ইসরাইলের ভয়ানক আগ্রাসনে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকা। বিমান ও স্থল হামলা, খাদ্য সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়াÑ এমনকি গাজার বাতাস বিষাক্ত করতে ক্লোরিন গ্যাস হামলা- গাজা উপত্যকা খালি করতে কোনো কিছুই বাকি রাখছে না তারা। গাজার ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইলের এই বর্বরতার বিরুদ্ধে কিছু করতে না পারার বেদনায় খানখান হয়ে যাচ্ছে তাবৎ মুসলমানদের মন। পুড়ছে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে থাকা সচেতন মানুষের হৃদয়।
দিকে দিকে ইসরাইলকে বয়কটের ডাক জোরদার হয়েছে। পাশাপাশি ইসরাইলকে নিঃশর্তভাবে সমর্থন দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিও ঘৃণা বেড়েছে। মানুষ তালিকা করে করে দেশ দুটির পণ্য বয়কট করছে। ইসরাইলের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত পণ্য বয়কটের বিপুল জনমত তৈরি হয়েছে বাংলাদেশে।
খাদ্যসামগ্রী, কসমেটিকসসহ বিভিন্ন পণ্যের বিকল্প আমাদের দেশে বা অন্যান্য দেশে উৎপাদিত বিকল্প পণ্য রয়েছে। তাই, একটু সচেতনতায় এসব পণ্যের বিক্রি কমে গেছে। এতে আমাদের মানবিক হৃদয়ও খানিকটা শান্তি পাচ্ছে। আবার, অনেক কিছুর বিকল্প পাওয়া গেলেও আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত প্রযুক্তি পণ্যের বিকল্প পণ্য খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন। চাইলেও সহজে এসব পণ্যের বিকল্প খুঁজে পাওয়া যায় না। আর এসব পণ্য প্রতিনিয়ত ব্যবহারের কারণে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো বিপুল অঙ্কের মুনাফা করছে। এতে দেশ দুটির অর্থনীতি ফুলেফেঁপে বড় হয়ে উঠছে।
প্রযুক্তি বিকল্পের জন্য মানবিক বাংলাদেশিদের তিন ধরনের বিকল্প পরিকল্পনা থাকতে পারে। এতে ধাপে ধাপে এসব পণ্যের বিকল্প পাওয়া যাবে। স্বল্পমেয়াদি বিকল্প : স্বল্পমেয়াদি বিকল্পগুলো আমাদের হাতের কাছে রয়েছে। একটু সচেতন হলেই আমরা এই বিকল্পগুলো ব্যবহার করতে পারি। যেমন : আমরা রাইড শেয়ারিং সার্ভিসের ক্ষেত্রে, উবার ও ইন ড্রাইভের পরিবর্তে দেশীয় রাইড শেয়ারিং কোম্পানি পাঠাও ব্যবহার করতে পারি। ওটিটি প্ল্যাটফরম নেটফ্লিক্সের পরিবর্তে বঙ্গ বা চরকি বিকল্প হতে পারে।
প্রাইভেট মেসেজিং প্ল্যাটফরম হোয়াটসঅ্যাপ বা মেসেঞ্জারের পরিবর্তে আরব আমিরাতের বটিম অ্যাপ ব্যবহার করা যেতে পারে।
ডোমেইন কেনার ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় ধরে সার্ভিস দেওয়া দেশীয় আইটি কোম্পানির কথা চিন্তা করতে পারেন। হোস্টিংয়ের ক্ষেত্রেও একই কথা। ক্লাউড সার্ভিসের জন্য আমাজন, গুগল ক্লাউড কিংবা ডিজিটাল ওশানের বিকল্প হিসেবে আলিবাবা ক্লাউডের কথা চিন্তা করা যায়।
মধ্যমেয়াদি বিকল্প : মধ্যমেয়াদি বিকল্প বলতে আমি বোঝাচ্ছি, এ ধরনের বিকল্প প্রযুক্তি তৈরির সামর্থ্য বাংলাদেশিদের আছে এবং একটু চেষ্টা করলে আমাদের সিস্টেমের সঙ্গে সমন্বয় করতে পারি।
বাংলাদেশের বেশিরভাগ লজিস্টিকস কোম্পানিগুলো গুগল ম্যাপ ব্যবহার করছে। এতে প্রতি মাসে গুগলকে ব্যবহার অনুসারে একটি টাকা পে করতে হয়। যদি দেশীয় কোনো কোম্পানি বা ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত কোনো ম্যাপ ব্যবহার না করলে তাও প্রতিবাদ হিসেবে যুক্ত হবে। যেমন : গুগল ম্যাপের পরিবর্তে আমরা দেশীয় ম্যাপিং কোম্পানি বাড়ি কই ম্যাপের ব্যবহারের কথা বলতে পারি। আবার, প্ল্যাটফরমগুলো একটু চেষ্টা করলে ওপেন সোর্স মাধ্যম থেকে কোড ডাউনলোড করে নিজেদের মতো ম্যাপ তৈরি করতে পারে। দেশীয় প্রতিষ্ঠান পাঠাও নিজস্ব ম্যাপ ব্যবহার করে থাকে।
দীর্ঘমেয়াদি বিকল্প : বাংলাদেশিরা চাইলেই কিন্তু ফেসবুক বা জিমেইল ব্যবহার করা বন্ধ করতে পারবে না। কিন্তু রাষ্ট্রীয়ভাবে বা ওআইসির মাধ্যমে ফেসবুক বা জিমেইলের বিকল্প প্ল্যাটফরম তৈরির উদ্যোগ হাতে নিতে পারে। সঠিক পরিকল্পনা বা ইনভেস্টমেন ব্যাকআপ থাকলে এ ধরনের প্ল্যাটফরম তৈরি করা সম্ভব হবে।
বর্তমান সময়ে বেশিরভাগ কোম্পানি তাদের পণ্য বা সেবা প্রমোশনের জন্য ফেসবুক বা গুগলে বিজ্ঞাপন দিয়ে থাকে। এ দুটি এত বড় প্ল্যাটফরম যে চট করে এসব প্ল্যাটফরমের বিকল্প খুঁজে পাওয়া যাবে না। আবার এসব প্ল্যাটফরমে বিজ্ঞাপন বাবদ মোটা অঙ্কের টাকা আমরা তাদের প্রদান করে আসছি। এ ক্ষেত্রে যে প্রোডাক্ট বা সেবা নিয়ে ফেসবুকে বুস্ট করার কথা ভাবছেন, তা না করে সেই প্রোডাক্ট বা সেবা সম্পর্কিত বিভিন্ন গ্রুপে গ্রুপে পোস্ট দেওয়া যেতে পারে। প্রোডাক্টের সঙ্গে যায়, এমন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইনফ্লুয়েন্সের মাধ্যমেও প্রমোশন করা যেতে হবে। ইউটিউবে সরাসরি বিজ্ঞাপন দেওয়ার পরিবর্তে কনটেন্টের মধ্যে প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন বসিয়ে প্রকাশ করা যেতে পারে। আবার, গুগলে অ্যাড দেওয়ার পরিবর্তে সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশনের কথা চিন্তা করা যেতে পারে।
আমাদের দেশে অনেকেই আইফোন ব্যবহার করেন। এ আইফোনে মেড ইন চায়না লেখা থাকলেও এই স্মার্টফোনের মালিকানা প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রের। আইফোনের পরিবর্তে দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং, চীনের শাওমি, ওয়ান প্লাস কিংবা বাংলাদেশি ওয়ালটনের স্মার্টফোনের কথা চিন্তাও করতে পারেন। মনে রাখতে হবে, ফিলিস্তিনের গাজার যে বর্তমান অবস্থা, তাতে ইহুদিবাদী ইসরাইল এবং এই রাষ্ট্রকে সমর্থন দিয়ে আসা যুক্তরাষ্ট্র সম্পূর্ণ দায়ী। আমরা যদি ন্যূনতম হলেও বর্জন করি, বিকল্প খুঁজে বের করি, তাহলে তাও প্রতিরোধের অংশ হবে।
লেখক : তথ্যপ্রযুক্তি উদ্যোক্তা
ইমেইল : ceo@banglapuzzle.com
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

