আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

বাংলাদেশে মাছ নিয়ে গবেষণা

আবু তাহের মুহাম্মদ জাবের

বাংলাদেশে মাছ নিয়ে গবেষণা
আবু তাহের মুহাম্মদ জাবের

নদীমাতৃক বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম মৎস্য উৎপাদক দেশ হিসেবে পরিচিত। নদী, হাওড়, বাঁওড়, খাল-বিল, পুকুর, লেক, অন্যান্য জলাশয় এবং বঙ্গোপসাগর মৎস্য খাতের বিস্তৃত উৎস। বাংলাদেশে মৎস্য গবেষণা একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র, যা দেশের অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং পুষ্টি নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য। মৎস্য খাত বাংলাদেশের জিডিপিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে এবং দেশের অনেক মানুষের জীবিকানির্বাহের মাধ্যম হিসেবে কাজ করে।

বাংলাদেশে মৎস্য খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির মধ্যে রয়েছে অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে মাছ আহরণে বাংলাদেশ বিশ্বে দ্বিতীয়, বদ্ধ জলাশয়ে মাছ উৎপাদনে পঞ্চম, ইলিশ আহরণে প্রথম এবং তেলাপিয়া উৎপাদনে চতুর্থ। এ অর্জন নিঃসন্দেহে আমাদের জাতীয় গৌরব। মৎস্য খাতের মাধ্যমে দেশের খাদ্য ও পুষ্টিচাহিদা পূরণ, বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, আধুনিক চাষ পদ্ধতি, কৃত্রিম প্রজনন প্রভৃতি সব ক্ষেত্রে মৎস্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উদ্ভাবিত প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

বিজ্ঞাপন

বাঙালির খাদ্যতালিকার প্রধান উপাদান মাছ ও ভাত। তাই আমাদের ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ বলা হয়। বাংলাদেশ নদীমাতৃক এবং কৃষিপ্রধান দেশ হওয়ায় চাল ও মাছ বাঙালির দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসে পরিণত হয়। বাংলাদেশে নদী, হাওড়-বাঁওড় ও খাল-বিলে মাছের প্রাচুর্য ছিল, সহজলভ্য ছিল। আমিষের উৎস মাছ বাঙালির একটি ঐতিহ্যবাহী ও প্রিয় খাদ্য হিসেবে সুপরিচিত। প্রাচীনকাল থেকেই মাছ-ভাত বাঙালির সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। এটি শুধু একটি খাবার নয়, বাঙালির জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাছ প্রোটিন ও পুষ্টির একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস, যা আমাদের শারীরিকভাবে সুস্থ ও সবল রাখতে সাহায্য করে। এ কারণেই ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ প্রবাদটি বাঙালি চরিত্রের একটি বিশেষ পরিচিতি বহন করে।

আমাদের অভ্যন্তরীণ মৎস্যসম্পদের পাশাপাশি সামুদ্রিক মৎস্য একটি অপার সম্ভাবনার ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এটি আমাদের জন্য এক বিরাট সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। এখন সময় এসেছে এ সম্পদকে টেকসইভাবে আহরণ ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করার। উপকূলীয় অঞ্চলে চাষাবাদে আমরা দীর্ঘদিন ধরে মূলত চিংড়ির ওপর নির্ভর করেছি। তবে চিংড়ির পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের মাছ ও কাঁকড়ার মতো আরো অনেক প্রজাতি রয়েছে যেগুলো সুস্বাদু ও বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই) ইতোমধ্যে এ প্রজাতিগুলোর প্রজনন ও চাষাবাদ কৌশল উদ্ভাবনে সফল হয়েছে। অন্যদিকে সুনীল অর্থনীতির অংশ হিসেবে সিউইড, ঝিনুক, ওয়েস্টার ও মুক্তা উৎপাদনেও গবেষণা কার্যক্রম এগিয়ে চলেছে। মিঠাপানির ঝিনুকে মুক্তা উৎপাদনের প্রযুক্তি গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে, বিশেষ করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে নারীর কর্মসংস্থান, আত্মনির্ভরতা ও ক্ষমতায়নে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট জাতীয় চাহিদার আলোকে এ পর্যন্ত প্রায় ৮৭টি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। এর মধ্যে দেশীয় মাছের কৃত্রিম প্রজনন কৌশল, জিনপুল সংরক্ষণ, জাত উন্নয়ন, উচ্চ ফলনশীল জাত উদ্ভাবন, রোগ প্রতিরোধে ভ্যাকসিন উন্নয়ন, চাষাবাদের আধুনিক কৌশল উদ্ভাবন এবং মুক্ত জলাশয়ে মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনাবিষয়ক প্রযুক্তি অন্যতম। সাম্প্রতিক সময়ে ইনস্টিটিউট ‘বিএফআরআই সুবর্ণ রুই’ নামক উচ্চ ফলনশীল রুই উদ্ভাবন করেছে, যা চাষিদের জন্য খুবই লাভজনক। কই মাছের ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ প্রতিরোধে ভ্যাকসিন উদ্ভাবনও একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। এটা খুবই আনন্দ ও গর্বের বিষয় যে, বিএফআরআইয়ের গবেষণার ফলাফল মাঠপর্যায়ে সম্প্রসারণের ফলে কৃষক, মৎস্যচাষি ও উদ্যোক্তারা সরাসরি উপকৃত হচ্ছেন।

নীলফামারী জেলার সৈয়দপুরে ২০০৬ সালে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের স্বাদুপানি উপকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে নানা ধরনের গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে; এর মধ্যে অল্প সময়ে চাষযোগ্য কই, শিং, তেলাপিয়া ও থাই সরপুঁটি মাছের চাষ পদ্ধতি উদ্ভাবন করে। উত্তরবঙ্গের নদ-নদীতে আগে প্রচুর পরিমাণে ছোট মাছ পাওয়া যেত। কালের বিবর্তনে নদীভরাট, কম বৃষ্টিপাত ও জলবায়ুর প্রভাবের ফলে মাছের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। আইইউসিএনের তথ্যমতে, ২০১৫ সালে বাংলাদেশের মিঠাপানির ৬৪ প্রজাতির মাছ বিপন্ন হওয়ার তালিকায় ছিল। বিগত কয়েক বছরের গবেষণায় প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ১৩টি বিপন্ন প্রজাতির মাছের কৃত্রিম প্রজনন ও পোনা উৎপাদন কৌশল উদ্ভাবন করতে সক্ষম হয়েছে। মাছগুলোর মধ্যে রয়েছে দেশীয় প্রজাতির টেংরা, লইট্যা টেংরা, গুতুম, বৈরালী, খলিশা, বালাচাটা, নাটুয়া, আঙ্গুস, কুর্শা, নারকেলি চেলা, জারুয়া, গোটালী ও বগাট। এ মাছগুলোর মধ্যে টেংরা এখন সারা দেশে চাষাবাদ হচ্ছে। বৈরালী, আঙ্গুস ও কুর্শা মাছের চাষ পদ্ধতিও প্রায় সমাপ্তির পথে। এভাবে বাকি মাছগুলোর চাষ পদ্ধতি উদ্ভাবন করে ছড়িয়ে দিতে পারলে একদিকে মাছগুলো প্রকৃতিতে রক্ষা পাবে, অন্যদিকে মানুষের আমিষের চাহিদা পূরণে বিশেষ ভূমিকা পালন করবে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বিএফআরআইয়ের গবেষণা কার্যক্রম দেখার জন্য ময়মনসিংহ, কক্সবাজার ও সৈয়দপুর সফর করেছেন এবং বিজ্ঞানীদের উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করেছেন। মাছের জাত উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে যারা অবদান রাখছেন, তাদের প্রণোদনার ব্যবস্থা করা হলে বিজ্ঞানীরা নিষ্ঠা ও উদ্দীপনা নিয়ে গবেষণা করতে পারবেন এবং আমাদের মৎস্য সম্পদ আরো বিকশিত হবে।

মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ অভূতপূর্ব উন্নয়ন সাধন করেছে। ১৯৮৩-৮৪ অর্থবছরে বাংলাদেশে মাছের উৎপাদন ছিল ৭ দশমিক ৫ লাখ মেট্রিক টন; ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মাছ উৎপাদিত হয়েছে ৫০ লাখ মেট্রিক টন। তথাপি আমাদের সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। নদীর নাব্য হ্রাস, জলবায়ু পরিবর্তন, পানিদূষণ, ভয়ংকর প্লাস্টিক বর্জ্য, অতিরিক্ত মৎস্য আহরণ এবং প্রাকৃতিক জলাশয়ের অবৈধ দখল মৎস্য খাতের টেকসই উন্নয়নে মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করেছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন গবেষণা, টেকসই প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও সঠিক ব্যবস্থাপনা। গবেষণা থেকে প্রাপ্ত ফলাফল মাঠপর্যায়ে পৌঁছে দিতে হবে, যাতে মৎস্যচাষিরা আধুনিক কৌশল ব্যবহার করে উৎপাদন ও আয় বৃদ্ধি করতে পারেন।

বাংলাদেশে মৎস্য গবেষণা আমাদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খাদ্য নিরাপত্তা, প্রাণিজ প্রোটিনের জোগান, রপ্তানি আয়, কর্মসংস্থান, টেকসই উন্নয়ন, জিডিপিতে মৎস্য খাতের অবদান বৃদ্ধি, জীবনমান উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন প্রভৃতি সব ক্ষেত্রে মৎস্য গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে এবং করবে।

বাংলাদেশে মৎস্য গবেষণার ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া খুবই জরুরি—১. মাছের জাত উন্নয়ন ও উন্নত চাষাবাদ; ২. মাছের রোগ নিরাময়ে প্রতিকার ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা; ৩. জলবায়ু পরিবর্তন ও দূষণ মোকাবিলা; ৪. ইলিশসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ মাছের উৎপাদন ও টেকসই ব্যবস্থাপনা; এবং ৫. সাগরের মৎস্য সম্পদ আহরণ ও সংরক্ষণ। এর পাশাপাশি মৎস্য খাতে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং গবেষণালব্ধ ফলাফল মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের ওপরও জোর দেওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশের জলবায়ু ও পরিবেশের জন্য উপযুক্ত, দ্রুত বর্ধনশীল এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন নতুন মাছের জাত উদ্ভাবন ও প্রজননের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ দূষণের কারণে মৎস্যসম্পদের ওপর যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, তা থেকে উত্তরণের জন্য গবেষণা ও সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইলিশসহ অন্যান্য দেশীয় মাছের টেকসই উৎপাদন, সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার জন্য গবেষণার প্রয়োজন। গভীর সমুদ্রের মৎস্যসম্পদের জরিপ, আহরণ কৌশল এবং টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করতে ব্লু-ইকোনমি সম্পর্কে গবেষণা অপরিহার্য। মৎস্যচাষের ক্ষেত্রে নতুন ও উন্নত প্রযুক্তি, যেমন স্মার্ট অ্যাকুয়াকালচার, রিসার্কুলেটরি অ্যাকোয়াকালচার, বায়োফ্লক প্রযুক্তি, বটমক্লিন অ্যাকোয়াকালচার, অ্যাকোয়াপনিক্স প্রভৃতি উদ্ভাবন এবং মাঠপর্যায়ে প্রয়োগের ওপর জোর দিতে হবে। মৎস্য বিজ্ঞান, মেরিন বায়োলজি এবং অ্যাকুয়াকালচার বিষয়ে উচ্চশিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনবল তৈরি করা প্রয়োজন, যারা গবেষণার ফলাফল মাঠপর্যায়ে প্রয়োগ করতে পারবে। গবেষণার মাধ্যমে প্রাপ্ত ফলাফল যাতে মাঠ পর্যায়ে সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, সেজন্য বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন।

লেখক : সচিব, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন