ভারতে প্রাচীন মসজিদকে মন্দির ঘোষণা

‘হিন্দু শাসনই ভারত চালায়’

যশরাজ শর্মা ও মোহাম্মদ সরতাজ আলম

‘হিন্দু শাসনই ভারত চালায়’

ভারতের মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের ধার জেলায় অবস্থিত কমল মৌলা মসজিদটি কয়েক দশক ধরে ছিল ৭৮ বছর বয়সি মোহাম্মদ রফিকের কাছে দ্বিতীয় বাড়ির মতো। ৫০ বছর ধরে তিনি এই মসজিদে মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব পালন করছেন। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে ভারতের স্বাধীনতা লাভের আগে থেকে তার দাদা হাফেজ নাজিরউদ্দিন এই মসজিদে ইমামতি করতেন।

কিন্তু প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্বের একটি সংরক্ষিত স্মৃতিস্তম্ভ ভোজশালা কমপ্লেক্সে অবস্থিত এই মসজিদটি এখন রফিক এবং ধার এলাকার অন্য মুসলমানদের জন্য নিষিদ্ধ এলাকা হয়ে গেছে।

বিজ্ঞাপন

ওই স্থানে মসজিদের আগে একটি মন্দির ছিল দাবি করে করা একটি আবেদনের শুনানি শেষে মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট শুক্রবার রায় দিয়েছে, মধ্যযুগের এই কমপ্লেক্সটি একজন হিন্দু দেবীকে উৎসর্গীকৃত একটি মন্দির। এরপরই রবিবার ত্রয়োদশ-চতুর্দশ শতাব্দীর এই স্মৃতিস্তম্ভটি বিজেপি ও এর অঙ্গসংগঠনের উগ্র সমর্থকদের হাতে থাকা গেরুয়া পতাকায় ছেয়ে যায়। সেখানে তারা ধর্মীয় সুরে নাচছিল ও তাদের ফোনে সেই আচার-অনুষ্ঠানের ভিডিও ধারণ করছিল। বিজেপির স্থানীয় কর্মী ও সমবেত বিপুলসংখ্যক হিন্দু ভক্ত ব্যাপক পুলিশি পাহারার মধ্যে মসজিদে দেবীর একটি অস্থায়ী মূর্তি স্থাপন করেন।

শুধু কমল মৌলা মসজিদ নয়, ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর উৎসাহিত হয়ে উগ্র-ডানপন্থি হিন্দুত্ববাদীরা ভারতজুড়ে একই ধরনের দাবি করে আসছে যে, সারা ভারতেই অসংখ্য মসজিদ কোনো না কোনো মন্দিরের ওপরে নির্মিত হয়েছে। সপ্তদশ শতাব্দীর মোগল স্থাপত্যের অন্যতম নিদর্শন ও বিশ্বের সপ্ত আশ্চর্যের একটি তাজমহলও মন্দির খোঁজার হিন্দুত্ববাদী অভিযান থেকে রক্ষা পায়নি। তাজমহল মসজিদ নয়, একটি সমাধিসৌধ হলেও উগ্র জাতীয়তাবাদী হিন্দুরা এটাকেও বিতর্কের বিষয়ে পরিণত করেছে। রফিকের মতো ভারতে লাখ লাখ মুসলমানের জন্য স্মৃতি মুছে ফেলার এ ঘটনাটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক। ক্ষীণ কণ্ঠে তিনি আলজাজিরাকে বললেন, ‘গত শুক্রবার পর্যন্ত মসজিদটি আমাদেরই ছিল, আজ আর নেই। আমি স্বপ্নেও ভাবিনি যে এমন কিছু ঘটবে।’

‘গভীরভাবে প্রোথিত ইসলামোফোবিয়া’

কমল মৌলা মসজিদের স্থান বা তথাকথিত ভোজশালা কমপ্লেক্স কয়েক দশক ধরেই বিবাদের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। ১৯৫০-এর দশকের শেষের দিকে এই স্থানে প্রথমবারের মতো উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা মন্দির থাকার দাবি উত্থাপন করে। ঐতিহাসিক স্মৃতিস্তম্ভ সুরক্ষার দায়িত্বে থাকা সরকারি সংস্থা আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া’র (এএসআই) সঙ্গে ২০০৩ সালের একটি চুক্তি অনুসারে মঙ্গলবার হিন্দুদের স্থানটি পরিদর্শনের অনুমতি দেওয়ার পাশাপাশি শুক্রবার মুসলমানদের জুমার নামাজ আদায়েরও অনুমতি দেওয়া হয়। কিন্তু আদালত এএসআইয়ের একটি সমীক্ষার ওপর ভিত্তি করে প্রাচীন এই মসজিদটিকে মন্দির হিসেবে ঘোষণা করে।

আদালতের রায়ে মুসলমানদের দাবি খারিজ করে স্থানটিকে বাগদেবী বা বাণীর দেবীর মন্দির হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, যা হিন্দুদের সেখানে পূজা করার সুযোগ এনে দিয়েছে। তবে আদালত জেলায় আরেকটি মসজিদ নির্মাণের জন্য বিকল্প জমি চাওয়ার অনুমতি দিয়েছে। মুসলমানরা জানিয়েছে, তারা সুপ্রিম কোর্টে এই রায়কে চ্যালেঞ্জ করবে।

ভারতীয় উপমহাদেশ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ইতিহাসবিদ অড্রে ট্রুশকে এএসআইয়ের সমীক্ষা প্রসঙ্গে আলজাজিরাকে বলেন, ‘পণ্ডিতরা এমন পদ্ধতি, কঠোরতা এবং সিদ্ধান্ত খোঁজেন, যা আন্তর্জাতিক পাণ্ডিত্যপূর্ণ মানদণ্ড পূরণ করে। তাদের কাছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং নিম্নমানের সমীক্ষার কোনো গুরুত্ব নেই। ভারতে মসজিদগুলো লক্ষ্যবস্তু করার বর্তমান প্রবণতা হিন্দু জাতীয়তাবাদের গভীরে প্রোথিত ইসলামোফোবিয়ারই একটি অংশ।’

তিনি আরো বলেন, ‘মুসলমানদের হয়রানি, হুমকি এবং ক্ষতি করার জন্য হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের এটি অনেকগুলো পদ্ধতির মধ্যে একটি। মুসলমানদের ধর্মীয় স্বাধীনতা সীমিত করার জন্য ভারতে চলমান প্রচারণাগুলো ভয়াবহ।’

‘বন্যার দ্বার খুলে দিয়েছে’

সমালোচকরা বলছেন, মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট বেঞ্চ হিন্দুদের ওই স্থানটি দেওয়ার জন্য বাড়াবাড়ি করেছে। আলজাজিরার পর্যালোচনা করা ১৯৩৫ সালের আগস্ট মাসের একটি আনুষ্ঠানিক গেজেট বিজ্ঞপ্তিতে তৎকালীন সরকারি কর্মকর্তারা লিখেছিলেন, মুসলিমদের নামাজের ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই এবং তা অব্যাহত থাকবে, কারণ এই চত্বরটি ‘একটি মসজিদ এবং ভবিষ্যতেও এটি একটি মসজিদই থাকবে’। কিন্তু আদালত ব্রিটিশ আমলের এই বিজ্ঞপ্তিটি গ্রহণ করেনি এই বলে যে, এটি বর্তমান আইনগুলোর পূর্ববর্তী।

এখানে আলোচ্য মূর্তিটিকে দেবীর অপর নাম ‘অম্বিকা’ নামে উল্লেখ করা হয়েছে। ব্রিটিশ মিউজিয়ামের প্রত্নবস্তুটির বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে, এটি পরমার রাজবংশের, যা ১৮৭৫ সালে ব্রিটিশ মেজর জেনারেল উইলিয়াম কিনকেইড ধারের সিটি প্যালেসের ধ্বংসাবশেষ থেকে খুঁজে পান।

মামলায় মুসলমানদের আইনজীবী আশহার ওয়ারসি বলেন, ‘বর্ণনার সঙ্গে থাকা একটি মানচিত্রে স্পষ্টভাবে দেখা যায়, ‘কামাল মৌলা মসজিদ’ সিটি প্যালেস থেকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করা আছে। ঐতিহাসিক নথিপত্রে স্পষ্টভাবে দেখা যায়, মূর্তিটি কামাল মৌলা মসজিদের স্থানে পাওয়া যায়নি এবং বিরোধীরা সরাসরি মিথ্যা বলছে।’

এই রায়ে অসন্তুষ্ট ওয়ারসি আরো বলেন, ‘এটি একটি ভুল রায়। এটি প্রতিষ্ঠিত আইনের শাসনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।’ তিনি ভারতের ১৯৯১ সালের উপাসনালয় আইনের কথা উল্লেখ করেন, যা ১৯৪৭ সালের আগস্টে স্বাধীনতার সময়কার সব উপাসনালয়ের ধর্মীয় চরিত্রকে অপরিবর্তিত রাখে। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল ধর্মীয় স্থানগুলোর প্রকৃতি পরিবর্তনের জন্য যেকোনো নতুন দাবিকে বাধা দেওয়া।

দক্ষিণ ভারতের হায়দরাবাদ শহর থেকে পাঁচবারের সংসদ সদস্য আসাদুদ্দিন ওয়াইসি বলেন, ‘হাইকোর্টের সিদ্ধান্তটি অযৌক্তিক, কারণ এএসআই হিন্দুত্ববাদী শক্তির হাতের পুতুলে পরিণত হয়েছে।’ আলজাজিরাকে তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকার যদি সব মসজিদকে মন্দিরে রূপান্তরিত করতে চায়, তবে এটি এই বার্তা দেয় যে, ভারতের বৃহত্তম সংখ্যালঘু গোষ্ঠী মুসলমানদের ধর্মীয় স্থানগুলোর প্রতি গুরুতর হুমকি রয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টের এই রায় বাবরি মসজিদ ধ্বংসের বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের ২০১৯ সালের রায়ের দুর্গন্ধে পরিপূর্ণ। ‘বাবরি রায় এসব দাবি ও রায়ের স্রোত বইয়ে দিয়েছে। এর শেষ কোথায়? নিশ্চয়ই ধরের কামাল মওলা মসজিদে নয়।’

‘বাবরি মসজিদের পতন হিন্দুদের গর্বকে জাগিয়ে তুলেছিল’

ভারতের হিন্দু জাতীয়তাবাদী নেতারা উগ্র ডানপন্থি জনতাকে নেতৃত্ব দিয়ে ষোড়শ শতাব্দীর বাবরি মসজিদটি ভেঙে ফেলে। তাদের দাবি, প্রথম মোগল শাসক বাবরের আমলে একটি মন্দিরের জায়গায় এই মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল, যা ছিল তাদের প্রধান দেবতা রামের জন্মস্থান। ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত মুসলমানরা এখানে নামাজ পড়তেন। এরপর কথিত হিন্দু পুরোহিতরা মসজিদের ভেতরে মূর্তি স্থাপন করেন। এই ধ্বংসযজ্ঞের ফলে দেশব্যাপী হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গায় ২,০০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়, এর অধিকাংশই মুসলমান।

বছরের পর বছর ধরে তিক্ত আইনি লড়াইয়ের পর সুপ্রিম কোর্ট বিতর্কিতভাবে রামমন্দির নির্মাণের জন্য জায়গাটি হিন্দুদের দেয়। প্রধানমন্ত্রী মোদি ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে মন্দিরের অভিষেক অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, যা হিন্দুত্ব আন্দোলনের জন্য একটি বড় বিজয়ের ইঙ্গিত দেয়। তিনি বলেন, ‘সময়ের চাকা উল্টোদিকে ঘুরছে এবং হিন্দুদের গর্বের দিন ফিরে এসেছে।’

প্রকৃতপক্ষে, অন্যান্য ঐতিহাসিক মসজিদ নিয়েও একই ধরনের দাবি মোদির বিজেপির একটি প্রধান নির্বাচনি ইশতেহার হয়ে উঠেছে। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর দলটি তাদের প্রচারের কেন্দ্রবিন্দুতে ‘অযোধ্যা শুধু ঝাঁকি হ্যায়; কাশী, মথুরা বাকি হ্যায়’ (অযোধ্যা শুধু এক ঝলক; এরপর কাশী ও মথুরা) স্লোগানটি জুড়ে দেয়। এর মাধ্যমে তারা উত্তর প্রদেশের আরো দুটি শহরের কথা উল্লেখ করে, যেখানে মসজিদগুলোকে মন্দির বলে দাবি করা হয়েছে।

কাশী যা বারাণসী নামে বেশি পরিচিত, সেটিও মোদির সংসদীয় নির্বাচনি এলাকা। ২০২৪ সালে বারাণসীর একটি আদালত রায় দেয় যে, শহরের সপ্তদশ শতকের জ্ঞানবাপী মসজিদের নিচে একটি হিন্দু মন্দিরের চিহ্ন রয়েছে এবং হিন্দুদের এর ভেতরে প্রার্থনা করার অনুমতি দেওয়া হয়। মথুরায় হিন্দু গোষ্ঠীগুলো অযোধ্যার পুনরাবৃত্তি চায় এই দাবি করে, যেখানে তাদের দেবতা ভগবান কৃষ্ণের জন্ম হয়েছিল, মোগল আমলের আরেকটি মসজিদ ‘শাহি ঈদগাহ’ ঠিক সেই স্থানেই অবস্থিত।

কামাল মৌলা মসজিদ মামলার একপক্ষ স্থানীয় একটি হিন্দু সংগঠনের আহ্বায়ক গোপাল শর্মা আলজাজিরাকে বলেন, ‘৭২০ বছরের বেশি সময় ধরে আমরা আমাদের দেবীর মর্যাদা পুনরুদ্ধারের জন্য অপেক্ষা করছি, যাকে মুসলিম শাসকরা অপমান করেছিল এবং তার মন্দির ভেঙে ফেলেছিল।’

কিন্তু ১৩০০-এর দশকে একজন মুসলিম শাসক কথিত মন্দিরটি ধ্বংস করেছিলেনÑশর্মার এই দাবির সমর্থনে আলজাজিরা কোনো স্বাধীন ঐতিহাসিক সূত্র খুঁজে পায়নি। কিন্তু এরপরও গোপাল শর্মা দাবি করেন, ‘বাবরি মসজিদ পতনের পর থেকে এটি হিন্দুদের মধ্যে গর্বের অনুভূতি জাগিয়ে তুলেছে। আর সেই আত্মবিশ্বাসই এখন আমাদের দেশে হিন্দুব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে পরিচালিত করছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘ভারতে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির অজুহাতে এত বছর ধরে তথাকথিত ধর্মীয় সম্প্রীতি সহ্য করা হয়েছে। এখন আর ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতি ভারতকে চালায় না। মোদির হিন্দুত্বই চালায়।’

অন্যদিকে, ওয়াইসি আলজাজিরাকে বলেন, ‘বাবরি মামলার রায় এবং এই হাইকোর্টের রায় প্রমাণ বা ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে নয়, বরং জনবিশ্বাসের ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছে।’

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন