জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ

অনন্য দৃষ্টান্তে বাংলাদেশ

এলাহী-নেওয়াজ-খান
এলাহী নেওয়াজ খান

অনন্য দৃষ্টান্তে বাংলাদেশ
ছবি: সংগৃহীত

এই উপমহাদেশে বিগত ৭২ বছরে তিনজন ব্যক্তিত্ব জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন। তাদের মধ্যে বাংলাদেশেরই দুজন। প্রথমজন হচ্ছেন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর বড় বোন বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিত। তিনি ১৯৫৩ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অষ্টম সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। দ্বিতীয়জন হচ্ছেন বাংলাদেশের ঝানু কূটনীতিক ও রাজনীতিবিদ হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী। তিনি ১৯৮৬ সালে জাতিসংঘের ৪১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। এর আগে তিনি পররাষ্ট্রসচিব, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই ঘটনার ৪০ বছর পর সর্বশেষ জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হলেন বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের অধিকারী এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান।

এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৪৬ সালের ১০ জানুয়ারি লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টার হলে। সেই অধিবেশনে প্রথম সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন বেলজিয়ামের বিশিষ্ট কূটনীতিক ও রাজনীতিবিদ পল-হেনরি স্পাক। তার অনন্য কৃতিত্ব হচ্ছে, তিনি চারবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে নিয়ম অনুযায়ী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে এক ব্যক্তি একবারই সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে সভাপতিত্ব করে থাকেন। তবে একবার এর ব্যতিক্রম ঘটেছিল। আর সেটা ছিল ১৯৪৭ সালের ঘটনা। সভাপতি হিসেবে ব্রাজিলের প্রখ্যাত কূটনীতিক ও রাজনীতিবিদ ওসভালদো আরানহা ভিন্ন দুটি অধিবেশনের সভাপতি ছিলেন। প্রথমটি ছিল একটি বিশেষ অধিবেশন। দ্বিতীয়টি ছিল নিয়মিত অধিবেশন। আর এই নিয়মিত অধিবেশনে তার সভাপতিত্বে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত সৃষ্টিকারী জাতিসংঘ প্রস্তাব ১৮১ গৃহীত হয়েছিল। অর্থাৎ এই প্রস্তাবের ভিত্তিতেই ১৯৪৮ সালের ১৪ মে ইসরাইল নামক দানব রাষ্ট্রটির জন্ম হয়।

এদিকে এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চল থেকে এ পর্যন্ত (৮১তম অধিবেশনসহ) বিভিন্ন দেশের ২০ জন ব্যক্তিত্ব জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। এর মধ্যে একমাত্র বাংলাদেশেরই দুজন সভাপতি হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছেন। এই কৃতিত্ব এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের আর কোনো দেশের ভাগ্যে জোটেনি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নানা উত্থান-পতন, সংঘাত ও রক্তপাতের ঘটনাবলি সত্ত্বেও বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের কৃতিত্বপূর্ণ এই অবস্থান অনেক গুরুত্ব বহন করে। যদিও আমরা এমন একটা জাতি, যারা কোনো গৌরবকেও সহজভাবে মেনে নিতে পারি না; নানা নেতিবাচক মন্তব্য দিয়ে খাটো করার চেষ্টা করে থাকি। যেমনটা দেখলাম খলিলুর রহমানের ক্ষেত্রে—কেউ কেউ নেতিবাচক মন্তব্য করার অপচেষ্টা চালিয়েছেন।

যাহোক, সাধারণ পরিষদের ইতিহাসে এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চল গ্রুপে শুধু বাংলাদেশের পাশাপাশি অন্যান্য গ্রুপের মাত্র আটটি দেশে দুজনের সভাপতি হওয়ার নজির রয়েছে। সে দেশগুলো হচ্ছে—আর্জেন্টিনা, চিলি, ইকুয়েডর, জার্মানি, হাঙ্গেরি, নাইজেরিয়া ও স্পেন। এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে বাংলাদেশ সেই গৌরবের অধিকারী, যা আগেই উল্লেখ করেছি। এছাড়া জাতিসংঘের সৃষ্টি হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের মাত্র ১৭টি দেশ সভাপতি হওয়ার সুযোগ লাভ করেছে। সে দেশগুলো হলো—ফিলিপাইন, ইরান, ভারত, লেবানন, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা, ইরাক, বাংলাদেশ, সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, বাহরাইন, কাতার, ফিজি ও মালদ্বীপ।

এসব ছাড়া জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পদ্ধতি সম্পর্কেও পরিষ্কার হওয়া দরকার। মূলত রোটেশন বা আবর্তনের ভিত্তিতে পাঁচটি আঞ্চলিক গ্রুপের ভিত্তিতে সভাপতি নির্বাচিত হয়ে থাকেন। যেমন জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্রকে প্রধান পাঁচটি আঞ্চলিক গ্রুপে ভাগ করা হয়েছে। আর সাধারণ পরিষদের সভাপতি এই পাঁচটি গ্রুপে আবর্তিত হন। এই গ্রুপগুলো হচ্ছে—আফ্রিকান গ্রুপ, এশিয়া প্যাসিফিক গ্রুপ, পূর্ব ইউরোপীয় গ্রুপ, লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় গ্রুপ এবং পশ্চিম ইউরোপীয় ও অন্যান্য গ্রুপ। এই গ্রুপ ভিত্তিতে যে বছর যে গ্রুপের পালা থাকে, সেই গ্রুপ তাদের প্রার্থী মনোনয়ন দিয়ে থাকে।

এক্ষেত্রে যে গ্রুপের পালা থাকে, সে গ্রুপের দেশগুলো সর্বসম্মতভাবে একজনকে অনুমোদন দিলে আর নির্বাচনের প্রয়োজন হয় না। কিন্তু একাধিক প্রার্থী হলে গোপন ব্যালটের মাধ্যমে সভাপতি নির্বাচিত হন। যেমন এ বছর এশিয়া প্যাসিফিক গ্রুপের পালা ছিল। কিন্তু এই গ্রুপের দেশগুলো সর্বসম্মত একক প্রার্থী না দিতে পারায় বাংলাদেশ ও সাইপ্রাস প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। গোপন ভোটাভুটিতে বাংলাদেশের প্রার্থী খলিলুর রহমান ৯৯ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। আর সাইপ্রাসের প্রার্থী পান ৯১ ভোট।

এই সামগ্রিক তথ্যের ভিত্তিতে এটা বোঝা যায়, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির মেয়াদ মাত্র এক বছর হলেও বিশ্বমঞ্চে এর গুরুত্ব অপরিসীম। আর বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের জন্য তো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। এ প্রসঙ্গে ব্যাখ্যায় যাওয়ার আগে এটা বলা দরকার যে, সাধারণ পরিষদের সভাপতি কোনো একটি দেশ থেকে নির্বাচিত হলেও জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্রের বৈশ্বিক নীতি, মানবাধিকার, জলবায়ু, অর্থনৈতিক বিষয়ে সমঝোতা তৈরি করা এবং সদস্যদেশগুলোর ভিন্ন ভিন্ন চাওয়া ও অবস্থানের জটিল পরিস্থিতির মধ্যে সমন্বয় সাধন করে আলোচনার পথ খোলা রাখার কাজটি সভাপতিই করে থাকেন। শুধু তাই নয়, তিনি সাধারণ পরিষদের সুপারিশের ভিত্তিতে জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব নিয়োগের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

সুতরাং সভাপতির ভূমিকা আরো ব্যাপক ও বিস্তৃত, যা এই সংক্ষিপ্ত আলোচনায় শেষ করা সম্ভব নয়। তাই ওদিকে আরো বেশি না গিয়ে বাংলাদেশের জন্য বর্তমান সভাপতি কেন গুরুত্বপূর্ণ, সে বিষয়ে একটু আলোকপাত হওয়া দরকার। এরই মধ্যে অনেকেই জেনেছেন, বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানকালে যে গণহত্যা চালিয়েছিল, সে সম্পর্কে সাফাই গেয়ে দলটি জাতিসংঘে একটি আবেদন করেছিল, যা সম্প্রতি প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। অর্থাৎ ওই গণহত্যা সম্পর্কে জাতিসংঘ যে রিপোর্ট প্রদান করেছিল, সেখানে বিশ্বসংস্থাটি অবিচল আছে। সেই রিপোর্টে বলা হয়েছিল, ওই গণহত্যার দায় থেকে কেউ যেন মুক্তি না পায়। আর ওই সময় যে সরকার ক্ষমতায় ছিল, সেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ছিলেন সাধারণ পরিষদের নবনির্বাচিত সভাপতি খলিলুর রহমান। তাই স্বাভাবিকভাবে জাতিসংঘের মানবাধিকার মানদণ্ড রক্ষার সেই গুরুদায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে খলিলুর রহমান নিশ্চয়ই সচেষ্ট থাকবেন এবং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে সুতীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখবেন।

এদিকে একদা যারা খলিলুর রহমানকে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে মেনে নিতে দ্বিধাবোধ করেছিলেন, তাদের তাদের জন্য এটা কিছুটা বিব্রতকর হলেও আখেরে শুভ বার্তাই বহন করছে। শান্তিরক্ষী মিশন এবং রাজনৈতিক ও তদন্ত মিশন সরাসরি সাধারণ পরিষদের সভাপতির কমান্ডে নেই, এগুলো মহাসচিব ও নিরাপত্তা পরিষদের অধীন। তা সত্ত্বেও বিভিন্ন মিশনের বাজেট পাস এবং সমস্যা ও সংকট নিয়ে সাধারণ পরিষদে আলোচনার সমন্বয় সাধন করে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন সভাপতি। সুতরাং সরাসরি কমান্ডে না থাকলেও সভাপতির গুরুত্ব থেকেই যাচ্ছে—আগামী দিনগুলোয় বাংলাদেশের জন্য তা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠবে।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...