আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

বিধ্বস্ত শিক্ষাব্যবস্থা

আবদুল লতিফ মাসুম

বিধ্বস্ত শিক্ষাব্যবস্থা

পবিবর্তনশীল বিশ্বের রাজনীতি অধ্যয়নের দিকপাল এসপি হান্টিংটন দুটি প্রেক্ষিতে রাজনৈতিক নেতৃত্বের ধরন-ধারণ বা গতি-প্রকৃতি ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের পরামর্শ দিয়েছেন। এ দুটি প্রেক্ষিতের প্রথমটি ব্যক্তিগত। দ্বিতীয়টি সামষ্টিক। প্রথমটিকে মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষিত বলা যেতে পারে। মনস্তাত্ত্বিক মানদণ্ড ব্যক্তিত্ব, ব্যবহার ও বিশ্বাসকে ধারণ করে। বিষয়ানুগ আগ্রহ ও অভিজ্ঞতা মনস্তাত্ত্বিক মানদণ্ডকে সমৃদ্ধ করে। সামষ্টিক মানদণ্ড সংগঠন ও সমষ্টির সমন্বয়ে প্রস্ফুটিত জীবনবোধের প্রতিফলন ঘটায়। সামষ্টিক ব্যাপারটি ব্যাপক। বলা যেতে পারেÑরাষ্ট্রিক। রাষ্ট্র নেতৃত্ব বিষয়টিকে কীভাবে গ্রহণ করেন এবং কীভাবে আরোপিত দায়িত্ব পালন করেন, নেতৃত্বের বিচারে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রে নেতৃত্বের সফলতা অথবা ব্যর্থতা দুটো বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল : রাষ্ট্রনায়োকচিত দূরদৃষ্টি এবং রাজনৈতিক প্রথা প্রতিষ্ঠান গড়ার সফলতা। এসব দৃষ্টিভঙ্গিতে বাংলাদেশের বিধ্বস্ত শিক্ষাব্যবস্থা পুনর্গঠন তথা পুনর্নির্মাণের বিষয়টি প্রাসঙ্গিক।

মর্নিং শোজ দ্য ডে অ্যাজ চাইল্ড শোজ দ্য ম্যান (Morning shows the day as child shows the man) বাংলাদেশের মানুষের নিরঙ্কুশ আস্থা ও বিশ্বাস নিয়ে যে সরকারটি যাত্রা শুরু করল, তার নেতৃত্ব ও দায়িত্ব বণ্টন দেখে বোঝা যায় ভবিষ্যৎটি কেমন হবে। বিধ্বস্ত শিক্ষাব্যবস্থা মেরামতের দায়িত্ব যে নেতৃত্বে বর্তেছে, তাতে আশান্বিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। ইংরেজিতে একটা কথা আছেÑরাইট ম্যান ফর দ্য রাইট পারপাস (Right man for the right purpose) নবগঠিত সরকারের সর্বত্র এমনটি হয়েছে, সেটি বলা যাবে না। তবে শিক্ষাক্ষেত্রে যে ব্যক্তি ও ব্যক্তিবর্গের সংশ্লিষ্টতার কথা প্রকাশিত হয়েছে, তা যথার্থ বলে নাগরিক সাধারণ মনে করে। যেকোনো ক্ষেত্রে মেধা, অভিজ্ঞতা ও সৃজনশীলতা অপরিহার্য। অন্যান্য ক্ষেত্রে জ্ঞান অতটা জরুরি না হলেও শিক্ষাক্ষেত্রে বারবার উচ্চারিত হয় নলেজ ইজ পাওয়ার (Knowledge is power) জ্ঞানই শক্তি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো যেহেতু জ্ঞানের সার্বভৌমত্ব দ্বারা পরিচালিত হয়, সেহেতু শিক্ষা নেতৃত্ব জ্ঞানের প্রতিযোগিতায় অগ্রগামী হবেন এটাই কাম্য। একটি গণবিপ্লবের পর গণআকাঙ্ক্ষায় শিক্ষাক্ষেত্রে নির্বাচনের মাধ্যমে যে নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেটি জ্ঞানের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করবেÑনাগরিক সাধারণ সেভাবেই আশান্বিত।

বিজ্ঞাপন

দুর্ভাগ্যের বিষয়Ñ২০২৪ সালের আগস্ট গণবিপ্লবের পর যে সরকারটি শিক্ষার্থীদের রক্তের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তারা শিক্ষাক্ষেত্রে সবচেয়ে কম সময়, শ্রম ও সাধনা বিনিয়োগ করেছে। যে আন্দোলনটি শুরু হয়েছিল শিক্ষা বৈষম্য থেকে, সে বৈষম্য দূর করার কোনো প্রচেষ্টা অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যক্রমে পরিলক্ষিত হয়নি। প্রতিটি ভালোর মধ্যে মন্দ থাকতে পারে। যে ছাত্র গণবিপ্লবটি আমাদের স্বাধীনতাকে দ্বিতীয়বার নিশ্চিত করেছে, কষ্টের কথা দিন শেষে শিক্ষার্থীরা শিক্ষায় প্রত্যাবর্তন করেনি। এই ব্যর্থতাটি শিক্ষার্থীদের নয়। তারা সততই আবেগ ও উত্তেজনা দ্বারা পরিচালিত। রাষ্ট্র নেতৃত্ব, শিক্ষা নেতৃত্ব ও অভিভাবকদের দায়িত্ব ছিল তাদের শ্রেণিকক্ষে আবার ফিরিয়ে নেওয়া। ১৭ মাস ধরে ছাত্ররা প্রায় সর্বত্র সব সময় আন্দোলনমুখর থেকেছে। রাষ্ট্র নেতৃত্ব তথা সরকার যখন তাদের সৃজনশীল পথে ধাবিত করতে পারেনি, তখন তারা নিজেরা নিজেরা দ্বন্দ্ব, বিদ্বেষ ও হানাহানিতে লিপ্ত হয়েছে। ছাত্রদের একাংশ রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে এটি প্রবল ছিল। যতই সময় গেছে, ততই তারা আবার রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তিতে আক্রান্ত হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের মতো রাজনৈতিক এজেন্ডাহীন সরকার বিষয়টির প্রতি বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ করেনি। রাজনৈতিক দলীয় সরকারের মতো তারা এসব বিষয়কে সংবেদনশীল মনে করেছে। তাই এড়িয়ে গেছে। তারা যে শিক্ষা কমিশন করেনি, তার কারণ হিসেবে রাজনৈতিক ভাবাদর্শের সংঘাতের দোহাই দেওয়া হয়েছে। নৈর্ব্যক্তিকভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার যে চমৎকার সুযোগ ছিল, তারা তা হারিয়েছে। চরম অস্থিরতা, অনিয়ম ও আলোচনা-সমালোচনার মধ্য দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার তাদের পাট চুকিয়েছে।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিধ্বস্ত শিক্ষা খাতে পরিবর্তন আসবে, এ প্রত্যাশা ছিল মানুষের। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে শিক্ষা প্রশাসনে জবাবদিহি বাড়বে, অনিয়ম-দুর্নীতি কমবে, শিক্ষাবান্ধব নীতি গ্রহণ করা হবেÑএ ছিল আশা। কিন্তু সে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে উল্টো চিত্র দেখা গেছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় যেসব উদ্যোগ নিয়েছে, তাতে কার্যকর পরিবর্তন আসেনি। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বুমেরাং হয়েছে। বিদায়ি বছরে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীরা তিন মাস দেরিতে বই হাতে পেয়েছে। শিক্ষকরা দাবি নিয়ে মাঠে আন্দোলন করায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ঠিকমতো ক্লাস পরীক্ষা হয়নি। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়Ñসর্বত্র অস্থিরতা বিরাজ করেছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের আন্দোলন অস্থিরতা আরো বাড়িয়েছে। শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবনে এর প্রভাব পড়েছে। অনেকেই শিখন ঘাটতি নিয়ে শিক্ষাবর্ষ শেষ করেছে। অন্তর্বর্তী সরকার নিজেদের গরজে নয়; বরং শিক্ষকদের আন্দোলনের ফলে প্রাথমিক স্তরে একটি কমিটি গঠন করেছিল। শিক্ষাবিদ মঞ্জুর আহমেদের নেতৃত্বে অনেকগুলো সুপারিশ এসেছিল। আটটি পর্যায়ে ১০০ সুপারিশ পেশ করে এই কমিটি। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ ছিল পাঠ্যসূচির পরিবর্তন, শিক্ষকদের বেতন ও মর্যাদার উন্নয়ন এবং শিক্ষাব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ। এই কমিটি স্থানীয় পর্যায়ে উপজেলা ব্যবস্থাধীনে শিক্ষাব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণের কথা বলে। এসব সুপারিশ কার্যকর করার কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। আবার একই শিক্ষাবিদের নেতৃত্বে আরেকটি কমিটি করা হয় মাধ্যমিক শিক্ষা পর্যবেক্ষণের জন্য। তিন মাস সময়ের মধ্যে সুপারিশ জমা দিতে বলা হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় আরেকটি আন্তঃবিষয়ভিত্তিক কমিটি করে। এটির প্রধান ছিলেন, বিজ্ঞানী ড. আবেদ চৌধুরী। এসব কমিটি কোনো কাজে আসেনি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শেষ হয়ে যায়। যেহেতু অন্তর্বর্তী সরকার শিক্ষাক্ষেত্রে তেমন কোনো পরিবর্তন করে যেতে পারেনি, তাই নবনির্বাচিত সরকারকে অধিকতর দায়-দায়িত্ব নিতে হবে।

১৭ বছরের আওয়ামী স্বেচ্ছাচার আমলে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংসের প্রান্তঃসীমায় উপনীত হয়েছে। বন্দনা, দুর্নীতি, দলীয়করণ ও পাঠ্যসূচির পরীক্ষা-নিরীক্ষা দিয়ে প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার সর্বনাশ করা হয়েছে। মাধ্যমিক পর্যায়ে একই অবস্থা বিরাজ করেছে। উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে যেহেতু রাজনীতিকরণের ব্যাপক সুযোগ রয়েছে, তারা শিক্ষাকে শতভাগ ছাত্ররাজনীতির দলনে পিষ্ট করেছে। তাদের হাতে প্রতিষ্ঠান প্রধানরা অপমান-অপদস্থ হয়েছে। তাদের একজন গডফাদার অধ্যক্ষকে কান ধরে ওঠবস করিয়ে সুনাম! কুড়িয়েছে। অধ্যক্ষকে ঠেলে পুকুরে ফেলে দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোয় নিয়োগ-বাণিজ্যে সোনার ছেলেরাও ভাগ বসিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় কী হয়েছে, তা লিখতে মহাকাব্য রচিত হবে। এ তো গেল শুধু পরিবেশগত দুর্ভোগের কথা।

১৭ বছরে আওয়ামী সরকার যে জঞ্জাল রেখে গেছে, তার শেষ নেই। ২ হাজার ৫০০ কলেজ সমন্বয়ে গঠিত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা বলা যেতে পারে। শিক্ষাক্ষেত্রে মান ও মাত্রায় বিপর্যয় ঘটে। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে যেসব শিক্ষার্থী শিক্ষা গ্রহণ করেছে, তারা দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক ক্ষেত্রে শিক্ষাদানে নেতৃত্ব দিচ্ছে। সুতরাং নিম্নমানের শিক্ষক দিয়ে শিক্ষাক্ষেত্রে বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে। দেশের অন্যান্য সরকারি ও বেসরকারি ক্ষেত্রে এরা কোনো অবদান রাখতে পারছে না। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঢাকা মহানগরীর সাতটি কলেজ বিচ্ছিন্ন করে আরেক জঞ্জাল সৃষ্টি করে আওয়ামী সরকার। অন্তর্বর্তী সরকার যে সমাধানটি দিয়েছে, তা সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে আরো বাড়িয়ে তুলেছে। সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি নামে যে ব্যবস্থাটি অবশেষে উপহার দেওয়া হয়েছে, তা এক হ-য-ব-র-ল ছাড়া আর কিছুই নয়। এরপর যে বিষয়টি সর্বনাশের কারণ হয়েছে, তা হচ্ছে, পাইকারি হারে জেলাভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন। এরপর রয়েছে ১১১টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে মানসম্মত শিক্ষা হচ্ছে না। সার্টিফিকেট দেওয়া হয় অথচ কোনো কাজে আসে না। সমাজ ও রাষ্ট্রের চাহিদা পূরণ হচ্ছে না।

অন্য এক বিপর্যয় হচ্ছে, কারিগরি ও প্রযুক্তি শিক্ষা। নামে বিষয়টি জনপ্রিয় ও ব্যাপকতা লাভ করলেও আসলে শিক্ষকের অভাব এবং ব্যবস্থাপনা ত্রুটির কারণে বিষয়টিতে ধস নেমেছে। পেশাগত শিক্ষাগত ব্যবস্থায়ও একই অবস্থা। ডাক্তারি চিকিৎসায় ডাক্তার তৈরি হয় না। প্রকৌশল শিক্ষা ব্যবহারিক কাজে আসছে না। সর্বাধুনিক প্রযুক্তিবিষয়ক শিক্ষা ব্যর্থতা সর্বত্র। সবচেয়ে গুরুতর সংকট ভাষা দক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রে। বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষাতেই দক্ষতা অর্জন না করেই শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষা সার্টিফিকেট অর্জন করছে। তারা ভালো বাংলা লিখতে পারে না। ইংরেজিতেও দক্ষ হতে পারছে না। এর ফলে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে রাষ্ট্রিক ব্যবস্থাপনায়। সম্প্রতি প্রকাশিত দু-একটি গবেষণা কর্মে এ করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে। এতে দেখা গেছে, শিক্ষার্থী যত ওপরে উঠছে, ভাষার ঘাটতি ততই বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভাষা শিক্ষায় দুর্বলতা এখন বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়। এটি প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত একটি কাঠামোগত সংকট। সচ্ছল পরিবারের শিশুরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে বিভিন্ন মাধ্যমে ভাষা ও যোগাযোগ দক্ষতা অর্জন করছে। ভাষাশিক্ষাকেন্দ্রিক বড় বাণিজ্য তৈরি হয়েছে। কিন্তু দেশের সাধারণ মানুষের সন্তানরা অসাধারণ ও স্থায়ী বঞ্চনার শিকার হচ্ছে। শুধু ভাষা শিক্ষাই নয়, গণিত ও অন্যান্য মৌলিক বিষয়ের শিক্ষাক্ষেত্রেও একই করুণদশা। বিষয়টিকে সারাংশ হিসেবে পেশ করলে তিনটি বিষয় উঠে আসে। প্রথমত, পঠন-পাঠন তথা শিক্ষাসূচি। দ্বিতীয়ত, শিক্ষা ব্যবস্থাপনা। তৃতীয়ত, শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিতকরণ। নতুন সরকারের জন্য নতুন করে যথার্থ হোমওয়ার্কের পর পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। পরিকল্পনাটি হবে তাৎক্ষণিক, মধ্যমেয়াদি এবং অবশেষে দীর্ঘমেয়াদি। একটি জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠন অপরিহার্য হয়ে আছে।

আশান্বিত হওয়ার বিষয় যে, বিএনপি তার ৩১ দফায় শিক্ষা সম্পর্কিত পরিকল্পনায় বলেছে : ‘বর্তমানে শিক্ষাক্ষেত্রে বিরাজমান নৈরাজ্য দূর করে নিম্ন ও মধ্যপর্যায়ে চাহিদাভিত্তিক শিক্ষা এবং উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষাকে প্রাধান্য দেওয়া হবে। গবেষণায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। একই মানের শিক্ষা ও মাতৃভাষায় শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। ভবিষ্যতের নেতৃত্ব গড়ে তুলতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ছাত্র সংসদে নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হবে। যোগ্য, দক্ষ ও মানবিক জনগোষ্ঠী গড়ে তোলার লক্ষ্যে জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ অর্থ বরাদ্দ করা হবে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সংগতিপূর্ণভাবে ক্রমান্বয়ে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট খাতে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হবে। দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টির লক্ষ্যে শিক্ষা প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণসহ সংশ্লিষ্ট সব খাতকে ঢেলে সাজানো হবে। শিক্ষা, শিল্প, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং উৎপাদন খাতে গবেষণা ও উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। ক্রীড়া উন্নয়ন ও জাতীয় সংস্কৃতির বিকাশে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। অনৈতিক আকাশ সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসন রোধ করা হবে।’ দায়িত্ব গ্রহণের পর শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন নিশ্চিত করে বলেছেন, নকল ও প্রশ্ন ফাঁসের সংস্কৃতি আর ফিরে আসবে না। শিক্ষকদের দাবি-দাওয়ার জন্য রাজপথে নামতে হবে না।

জনাব মিলন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পরই বিএনপি মন্ত্রিসভা গঠন ঘিরে যখন কৌতূহল তৈরি হয়, তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা গিয়েছিল এক ধরনের আলোচনা। তখন অনেককেই বলতে দেখা গেছে, বিএনপির নতুন মন্ত্রিসভায় শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পেতে পারেন সাবেক এই শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী। শেষ পর্যন্ত সেই ধারণাই সঠিক হয়েছে। জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় প্রায় ২৫ বছর পর একই মন্ত্রণালয়ের পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রীর দায়িত্ব পান তিনি। একই সঙ্গে তাকে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়েরও পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ২০০১ সালে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়লাভের পর জনাব মিলনকে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। দায়িত্ব নেওয়ার পর জনাব মিলনের ব্যাপক কর্মতৎপরতা দেশে নানা আলোচনা তৈরি করেছিল। একদিকে তিনি যেমন পরীক্ষায় নকল রোধে নানা কৌশল নিয়েছিলেন, তেমনি শিক্ষাব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরাতে নানা উদ্যোগও নিয়েছিলেন। সে সময় তার এই পদক্ষেপের কারণে তখনকার বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় পাসের হারও কমে গিয়েছিল অনেক। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের পাবলিক পরীক্ষায় নকলবিরোধী অতীত তৎপরতার কারণেই জনাব মিলনকে ঘিরে এবারও ব্যাপক আলোচনা হয়। তবে, হেলিকপ্টারে চড়ে নকল ধরা কিংবা সে সময়ের তার কিছু কিছু কর্মকাণ্ডের সমালোচনাও তৈরি হয়েছিল। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন ববি হাজ্জাজ। উপদেষ্টা নিযুক্ত হয়েছেন ড. মাহদী আমিন। উভয়ই উচ্চশিক্ষিত এবং শিক্ষাসংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে সম্পৃক্ত। সুতরাং আশান্বিত হওয়া যায় যে, পুরো টিমটি শিক্ষাক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনে সক্ষম হবে। আমরা আশা করতে চাই, শিক্ষার সর্বস্তরে জ্ঞানই শক্তির (Knowledge is power) প্রতিফলন ঘটবে।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সাবেক অধ্যাপক, সরকার রাজনীতি বিভাগ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...