আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ : দুর্ভিক্ষ নির্যাতন ও প্ল্যান বি

ড. ইশরাত জাকিয়া সুলতানা

রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ : দুর্ভিক্ষ নির্যাতন ও প্ল্যান বি
ছবি: সংগৃহীত

ভারত ৪৩ জন রোহিঙ্গাকে সমুদ্রে ফেলে দিয়েছে মর্মে জাতিসংঘের বিশেষ র‍্যাপোটিয়ার অভিযোগ এনেছে। ভারতের বিচারপতিরা একে শুধু যে তথ্য-প্রমাণহীন অভিযোগ বলে অভিহিত করেছেন, তাই নয়, ভারতের সংকটময় পরিস্থিতিতে এ জাতীয় বিষয়ের অবতারণা একদমই সঠিক নয় বলেও মন্তব্য করেছেন।

ভারতে রোহিঙ্গার সংখ্যা ৩০,০০০ থেকে ৪০,০০০-এর মধ্যে। কিন্তু জোরপূর্বক রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোসহ ভারতের রোহিঙ্গাবিরোধী অবস্থানের নমুনা এর আগেও প্রকাশ পেয়েছে। মানবতার চেয়ে দেশের স্বার্থ তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেশী দেশের তুলনায় বাংলাদেশের চিত্র অবশ্য একেবারেই ভিন্ন।

বিজ্ঞাপন

২০১৭ সালে আসা রোহিঙ্গাদের একজনকেও জবরদস্তিমূলক ফেরত পাঠানোর একটি নজিরও বাংলাদেশের নেই। অধিক জনসংখ্যা ও সীমিত সম্পদের বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের সংখ্যা উখিয়া ও টেকনাফের মোট জনসংখ্যাকে অতিক্রম করে গিয়েছে অনেক আগেই। তবে রোহিঙ্গা বিষয়ে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পার্থক্যটি হলো বাংলাদেশকে জাতিসংঘ এবং বৃহৎ শক্তির দেশগুলো রোহিঙ্গা বিষয়ে প্রভাবিত করতে পারে, ভারতকে পারে না। জাতিসংঘের উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা কর্তৃক ২০২৪ সালে প্রকাশিত রাখাইনে দুর্ভিক্ষবিষয়ক প্রতিবেদন অতি নীরবে বাংলাদেশে যে শোরগোল পাকিয়েছে, তা কখনোই ভারতে সম্ভব নয়। দুর্ভিক্ষ নিয়ে বলার আগে কয়েকটি প্রশ্ন সামনে রাখা প্রয়োজন।

২০২৫ সালের প্রথমার্ধে হঠাৎ করে কেন বাংলাদেশে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটল? সরকারি সূত্রমতে ১,১৩,০০০ রোহিঙ্গা এবং গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী ১,৫০,০০০ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে ২০২৫ সালের এপ্রিল মাস নাগাদ। সংখ্যাটি বছর শেষে আরো বড় হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। জাতিসংঘের মহাসচিবের রোহিঙ্গা ক্যাম্প সফর, রোজায় রোহিঙ্গাদের সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা ও জাতিসংঘের মহাসচিবের ইফতার গ্রহণ, ২০২৬-এর ঈদ রোহিঙ্গাদের স্বদেশে উদযাপন করার সুযোগ তৈরিসহ আরো নানা ইতিবাচক সংবাদ যখন রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশের মানুষকে আশাবাদী করে তুলেছিল, তার পরপরই কেন রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঘটল? ঘটনাটির সঙ্গে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টার করিডোরবিষয়ক স্লিপ অব টাংয়ের কোনো যোগসূত্র আছে কি? এই অনুপ্রবেশ কি মিয়ানমার তথা আরাকান আর্মির ওপর প্রভাবশীল কোনো দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রকাশ? এ বছর আসা রোহিঙ্গারা কি দুর্ভিক্ষপীড়িত হয়ে নাকি বরাবরের মতো নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছে? এ প্রশ্নগুলোর উত্তরের পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ আমাদের কাছে আছে কি?

২০২৪ সালের ঐতিহাসিক প্রতিবেদন প্রকাশের পর জাতিসংঘ শঙ্কিত হয়েছিল, রাখাইনের দুর্ভিক্ষ মোকাবিলা করা না গেলে এবার শুধু রোহিঙ্গা নয়, সেখানে বসবাসরত বাকি জনগোষ্ঠীও নাকি সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারে। তাই, জাতিসংঘ চেয়েছিল, সেখানকার দুর্ভিক্ষ মোকাবিলায় বাংলাদেশ মানবিক সহায়তা পাঠাক। দুর্ভিক্ষ নিয়ে প্রতিবেদন কী কী বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে?

রাখাইন : এক দুর্ভিক্ষের সূত্রপাত’ শিরোনামের এ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাখাইন শিগগিরই চরম দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি হতে পারে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চ-এপ্রিল নাগাদ রাখাইনের অভ্যন্তরীণ খাদ্য উৎপাদন তার চাহিদার মাত্র ২০ শতাংশ পূরণ করতে পারবে। অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বাণিজ্য প্রায় সম্পূর্ণই স্থবির হয়ে পড়ার ফলে ২০ লাখেরও বেশি মানুষ অনাহারের ঝুঁকিতে পড়বে। ইউএনডিপি সতর্ক করে বলেছে, জরুরি ব্যবস্থা না নিলে ৯৫ শতাংশ জনগণ বেঁচে থাকার সংগ্রামে পিছিয়ে পড়বে। ভাষার ওস্তাদির কাছে হার মানতেই হয়। বলা হয়নি, তারা মারা যাবে। জীবন-সংগ্রামে পিছিয়ে পড়ার একাধিক অর্থ নিরূপণ করা যেতে পারে। বাংলাদেশের কত মানুষ জীবন-সংগ্রামে পিছিয়ে রয়েছে, সেটার পরিসংখ্যান কি আমরা জানি? কিংবা আমেরিকার মতো উন্নত দেশে তাদের কত নাগরিক জীবন-সংগ্রামে প্রতিনিয়ত পিছিয়ে পড়ছে, তা-ও কি আমরা জানি? যাই হোক। রাখাইনে পণ্য ও মানবিক সহায়তা প্রবেশের জন্য অবিলম্বে ব্যবস্থা গ্রহণ করা আবশ্যক মনে করেছে জাতিসংঘ। সেই সঙ্গে বাংলাদেশকে অনুপ্রাণিত করেছে সেখানকার মানুষের জন্য মানবিক সহায়তাদানের কথা ভাবতে। তা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে যত সংকটময় পরিস্থিতিই বিরাজ করুক না কেন।

বাংলাদেশ সেই প্রতিবেদনে ও জাতিসংঘের অনুরোধ-আবদারে এতটাই প্রভাবিত হয়েছে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বৈকালিক ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা রীতিমতো ঘোষণা দিয়ে দিলেন, ‘নীতিগতভাবে আমরা রাখাইন রাজ্যে করিডোরের ব্যাপারে সম্মত হয়েছি। জাতিসংঘ চেয়েছে সহায়তা আর উপদেষ্টা মহোদয় প্রস্তুত হয়েছিলেন করিডোর দিতে। ধন্যবাদ জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাকে যিনি সম্প্রতি সংবাদ সম্মেলনে বিষয়টি পরিষ্কার করেছেন, এ জাতীয় কোনো আলোচনা কারো সঙ্গে হয়নি, হবেও না। তিনি এ ধরনের তথ্যকে ‘বিভ্রান্তিকর’ এবং ‘অপব্যবহার’ বলে অভিহিত করেছেন এবং পররাষ্ট্র উপদেষ্টার বক্তব্যকে স্লিপ অব টাং বলেছেন। আসলে একজন রিকশাচালক বা কৃষক বা যেকোনো পর্যায়ের সাধারণ নাগরিক দেশ নিয়ে যা তা বলে ফেললেও দেশের তাতে কিছু আসে যায় না। কিন্তু একজন উপদেষ্টার স্লিপ অব টাং হওয়া কাম্য নয়। কারণ, তার দিকে পুরো দেশ তাকিয়ে থাকে। তার ছোট্ট একটা কথার প্রভাব অনেক বড়। সারাজীবন পররাষ্ট্র দপ্তর সামলানো একজন সুদক্ষ আমলা করিডোর দেওয়া আর সহায়তা দেওয়ার মধ্যে পার্থক্য জানবেন না, তা কি হয়?

বাংলাদেশ কি নিজে খোঁজ নিতে পারত না আসলেই রাখাইনে দুর্ভিক্ষ হচ্ছে কি না? বাংলাদেশ কি নিজ দায়িত্বে দুর্ভিক্ষের প্রমাণ বা দৃষ্টান্ত বা আলামত সংগ্রহ করতে পারত না? কেন একটা প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করে থাকতে হবে বাংলাদেশকে? এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, মানবিক সহায়তা দিতে জাতিসংঘকে কেন বলতে হবে? কেউ বলার আগেই মিয়ানমারে ভূমিকম্পের পর চিকিৎসকসহ প্রায় ৫০ জন বিশেষজ্ঞ উদ্ধারকর্মীর দলকে দুবার মিয়ানমারে অন্য যেকোনো প্রতিবেশী দেশের তুলনায় বেশি ত্রাণ সহায়তাসহ কি পাঠায়নি বাংলাদেশ? তাহলে সহায়তার বিষয়টি তো বাংলাদেশের কাছে নতুন নয়। করিডোর, সহায়তা, প্যাসেজ, স্লিপ অব টাংÑএত শোরগোলের মাঝে যে কথাটি অধিকাংশের মনোযোগ এড়িয়ে গেল, তা হলোÑসেই প্রতিবেদনে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল এবং কিছু আশঙ্কা তুলে ধরা হয়েছিল মাত্র। কিন্তু দুর্ভিক্ষ কী কী ক্ষতি করেছে, তা নিয়ে কোনো প্রতিবেদন এখনো প্রকাশিত হয়নি। তাহলে ২০২৫-এর শুরুতে রোহিঙ্গা-অনুপ্রবেশ কেন ঘটল?

এর উত্তর বিস্তারিত করার কোনো আবশ্যকতা নেই। এ বছর বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে এ পর্যন্ত যাদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে (যা ইউটিউবে প্রকাশ্য), তাদের সবাই বাংলাদেশে আসার একটি কারণই বলেছে। তা হলোÑআরাকান আর্মির হাতে নির্যাতিত হওয়া। দুর্ভিক্ষ নিয়ে কেউ কোনো কথা বলেনি। তাহলে বাংলাদেশ কেন মানবিক সহায়তা পাঠাতে ব্যগ্র হয়ে উঠল? রাজনৈতিক দলগুলোর কেউ এ প্রশ্নটি করেনি। ‘দুর্ভিক্ষে’র জনপ্রিয় হয়ে ওঠার কারণ বিশ্লেষণ করলে যা দাঁড়ায় তা হলোÑদুর্ভিক্ষ নিয়ে গণমাধ্যমের প্রমাণহীন প্রচারণা (আল-জাজিরা, দি গার্ডিয়ান, এনডিটিভি, এমনকি ঢাকা ট্রিবিউন পর্যন্ত এ প্রচারণায় শামিল), রাখাইন থেকে বাংলাদেশের তথ্য সংগ্রহ করতে না পারা, দুর্ভিক্ষকে সহজেই সহানুভূতি অর্জনের কৌশল হিসেবে ব্যবহার করতে পারা এবং দুর্ভিক্ষকে অজুহাত বানিয়ে রাজনৈতিকভাবে মোটামুটি একটা নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকা। অর্থাৎ সত্যের চেয়ে স্বস্তি বেশি কাঙ্ক্ষিত হয়ে উঠেছে।

পৃথিবী যখন রাখাইনে দুর্ভিক্ষ দেখে, রাখাইনের রোহিঙ্গারা তখন দেখে আরাকান আর্মির হাতে নিজেদের নির্যাতিত হতে। তবে, স্বনামধন্য গণমাধ্যমে এ কথা স্থান পায় না। রোহিঙ্গাদের নির্যাতিত হওয়ার কথা প্রকাশ পায় Radio Free Asia, Bay of Bengal Post, The New Humanitarian, BenarNews, International Affairs Review, Rohingya Centre UK প্রভৃতি মাধ্যমে। ৩০ জানুয়ারি, ২০২৫ থেকে ৬ মে, ২০২৫-এর মধ্যে প্রকাশিত এদের প্রতিবেদনগুলোয় তুলে ধরা হয় আরাকান আর্মি কীভাবে ব্যাপক হত্যা, নির্যাতন, জোরপূর্বক নিয়োগ এবং রোহিঙ্গা গ্রাম ধ্বংসের মাধ্যমে সাম্প্রতিক সময়ে হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে পালাতে বাধ্য করেছে। আর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হিসেবে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের ভাষ্য তো রয়েছেই।

তবে, আরাকান আর্মির খুঁটি যার হাতে, করিডোরবিষয়ক বাগাড়ম্বর তাদের ক্ষীপ্ত করেছে কি না, সে ভাবনাটি গুরুত্বপূর্ণ বৈকি। যে দেশের সঙ্গে বাংলাদেশ শুধু মধুচন্দ্রিমা শুরু করেছে, তারা বিনিয়োগ, চিকিৎসাসেবা ইত্যাদি ক্ষেত্রে যে আশার আলো আমাদের দেখাচ্ছে, তারা ক্রোধান্বিত হলে বাংলাদেশের সামনে কঠিন দিন অপেক্ষা করছে। কিন্তু তাদের মধ্যস্থতায়ই যে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সম্ভব হতে পারে, সেটি বাংলাদেশের না বোঝার কারণ নেই। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য শতভাগ অনুকূল পরিবেশ মিয়ানমারে সৃষ্টি হবে, এমনটি আশা না করাই ভালো। বরং, প্রত্যাবাসন বাধাগ্রস্ত হলে প্ল্যান বি রাখা প্রয়োজন এখনই।

জাতীয় শরণার্থী নীতি প্রণয়ন ও সে অনুযায়ী রোহিঙ্গাদের ‘শরণার্থী’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং শিক্ষা ও কাজের সুযোগ অবারিত করে দেওয়া প্ল্যান বির অন্তর্ভুক্ত হতে হবে। সেই সঙ্গে আন্তর্জাতিক আদালতে মিয়ানমারের গণহত্যার বিচার কার্যকর করার তদবিরও বাংলাদেশকেই করতে হবে। এ বিষয়ে জাতিসংঘ সরব না হলেও বাংলাদেশের হাত দিয়ে মিয়ানমারে মানবিক সহায়তা পাঠাতে বেশ উচ্চকণ্ঠ। ফুটো বালতিতে অবিরাম জল ঢাললেও তা কখনো পরিপূর্ণ হয় না। সংকটের উৎস যে মিয়ানমারে, তার কাছে জাতিসংঘ টু শব্দটিও করতে পারে না, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয় যে বাংলাদেশ, তাকে সহায়তার হাত বাড়াতে বলে। আমরা রোহিঙ্গাদের জন্য সীমান্ত বন্ধ করতে পারি না, তাদের সাগরে ফেলে দিই না, জোর করে তাদের দেশেও পাঠিয়ে দিই না। কিন্তু তাদের ‘শরণার্থী’ পরিচয় তো দিতে পারি। স্লিপ অব টাং বা লিপ সার্ভিস নয়, বাংলাদেশের স্বার্থেই প্ল্যান বি নিয়ে এখন ভাবা আবশ্যক।

লেখক : শিক্ষক, নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন