আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

মিয়ানমার থেকে গাজা : আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার ব্যর্থতা

নাটালি ব্রিনহাম ও মং জারনি

মিয়ানমার থেকে গাজা : আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার ব্যর্থতা
ছবি: এএফপি

আট বছর আগে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর গণহত্যা শুরু করে। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে রোহিঙ্গারা নিজেদের মাতৃভূমিতে এই হত্যাযজ্ঞের শিকার হন। পোড়ামাটি নীতিতে পরিচালিত এই অভিযানে ৭ লাখ ৪০ হাজার রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুত হয়। ‘মুসলিম সন্ত্রাসীদে’র বিরুদ্ধে ‘সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ পরিচালনার নামে তিন শতাধিক গ্রাম গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। তখন মিয়ানমারে অং সাং সুচির নেতৃত্বে একটি বেসামরিক সরকার ক্ষমতায় ছিল। সুচি এই গণহত্যাকে অনুমোদন দিয়েছিলেন এবং দুনিয়াজুড়ে এই গণহত্যার সাফাই গাইতেন।

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রবাহ কিছুটা কমে গেলে আমরা দুজনই বাংলাদেশের কক্সবাজারে গিয়েছিলাম। তখন আমরা বিতাড়ন, গণধর্ষণ, খুন ও অগ্নিসংযোগের শিকার মানুষদের কাছ থেকে সরাসরি তাদের ঘটনা জানতে পেরেছিলাম। মিয়ানমারের সেই গণহত্যা এখনো থামেনি। তাদের কোনো অধিকারও নেই, আশ্রয়ও নেই। নিজেদের ভূমিতে ফিরে যাবে, এমন কোনো ভরসাও নেই। ফিলিস্তিনিরাও একই ধরনের পরিস্থিতির শিকার।

বিজ্ঞাপন

আট বছরে আমাদের অভিজ্ঞতা হচ্ছে, শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো যে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা চালু করে রেখেছে, তা আর কাজ করছে না। ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক সংগঠন ‘আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালত’ অপরাধী রাষ্ট্রগুলোকে বিচারের মুখোমুখি করতে পারছে না। এ অবস্থা মিয়ানমারের যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষেত্রে একধরনের দায়মুক্তির পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। মিয়ানমারের এ দৃষ্টান্ত সাম্প্রতিক বিশ্বের অন্যান্য ঘটনাপ্রবাহেও প্রভাব ফেলছে।

ইসরাইলের ফাঁস হওয়া একটি মিলিটারি রিপোর্ট থেকে জানা গেছে, গাজায় হামাসের বিরুদ্ধে ইসরাইলের তথাকথিত আরবান ওয়ারফেয়ারের শিকার হয়ে ৮৩ শতাংশ বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন।

ইসরাইলের মতো মিয়ানমারের বিরুদ্ধেও গণহত্যার অভিযোগে তদন্ত চলছে। আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালত (আইসিজে) সর্বসম্মতভাবে নিশ্চিত হয়েছিল যে মিয়ানমারে আন্তর্জাতিক গণহত্যা কনভেনশন লঙ্ঘিত হচ্ছে। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে আইসিজে মিয়ানমারে অবস্থানকারী ছয় লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রিত জনগণ হিসেবে ঘোষণা করে। সেইসঙ্গে এদের বিরুদ্ধে নতুন করে যেন সহিংসতা না হয়, সে ব্যাপারে ইয়াঙ্গুনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তার পর থেকে মিয়ানমারে দায়মুক্তির ঘটনা উলটো বেড়ে গিয়েছিল। গণহত্যা ঠেকাতে জাতিসংঘের প্রধান ন্যায়বিচার নিশ্চিতকারী প্রতিষ্ঠানটি সুস্পষ্টভাবে ব্যর্থ হয়েছে। আইসিজের বিচারপ্রক্রিয়ার চেয়ে দ্রুত গতিতে রোহিঙ্গা গণহত্যা পরিচালিত হচ্ছে।

২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সুচি ও তার দুবারের নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করা হয়েছিল। তখন থেকেই সামরিক জান্তা সরকার দেশজুড়ে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও ক্যু-বিরোধীদের ওপর গণহত্যা চালাচ্ছে।

এদিকে দেশজুড়ে সশস্ত্র সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন কিছু গোষ্ঠীর উদ্ভব হয়েছে, যারা রোহিঙ্গাদের টার্গেট বানাচ্ছে।

আরাকান আর্মি মিয়ানমারের রাখাইন অঞ্চলের একটি বৌদ্ধ সশস্ত্র গোষ্ঠী। রাখাইনের অধিকাংশ অঞ্চলই এদের দখলে। জাতিসংঘসহ অনেকগুলো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার কাছে জোরালো প্রমাণ রয়েছে যে, এই সশস্ত্র গোষ্ঠী মিয়ানমারের অভ্যন্তরস্থ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর এখনো গণহত্যা চালাচ্ছে। বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদীদের তীব্র ইসলাম-বিদ্বেষের অংশ হিসেবেই আরাকান আর্মি এই নিপীড়ন চালাচ্ছে বলে ধারণা করা হয়।

যদিও সাধারণ জনগণ সামরিক শক্তিগুলোকেই রোহিঙ্গা গণহত্যার জন্য প্রধান দোষী হিসেবে সাব্যস্ত করছে, তবুও তারা গণহত্যার সহযোগীদের ব্যাপারে খুব একটা সোচ্চার নয়। রাজনৈতিক দল, বৌদ্ধ সংগঠনগুলো ও সুশীল সমাজের মধ্যে যারা গণহত্যার অংশীদার, তাদের অপরাধের জন্য অভিযুক্ত করা হচ্ছে না।

২০১৪ সালে আমরা তিন বছর মেয়াদি একটা গবেষণার প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিলাম। সেখানে আমরা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে পরিচালিত বিতাড়ন, নির্যাতন ও ধ্বংসাত্মক কার্যক্রমের ব্যাপারে বিশ্ববাসীকে সতর্ক করেছিলাম।

‘নীরব গণহত্যা’ শব্দ দুটি দ্বারা আমরা বুঝাতে চেয়েছিলাম, রাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইচ্ছাকৃতভাবে একটি জনগোষ্ঠীর ওপর পরিচালিত ধ্বংসযজ্ঞকে। এই ধ্বংসযজ্ঞে সহিংসতা ও আন্তর্জাতিক আইনকে গণহত্যার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

গণহত্যার পক্ষে সমাজের বৃহত্তর পরিসরে এক ধরনের বৈধতা উৎপাদন করা হয়েছে। মিয়ানমারের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে ইসলামোফোবিক আইডিয়োলজি দ্বারা জনগণের মনমানসিকতাকে প্রস্তুত করা হয়েছে। এর ফলে রোহিঙ্গাদের ওপরে চালানো গণহত্যার পরে তেমন কোনো নাগরিক প্রতিক্রিয়া হয়নি।

অং সাং সুচি একসময় পশ্চিমাদের চোখে গণতন্ত্রের মানসকন্যা ছিলেন। এই ইমেজ ব্যবহার করে ২০২০ সালে আইসিজেতে নিজ দেশে পরিচালিত গণহত্যার ব্যাপারে সাফাই গেয়েছিলেন তিনি। এর চেয়েও দুঃখজনক ব্যাপার হলো কিছুদিন আগে ৬০০ রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হয়েছে, এমন একটি বধ্যভূমি আবিষ্কৃত হয়েছে। আরাকান আর্মি এই গণহত্যার সঙ্গে জড়িত। কিন্তু মিয়ানমারের কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী কিংবা কোনো রাজনৈতিক দল এর বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ জানায়নি।

আপাতদৃষ্টিতে এসব সরকারবিরোধী গোষ্ঠীর কাছে চলমান গণহত্যা, নির্যাতন ও বিতাড়নের বিরোধিতা করার চেয়ে আরাকান আর্মির সহযোগিতাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একটি গণহত্যা চলমান অবস্থায় নীরব ভূমিকা পালন করা গণহত্যায় অংশগ্রহণ করারই শামিল। ২০২১ সালের পর থেকে বন্দি দশায় থাকা অং সাং সুচির পতন থেকে মিয়ানমারের জনগণ কিছুই শেখেনি। তিনি গণহত্যায় সমর্থন দেওয়ার কারণে এখন আর বিশ্বের জনগণের সমর্থন পাচ্ছেন না। পিনোশেট-জাতীয় মামলায় মানবতাবিরোধী অপরাধে সরাসরি অংশগ্রহণের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।

মিয়ানমারের বাইরেও কতিপয় নেতা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছ থেকে সম্পূর্ণ দায়মুক্তি নিয়ে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। আমরা মানবতার ইতিহাসের এক চরম সংকটময় মুহূর্ত অতিক্রম করছি, যখন পাশ্চাত্যের রাষ্ট্রগুলো হলোকাস্ট-পরবর্তী সময়ে বিশ্বের রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করছে। কিন্তু তারা গণহত্যার প্রতিরোধ আর স্বাভাবিক মানবিক মূল্যবোধ রক্ষায় সম্পূর্ণ ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে।

গণহত্যা বন্ধ করার বদলে যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রশংসা করে। তারা ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্টের সেই কর্মকতাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেন, যারা ইসরাইলি নেতাদের নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন। এদিকে ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোও একই পথে হাঁটছে।

টিআরটি ওয়ার্ল্ড থেকে ভাষান্তর : এইচ এম নাজমুল হুদা

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন