‘পুশইন’ কূটনীতির অনিষ্টেও নির্বিকার?

খাজা-মাঈন-উদ্দিন
খাজা মাঈন উদ্দিন

‘পুশইন’ কূটনীতির অনিষ্টেও নির্বিকার?

ধরুন, একদল নারী-পুরুষ ও শিশুকে ধরে গভীর রাতে দুর্গম এবং নজরদারিবিহীন সীমান্ত এলাকায় এনে ভয় দেখিয়ে বলা হলো, ‘এবার সীমান্ত অতিক্রম করো’। এ কাজটি, সভ্যবিশ্বের দৃষ্টিতে, মানব পাচার নয় কি?

লোকচক্ষুর আড়ালে এমন দৃশ্য সম্প্রতি বারবার রূপায়িত হচ্ছে ভারত-বাংলাদেশ দীর্ঘ সীমান্তের ভঙ্গুর অংশে। কোনো অ-রাষ্ট্রীয় অপরাধ চক্র কিন্তু পরিচালনা করছে না আদমসন্তান ধরা ও অবৈধভাবে ‘রপ্তানি’র এই ধারাবাহিক পর্বগুলো, যার শিরোনাম (বাংলাদেশমুখী) ‘পুশইন’। নির্ভুলতার স্বার্থে সাংবাদিকরা তো বলতেই পারেন এই অপকর্মটি রাষ্ট্রপরিচালিত মানব পাচার।

বিজ্ঞাপন

রাতের সীমান্তে ‘জিম্মি’ লোকদের বাধ্য করা হয় অনুপ্রবেশকারীর ভান করতে। আর তারা বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করে ব্যর্থ হলে, তাদের ফিরে যেতে বাধা দেয় ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। এই অসহায় মানুষেরা আটকা পড়ে থাকে সীমান্তের শূন্যরেখায়Ñখোলা আকাশের নিচে, খাদ্য বা পানি সরবরাহ ছাড়াই।

ভারতের নাগরিক বা যেকোনো মানুষই হোকÑজোরপূর্বক কাউকে সীমান্তে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা আন্তর্জাতিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনার নীতিমালা এবং এমনকি দ্বিপক্ষীয় চুক্তির বরখেলাপ।

তবে ‘পুশইন’ ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সচেতন পদক্ষেপ, যার সঙ্গে মিল পাওয়া যায় ফিলিস্তিনিদের প্রতি ইসরাইলি বাহিনীর নিষ্ঠুর আচরণের।

ভারতের বাইরের পণ্ডিতরা হয়তো অবাক হবেন, কেন উপনিবেশোত্তর গণতান্ত্রিক ভারতে নির্বাচিত প্রতিনিধি ও প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা এমন কাজ করেন, যেসব কর্মকাণ্ড তাদের দেশের জন্য শুধু দুর্নাম ও ঘৃণা তৈরি করে? সরল দৃষ্টিতে দেখলে এতে রাজনৈতিকভাবে সঠিক কোনো লাভ হচ্ছে না ভারতের।

ভাষা, ধর্ম কিংবা পুরোনো কাগজপত্র না থাকার অজুহাতে বিভিন্ন রাজ্য থেকে নিরপরাধ মানুষকে ধরে এনে কীভাবে বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়া যায়? উদ্দেশ্য গণবহিষ্কার তো! এ কাজ ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দুর্বলতাকেই বাইরের পৃথিবীর কাছে প্রকাশ করে দেয়। ফলে ভৌগোলিকভাবে নিকটতম প্রতিবেশী বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কও তিক্ত হয়।

ভারতের অভিযোগ, সীমান্ত দিয়ে ঠেলে পাঠানো ব্যক্তিরা বাংলাদেশের অধিবাসী। সে ক্ষেত্রে তাদের বৈধভাবে ফেরত পাঠানো যেত। ‘পুশইন’-এর শিকার মানুষদের অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসী হওয়ার সম্ভাবনা কিন্তু শূন্যের কাছাকাছি। কারণ ভারত এখনো ইউরোপ, আমেরিকা বা মধ্যপ্রাচ্যের মতো অভিবাসনপ্রত্যাশীদের কাছে স্বপ্নের গন্তব্য নয়।

মানুষকে রাজনৈতিক খেলায় ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করে সুবিধা আদায়ের উদ্দেশ্যে নয়াদিল্লি অতীতেও ‘মানুষ তাড়ানোর’ নীতি বা কূটনীতি অনুসরণ করেছে।

দেশের অভ্যন্তরে শাসকগোষ্ঠী বিভিন্ন রাজ্যের জনমিতির বিন্যাস পরিবর্তনের চেষ্টা করেছে, বিশেষ করে নির্বাচনি সুবিধা অর্জনের লক্ষ্যে। অন্যদিকে অসহায় ও রাষ্ট্রহীন মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার আরেক উদ্দেশ্য ঢাকার ওপর চাপ সৃষ্টি করা। যাতে দিল্লির দাবি মেনে নিতে বাধ্য করা অথবা সম্ভাব্য দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের দর-কষাকষির মানসিকতা দুর্বল করে দেওয়া যায়।

চাপ প্রয়োগ করে স্বার্থ উদ্ধারের চেষ্টা দিল্লির পুরোনো কূটনৈতিক কৌশল। বাংলাদেশে অনুগত সরকারের সঙ্গেও কিছুটা এমন কাজ করা হয়েছে। তবে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ‘পুশইন’ কার্যক্রম অনেকটাই স্থগিত ছিল, কারণ ক্ষমতায় টিকে থাকার স্বার্থে তার সরকার দিল্লিকে প্রায় সব ধরনের ছাড় দিয়েছিল।

তবু কিছু সাবেক কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, বাণিজ্য বা পানিবণ্টনের মতো আলোচনার শুরুতেই ভারতীয় কর্মকর্তারা সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ইস্যুতে উদ্বেগ প্রকাশ করে বসতেন, যা বাংলাদেশ পক্ষকে দর-কষাকষির বদলে আত্মরক্ষামূলক অবস্থানের দিকে ঠেলে দিত।

আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য শাসনামলে কিংবা গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় আলোচনার আগে সীমান্তে বাংলাদেশি হত্যাকাণ্ড বৃদ্ধি এবং ‘পুশইন’ মানব পাচারের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়ে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।

এখন যেমন সীমান্তে নতুন করে উত্তেজনা দেখছি, যখন হাসিনার পতনের পর সৃষ্ট অচলাবস্থা কাটিয়ে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক পুনর্গঠনের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নবনির্বাচিত সরকারের সঙ্গে দিল্লি নতুন করে সম্পৃক্ত হচ্ছে।

কিন্তু বাংলাদেশের প্রতি মানসিকতা যে সেকেলেই রয়ে গেছে, তা ‘পুশইন’-এর মতো কৌশল দেখলেই বোঝা যায়। এ ধরনের পন্থা শুধু একচোখা নয়, বরং এতটাই পূর্বানুমেয় যে, তা হয়ে গেছে প্রায় অচল (ক্লিশে)।

২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের প্রহসনের নির্বাচন অনুষ্ঠান সফল করে হাসিনা সরকারের ধারাবাহিকতা রক্ষায় সমর্থন জুগিয়েছে ভারত। দিল্লির শাসকরা বাংলাদেশের জনগণের ইচ্ছা ও অনুভূতির প্রতি মোটেও সংবেদনশীলতা দেখায়নি। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সেই জনগণই হাসিনা ও তার সহযোগীদের ক্ষমতা থেকে সরিয়ে ভারতীয়দের অহংবোধ ধূলিসাৎ করে দেয়। কিন্তু নতুন করে শুরু হওয়া ‘পুশইন’ কূটনীতি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের আরো সর্বনাশ করছে। এতে প্রমাণ হচ্ছে বাংলাদেশকে অন্যায় চাপের মধ্যে রাখার পুরোনো নীতিতেই দিল্লি অনড়।

ভারতের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারকরা হয়তো বুঝতে পারেননি যে আমরা এখন বাস করছি এমন এক নতুন বিশ্বে, যেখানে তথাকথিত ক্ষুদ্র শক্তিকেও উপেক্ষা করার ধারণা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।

ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের চাপিয়ে দেওয়া অসম যুদ্ধে মর্যাদা রক্ষা করে টিকে আছে ইরান। তথাকথিত বড় শক্তিগুলোর কাছে নতি স্বীকার করার পুরোনো ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে তেহরান। এদিকে ইরান যুদ্ধ ও যুদ্ধবিরতির দোলাচলের মধ্যে এশিয়া ও বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি নিয়ে চীনের নেতা শি জিনপিং বেইজিংয়ে স্বাগত জানিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প নামক এক ‘ক্লান্ত’ মার্কিন প্রেসিডেন্টকে। এতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কার্যত হয়ে পড়েছেন ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের এক নীরব পর্যবেক্ষক।

তাই সম্পর্কোন্নয়ন চাইলে বাংলাদেশে ভারতীয় নেতাদের শুনতে হবে নতুন প্রজন্মের কণ্ঠস্বর। এটি সেই প্রজন্ম যারা চায় ‘বৃহৎ’ প্রতিবেশীর সঙ্গে ন্যায্য ও সমতাভিত্তিক সম্পর্ক। দিল্লির জন্য নতুন খবর হলো, হাসিনা যুগের সেই প্রতিপক্ষকে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না ভবিষ্যৎ বাংলাদেশে।

লেখক : সাংবাদিক

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...