ট্রাম্পের ব্যক্তি স্বার্থের চড়া মূল্য দিচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য

ড. সানিয়া ফয়সাল আল-হুসেইনি

ট্রাম্পের ব্যক্তি স্বার্থের চড়া মূল্য দিচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

ইসরাইলের হয়ে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার অভিযোগ উঠেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের বিরুদ্ধে। আগের প্রশাসনগুলোকে এতে জড়াতে ব্যর্থ হওয়ার পর ইসরাইল যে ট্রাম্প প্রশাসনকে এই সংঘাতে টেনে আনতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিল, তা তারা কখনোই গোপন করেনি। তখন থেকেই এই যুদ্ধের প্রভাব এবং এই যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের পরিণাম এই অঞ্চলের দেশগুলোকে ভোগ করতে হচ্ছে। আঞ্চলিক সম্পর্ক, বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তা কিংবা দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতাসহ সব ক্ষেত্রেই এটি এখন দৃশ্যমান।

ট্রাম্প আগে থেকেই আপাদমস্তক একজন ব্যবসায়ী। স্বাভাবিকভাবেই তিনি প্রথাগত রাজনীতি ও কূটনীতির ওপর নির্ভর করার চেয়ে চুক্তি স্বাক্ষর এবং সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক মুনাফা করায় অনেক বেশি দক্ষ। এসব বিষয়ের সংমিশ্রণ যে মৌলিক প্রশ্নটি সামনে আনে, তা হলো—যুদ্ধের সময় ট্রাম্পের নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো কি শুধু রাজনৈতিক বিবেচনাপ্রসূত ছিল? নাকি মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা ক্ষুণ্ণ করে তার ব্যক্তিগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থ সেসব সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছে?

বিজ্ঞাপন

ইরানে হামলা বা দেশটির সঙ্গে উত্তেজনা বৃদ্ধির হুমকি তেলের দাম ও জ্বালানি খাতের কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দর বাড়িয়েছে বারবার, যার বিরূপ প্রভাব পড়েছিল বিমান সংস্থা, পরিবহন কোম্পানি ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ার সূচকের ওপর। অন্যদিকে, যুদ্ধবিরতি ও ইরানের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ জ্বালানি খাতের শেয়ারের দর কমালেও অন্যান্য খাতের কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দর বাড়িয়েছে। আর শেয়ারবাজারের সঙ্গে ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের সম্পর্কের কথা সর্বজনবিদিত।

ট্রাম্পের আগের প্রেসিডেন্টরা দায়িত্ব গ্রহণের সময় যে প্রথা মেনে চলতেন, তিনি সেটিও অনুসরণ করেননি। তার প্রথম মেয়াদের শুরুতে ‘অফিস অব গভর্নমেন্ট এথিক্স’ (সরকারি নৈতিকতাবিষয়ক দপ্তর) সুপারিশ করেছিল, ট্রাম্প যেন তার এমন সব আর্থিক স্বার্থ থেকে দূরে থাকেন, যা তার সরকারি দায়িত্বের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ১৯৭৮ সালের ‘এথিক্স ইন গভর্নমেন্ট অ্যাক্ট’র (সরকারি নৈতিকতা আইন) আওতায় প্রেসিডেন্টদের তাদের আর্থিক স্বার্থ ও লেনদেনের বিবরণ প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক।

এই আইন চালু হওয়ার পর থেকে ট্রাম্পের পূর্ববর্তী সাতজন প্রেসিডেন্ট হয় তাদের সরকারি দায়িত্বের সঙ্গে সাংঘর্ষিক সম্পদ বিক্রি করে দিয়েছিলেন, অথবা সেগুলো একটি ‘ব্লাইন্ড ট্রাস্ট’র (এমন ট্রাস্ট যেখানে সম্পদ ব্যবস্থাপনার বিষয়ে মালিকের কোনো নিয়ন্ত্রণ বা তথ্য থাকে না) অধীনে ন্যস্ত করেছিলেন, যাতে ক্ষমতায় থাকাকালে সেসব সম্পদের লেনদেন সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণা না থাকে। যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও বিবৃতি শেয়ারের দরকে সর্বদাই প্রভাবিত করে। কিন্তু ট্রাম্প যেকোনো বক্তব্য দেওয়ার পর শেয়ারবাজারের ওপর সবসময়ই তীক্ষ্ণ নজর রাখেন।

ট্রাম্প তার নিজের নামযুক্ত একটি তালিকাভুক্ত কোম্পানির মালিকানা এখনো ধরে রেখেছেন এবং বন্ড ও শেয়ার-সংবলিত বিনিয়োগ পোর্টফোলিও বা তহবিলের মালিকানাও তার হাতে আছে। দায়িত্ব গ্রহণের সময় তিনি যে বিনিয়োগ তহবিলের তথ্য প্রকাশ করেছিলেন, তাতে থাকা শেয়ারের মূল্য যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আর্থিক প্রতিবেদনভুক্ত ক্যাটাগরির অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ ৫০ কোটি ডলারের বেশি। ট্রাম্পই এই তহবিলের একমাত্র সুবিধাভোগী এবং তার ক্ষমতায় থাকার পুরো সময় শেয়ার কেনাবেচার এখতিয়ার এই তহবিলের হাতেই আছে। যদিও ট্রাম্পের দাবি—অন্য ব্যক্তিরা এই তহবিলের লেনদেন পরিচালনা করেন। কিন্তু ‘অফিস অব গভর্নমেন্ট এথিক্স’র একজন সাবেক কর্মকর্তা বলেছেন, ট্রাম্পের এই আর্থিক ব্যবস্থাপনা ‘ব্লাইন্ড ট্রাস্ট’ হিসেবে প্রচলিত ধারণার মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হয়েছে।

শুল্ক, আমদানি বিধিনিষেধ, যুদ্ধ ও যুদ্ধবিরতি-সংক্রান্ত বিষয়সহ ট্রাম্প প্রশাসনের নেওয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্তের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বড় কোম্পানিগুলোর স্বার্থ প্রভাবিত হয়। শুধু চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে ট্রাম্পের বিনিয়োগ তহবিল এই কোম্পানিগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৩ হাজার ৬০০-এর বেশি শেয়ার কেনাবেচা করেছে। তার আনুষ্ঠানিক আর্থিক বিবরণীতে এই শেয়ার কেনাবেচা থেকে অর্জিত সুনির্দিষ্ট মুনাফার পরিমাণ উল্লেখ করা হয়নি।

ইরান যুদ্ধে ট্রাম্পের বিভিন্ন বক্তব্যের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া শেয়ারবাজারে দেখা গেছে। ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের কঠোর হুমকির পর তেলের দাম বাড়ত এবং অন্যান্য কোম্পানির শেয়ারের দর কমে যেত। অন্যদিকে, ইরানকে অতিরিক্ত সময় দেওয়ার ঘোষণা বা আলোচনার প্রসঙ্গ উত্থাপন করলে সেই প্রবণতা উল্টে যেত। ৯ মার্চ ট্রাম্প এক বিবৃতিতে বলেছিলেন, যুদ্ধ প্রত্যাশার চেয়েও ভালোভাবে এগোচ্ছে। তার এই বক্তব্যের ফলে তেলের দাম কমে যায় এবং অন্যান্য কোম্পানির শেয়ারের দাম বেড়ে যায়। একইভাবে, ২৩ মার্চ ইরানের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা স্থগিত করার ঘোষণার পর তেলের দাম প্রায় ১৫ শতাংশ কমে যায়। তবে যে বিষয়টি আরো প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে, তা হলো—ইরানে হামলা স্থগিতের ঘোষণা দেওয়ার কয়েক মিনিট আগেই অজ্ঞাত কোনো পক্ষ বিপুল পরিমাণ ‘অয়েল ফিউচারস’ (ভবিষ্যতে তেল সরবরাহের চুক্তি) বিক্রি করেছিল, যা তেলের দামের তাৎক্ষণিক পতনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ৭ এপ্রিল, ট্রাম্প দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেও একইভাবে ‘অয়েল ফিউচারস’ বিক্রি করা হয় এবং তেলের দাম প্রায় ১৫ শতাংশ কমে যায়। ইরানের অবরুদ্ধ সম্পদ বা অর্থছাড়ের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অস্বীকৃতি এবং নির্দিষ্ট কিছু খাতে তা ব্যবহারের শর্ত জুড়ে দেওয়া চুক্তির পরিপন্থী। কারণ চুক্তিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, অর্থ ব্যয়ের কোনো বিধিনিষেধ ছাড়াই তা অবিলম্বে ছাড় করতে হবে। একইভাবে, যুক্তরাষ্ট্রের আহ্বানে সাড়া দিয়ে হরমুজ প্রণালির মাঝখান দিয়ে জাহাজ চলাচলের রুট পরিবর্তন করে নতুন রুট চালু করার চেষ্টা ছিল ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে চুক্তির আরেকটি লঙ্ঘন। এটি ওমান ও ইরানের মধ্যকার সম্পর্কের ভারসাম্যকেও বিঘ্নিত করেছে।

ইরান এবং ওমানের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের চেষ্টা বরাবরই ব্যর্থ হয়েছে। কারণ ওমান ও ইরানের সম্পর্ক সবসময়ই সৌহার্দ্যপূর্ণ এবং ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে মধ্যস্থতার ক্ষেত্রে ওমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে যুদ্ধবিরতি চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র এ দুই দেশকে হরমুজ প্রণালিতে সংঘাতের মুখোমুখি দাঁড় করাতে সফল হয়। কারণ ওমান ইরানের সঙ্গে কোনো সমঝোতা ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের সঙ্গে সংগতি রেখে হরমুজ প্রণালির দক্ষিণ অংশে জাহাজ চলাচলের পথটি চালু করেছিল। ইরান নতুন এই রুট বন্ধে এই পথে যাওয়া জাহাজে হামলা করে।

ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর ইরান যুদ্ধে এই অঞ্চলের দেশগুলোর স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের দূরত্ব ঘোচাতে কয়েক দশক ধরে চলা কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক চেষ্টা সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সফল হয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধের কারণে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক এখন জটিল রূপ নিয়েছে। ইরান প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলোয় অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালাচ্ছে। ইরান বলছে, এসব ঘাঁটি ইরানে হামলায় ব্যবহৃত হচ্ছে। এতে ইরানের সঙ্গে এসব দেশের সম্পর্কে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হচ্ছে। অথচ এই সম্পর্ক সুদৃঢ় করতে বহু বছর লেগেছিল। ট্রাম্পের নীতির প্রভাব থেকে রেহাই পায়নি ইরাক, কুয়েত, লেবানন ও সিরিয়াও। তিনি লেবাননের জন্য হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণকে একটি শর্ত হিসেবে দাঁড় করান, যদিও লেবাননের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এটি কোনো নতুন প্রস্তাব ছিল না। ট্রাম্প এটিকে দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরাইলের সরে আসার বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত করেন, যা বিতর্ক ও অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যের জন্ম দিয়েছে। ট্রাম্প এমনও প্রস্তাব দিয়েছিলেন, ইসরাইলের পরিবর্তে সিরিয়া যেন হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে লড়াই করে। এ ধরনের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে তা এ অঞ্চলের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর অগ্রাধিকার ও লক্ষ্যগুলো তাদের গণমাধ্যমের ওপর নজর রাখলেই বোঝা যায়। উপসাগরীয় অঞ্চলের গণমাধ্যমগুলো ইরানবিরোধী যুদ্ধকে তাদের অর্থনীতি ও জাতীয় সম্পদের ওপর এর প্রভাবের দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরছে। ইরানি গণমাধ্যমগুলো আত্মসমর্পণ প্রত্যাখ্যানের ওপর জোর দিয়েছে এবং দাবি করেছে, ইরান যুদ্ধ চায় না। ইসরাইলি গণমাধ্যমগুলো তাদের দেশের বিরুদ্ধে ইরানের হুমকির বিষয়টি বারবার সামনে এনেছে এবং যুদ্ধবিরতি, চুক্তি বা আলোচনার সম্ভাবনাকে নাকচ করেছে। মার্কিন গণমাধ্যমগুলো মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা ও আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতার ওপর আলোকপাত করছে। অন্যদিকে, ইউরোপীয় গণমাধ্যম এই যুদ্ধকে আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা এবং বহুমেরুর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বিবর্তনের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছে।

মিডল ইস্ট মনিটর অবলম্বনে মোতালেব জামালী

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন