নদীও জলাশয় বাঁচলে তবেই ঢাকা বাঁচবে এবং আমরা সবাই ভালোভাবে বাঁচতে পারব। কারণ নদী শুধু পানির জোগান দেয় না, এটি মানুষের জীবন, সংস্কৃতি এবং একটি শহরের আত্মার প্রতীক। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা ছিল ঢাকার প্রাণশক্তির উৎস। কিন্তু আজ এই নদীগুলো পানি নয় যেন বিষাক্ত তরল পদার্থের প্রবাহে পরিণত হয়েছে। আমাদের প্রাণের ঢাকায় এ কোন নগরায়ণ, যেখানে নদীকে মেরে মানুষ ধনী হয়, নদী মরে যায়, আর মানুষ দীর্ঘদিন আয়ু চায়, বাঁচতে চায়?
ঢাকার নদী-নালা ও জলাশয়ের বর্তমান চিত্র ভয়াবহ। বুড়িগঙ্গার পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসে অনেক সময়। পানির রঙ এতটাই কালো যে, সেটি আর জল বলে মনে হয় না। বরং এক ধরনের বিষাক্ত রাসায়নিক মিশ্রণ। নদীর তীরে দাঁড়ালে নাকে লাগে তীব্র দুর্গন্ধ, যা শুধু পরিবেশ নয়, মানুষের স্বাস্থ্যকেও হুমকির মুখে ফেলছে।
এই প্রেক্ষাপটে সমাধান খোঁজা জরুরি এবং তা হতে হবে বাস্তবভিত্তিক, দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত। তিলোত্তমা ঢাকার চারপাশে নদী-নালার জালের মতো বিস্তৃত জলপথ একসময় তাকে প্রাণবন্ত ও টেকসই করে তুলেছিল। কিন্তু আজ সেই নদীগুলো দূষিত ও স্থবির হয়ে পড়েছে। নগর উন্নয়নের নামে প্রকৃতির এই নির্মম অবক্ষয় এখন এক গভীর জাতীয় সংকটে পরিণত হয়েছে।
পানির উৎস রক্ষা করা অর্থনীতি এবং টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
আমরা জানি, ঢাকার সবদিকে শিল্পবর্জ্যের অবাধপ্রবাহ। বিশেষ করে, ট্যানারি, টেক্সটাইল ও ডাইং কারখানাগুলো থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার লিটার অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলা হচ্ছে। এসব বর্জ্যে থাকে ক্রোমিয়াম, সিসা, আর্সেনিকসহ নানা ভারী ধাতু, যা পানিকে বিষাক্ত করে তোলে।
দ্বিতীয়ত হচ্ছে, অবৈধ দখলদারদের অসীম দৌরাত্ম্য। এরা সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে ভোল পালটিয়ে রাতারাতি সরকারি দলের লোক হয়ে যায়। ঢাকার অসংখ্য খাল, জলাশয় ও নদীর তীর দখল করে গড়ে উঠেছে বসতবাড়ি, মার্কেট ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান। একসময়কার প্রাকৃতিক জলাধার আজ কংক্রিটের জালে বন্দি। পরিবেশ রক্ষার জন্য দেশে আইন রয়েছে; কিন্তু তার কার্যকর প্রয়োগ নেই। নিয়মিত মনিটরিং, জরিমানা ও শাস্তির অভাবে দূষণকারীরা নির্বিঘ্নে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
বছরের পর বছর অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি, রাজনৈতিক উদাসীনতা এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে আজকের এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তাই সমাধানও হতে হবে দীর্ঘমেয়াদি, কাঠামোগত এবং রাজনৈতিকভাবে সাহসী।
তৃতীয়ত, আমাদের নগর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিপ্লব ঘটাতে হবে। ঢাকায় প্রতিদিন যে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য উৎপন্ন হয়, তার একটি বড় অংশই শেষ পর্যন্ত নদী-নালায় গিয়ে পড়ে। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বর্জ্য পৃথককরণ, রিসাইক্লিং এবং স্যানিটারি ল্যান্ডফিল ব্যবস্থা চালু করতে হবে। পাশাপাশি, প্লাস্টিক ব্যবহারে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে হবে। চতুর্থত, নদী পুনরুদ্ধারে ‘ব্লগ্রিন ইনফ্রাস্ট্রাকচার’ ধারণা বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। অর্থাৎ, নদী ও খালকে কেন্দ্র করে সবুজ বেষ্টনী, ওয়াকওয়ে, পার্ক এবং উন্মুক্ত স্থান তৈরি করা। এতে একদিকে পরিবেশ রক্ষা হবে, অন্যদিকে নাগরিকদের জন্য স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের সুযোগ তৈরি হবে। এ জন্য নদী ও খাল পুনরুদ্ধার কার্যক্রম নিয়ে অবৈধ দখল উচ্ছেদ করে নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে হবে। ইতোমধ্যে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা পর্যাপ্ত নয়। এই ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং রাজউকের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
পঞ্চমত, নদী বাঁচাতে জনসম্পৃক্ততা নিশ্চিত করতে হবে। নদী রক্ষা শুধু সরকারের কাজ নয়। এটি একটি সামাজিক আন্দোলন হওয়া উচিত। স্কুল-কলেজে পরিবেশ শিক্ষা জোরদার, গণমাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচার এবং স্থানীয় কমিউনিটিকে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে একটি সম্মিলিত উদ্যোগ গড়ে তুলতে হবে।
এর সঙ্গে নতুন করে, ‘জিরো ওয়েস্ট টু রিভার’ নীতি প্রণয়ন করা যেতে পারে। অর্থাৎ কোনো ধরনের কঠিন বা তরল বর্জ্য সরাসরি নদী বা খালে ফেলা যাবে না। এ জন্য নগর-বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক করতে হবে। বর্জ্য পৃথককরণ, পুনর্ব্যবহার এবং স্যানিটারি ল্যান্ডফিল নিশ্চিত করতে হবে। প্লাস্টিক ব্যবহারে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপও সময়ের দাবি।
এসব ছাড়াও গঠনমূলক দৃষ্টান্ত সামনে রেখে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কাজে লাগানো যেতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন শহর যেমন : সিউল, সিঙ্গাপুর, চিবা প্রভৃতি তাদের নদী পুনরুদ্ধারে সফল হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ঢাকায় উপযোগী মডেল তৈরি করা সম্ভব। উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর সহায়তায় বড় আকারের প্রকল্প গ্রহণ করা যেতে পারে।
বহু বছর ধরে ক্রমাগত দূষণ, দখল এবং অব্যবস্থাপনার দীর্ঘ ইতিহাস ঢাকাকে এমন এক অবস্থায় দাঁড় করিয়েছে, যেখানে নদী রক্ষার প্রশ্নটি এখন আর পরিবেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং নগর টিকে থাকার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। তাই এখন প্রয়োজন একটি নতুন, সমন্বিত ও কার্যকর নীতি-পরিকল্পনা।
তবে আরো জরুরি হলো, নদী ব্যবস্থাপনায় একক কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা করা উচিত। বর্তমানে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, রাজউক এবং সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন সংস্থা আলাদাভাবে কাজ করছে, যার ফলে সমন্বয়ের ঘাটতি প্রকট। একটি শক্তিশালী ‘ঢাকা রিভার ম্যানেজমেন্ট অথরিটি’ গঠন করে পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও তদারকি এক ছাতার নিচে আনতে হবে।
নদী ও খাল পুনরুদ্ধারে শুধু উচ্ছেদ করলেই হবে না। সেই জায়গাগুলো সবুজ বেষ্টনী, ওয়াকওয়ে ও উন্মুক্ত স্থানে রূপান্তর করতে হবে, যাতে আবার দখলের সুযোগ না থাকে। নগর-পরিকল্পনায় জলাধার সংরক্ষণকে বাধ্যতামূলক করতে হবে। নতুন কোনো উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনের আগে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন বা ইআইএ অনুযায়ী কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। খাল ও জলাধার ভরাটের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করতে হবে।
বর্তমান এআই যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রযুক্তি ও তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। ড্রোন ও স্যাটেলাইটের মাধ্যমে অবৈধ দখল নজরদারি, স্মার্ট সেন্সরের মাধ্যমে পানির মান পর্যবেক্ষণ এবং একটি উন্মুক্ত ডেটা প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে নাগরিকদের তথ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা যেতে পারে। এতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়বে।
লেখক : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন
fakrul@ru.ac.bd
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


টেকসই উন্নয়ন ও মানবসম্পদ গঠনের চাবিকাঠি