আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

যেভাবে হাতছাড়া হচ্ছে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার সুযোগ

এলাহী নেওয়াজ খান

যেভাবে হাতছাড়া হচ্ছে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার সুযোগ

এবার ভেবেছিলাম বাংলাদেশে জাতীয় ঐকমত্যের একটি প্ল্যাটফর্ম দাঁড়িয়ে যাবে। জুলাই বিপ্লবের সময় ফ্যাসিবাদবিরোধী জাতীয় ঐক্যের যে দৃষ্টান্ত প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তাতে সে ভাবনা অবান্তর ছিল না; বরং উৎফুল্ল হওয়ার যথেষ্ট কারণ ছিল। মনে হয়েছিল ’৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের পর যা আমরা পারিনি, নিশ্চয় এবার তা আমরা পারব। কিন্তু কোথায় যেন ছন্দপতন ঘটেছে। বেসুরো হয়ে গেছে ঐকতান। এখন মনে হচ্ছে, বড় কোনো সুযোগ কাজে লাগানোর ব্যর্থতা আমাদের জাতীয় জীবনের বৈশিষ্ট্য হয়ে গেছে।

বিজ্ঞাপন

আমি ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধার কথা বলছি না। কারণ এ ক্ষেত্রে বাঙালির জুড়ি নেই বললেই চলে। আমি বলছি জাতীয় পর্যায়ের সুযোগের কথা, যে সুযোগকে কাজে লাগিয়ে জাতি হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো যায়। সে তাকত আমাদের আছে। আর সেটা আছে বলেই ’৭১ সালে জীবন দিয়ে যুদ্ধ করে আমরা দেশ স্বাধীন করেছি। সেটা আছে বলেই তরুণদের রক্তঢালা জুলাই বিপ্লব ঘটেছে। তবুও বারবার আমরা হোঁচট খাচ্ছি। বারবারই ক্ষুদ্র দলীয় স্বার্থের কাছে পরাজিত হচ্ছে জাতির বৃহত্তর স্বার্থ।

দুঃখজনক ঘটনা হচ্ছে, আমরা ক্রান্তিকালে জোটবদ্ধ হয়ে আন্দোলন করি, জীবন দিই; কিন্তু সফল হওয়ার পর শহীদের রক্তের দাগ মুছে যাওয়ার আগেই দ্বন্দ্ব-সংঘাতে জড়িয়ে পড়ি এবং অতঃপর গোটা জাতিকে নিমজ্জিত করি হতাশার গভীর গহ্বরে। আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে অনৈক্যের ভয়াবহ বিপর্যয় বারবার ঘটে আসছে, তবুও বোধোদয় হয়নি কখনো। ’৫৪ সালে তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের ঐতিহাসিক বিজয় শুধু অনৈক্যের কারণে মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় ভেঙে পড়েছিল। অর্থাৎ ’৫৪ সালের ৩ এপ্রিল যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠিত হয় এবং ৩০ মে মন্ত্রিপরিষদ ভেঙে দিয়ে জারি করা হয় কেন্দ্রীয় শাসন। নিজেদের হানাহানির কারণে এত বড় একটি বিজয় দ্রুততম সময়ে দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়।

তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান গণপরিষদের ওই নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের অভাবিত বিজয়ের পর আদমজী পাটকলে বাঙালি-অবাঙালি দাঙ্গা এবং চকবাজারে একটি তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে জোটের এক শরিক দলের নেতৃত্বে ভয়াবহ সংঘর্ষের ঘটনা পরিস্থিতিকে নাজুক করে তুলেছিল। মূলত শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক সংসদীয় নেতা নির্বাচিত হওয়ার পর মন্ত্রিপরিষদ গঠন করলেও আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে কাউকে মন্ত্রী না করায় লীগের নেতারা শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হককে এক হাত দেখিয়ে দেওয়ার জন্য নানামুখী সহিংস তৎপরতা শুরু করে। তার মধ্যে অন্যতম ছিল চকবাজার সংঘর্ষ।

চকবাজারে একটি পানের দোকানে এক কারারক্ষীর বাকি খাওয়াকে কেন্দ্র করে যে ঝগড়া শুরু হয়, তা অচিরেই রাজনৈতিক সংঘাতে রূপ নেয়, যা পরবর্তী সময়ে কেন্দ্রীয় শাসন জারি করার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ ব্যাপারে বিখ্যাত রাজনীতিবিদ অলি আহাদ তার ‘জাতীয় রাজনীতি ১৯৪৫-৭৫’ গ্রন্থে লিখেছেন, “...তুচ্ছ ঘটনাটিই অচিরে জনতা ও কারারক্ষীদের মধ্যে সংঘর্ষের কারণ হইয়া দাঁড়ায়। রাজনৈতিক ফায়দা লুটার মতলবে খবর পাওয়া মাত্র পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ সাধারণ সম্পাদক ও পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদের সদ্য নির্বাচিত সদস্য শেখ মুজিবুর রহমান এক উচ্ছৃঙ্খল জনতার কাফেলাকে নেতৃত্ব দিয়া জেলগেট আক্রমণ করেন। উচ্ছৃঙ্খল জনতা জেলগেট সন্নিকটবর্তী সশস্ত্র পুলিশদের অস্ত্রাগার লুণ্ঠনে অগ্রসর হইলে আত্মরক্ষা ও নিরাপত্তার অপরিহার্য কারণেই জেলগেটে প্রহরারত সশস্ত্র পুলিশ গুলিবর্ষণ করিতে বাধ্য হয়।” এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক আওয়ামী মুসলিম লীগ নেতাদের মন্ত্রিপরিষদে অন্তর্ভুক্ত করলেও শুরুতেই যে বিবাদের সূচনা হয়েছিল, তা নিরসন হয়নি। বরং কর্ণফুলী পেপার বিলের দাঙ্গার পর আদমজী পাটকলে ভয়াবহ বাঙালি-অবাঙালি শ্রমিকদের মধ্যকার দাঙ্গায় ১ হাজার ৫০০ আদম সন্তানের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। আর এই ঘটনার সুযোগ গ্রহণ করে কেন্দ্রীয় সরকার যুক্তফ্রন্টের পতন ঘটিয়ে দেয়।

শুধু যুক্তফ্রন্টের নেতাদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব, অনৈক্য এবং একে-অপরকে দেখে নেওয়ার ফলে কেবল যুক্তফ্রন্ট সরকারের পতন ঘটেনি; বরং পরবর্তী সময়ে অনৈক্যের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকায় ১৯৫৮ সালে গণতন্ত্র বিপর্যয়কারী আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের সূচনা ঘটে। শেষ পর্যন্ত এটাই পাকিস্তানের বারোটা বাজিয়ে দেয়।

অনৈক্যের খেসারত কতটা ভয়বহ হতে পারে, তা পাকিস্তান ভাঙনের মাধ্যমে প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও আমরা শিক্ষা গ্রহণ করতে পারিনি। এখন দেখা যাচ্ছে, রাজনৈতিক নেতৃত্বের অনৈক্যের কারণেই জনগণের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের সাফল্য বারবার ব্যর্থতায় পর্যবসিত হচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার অনৈক্য ও প্রতিশোধমূলক সহিংস ঘটনার কারণে যদি যুক্তফ্রন্ট সরকারের পতন এবং পরে সকাল-বিকাল সরকার পরিবর্তনের ঘটনা না ঘটলে হয়তো আইয়ুবের সামরিক শাসন নাও আসতে পারত। একইভাবে ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে যেভাবে জাতীয় ঐক্য গড়ে উঠছিল, ঠিক সেভাবে যদি ’৭০-এর জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতো, তা হলে হয়তো ইতিহাস অন্যভাবে লিখিত হতো।

এখানে উল্লেখ করতে হয়, প্রতিটি রক্তাক্ত আন্দোলনের পেছনে ছিল রাজনৈতিক দল ও জনগণের ঐক্যবদ্ধতা। যেমন ’৫২ সালের ভাষা আন্দোলন সংগঠিত হয়েছিল রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও জনগণের ঐক্যবদ্ধতার মাধ্যমে। সেটাই মূলত ’৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট গঠনের অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করছিল। একইভাবে ’৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের অনুপ্রেরণা ছিল উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে গড়ে ওঠা অবিস্মরণীয় জাতীয় ঐক্য। তাই স্বাভাবিকভাবে ’৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সব মহল থেকে জাতীয় সরকার গঠনের দাবি উঠেছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ সে দাবিকে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করায় একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে যায়। তবে সবচেয় দুঃখজনক ঘটনা হচ্ছে, সে সময় ন্যাপ (মুজাফফর) নেতা মুজাফফর আহমেদ প্রথম জাতীয় সরকারের দাবি তুললেও অতি দ্রুত তিনি তার দল এবং বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টিকে (সিপিবি) সঙ্গে নিয়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে মিলেমিশে ত্রিদেশীয় ঐক্যজোট গঠন করে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার সেই সুবর্ণ সুযোগকে ক্ষুদ্র দলীয় স্বার্থের কাছে বলি দেন। শুধু তা-ই নয়, তারা পরবর্তী সময়ে একদলীয় বাকশাল সৃষ্টি করে সেটাকেই জাতীয় সরকার বলে অভিহিত করে জাতীয় সরকারের গুরুত্বকে তামাশায় পরিণত করেছিল।

সবশেষে মানুষের মধ্যে প্রচণ্ড আশা জাগিয়ে তোলা ’২৪-এর জুলাই-আগস্ট বিপ্লবোত্তর ঘটনাপ্রবাহ দেখে মনে হচ্ছে, আবার আমরা ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠনের আরকটি বড় সুযোগ দ্রুত হারিয়ে ফেলছি। যদি জুলাই বিপ্লবে অংশগ্রহণকারী দলগুলো একসঙ্গে বসে ‘নতুন বাংলাদেশ’ গঠনের লক্ষ্যে অভিন্ন সিদ্ধান্ত নিতে পারতো, তা হলে হয়তো একটা আশার আলো দেখা যেত। তা হলো না, বরং বিভেদ আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে বিপ্লবে নেতৃত্বদানকারী ছাত্রদের দ্বারা গঠিত ‘জাতীয় নাগরিক পরিষদ’ নামের নতুন রাজনৈতিক দল বিভাজিত জাতির মধ্যে কতটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে সন্দেহ রয়ে গেছে। বরং এটা সমমনা অনেক দলের সঙ্গে আরকটি নতুন দলের সংযোজনই শুধু নয়, বরং একই ভোটব্যাংক নিয়ে প্রধানত বিএনপি, জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পরিষদের মধ্যে কাড়াকাড়ি তীব্র আকার ধারণ করবে। জাতীয়তাবাদী ও ইসলামি মূল্যবোধের এই সমমনা ভোটারদের মধ্যে যারা বিএনপি ও জামায়াতের ওপর বিরক্ত, তাদের অনেকেই নতুন দল নিয়ে উল্লসিত। কিন্তু শত শত শহীদের রক্তের বিনিময়ে জাতীয় ঐক্যের যে স্বপ্ন জনগণ দেখেছিল, তা কতটা বাস্তবায়িত হবে তা নিয়ে সংশয় রয়েই গেছে। তাই বলা যায়, আগামীতে যদি সমমনা রাজনৈতিক দলগুলো সংকীর্ণতার ওপরে উঠে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করতে না পারে, তা হলে আরেকটি বড় সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাবে, যা আমাদের আরো অনেক বছর পিছিয়ে দেবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন