আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

বিপন্ন স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও সংস্কার কমিশন প্রতিবেদন

ডা. সাইফুদ্দিন কিচলু

বিপন্ন স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও সংস্কার কমিশন প্রতিবেদন

স্বাস্থ্যব্যবস্থা একটা দেশের সার্বিক অবকাঠামো মূল্যায়নের এক শক্তিশালী নির্ধারক। বাংলাদেশের বিদ্যমান সংকটময় চিকিৎসার ব্যবস্থা এর যথাযথ প্রমাণ। জুলাই বিপ্লবের পর স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন ৩২২ পৃষ্ঠার রিপোর্ট প্রফেসর ইউনূস সরকারের কাছে জমা দিয়েছে। সংস্কার কমিশনের ১২ জন সদস্যসহ ৪ শতাধিক মানুষের (অধিকাংশই চিকিৎসক) মতামতের ভিত্তিতে বাংলাদেশ সর্ববৃহৎ স্বাস্থ্য সংস্কার রিপোর্ট তৈরি করা হয়েছে।

স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়নের লক্ষ্যে সংস্কার কমিশন স্বল্প ও মধ্যম মেয়াদে ৩২টি মুখ্য সুপারিশ করেছে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং স্বাস্থ্য বাজেটের ৫০ ভাগেরও বেশি অর্থ প্রাথমিক চিকিৎসায় বরাদ্দের প্রস্তাবনা এক যুগান্তকারী উদ্যোগ।

বিজ্ঞাপন

তবে এই দীর্ঘ প্রতিবেদনে গত ৫৪ বছরের বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার কোনো সংক্ষিপ্ত বিবরণ নেই। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান জনপ্রতিনিধির অংশগ্রহণের মাধ্যমে স্বাস্থ্যব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন কিন্তু এর প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার সময় তিনি পাননি। ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর উদ্যোগে নেওয়া ১৯৮২ সালের ‘জাতীয় ওষুধ নীতি’ ছিল এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। দুঃখজনক, বর্তমান সংস্কার প্রতিবেদনে এগুলোর কোনো উল্লেখ নেই। এমনকি এই প্রতিবেদনের প্রায় ২০০ রেফারেন্সও বাংলাদেশের ওষুধ নীতি এবং ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী কোনো স্থান হয়নি।

অনেক লোকবল, সময় ও অর্থ ব্যয় করে এই বিশাল প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করা হয়েছে। কিন্তু বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে, এখানে উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা, স্বাস্থ্যবীমা, স্বাস্থ্যকবচ, ই-প্রেসক্রিপশন, এআই ব্যবহার ইত্যাদির উল্লেখ থাকলেও, প্রতিবেদনে চিহ্নিত মূল সমস্যাগুলোর সমাধানের কোনো সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনায় না থাকায়, দেশের বিদ্যমান ভঙ্গুর স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়নে এর মাধ্যমে কোনো গুণগত পরিবর্তন আশা করা যায় না।

স্বাস্থ্যব্যবস্থায় অতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার কথা একাধিকবার উল্লেখ করলেও সংস্কার প্রস্তাবনায় আরো বেশি আমলাতান্ত্রিক বিভাগ (বিএইচএস ও বিএইচসি) ও পদ সৃষ্টির সুপারিশ করা হয়েছে। চিকিৎসকদের নিয়ে এসব নতুন পদ পূর্ণ করার জন্য আপিল বিভাগের বিচারকের সমতুল্য পদসহ সচিব থেকে উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক পদে উপসচিব হিসেবে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট চিকিৎসক নিয়োগ সুপারিশ করেছেন, যাদের আবার কোনো ক্লিনিক্যাল দায়িত্ব থাকবে না। একইভাবে যেখানে বিদ্যমান নারী সংগঠন, যেমন : ওজিএসবি, আইসিএমএইচ এবং বিএনএমডব্লিউসি আছে, নতুন করে ‘জাতীয় নারী স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট’ গঠনের প্রস্তাবনা একটা বাড়তি নারীকেন্দ্রিক আমলাতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ছাড়া কিছুই হবে না।

জনমত জরিপের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অনেক প্রশ্নের যৌক্তিকতাই নেই অথচ সন্তান প্রসবের সময় নারীর পাশে স্বামী থাকার যে বিতর্কিত প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। (পৃষ্ঠা-৯০) সে ব্যাপারে জনমত নেওয়া হয়নি। সংস্কার প্রতিবেদনে চার বছরের মধ্যে স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়নের যে রূপরেখা দেওয়া হয়েছে, তার অনেকগুলোই একেবারেই অবাস্তব। মহাসড়কের পাশে থানা স্বাস্থ্য প্রকল্পে ‘ট্রমা সেন্টার’ গঠন অজ্ঞতাপ্রসূত প্রস্তাবনা, এমনকি ক্ষতিকারকও।

আরো দুঃখজনক, স্বাস্থ্য সংস্কার প্রস্তাবনায় রোগ প্রতিরোধের মতো গুরুত্বপূর্ণ, যা বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্যসেবার জন্য একটি ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবে স্বীকৃত, সে বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা নেই । শুধু প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা অবলম্বনের মাধ্যমেই আমাদের প্রধান ঘাতক ব্যাধি যেমন কার্ডিওভাসকুলার অসুখের মৃত্যুর হার ৭০ থেকে ৮০ ভাগ কমানো সম্ভব। একইভাবে মরণব্যাধি ক্যানসার, ডায়াবেটিস, কিডনির অসুখ অনেকাংশে কমানো যায়। সুস্বাস্থ্য রক্ষার জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ছাড়াও অন্যান্য বিভাগ যেমন পরিবেশ, খাদ্য পুষ্টি, কৃষি, সড়ক পরিবহন ও স্বরাষ্ট্র—এসব মন্ত্রণালয়ের সম্মিলিত অংশগ্রহণ অপরিহার্য, যা এই প্রতিবেদনে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। অনাকাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কথা সংস্থার রিপোর্টে একাধিকবার উল্লেখ করলেও এর থেকে পরিত্রাণের কোনো নির্দিষ্ট পন্থার নির্দেশ নেই। স্বাস্থ্যব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির দুর্বলতা চিহ্নিত করা হলেও, শুধু এগুলো জোরদারের কথা বলাই যথেষ্ট নয়।

বেসরকারি খাতে চিকিৎসাব্যবস্থা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হলেও এ ক্ষেত্রে বিদ্যমান ব্যাপক অপচিকিৎসা, অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার (যেমন সিজারিয়ান) সম্পূর্ণ অনিয়ন্ত্রিতভাবে চলছে। দেশে ১৫ হাজার ২৩৩টি বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের মধ্যে মাত্র ৪ হাজার ১২৩টি লাইসেন্স নবায়ন করেছে, অর্থাৎ ১১ হাজারের বেশি এসব প্রতিষ্ঠানই দেশে অবৈধভাবে চলছে। অত্যন্ত এই নাজুক পরিস্থিতির উত্তরণের কোনো সুনির্দিষ্ট রূপরেখা সংস্কার প্রস্তাবনায় নেই।

স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকারক তামাক, নেশা ড্রাগ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণে শুধু শুল্ক বাড়ানোর প্রস্তাব একেবারেই অকার্যকর পদক্ষেপ। খাদ্যশস্যে মারাত্মক বিষাক্ত রাসায়নিক দ্রব্যের ব্যবহার বন্ধের কোনো পদক্ষেপ এখানে নেই।

শুধু এমবিবিএস এবং ডেন্টিস্টরা ডাক্তার পদবি লিখতে পারবেন প্রস্তাবনা অযৌক্তিক। সরকারস্বীকৃত হোমিওপ্যাথিক, আয়ুর্বেদিক ও ইউনানি চিকিৎসকদের অবস্থান কী হবে? চিকিৎসক এবং ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলোর মধ্যে অনৈতিক সম্পর্কের কথা উল্লেখ এবং এটা বন্ধ করার কিছু প্রস্তাবনা থাকলেও নির্দেশনা ভঙ্গকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কী ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে, তার কোনো উল্লেখ নেই। চিকিৎসকদের নিরাপত্তার জন্য মেডিকেল পুলিশের প্রস্তাবনা করলেও জনগণের প্রাপ্য স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার জবাবদিহির কোনো নিশ্চয়তার এখানে নেই।

ঐতিহাসিক জুলাই বিপ্লবে বহু সহস্রাধিক আহতদের যথাযথ চিকিৎসার জন্য অন্তর্বর্তী সরকার প্রথমেই জরুরি ভিত্তিতে ট্রমা সেন্টার গঠন করে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু এবং আহতদের দুর্ভোগ কমাতে পারতেন। এখনো রাজধানীতে অন্তত একটা মডেল ‘ট্রমা সেন্টার’ গঠনের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।

প্রফেসর ইউনূস সরকারের অনেক ক্ষেত্রে সাফল্য থাকলও স্বাস্থ্যব্যবস্থার ক্ষেত্রে এটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এ প্রেক্ষাপটে আগামী নির্বাচিত সরকারের জন্য কিছু প্রস্তাবনা—

স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রশাসন সম্পূর্ণ নতুনভাবে ঢেলে সাজাতে হবে। এখানে ডাক্তারদের প্রাধান্য দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। প্রশাসক হওয়া জন্য পেশাগত যোগ্যতার প্রয়োজন। চিকিৎসকরাও প্রশাসক হতে পারেন, তবে তাদের প্রশাসনে পড়াশোনা এবং সনদ থাকা বাঞ্ছনীয়। শুধু ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য চিকিৎসকদের বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে অন্য ক্যাডার সার্ভিসে যাওয়ার বর্তমান নিয়ম অগ্রহণযোগ্য এবং বাতিল করা উচিত। কারণ দেশেই চিকিৎসকদের সংকট আছে। চিকিৎসকদের নিয়ন্ত্রণকারী সংগঠন বিএমডিসিসহ স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত প্রতিটি নিয়ন্ত্রণকারী সংগঠনগুলো জনপ্রতিনিধি নিয়ে পুনর্গঠন করতে হবে। এদের মূল দায়িত্ব জনসাধারণের স্বাস্থ্য সুরক্ষা করা।

স্বাস্থ্য বিভাগে সর্বাধিক গুরুত্ব পাবে প্রধান মরণব্যাধিগুলোর প্রতিরোধের পদক্ষেপ নেওয়া এবং নাগরিকদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা । বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে থানা স্বাস্থ্য প্রকল্পসহ হাসপাতালগুলো জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান করতে হবে।

৫৪ বছরে ডাক্তারদের জন্য ব্যাপক ট্রেনিংয়ের কোনো সুনির্দিষ্ট নিয়মমালা না থাকার কারণে এ পর্যন্ত খুবই অল্পসংখ্যক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং জেনারেল ফিজিশিয়ান তৈরি হয়েছেন। তারা স্বাস্থ্যব্যবস্থার মূলস্তম্ভ। এই স্পেশালিটিতে আসার জন্য ডাক্তারদের বিশেষ সুবিধা দিতে হবে। জেনারেল ফিজিশিয়ানসহ স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতিটি স্পেশালিটিতে আন্তর্জাতিক মানের প্রোগ্রামের আদলে ট্রেনিং প্রোগ্রাম প্রবর্তন করতে হবে। কয়েক বছর সফলভাবে প্রশিক্ষণ সমাপ্ত করার পরই একজন চিকিৎসক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হিসেবে বিবেচিত হবেন এবং এর মধ্যে তাকে অবশ্যই পোস্ট গ্র্যাজুয়েট পরীক্ষায় এফসিপিএস/এমডি উত্তীর্ণ হতে হবে। নার্সদেরও শিক্ষা কারিকুলাম এবং ট্রেনিং উন্নত করতে হবে। নার্সদের স্নাতকোত্তর শিক্ষা অর্জনের জন্য উৎসাহ ও সুবিধা দিতে হবে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হবে মনিটরিং করা। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত সব প্রতিষ্ঠান ও প্রকল্পের মান ঠিকমতো মেনে চলছে কি না, তার তদারকি করবেন। যেমনটি ব্রিটেনে সিকিউসি এবং অন্যান্য বিভাগের মাধ্যমে করা হয়।

এটা প্রমাণিত, বিগত কয়েক দশকে চিকিৎসকদের রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠনের অশুভ কার্যক্রম স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়নের অন্যতম প্রধান অন্তরায়। চিকিৎসকদের এ ধরনের সংগঠন থাকাটাই সম্পূর্ণ অনৈতিক। রাজনৈতিক দলগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে এবং তাদের চিকিৎসক সংগঠন থাকলে জনগণের স্বার্থে সেগুলো বিলুপ্ত করা উচিত।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...