এনসিপি কি ‘ট্রেন মিস’ করতে যাচ্ছে

এনসিপি কি ‘ট্রেন মিস’ করতে যাচ্ছে

বিপ্লবকে রোমান পুরাণের দেবতা স্যাটার্নের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন ফরাসি সাংবাদিক জাক মালে দু পাঁ। বলা হয় নিজের ক্ষমতাচ্যুতি ঠেকাতে স্যাটার্ন নিজেই নিজের সন্তানদের গিলে খেয়ে ফেলতেন। ফরাসি বিপ্লবের সময় রাজতন্ত্রবাদী ওই সাংবাদিক লেখেন, ‘স্যাটার্নের মতোই বিপ্লব তার নিজের সন্তানদের গ্রাস করে।’

২০২৪-এর বাংলাদেশে বিপ্লবকে ব্যর্থ করে দিতে নিষ্ঠুর শাসক শেখ হাসিনা বিপ্লবীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও নির্বিচারে হত্যা করেন এবং এক ‘ত্রাসের রাজত্ব’ দীর্ঘায়িত করতে মরিয়া হয়ে ওঠেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হন। ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর সমন্বয়কারীরা প্রাণে বেঁচে যান, কারণ তখন স্বৈরশাসক হাসিনার পক্ষে জনগণের রোষ থেকে পালিয়ে বাঁচা ছাড়া গত্যন্তর ছিল না।

বিজ্ঞাপন

তবে ফরাসি সাংবাদিকের পর্যবেক্ষণ যে জুলাই ২০২৪-এর বাংলাদেশ বিপ্লবেও অক্ষরে অক্ষরে মিলবে—এমন কোনো কথা নেই। বরং নাহিদ, আসিফ, সারজিস, হাসনাত, হান্নান, মাহফুজ, নুসরাত, বাকের, উমামা, আরিফ, সিনথিয়া, রিফাত, হাসিব, মহিমসহ তরুণ সমন্বয়কারীরা বিপ্লবের সন্তান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন, বিশেষ করে তিন সপ্তাহব্যাপী এর ‘পুষ্পায়ন’ পর্যায়ে।

গণআন্দোলনের চারাগাছ রোপণ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে। এটি চলে ২০১১ সাল থেকে যখন শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ কারচুপির মাধ্যমে ক্ষমতায় থাকার খায়েশে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে। তিন তিনটি কারচুপির নির্বাচনে তার প্রমাণও মেলে। সেই অন্যায় রাজত্বের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের চারাগাছে নীরবে পানি দেয় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।

অবশেষে সেই আন্দোলন বিপ্লবে রূপ নেয় ২০২৪ সালে; ৫ আগস্ট স্বৈরশাসক শেখ হাসিনাকে দেশছাড়া করার মধ্য দিয়ে এর প্রাথমিক বিজয় অর্জিত হয়। যে রাষ্ট্রীয় কাঠামো বাংলাদেশিদের নিজ বাসভূমে পরাধীন করে রেখেছিল, সেই ব্যবস্থারও পতন হয়।

শেখ হাসিনার সর্বশেষ দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে সম্মুখসারির যোদ্ধা ছাত্র সমন্বয়কারীরা পরবর্তী বিপ্লবী পরিবর্তনের নেতৃত্ব দিতে পারতেন। তাদের মধ্যে দুজন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদে অন্তর্ভুক্ত হন। কিন্তু সেটি ছিল না কোনো বিপ্লবী সরকার; আবার বিএনপিসহ অন্যান্য গণতন্ত্রপন্থি রাজনৈতিক দলও এতে যোগদানে বিরত থাকে।

গণঅভ্যুত্থানের প্রথম বার্ষিকীর আগেই তরুণরা ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) গঠন করেন। এর আগে পর্যন্ত পরাজিত আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে তারা সমালোচনার মুখে ছিলেন। পরে একই সঙ্গে সরকারে থেকে দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার অভিযোগে নতুন করে সমালোচিত হতে থাকেন জুলাইযোদ্ধা তরুণরা।

তাদের জনসমর্থন ধরে রাখতে না পারা কিংবা ক্যাম্পাসে নিজেদের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ার প্রতিফলন দেখা যায় দেশের প্রধান পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র সংসদ নির্বাচনে বৈষম্যবিরোধী জোট প্রার্থীদের ভরাডুবিতে। এসব নির্বাচনে জামায়াত-সমর্থিত ছাত্রশিবির ব্যাপক সাফল্য পায়। তবে জাতীয় নির্বাচনে জামায়াতের সঙ্গে জোট করে এনসিপির তরুণ নেতারা ৩০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ৩০০ সদস্যের জাতীয় সংসদে ছয়টি আসন পেতে সমর্থ হন।

মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের মধ্যস্থতায় নির্বাচনের আগে সংস্কার এজেন্ডাসংবলিত জুলাই জাতীয় সনদ নিয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। এখন পর্যন্ত বিপ্লবের অন্যতম প্রধান শক্তি এনসিপি ক্ষমতাসীন বিএনপিকে সেই সংস্কারগুলো দ্রুত ও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়নে রাজি করতে পারেনি। সম্প্রতি যারা এনসিপি নেতাদের বিভিন্ন স্থানে আক্রমণ করছে, তাদেরও হয়তো ধারণা দলটির ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা সুদূর পরাহত।

ফলে যেকোনো রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মনে হতে পারে, এনসিপি একদিকে ক্যাম্পাসে শক্তি হারিয়েছে, অন্যদিকে ছয় সদস্যের একটি ক্ষুদ্র দলে পরিণত হয়েছে জাতীয় সংসদে, যদিও তাদের তরুণ সংসদ সদস্যদের বক্তৃতা অনেককে মুগ্ধ করেছে। সংসদে বিএনপি জোটের শক্তি দুই-তৃতীয়াংশ এবং জামায়াতের সদস্য ৭০-এর মতো। আগামী জাতীয় নির্বাচনে ক্ষমতার দাবিদার কিংবা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার মতো লক্ষণ এখনো দেখাতে পারেননি তারা।

সমালোচক অথবা দলের নেতাকর্মীÑকেউই এনসিপির বর্তমান অবস্থান ও সম্ভাবনা নিয়ে বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন করতে পারেননি। অথচ গণভিত্তি সুসংহত করা এবং জনগণের আস্থাভাজন একটি সংগঠন হিসেবে গড়ে ওঠার জন্য বর্তমানের চেয়ে অনুকূল সময় আর হয়তো পাবে না এনসিপি।

নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ কার্যত অচল হয়ে পড়েছে, কারণ শেখ হাসিনাসহ এর শীর্ষ নেতারা তরুণদের তাড়নায় দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। বিএনপিতেও জেনারেশন গ্যাপ রয়েছে, যার প্রতিফলন দেখা গেছে ছাত্রসংগঠনের নেতাদের নির্বাচনি পরাজয়ে। অন্যদিকে জামায়াত একটি রক্ষণশীল দল; সদস্যপদ গ্রহণের মতো প্রক্রিয়া আরো উন্মুক্ত না হলে ভবিষ্যতে এটি ‘বনসাই সিনড্রোম’-এ ভুগতে পারে।

বাংলাদেশের রাজনীতি আজ এক উত্তরণের পর্যায়ে আছে। অবস্থা এমন যে আওয়ামী লীগের কিছু সমর্থক বিএনপিতে যোগ দিতে পারেন, আবার তাদের ইসলামপন্থি একটি অংশ জামায়াতেও যেতে পারেন। তবে বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে এমন অনেকে আছেন, যারা এই তিন দলের কোনো একটির সঙ্গেও নিজেদের যুক্ত করতে চাইবেন না। এই গোষ্ঠীর জন্য এনসিপি একটি সম্ভাবনাময় রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠতে পারে।

আর যদি এনসিপি সেই সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়, তবে সেই রাজনৈতিক ফায়দা নেবে কোন দল? সম্ভবত পুরোটা বিএনপি বা জামায়াতের হবে না। সে ক্ষেত্রে নতুন মেরূকরণে আরো দুটি নতুন রাজনৈতিক বলয় তৈরি হতে পারে—একটি আওয়ামী লীগপন্থি মধ্য-বাম ধারার প্রতিনিধিত্ব করবে এবং হয়তো ২০-২৫টি আসন পাবে; অন্যটি হতে পারে মধ্য-ডানপন্থি নতুন শক্তি, যদিও তার সম্ভাবনা তুলনামূলক অনিশ্চিত। ১৯৭০-এর দশকে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) আত্মঘাতী রাজনীতির মাধ্যমে নিজের গণতান্ত্রিক বিকল্প হয়ে ওঠার পথ বন্ধ করে। ফলে, ১৯৮০-এর দশকে বিএনপির উত্থান এবং একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থার পতনের পর আওয়ামী লীগের পুনরুত্থান প্রক্রিয়ায় আর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী থাকেনি।

এই মুহূর্তে এনসিপির সমস্যাটা তাহলে কোথায়? বাইরে থেকে মনে হয়, দলটির নেতারা নিয়মিত সাংগঠনিক কাজ-কর্মেই কাহিল হয়ে পড়েছেন, গণমাধ্যমে উপস্থিতি এবং জনসমাগমে পাওয়া উচ্ছ্বাসে বেশ আপ্লুত হয়ে আছেন।

দলটি বেশ কয়েকজন তারকা পেয়েছে, কিন্তু অভিজ্ঞ চিন্তাশীল ব্যক্তি ও প্রবীণ ‘মুরব্বি’দের সম্পৃক্ত করে প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সম্পদ সংগ্রহ করতে পারেনি। দীর্ঘদিন বই পড়া, সমাজ দর্শন, জীবন ও রাজনীতির সংকট থেকে শিক্ষা না নিলে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা অর্জন হয় না।

ফলে, অতীতের কিছু ছাত্রনেতার চেয়ে তাদের যোগাযোগ দক্ষতা ও বক্তৃতাশৈলী উন্নত হলেও, আম-জনতাকে সম্ভাব্য ভোটার বানাতে পারেননি তারা। প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে দলটি চাইলে সাধারণ মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করতে পারেÑকেন জুলাই সনদ বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

যদি দলটি মনে করে, আগামী (১৪তম) জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসনসংখ্যা তিন বা চার গুণ বাড়িয়ে ১৮ থেকে ২৪-এ নিতে পারলেই ১৫তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দেশের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় রাজনৈতিক শক্তি হয়ে উঠবে, তবে সেই হিসাব তাদের ক্ষমতার ধারেকাছেও নেবে না। এরই মধ্যে নতুন কোনো রাজনৈতিক শক্তি হয়তো সেই সুযোগ গ্রহণ করবে।

এখনো এনসিপির নেতৃত্বের বয়সসীমার মানুষদের, নির্দিষ্ট করে বললে ৩৫ বছরের নিচের তরুণদের সমর্থন নিজেদের ঝুলিতে রাখার সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে দলটি। কিন্তু তাদের সঙ্গে আদর্শিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে না পারলে নিজেদের প্রজন্মের সমর্থনও হারানোর ঝুঁকি রয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠী, পেশাজীবী এবং নানা বয়সের মানুষের জন্য দলকে আরো উন্মুক্ত করার প্রয়োজনীয়তাও উপলব্ধি করতে পারেনি এনসিপি নেতৃত্ব।

শোনা যায়, দল ও এর নেতারা অর্থসংকটে ভুগছেন। বাংলাদেশের প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলো যখন অস্বচ্ছ নির্বাচনি অর্থায়নের জন্য সমালোচিত, তখন এনসিপির উচিত ছিল এরই মধ্যে স্বচ্ছ ও টেকসই তহবিল সংগ্রহের একটি মডেল দাঁড় করা; সেটি দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারত।

ঐতিহাসিক ট্রেনটি হাতছাড়া করার আগে কিংবা রাজনৈতিকভাবে নিজেদের বিনাশ করার আগেই এনসিপি নেতাদের নিজেদের প্রশ্ন রাখা উচিতÑবাংলাদেশের নতুন এবং এমনকি পুরোনো প্রজন্ম কেন নতুন ধরনের রাজনীতির প্রতিশ্রুতি ছাড়া তাদের আন্দোলন ও দলকে সমর্থন জোগাবে?

লেখক: সাংবাদিক

khawaza@gmail.com

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন