আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

অনৈক্যের রাজনীতির পরিণাম হবে ভয়াবহ

ড. মুহাম্মদ আমিনুল হক

অনৈক্যের রাজনীতির পরিণাম হবে ভয়াবহ

৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর জনমনে স্বস্তি এসেছিল। সবাই ভেবেছিলেন হাসিনা পালিয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের জনগণের মুক্তি মিলেছে। কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ছয় মাস যেতেই সবার মধ্যেই এখন নতুন করে শঙ্কা তৈরি হচ্ছে। আবার কি আমরা পুরোনো দিনের অভিমুখে ফিরে যাচ্ছি, আবার কি ফ্যাসিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে, আবার কি খুন-গুমের রাজনীতি ফিরে আসবে—এ ধরনের অনেক প্রশ্ন এখন জনমনে ঘুরপাক খাচ্ছে।

নোবেল লরিয়েট প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে যখন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্বভার গ্রহণ করে, তখন বিগত ১৬ বছরে নিষ্পেষিত বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে আশার আলো জ্বলে উঠেছিল। বর্তমান সরকার এরই মধ্যে অনেক ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, যার সুফল দেশের জনগণ পাচ্ছে। তবে দেশকে আমূল পরিবর্তনের দিকে নিয়ে যাওয়ার যে স্বপ্ন ড. মুহাম্মদ ইউনূস দেশের জনগণকে দেখিয়েছেন, তা প্রশাসনসহ বিভিন্ন সেক্টরে ঘাপটি মেরে থাকা ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসরদের অব্যাহত ষড়যন্ত্রের কারণে বারবার হোঁচট খাচ্ছে। তারপরও সরকার চেষ্টা করে যাচ্ছে। এরই মধ্যে ছয়টি সংস্কার কমিশন প্রধান উপদেষ্টার কাছে তাদের সুপারিশমালা পেশ করেছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রধান হয়ে ‘জাতীয় ঐকমত্য কমিশন’ গঠন করে সব দলকে নিয়ে মিটিংও করেছেন। ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ও চূড়ান্ত করার পথে, যা শিগগিরই ঘোষণা করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

তবে সবকিছু ছাপিয়ে এখন ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’ হচ্ছে রাজনীতিতে বিএনপি ও জামায়াতের অনৈক্য। জুলাই বিপ্লবে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের সর্ববৃহৎ দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে এক ধরনের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। প্রথমে এই প্রতিযোগিতা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, মন্ত্রণালয়সহ সরকারি অফিস-আদালতের পদ-পদবির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এই প্রতিযোগিতায় কখনো বিএনপি জিতেছে, কখনো জিতেছে জামায়াত।

ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে দেশের শীর্ষ দুই দল বিএনপি ও জামায়াত যুগপৎ আন্দোলন করেছে। বিগত ১৬ বছরে বিএনপি ও জামায়াতের ওপর দিয়ে আওয়ামী লীগের সীমাহীন বর্বরতার স্টিমরোলার চলেছে। বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া থেকে শুরু করে হাজার হাজার নেতাকর্মীকে জেলে যেতে হয়েছে। শত শত নেতাকর্মী গুম-খুনের শিকার হয়েছেন। জামায়াতের ওপর যে বর্বরতা আওয়ামী লীগ চালিয়েছে, তা এককথায় নজিরবিহীন। জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়েছে।

কিন্তু ফ্যাসিবাদমুক্ত পরিবেশে এই দুটি দলের ঝগড়া-বিবাদ আমাদের বিস্মিত করছে। ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর যেখানে দরকার জাতীয়তাবাদী সব শক্তি বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াতের ঐক্যবদ্ধ হয়ে সামনের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করা, সে সময়ে তারা পরস্পরের বিরুদ্ধে এমন সব কথা বলছে, যা মোটেই কাম্য ও কাঙ্ক্ষিত নয়। কথার লড়াইয়ের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জায়গায় মারামারিতেও জড়িয়ে পড়ছে দল দুটি। দুই দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির তাদের মুরব্বি সংগঠনকেও ছাড়িয়ে গেছে।

১৯৯১ সালে বিএনপি-জামায়াত যখন ক্ষমতায় আসে, তখনই ভারতসহ দেশবিরোধী বিভিন্ন চক্রের মাথা খারাপ হয়ে যায়। জাতীয়তাবাদী ও ইসলামপন্থিদের ঐক্য তাদের চিন্তায় ফেলে দেয়। এজন্য শুরু হয় বহুমুখী ষড়যন্ত্র। সেই ষড়যন্ত্রে পা দেয় বিএনপি ও জামায়াত। দল দুটির মধ্যে কিছু দিনের মধ্যেই দেখা দেয় অনৈক্য। ফলে জাতীয়তাবাদী শক্তি দুর্বল হয়ে ক্ষমতা হারাতে বাধ্য হয় এবং ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। এরপর ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোটের ভূমিধস বিজয়ের পর থেকে বিরোধী শক্তির ঘুম আবার হারাম হয়ে যায়। আওয়ামী লীগ মরিয়া হয়ে বিএনপি-জামায়াতকে বিচ্ছিন্ন করার মিশন সফল না করতে পেরে জোর করে বাঁকা পথে ক্ষমতায় যেতে চেষ্টা করে।

২০০৬ সালে লগি-বৈঠার তাণ্ডব দিয়ে তাদের মিশন শুরু হয়। এরপর আর তাদের পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। ভারতের সরাসরি সহায়তায় ১/১১-র মাধ্যমে ক্ষমতায় গিয়ে আওয়ামী লীগ নামে জামায়াতকে বিএনপি ছাড়া করার মিশনে। এই মিশন বাস্তবায়নের মূলমন্ত্র ছিল ‘ভাগ করো শাসন করো’ নীতি। যুদ্ধাপরাধের বিচারের নামে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের ফাঁসিতে ঝোলানো হয়। বিএনপি-জামায়াতের হাজার হাজার নেতকর্মীকে জেল-জুলুম ও খুন-গুম দিয়ে নিঃশেষ করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতন ভারতের জন্য চরম অপমানের বিষয় হয়েছে। শেখ হাসিনার পতনে চরম নাখোশ ভারত ও তাদের এদেশীয় দোসররা আবার নতুন মিশন নিয়ে মাঠে নেমেছে। তাদের মিশন একটাই—বাংলাদেশে ভারতপন্থি দাসদের ক্ষমতায় নিয়ে আসা। এক্ষেত্রে তাদের সামনে প্রধানত তিনটি বাধা যথাক্রমে ড. মুহাম্মদ ইউনূস, বিএনপি ও জামায়াত। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্যতা থাকায় তাকে সহজেই টলাতে পারবে না বুঝতে পেরে দ্রুত নির্বাচন দিতে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। যে ভারত হাসিনাকে ক্ষমতায় রাখার জন্য বাংলাদেশে গণতন্ত্র হত্যা ও নির্বাচন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করেছে, তারাই এখন বলছে, তারা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সরকারের সঙ্গে কাজ করার জন্য অপেক্ষা করছে। বিএনপিও দ্রুত নির্বাচন দেওয়ার দাবি জানাচ্ছে।

ভারতের এখন প্রধান লক্ষ্যই হচ্ছে অতি দ্রুত ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ক্ষমতা থেকে সরানো। তাকে সরাতে পারলে গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কারের যে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল, সেটা শেষ হয়ে যাবে। একইসঙ্গে আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের লক্ষ্য পূরণে ভারতের সামনে চ্যালেঞ্জ ছিল বিএনপি-জামায়াত। কিন্তু নির্বাচনসহ কয়েকটি ইস্যুতে এই দল দুটির মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি করে ভারত সেই লক্ষ্যেও সফল হতে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

গত ২৪ ফেব্রুয়ারি দৈনিক আমার দেশ ও দৈনিক সমকাল পত্রিকায় প্রকাশিত দুটি প্রতিবেদন অনেকেরই দৃষ্টি কেড়েছে। দৈনিক আমার দেশ-এ ‘রাজনীতিতে অনৈক্য’ আর দৈনিক সমকালে ‘ভারতের ভরসা বিএনপি’ নামের প্রতিবেদন দুটি থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, জাতীয়তাবাদী শক্তির মধ্যে বিভেদকে চাঙা করে আবার ভারতীয় দুষ্টচক্র বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিতে মাঠে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ভারতীয় চক্রের এই চেষ্টা যদি সফল হয় তাহলে এদেশের জনগণের কপালে আবার দুর্ভোগ নেমে আসবে। বিএনপি-জামায়াতের অনৈক্য পুরোনো ফ্যাসিবাদকে নতুন মোড়কে ফিরিয়ে আনবে বলে আশঙ্কা করছেন এদেশের দেশপ্রেমিক জনগণ।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

বিষয়: