয়ে অনার্য সেমিটিক দ্রাবিড়দের বাংলার প্রথম স্বাধীন সুলতান হাজি শামসুদ্দিনের নেতৃত্বে প্রথম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছিল, সেভাবেই একসময় তা নবাবি নামে পরিচিত হয়ে ৪০৪ বছর পর বিদেশি উপনিবেশবাদী ব্যবসায়ী ও বেসরকারি সাহায্য সংস্থার ষড়যন্ত্রে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব, সন্ত হজরত হাজি নূরুদ্দিন মজনু শাহের নেতৃত্বে সুদীর্ঘ প্রতিরোধের শেষে তার শহীদ হয়ে যাওয়ার ভেতর দিয়ে উৎপাটিত হয়ে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত করেছিল অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ পাদে।

হারানো বাংলাকে ফিরে পেতে...

বহু বীরের রক্ত ও ঘাম, বহু সন্ত ও মনীষীর বিনিদ্র সাধনা ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামে জীবনের সবকিছু বিসর্জন দেওয়ার বিনিময়ে অস্তমিত সে সূর্য আবারও উদিত হয়েছে।

বাংলার জননির্বাচিত শাসকের শাসনের ঐতিহ্যবাদী শাসনব্যবস্থারও পুনরাভিষেকের সময় এসেছে।

লেখক: যুক্তরাষ্ট্রের এমআইটি, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় বিজ্ঞান কেন্দ্র ও অস্ট্রেলিয়ার সুইনবার্ন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে বৈজ্ঞানিক গবেষণা পদ্ধতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা লাভ ও গবেষণাপূর্বক পিএইচডি অর্জন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় আর মদিনায় বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিশ্বের বহু উচ্চশিক্ষা কেন্দ্রে শিক্ষকতা বা গবেষণা করেছেন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন