ফিলিপাইনে জ্বালানি জরুরি অবস্থা থেকে শিক্ষা

ড. মো. আব্দুল মোমেন

ফিলিপাইনে জ্বালানি জরুরি অবস্থা থেকে শিক্ষা

সম্প্রতি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ ফিলিপাইন এক বছরের জন্য ‘জাতীয় জ্বালানি জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করেছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র অত্যন্ত স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরাইল উত্তেজনা এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ বন্ধ হওয়ার আশঙ্কায় তাদের জ্বালানি নিরাপত্তা এখন ‘আসন্ন বিপদের’ মুখে। শুধু শঙ্কা প্রকাশ করেই ক্ষান্ত হয়নি ফিলিপাইন সরকার; তারা জ্বালানি সাশ্রয়, ভর্তুকি এবং সাধারণ মানুষের জন্য নগদ সহায়তার এক বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু করেছে।

ফিলিপাইনের ৯৮ শতাংশ জ্বালানি আসে হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে। ফলে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া ছাড়া দেশটির সামনে কোনো বিকল্প নেই। ফিলিপাইনের এই সিদ্ধান্ত বিশ্বজুড়ে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি বড় ‘ওয়েক-আপ কল’ বা সতর্কবার্তা। বিশেষ করে, বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য এই পরিস্থিতি গভীর পর্যালোচনার দাবি রাখে। আমরা যখন একটি স্মার্ট ও উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছি, তখন বৈশ্বিক ভূরাজনীতির এই অস্থিরতা আমাদের উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে থমকে দিতে পারে।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ তার জ্বালানি চাহিদার একটি বড় অংশ আমদানির মাধ্যমে মেটায়। বিশ্ববাজারের অস্থিরতা সরাসরি আমাদের পরিবহন খাত, কৃষি উৎপাদন এবং শিল্প কারখানায় প্রভাব ফেলে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। যদি এই পথ কোনোভাবে রুদ্ধ হয়, তবে জ্বালানি তেলের দাম কোথায় গিয়ে ঠেকবে, তা কল্পনা করাও কঠিন। ফিলিপাইন সেই অদূরদর্শী সংকটকে আঁচ করতে পেরেছে; আমাদেরও কি এখনই একই পথে হাঁটা উচিত নয়?

আপৎকালীন সময়ে দেশ সচল রাখতে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে অন্তত তিন মাসের ‘স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভ’ নিশ্চিত করা এখন জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রয়োজনে ভাসমান বা অস্থায়ী স্টোরেজ সুবিধা ব্যবহারের পরিকল্পনা এখনই চূড়ান্ত করতে হবে।

শুধু মধ্যপ্রাচ্য বা নির্দিষ্ট কিছু উৎসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া কিংবা মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে বিকল্প জ্বালানি আমদানির কূটনৈতিক পথ প্রশস্ত করতে হবে। জ্বালানি কূটনীতিতে এখন থেকেই আমাদের ভূমিকা নিতে হবে।

ফিলিপাইনের মতো আমাদেরও সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে কঠোর জ্বালানি সাশ্রয় নীতি কার্যকর করা প্রয়োজন। অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ অপচয় রোধ, ব্যক্তিগত গাড়ির পরিবর্তে গণপরিবহন ব্যবহারে উৎসাহ প্রদান এবং শিল্পে জ্বালানি ব্যবহারের আধুনিক অডিট ব্যবস্থা চালু করা এখন সময়ের দাবি।

নিজেদের ভূখণ্ডে থাকা প্রাকৃতিক গ্যাস ও কয়লা উত্তোলনে যে দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে হবে। গভীর সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর সঙ্গে চুক্তি প্রক্রিয়া দ্রুততর করতে হবে। নিজস্ব সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহারই হতে পারে টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তার রক্ষাকবচ। পাশাপাশি দেশেই তেল ও গ্যসের পরিবর্তে সৌর ও বায়ুচালিত বিকল্প টেকসই বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা করা এখন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।

জ্বালানি সংকটের বহুমুখী প্রভাবের প্রথম শিকার স্বল্প আয়ের মানুষ। তাই তাদের রক্ষায় কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে বাজারে দ্রব্যমূল্য বাড়ানোর অশুভ তৎপরতা রুখতে কঠোর মনিটরিং সেল গঠন করতে হবে।

লেখক : চেয়ারম্যান, মার্কেটিং বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন