প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ থেকে অনেক কিছু আশা করেছিলেন ভারতের ধনী ব্যক্তিরা। তারা ভেবেছিলেন, এই ক্ষমতা ভারত আর যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ককে আরো শক্তিশালী করবে। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রায় এক বছর চলে গেছে। যেভাবে পরিকল্পনা ছিল ভারতীয়দের, সেভাবে কিছুই হয়নি। ভারতের শীর্ষ বিলিয়নিয়ারদের মধ্যে অন্তত দুজন ট্রাম্পের ক্ষমতার ধকল পোহাচ্ছেন। নয়াদিল্লি আর ওয়াশিংটনের সম্পর্ক বহু বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে চলে গেছে।
রাশিয়ার নেতা ভ্লাদিমির পুতিনের ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হতাশ। ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করেননি পুতিন। ভারত সেই রাশিয়ার কাছ থেকে তেল আমদানি করছে। তাই ভারতের প্রতি ক্ষোভ দেখিয়েছেন ট্রাম্প। সেই সূত্রেই ভারতীয় পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়িয়েছেন তিনি। শুল্কের হার দ্বিগুণ বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করা হয়েছে। ভারতীয় ব্যবসার ওপর এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে।
ভারতের বিত্তশালীদের মধ্যে এক নম্বরে আছেন মুকেশ আম্বানি। রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনি। এই শিল্প গ্রুপের আকার বিশাল। তাদের তেল শোধনের ব্যবসা থেকে বিরাট মুনাফা আসছিল। ২০২২ সাল থেকে তারা প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার অর্জন করেছে। রাশিয়া থেকে তারা কম দামে অপরিশোধিত তেল কিনেছে। সেগুলো শোধন করে পশ্চিমা দেশগুলোয়ে বিক্রি করেছে। রাশিয়ার তেলের ওপর নতুন শুল্ক আর চাপের কারণে আম্বানির সাম্রাজ্যে শক্ত আঘাত লেগেছে।
ভারতের দ্বিতীয় ধনী ব্যক্তি হলেন গৌতম আদানি। আদানি গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনি। এই গ্রুপটি কাজ করে মূলত অবকাঠামো নিয়ে। ব্যক্তিগতভাবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঘনিষ্ঠজন আদানি। তার বিরুদ্ধে এখন মারাত্মক সব অভিযোগ সামনে এসেছে। মার্কিন কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে বিশাল ঘুষ কেলেঙ্কারির অভিযোগ এনেছে। ঘুষের পরিমাণ বহু মিলিয়ন ডলার। তিনি আশায় আছেন, ট্রাম্প প্রশাসন হয়তো এই অভিযোগ দ্রুত নিরসনে সাহায্য করবেন।
কিছু প্রতিবেদনে ইঙ্গিত মিলেছে, আদানির কোম্পানিতে খানিকটা স্বস্তি ফিরেছে। ট্রাম্প আদেশ দিয়েছেন, যাতে এখানে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ফরেন করাপ্ট প্র্যাকটিসেস অ্যাক্ট’-এর প্রয়োগ করা না হয়। অনেকে মনে করেছিল, এর ফলে হয়তো আদানির বিরুদ্ধে মামলাগুলো বাতিল করা হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেটা হয়নি। মামলা এখনো আছে। আদানি আর তার টিমকে এখনো এগুলো মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
অনেকেরই বিশ্বাস ছিল ট্রাম্প আর মোদি ঘনিষ্ঠ মিত্র। অতীতে তাদের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে হৃদ্যতা দেখা গেছে। ট্রাফটস ইউনিভার্সিটির দ্য ফ্লেচার স্কুলের বৈশ্বিক ব্যবসায় বিভাগের ডিন হিসেবে কাজ করছেন ভাস্কর চক্রবর্তী। তিনি এই শুরুর দিকের প্রত্যাশার বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন। ‘দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পদে ভারতীয়-আমেরিকানদের নিয়োগ দিয়েছিলেন ট্রাম্প। যেসব ব্যবসায়ী নেতার ভারতীয় পরিচয় আছে, তাদের সঙ্গে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠতা বেড়েছিল তখন। তখন মনে হয়েছিল শক্তিশালী একটা বন্ধুত্বের সম্পর্ক হয়তো তৈরি হতে যাচ্ছে।’
কিন্তু বাস্তবতা দেখা গেল অন্যরকম। দ্রুত বড় অঙ্কের শুল্ক চাপিয়ে দেওয়া হলো। এরপর থেকে মোদি আর ট্রাম্পের মধ্যে তেমন কথাবার্তাও আর হয়নি। পরিস্থিতির আরো অবনতি হলো পাকিস্তানের সঙ্গে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠতা বাড়ার পর। ভিসা কর্মসূচি নিয়েও সমালোচনা করলেন ট্রাম্প। এই ভিসা নিয়েই ভারতীয়দের অনেকে যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করছেন। এই পরিস্থিতিকে সম্ভাব্য সবচেয়ে হতাশাজনক হিসেবে বর্ণনা করেছেন চক্রবর্তী। তিনি বলেছেন, ‘এই পরিস্থিতিতে বড় ধরনের অর্জনের চিন্তা করাটাও অবাস্তব হয়ে উঠেছে।’
বিল ড্রেক্সেল ভারত বিষয়ে বিশেষজ্ঞ। রিপাবলিকানদের সঙ্গে সম্পৃক্ত থিংক ট্যাংক হাডসন ইনস্টিটিউটে কাজ করেন তিনি। প্রাথমিক চিন্তাভাবনাগুলোর কথা তিনিও বলেছেন। জনগণ ভেবেছিল ব্যাবসায়িক যোগাযোগ দুই দেশের সম্পর্ককে আরো শক্তিশালী করবে। কিন্তু ঘটেছে ঠিক তার উল্টো। এই যোগাযোগগুলো যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল না। সম্পর্কটা তাই পথচ্যুত হয়েছে।
আরো কিছু বলেছেন ড্রেক্সেল। বলেছেন, বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের ভারতের দিকে মনোযোগ নেই। বিশেষ করে শীর্ষপর্যায়ে বিষয়টি আরো বেশি সত্য। নেতারা এদিকে খুব একটা মনোযোগ দিচ্ছেন না।
আম্বানির ঘনিষ্ঠ মুম্বাইভিত্তিক এক ব্যবসায়ী নেতা পরিস্থিতি নিয়ে কথা বললেন। তার মতে, এ বছরটা ভারতের জন্য নতুন যুগ নিয়ে এসেছে। সত্যিকারের রাজনীতির মুখোমুখি হয়েছে তারা এ বছর। ভারত যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নিজেদের অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভেবেছিল। তার ভাষায়, ‘আমরা ভেবেছিলাম সত্যিকারের গুরুত্বের চেয়েও আমাদের গ্রহণযোগ্যতা অনেক বেশি।’
২০২৫-এর জানুয়ারিতে ক্ষমতায় বসেছেন ট্রাম্প। আম্বানি আর আদানি দুজনেই এরপর থেকে কঠোর পরিশ্রম করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ আরো উন্নত করার চেষ্টা করেছেন।
আম্বানি এই চেষ্টার পেছনে যথেষ্ট বিনিয়োগও করেছেন। লবিংয়ের পেছনে তার কোম্পানি গেল বছর ২৪০ হাজার ডলার ব্যয় করেছে। মার্কিন সিনেটের রেকর্ড থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র ভারত সফর করেছেন। ভারতের পশ্চিমাঞ্চলে আম্বানির তেল শোধনাগারেও গিয়েছিলেন তিনি। মুকেশের সন্তান অনন্ত আম্বানির সঙ্গেও সময় কাটিয়েছেন তিনি। আম্বানি পরিবারের বিরাট প্রাইভেট চিড়িয়াখানা ঘুরে দেখেছেন তারা। যুক্তরাষ্ট্রের বড় ঘোষণার ঠিক আগ দিয়ে এ সফর হয়েছিল। রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ বলেছে, তারা রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল কেনা বন্ধ করবে। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন আরোপিত নিষেধাজ্ঞা এড়াতেই তারা এই পদক্ষেপ নিচ্ছে।
প্রেসিডেন্টের আরেক ছেলে এরিক ট্রাম্পেরও ভারত নিয়ে পরিকল্পনা আছে। বেশ কিছু হোটেল প্রকল্পে কাজ করার কথা জানিয়েছেন তিনি। আম্বানির সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি কোম্পানি ট্রাম্প অর্গানাইজেশনকে অর্থও পরিশোধ করেছে। উন্নয়ন ফি হিসেবে ১০ মিলিয়ন ডলার দিয়েছে তারা।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মেয়ে ইভাঙ্কা ট্রাম্প ভারতে এক বিয়েতে উপস্থিত হয়েছিলেন। বিয়েটা ছিল অনন্ত আম্বানির। আম্বানি পরিবার এখনো আমেরিকায় প্রভাব বিস্তারের স্বপ্ন দেখছে। তাদের ঘনিষ্ঠ মুম্বাইয়ের ধনাঢ্য ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে মুকেশকে পছন্দ করেন। মুকেশকে তিনি বন্ধু হিসেবে দেখেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলেও রিলায়েন্স কোনো জবাব দেয়নি।
আদানিও যুক্তরাষ্ট্রে অর্থ ঢেলেছেন। গেল বছর লবিং এবং আইনি কাজে অন্তত ১৫০ হাজার ডলার খরচ হয়েছে তার। এই তথ্যও সিনেটের রেকর্ড থেকে পাওয়া।
অক্টোবরে আদানি এক ডিনারের আয়োজন করেছিলেন। আহমেদাবাদে নিজের বাড়িতে ছিল সেই আয়োজন। হাডসন ইনস্টিটিউটের ছোট্ট একটা গ্রুপ সেখানে যোগ দিয়েছিল। এই একই গ্রুপের আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করেছিল।
আদানির বিরুদ্ধে মামলা এখনো চলছে। দুটো আলাদা মামলা হয়েছে। একটি মামলা করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস। অন্যটি করেছে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন। দুটো মামলাই করা হয়েছে নিউ ইয়র্কের ইস্টার্ন ডিস্ট্রিক্ট কোর্টে।
২০২৪-এর ডিসেম্বরে সবশেষ অপরাধ মামলার আপডেট জানা গিয়েছিল। সম্প্রতি এসইসি আদালতকে হালনাগাদ তথ্য জানিয়েছে। ভারত সরকার এখন পর্যন্ত আদালতের সমনের জবাব দেয়নি। এই সমন জারি করা হয়েছে গৌতম আদানি আর তার ভাইপো সাগর আদানির বিরুদ্ধে। সাগরের বিরুদ্ধেও অভিযোগ রয়েছে। এসইসি ভারতের আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বহুবার যোগাযোগ করেছে। তবে অভিযুক্ত দুজনেই সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
মামলা এখনো চলমান। যুক্তরাষ্ট্রে আদানির কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অবগত এক ব্যক্তি একটা বিষয় স্পষ্ট করেছেন। তার ভাষায় ‘আমরা কে ট্রাম্প আসলে সেটা জানেনও না’।
চক্রবর্তী ব্যাখ্যা দিলে বললেন, আদানির চেষ্টায় কেন কাজ হচ্ছে না। তিনি শুধু লবিস্ট আর আইনজীবীদের কাজে লাগাচ্ছেন। ট্রাম্পের সঙ্গে সরাসরি ব্যক্তিগত যোগাযোগের কোনো চেষ্টা নেই। সেটা না হলে এই ইস্যুগুলো সহজেই ট্রাম্পের নজর এড়িয়ে যাবে।
যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে আদানির। কোম্পানির ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র এই তথ্য জানিয়েছেন। এই বিনিয়োগেরও একটা উদ্দেশ্য হলো ট্রাম্পের মনোযোগ আকর্ষণ করা।
আদানি গ্রুপের এক মুখপাত্র কিছু জবাব দিয়েছেন। অভিযোগের বিষয়গুলোকে তিনি সরাসরি অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিষয়গুলো কোম্পানির অপারেশান বা পরিকল্পনায় কোনো প্রভাব ফেলছে না। ওই দেশে কোম্পানির কাজ সীমিত। শুধু সোলার মডিউল বিক্রি করে তারা সেখানে। সেটা গ্রুপের মোট মুনাফার ২ শতাংশেরও কম। তারা এখনো দেশের বাইরে সুযোগ-সুবিধা খুঁজছেন। আমেরিকাও তাদের চিন্তায় আছে। সব জায়গাতেই তারা নিজেদের মূল্য নির্মাণ করতে চান।
হোয়াইট হাউসও এ বিষয়ে কোনো জবাব দেয়নি। আম্বানি বা আদানির সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্ক নিয়ে তাদের জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল।
মুম্বাইয়ের ধনাঢ্য ব্যক্তিরা পরিস্থিতির সম্ভাব্য উন্নতির আশায় আছেন। নতুন বাণিজ্য চুক্তি হলে উত্তেজনা কমতে পারে। চুক্তি হলে ভারতীয় পণ্যের ওপর থেকে শুল্ক কমতে পারে। কিন্তু যেদিক থেকেই দেখা হোক, পরিবর্তন আসছে। পুরোনো আইডিয়ায় ভারতীয় কোম্পানিগুলো আর ফিরতে পারবে না। একসময় তারা ভেবেছিল ট্রাম্প পুরোপুরি তাদের পক্ষে আছেন। সেই দেখাটা ছিল অবাস্তব। অতিরঞ্জিত সেই কল্পনা থেকে তারা বেরিয়ে এসেছেন।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমস অবলম্বনে জুলফিকার হায়দার
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট রদ্রিগেজ
খালেদা জিয়া-উত্তর বাংলাদেশ ও তারেক রহমানের বার্তা
জামালপুর-৩ আসনে জামায়াতসহ ৫ প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল