বাংলাদেশে শিক্ষকদের ঘরে জন্মালে যে স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি সবর করতে হয়, তা জানতাম কিন্তু তিনবেলা ন্যূনতম ডাল-ভাতের দাবিটুকুও ছেড়ে দিতে হবে, তা জানতাম না। আমি এমপিওভুক্ত মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের সন্তান। যে হাতের কর গুনে দুই যোগ তিন সমান কত হয় হিসাবের সঙ্গে সঙ্গেই শিখে গেছে কর ও ক্যালকুলেটরবিহীন শখ এবং সাধ বিসর্জনের সহস্র সংখ্যার বিয়োগটাও। বাবার নিত্য দুই পয়সা খরচেরও হিসাব লেখা ডায়েরি, মায়ের কাছ থেকে বেশি বায়না না ধরার প্রত্যহ পরামর্শ এবং বাবা-মায়ের প্রতিদিন নিয়ম করে রাতের খাবার টেবিলের সংসারের টানাটানির গল্প, সংসার চালাতে মায়ের অত্যাবশ্যকীয় চাহিদা এবং বাবার বাজেটের মুমূর্ষু দশার সমীকরণ মেলানোর প্রচেষ্টায় শিক্ষক বাবা ও গৃহিণী মায়ের রোজ রাতেই যে অর্থনীতিবিদে রূপান্তরিত হয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে সিরিয়াস ও গভীর আলাপ-আলোচনা চলে, তাতেই আমাদের বড় করে দেয় বয়সের দুর্ভেদ্য দেয়াল ডিঙিয়ে।
এই গল্পটা শুধু এককভাবে আমার নয়, এই গল্প এবং বাস্তবতা কমবেশি সব শিক্ষক পরিবারের সব সন্তানের। আমাদের জীবনে প্রতিনিয়ত পাঞ্জা লড়াই চলে স্বপ্ন এবং সংগ্রামের, টিকে থাকা এবং ছিটকে পড়ার! মায়ের লড়াইটা সন্তানদের আবদার পূরণ করতে না পারার আক্ষেপ এবং বাবার শুকনো মুখের দিকে তাকিয়ে বাজারের ফর্দটাও বড় না করতে পারার অক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করার ক্ষেত্রে! সে জন্য তাকে নামতে হয় ‘এক ডিম ভাজা দুই ভাগ করে’ সন্তানদের প্লেটে সমতা বিধানের আত্ম-সান্ত্বনার যুদ্ধে। বাবার লড়াইটা বহুমুখী, সন্তানদের পিঠে স্কুলব্যাগটা টিকিয়ে রাখা, স্ত্রীর তুলে দেওয়া শূন্য বাজারের ব্যাগটা উত্তপ্ত দরের হাট থেকেও ভর্তি করে বাড়ি ফেরা, মাসের সার্বিক সাংসারিক ব্যয়, মা-বাবা-আত্মীয়স্বজনদের দায়িত্ব পালন, মাস্টারি ভদ্রলোক সাঁটানো লেবেলটাকে রক্ষা ও সামাজিক মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রেখে চলার অদৃশ্য এক আত্মিক চাপ এবং এসবের বিপরীতে অসম আয়! মাসান্তে ওই কটা টাকার জন্যই শিক্ষক পরিবারের কী চাতক অপেক্ষা! গত ডিসেম্বর থেকে সেই অপেক্ষার যেন আর কোনো নিবৃত্তি নেই! গোটা তিনটি মাস বেতন নামক অন্ধের যষ্টিটুকুও মিলছে না! রাষ্ট্র শিক্ষকদের দায়িত্ব দেবে জাতির মজবুত মেরুদণ্ড গড়ার, বিনিময়ে তারা পাবে বুভুক্ষু পেট? শূন্য উদরে পূর্ণিমার চাঁদটাও যেখানে ঝলসানো রুটি মনে হয়, সেখানে শিক্ষকরা মজবুত মেরুদণ্ডের সূক্ষ্ম গাঁথুনি কীভাবে দেবেন অন্নজলহীন ক্ষুধার্ত ঝাপসা চোখে? রাষ্ট্রব্যবস্থার কাছে প্রশ্ন থেকে গেল শিক্ষক সন্তানদের প্রতিনিধি হিসেবে।
আয়-ব্যয়ের নির্মম বাস্তবতার বলয়ে পড়ে সারাজীবন মৌলিক চাহিদা পূরণের সংগ্রাম করা শিক্ষকটাকেও যখন দেখি নিজের ন্যায্য হিস্যা কল্যাণভাতা ও অবসরভাতার টাকাটা পেতেও নানা ব্যাধি আক্রান্ত ন্যুব্জ দেহে সেলাই করা চটিটাকে ক্ষয় করে ফেলতে হয়, তারই ছাত্রতুল্য কোনো কর্মকর্তার টেবিলে ধরনা দিতে দিতে, বাতের ব্যথাও তাকে কুর্নিশ করে অবসরভাতার পেছনে শিক্ষকের সিঁড়ি মাড়ানোর পরিসংখ্যান দেখে! তখন একজন শিক্ষক বাবার সন্তান হিসেবে কতটা আগ্রহ পুষতে পারি শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে? যে ব্যবস্থা আমার বাবার মতো লাখো শিক্ষকের সম্মান দেওয়ার বদলে স্রেফ ভোগান্তি দিতে পারে, তাদের সন্তানদের শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নিতে নিরুৎসাহিত করে, সেই ব্যবস্থার নির্মাতা কারা? শিক্ষকদের ক্রন্দনে কি মাউশি এবং মন্ত্রণালয়ের হর্তাকর্তাদের পাজেরোর কাচে বাষ্প জমে না? রমজানে যখন মাউশির কর্মকর্তাদের টেবিলে ইফতারির পসরা তখন আমাদের ঘরে শুকনো মুড়ি, মায়ের ভাজা দুটো ডালের চপ, একটা তুলনামূলক কম দামি বরই খেজুর ও জগভর্তি পানি সামনে নিয়ে ইএফটি সিস্টেমে তিন মাস বেতন না প্রাপ্তির উৎকট আলোচনা এবং দীর্ঘশ্বাস! ঈদে যখন সবাই সব কেনাকাটা সেরে ঈদ উদযাপনে ঘরের রাস্তা ধরে শিক্ষকদের তখন রঙচটা পুরোনো শার্টের পকেটে টাকা ঢোকে! ঈদুল আজহার কথা হিসাব করলে তো আর করুণ অবস্থা! আমাদের মুক্তি আসলে কোথায়? কবে? এবং কার হাতে? সরকার যায় সরকার আসে! প্রতিশ্রুতি আসে প্রতিশ্রুতি যায়! কিন্তু আমাদের শিক্ষক পরিবারের কপালে আর সৌভাগ্য ও সুখ সূর্যের উদয় হয় না!
লেখক : সাংস্কৃতিক কর্মী, মিরপুর, কুষ্টিয়া
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

