আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

গ্রামের গল্প টেঁটাযুদ্ধ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া

সৈয়দ আবদাল আহমদ

গ্রামের গল্প টেঁটাযুদ্ধ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া

নিজের গ্রামের প্রতি ভালোবাসা ও নাড়ির টান প্রতিটি মানুষেরই রয়েছে। তাই ঈদের মতো উৎসবগুলোয় নগরীর মানুষ গ্রামে যাওয়ার জন্য ব্যাকুল হন। প্রিয়জনের সঙ্গে উৎসব পালন ও দুচোখ ভরে নিজ গ্রামকে দেখার জন্য আগে থেকেই তারা ছটফট করতে থাকেন। বাস-ট্রেন, লঞ্চের ভিড়, অধিক ভাড়া, দুর্ঘটনাসহ নানা ঝক্কি-ঝামেলা উপেক্ষা করে তারা বাড়িতে ছুটে যান। গ্রামের বাড়িতে ঈদ করতে গিয়ে এবার দুর্ঘটনায় শতাধিক মানুষ মারা গেছেন। সড়কে মর্মান্তিক এবং হৃদয়বিদারক বহু ঘটনা ঘটেছে। তবু মানুষ বাড়ি গেছেন এবং ছুটি শেষে নগরের কর্মস্থলে ফিরে এসেছেন। এই যাওয়া-আসা চলতেই থাকবে।

এবার ঈদের পরের দিন জন্মস্থান ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে গিয়েছিলাম। আমাদের আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য এমএ হান্নানের গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আমাকে সভাপতি করা হয়েছিল। এবারই প্রথম এখান থেকে নির্বাচনে বিএনপির ধানের শীষের প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। আমি আমার শৈশব থেকে দেখে এসেছি, আসনটিতে আওয়ামী লীগের নৌকার জয়জয়কার। এবারই ব্যতিক্রম। এলাকার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার অনেকেই চেয়েছেন, আমি যেন গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দিই। তাছাড়া শৈশবের গ্রামকে দেখতে পাব তাও ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। অনুষ্ঠান বিকালে। ভোরবেলায় ঢাকা থেকে গ্রামের উদ্দেশে স্ত্রীকে নিয়ে রওনা হই। নাসিরনগরে যাওয়ার কথা জেনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের অধ্যাপক ড. হাফিজ উদ্দিন ভূঁইয়া, যিনি ঢাকার নাসিরনগর সমিতির সভাপতি আমাকে তার গ্রামের বাড়িটি দেখে যাওয়া এবং সেখানে দুপুরের খাবারের দাওয়াত করেন। বারবার অপারগতা জানানো সত্ত্বেও তাকে নিবৃত্ত করতে পারিনি। তার কুন্ডা গ্রাম নাসিরনগর যাওয়ার পথেই পড়ে। সরাইল থেকে যে রাস্তা নাসিরনগর গিয়েছে, সেই রাস্তায় যাচ্ছি। ধরন্তি থেকে উত্তর-পশ্চিম কোণে চোখে পড়ছে শিউলি ভাবির জয়দরকান্দা গ্রামের ঘরগুলোর টিন, রোদ পড়ে ঝিক ঝিক করছে। রাস্তার পাশেই পড়েছে কুন্ডা গ্রাম। একসময় ধরন্তি থেকে নাসিরনগর পর্যন্ত এই সড়কটি চীনের হুয়াংহু নদীর মতোই আমাদের জন্য ছিল দুঃখের কারণ। তিতাস নদী ও ধরন্তি হাওরের ঢেউয়ের চোটে রাস্তা নির্মাণ করা দুঃসাধ্য ছিল। ফলে এ এলাকার মানুষকে শুকনো মৌসুমে হেঁটে আসা-যাওয়া করতে হতো। বর্ষায় অবশ্য নৌকায় যাতায়াত ছিল আনন্দদায়ক। ১৯৯১ সালে বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তার মেয়াদের শেষের দিকে তিনি একবার নাসিরনগরে জনসভা করেছিলেন। তার উপ-প্রেসসচিব হিসেবে ওই জনসভায় গিয়েছিলাম। তাকে এই রাস্তার দুর্দশার কথা আগেই জানিয়েছিলাম। ফলে তিনি জনসভায় বক্তৃতা দেওয়ার সময় রাস্তাটি ভালোভাবে নির্মাণ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এবং একনেকে প্রকল্প অনুমোদনও করে দেন। পরে রাস্তাটি নির্মিত হয়। আমাদের যাতায়াতের দুঃখ অনেকটা লাঘব হয়।

বিজ্ঞাপন

কুন্ডা গ্রামে পৌঁছেই মনটা ভরে যায়। ড. হাফিজের বাড়িটি ছায়াঘেরা এক শান্তির নীড় বলতেই হবে। চারপাশে আম-কাঁঠাল ও ফল-ফুলে সজ্জিত অপূর্ব এই বাড়ির পুকুর পাড়ে সিমেন্টের তৈরি চেয়ার-টেবিলের সুন্দর বসার বৈঠকি ব্যবস্থা।

বিভিন্ন ধরনের নাশতা, শসা-আনারস ও পেয়ারার টুকরোতে কাসুন্দি মাখিয়ে সুস্বাদু চাটনি এলো। দুপুরের খাবার তৈরি হচ্ছে। তিতাস নদী ও মেদির হাওরের তরতাজা ট্যাংরা, বাইম, চিংড়ি, বোয়াল মাছের আয়োজন করা হয়েছে। আছে টাকি মাছের ভর্তা। আয়োজনে আছে দেশি মুরগি, গরু ও খাসির নানা পদ। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম মাছের সবগুলো পদই খাব। মাংস নেব না, যাতে মাছের স্বাদ জিভে লেগে থাকে।

ড. হাফিজের বড় ভাই কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের নাক, কান ও গলা বিভাগের অধ্যাপক ডা. রোকন উদ্দিন ভূঁইয়ার উদ্যোগে বাড়ির একপাশে তাদের জায়গায় গড়ে উঠেছে আইডিয়াল একাডেমি, কুন্ডা। প্লে-নার্সারি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিশুশিক্ষার সুন্দর ব্যবস্থা রয়েছে এই বিদ্যায়তনে। দুপুরের খাবার রান্নার ফাঁকে স্কুলটি দেখতে গেলাম। স্কুলের প্রবেশদ্বার, দেয়াল, মাঠ, মূল ভবন, শ্রেণিকক্ষÑসবখানে সৃজনশীলতার ছাপ। খুদে শিক্ষার্থীদের শেখানোর উপযোগী করে সাজানো হয়েছে প্রতিটি শ্রেণিকক্ষ ও এর আঙিনা। সাজে যেমন শিল্পীর ছোঁয়া আছে, তেমনি শিশুদের জন্য ঝলমলে রঙের খেলাও দারুণ। দেয়ালে উৎকীর্ণ আছে মনীষীদের শিক্ষণীয় বাণী। প্রধান ফটকের পাশে কাঁধে ব্যাগ ঝোলানো শিক্ষার্থীর ছবি আর সেখানে লেখা আছে, কবি নজরুলের কবিতার লাইনÑ‘আমরা যদি না জাগি মা কেমনে সকাল হবে, তোমার ছেলে উঠলে মাগো রাত পোহাবে তবে’। ভবনের প্রবেশদ্বারের নিচে লেখা আছে, নজরুলের বিদ্রোহী কবিতার লাইনÑ‘চির উন্নত মম শির’। উপরে লেখা আছে, পবিত্র কোরআনের প্রথম সেই ঐশীবাণীÑ‘পড় তোমার প্রভুর নামে’। স্কুলের সামনে দূরদূরান্ত থেকে আসা অভিভাবকদের বসা ও সময় কাটানোর ব্যবস্থাও চমৎকার। স্কুলের ছাদে গিয়ে প্রাণভরে দেখলাম পুরো কুন্ডা গ্রাম। দিগন্ত-বিস্তৃত ফসলের মাঠ। সবুজের সমারোহ চোখ জুড়িয়ে যায়। ধরন্তি হাওর ও তিতাস পাড়ের এই গ্রাম আমার শৈশবের গ্রামের কথা মনে করিয়ে দেয়। কবি আহসান হাবীবের কবিতার মতোই আমাদের গ্রামখানিও ছবির মতো। তিতাসের শাখা কুফুরিয়া খাল বয়ে গেছে আমাদের বাড়ির পাশ দিয়েই। বাড়ির সামনের এই খাল বর্ষায় যখন পানিতে টইটম্বুর হয়ে ওঠে, তখন এটি আর খাল থাকে না। পরিপূর্ণ নদীতে রূপ নেয়। এই খাল উত্তরদিকে মেদির হাওরে (মেদিনির হাওর) গিয়ে মিলেছে। আমাদের বাড়িটিও আম, জাম, কাঁঠালসহ নানা ফলের গাছে ভরপুর ছিল। বিশেষ করে বিভিন্ন জাতের সুস্বাদু আমের জন্য বাড়িটি বিখ্যাতই নয়, গ্রামের মানুষের মধ্যে লোভনীয়ও ছিল। বাড়ির সামনে ইট-সিমেন্টের তৈরি সোফার মতো করে নির্মিত চেয়ারে বসার ব্যবস্থা ছিল। তবে আমাদের সুন্দর বাড়ির অর্ধেকই এখন ভেঙে খালে চলে গেছে। আমার মনে আছে, বর্ষার সময় ওই ইট-সিমেন্টের সোফায় বসে আমরা নদীর দৃশ্য উপভোগ করতাম। পাল তোলা নৌকা, গয়না নৌকা, মালবোঝাই নৌকা, বিয়ের নৌকা এবং নৌকাবাইচের নৌকা যাতায়াত করত এই খাল দিয়ে। নৌকার মাঝির ভাটিয়ালি গান মনকে উদাস করত। খালে মাছ ধরতেন জেলেরা। ডাক দিলেই ঘাটে ভিড়ত, তাজা মাছ কিনতাম। ঝোপঝাড়ে বিচরণ করা ডাহুক, বক ও মাছরাঙার মাছ ধরার দৃশ্যও অপূর্ব লাগত। আমাদের গ্রামের পাশেই ছিল নোয়া খাল। বড়শি দিয়ে মাছ ধরে আমরা কুল পেতাম না। শুকনো মৌসুমে কম পানিতে বিলে পলো দিয়ে মাছ ধরার দৃশ্যও ছিল অপূর্ব। নাসিরনগরের অনুষ্ঠান সেরে গ্রামে গিয়ে ছোটবেলার সেই দৃশ্য দেখতে না পেলেও কোকিলের মধুর ডাক মনে করিয়ে দিয়েছে ঋতুরাজ বসন্ত বিরাজমান। সন্ধ্যায় জোনাকির আলো ও ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা ডাক এখনো কানে বাজছে। সবচেয়ে মজা লেগেছে খালের উপর বাঁশের সাঁকো পেরিয়ে বাড়িতে যাওয়া। অবশ্য শৈশবের চাঁদনি রাতে আমাদের বাঁশ বাগানে বকের ঝাঁক ও অন্যান্য পাখির ওড়াউড়ির সেই দৃশ্য দেখতে না পেয়ে আক্ষেপ করেছি।

সেদিন নাসিরনগরে গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বক্তৃতায় দাঁড়িয়ে ভাটি এলাকার অবহেলিত উপজেলাটির সমস্যাগুলো বলার পাশাপাশি কয়েকটি বিষয় কর্তৃপক্ষের নজরে এনেছিলাম। বলেছিলাম, এই এলাকা থেকে মাদক দূর করতে হবে, গ্রামের মানুষের ঝগড়াঝাঁটি সালিশের মাধ্যমে নিরসন করতে হবে। কথায় কথায় থানা-পুলিশ কিংবা আদালতে গিয়ে মামলা করা যাবে না। টেঁটার জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঐতিহ্য ম্লান হচ্ছে। এই জনপদে টেঁটার মারামারি যাতে আর না হয়, তার ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু ঢাকায় ফিরেই দুঃখজনক খবর পেয়ে মন ভীষণ ভারাক্রান্ত হয়। নাসিরনগরের গোয়ালনগর এলাকায় তুচ্ছ ঘটনা কেন্দ্র করে সেই বর্বর টেঁটাযুদ্ধ হয়েছে এবং তিনজন মারাও গেছেন।

টেঁটাযুদ্ধ কেন হচ্ছে

টেঁটাযুদ্ধ এখন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জন্য এক কলঙ্কের নাম। এই টেঁটাযুদ্ধ বর্তমানে জেলায় বড় ধরনের সামাজিক সমস্যায় রূপ নিয়েছে। এবার ঈদুল ফিতরের একদিন পর সোমবার নাসিরনগর উপজেলার গোয়ালনগরে বড় ধরনের ঝগড়া বেঁধে যায় এবং এতে ১০টি গ্রাম জড়িয়ে পড়ে। এই টেঁটাযুদ্ধে তিনজন নিহত হয়েছেন।

তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এই টেঁটাযুদ্ধ পাঁচ দশক ধরে হয়ে আসছে। নবীনগর, বাঞ্ছারামপুর, নাসিরনগর ও সদর উপজেলার বেশ কয়েকটি গ্রামে এ ধরনের ঝগড়া-বিবাদের নজির দেখা যায়। মূলত আধিপত্য বিস্তার এবং অতি তুচ্ছ ঘটনা কেন্দ্র করে এই জেলায় টেঁটা বা বল্লমের মতো দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মধ্যযুগীয় বর্বরতা হচ্ছে। প্রতিবছরই এ ধরনের ঘটনা দেখা যায়। গ্রামের মাতব্বর, স্থানীয় প্রভাবশালীদের আধিপত্য বজায়, বংশীয় ও গোষ্ঠীগত বিরোধ ছাড়াও তুচ্ছ ঘটনা যেমন শসা ও লাউ চুরি, হাঁস-মুরগি নিয়ে ঝগড়া, গায়ে ধাক্কা লাগা, ক্ষেতে গরু-ছাগলের শস্য, তরি-তরকারি খাওয়া, মাছ ধরা ইত্যাদি বিরোধ থেকেও শুরু হয়ে যায় টেঁটাযুদ্ধ। এতে মানুষও মারা যায়। এক পরিসংখ্যানে টেঁটাযুদ্ধে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ২৬ জনের মৃত্যুর রেকর্ডও রয়েছে। স্থানীয় রাজনীতি ও নির্বাচন-পরবর্তী বিরোধও টেঁটাযুদ্ধে রূপ নেয়।

একসময় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিশ্বজোড়া খ্যাতি ছিলÑশিল্পের শহর ও সাহিত্য-সংস্কৃতির শহর হিসেবে। বর্বর টেঁটাযুদ্ধের কালো ছায়ায় সেই ঐতিহ্য আজ হারাতে বসেছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাম শুনলেই একসময় চোখের সামনে ভেসে উঠত তিতাসবিধৌত এক সমৃদ্ধ জনপদের ছবি। সুর সম্রাট আলাউদ্দিন খাঁর সুরের মূর্ছনা আর অদ্বৈত মল্লবর্মণ ও কবি আল মাহমুদের সাহিত্যের স্নিগ্ধতা। কিন্তু সেই তিতাস পাড়েই আজ যখন আধিপত্যের লড়াইয়ে টেঁটার ঝনঝনানি, তা সবাইকে দারুণ মর্মাহত করছে। শিল্প-সাহিত্যের উর্বর ভূমি, টেঁটার কারণে সংঘাতের প্রতীক হয়ে যাচ্ছে। পান থেকে চুন খসলেই গ্রামজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে টেঁটাযুদ্ধ। এতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শতবছরের সম্মান ধুলোয় লুটিয়ে পড়ছে। আর তার ললাটে আঁকা হচ্ছে টেঁটা-বল্লমের কলঙ্কতিলক। শিক্ষা, শিল্প ও সাহিত্য-সংস্কৃতিতে যে জেলা আলোকবর্তিকা হয়ে দেশকে পথ দেখাত, সেই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঐতিহ্য টেঁটায় ম্লান হচ্ছে।

অবশ্য টেঁটাযুদ্ধ শুধু ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নয়, নরসিংদী, হবিগঞ্জ এবং চাঁদপুরের বিভিন্ন গ্রাম, বিশেষ করে হাওর এবং চরাঞ্চল এলাকার গ্রামগুলোতেও হচ্ছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বেশি হচ্ছে বলে গণমাধ্যমে তা উঠে আসছে। এই টেঁটাযুদ্ধ অবশ্য বন্ধ করতে হবে। এক্ষেত্রে নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছয় সংসদ সদস্যের এগিয়ে আসা উচিত। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ বিষয়ে সংসদ সদস্য ও সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষকে ডেকে টেঁটাযুদ্ধ বন্ধে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেবেন বলে মানুষ আশা করেন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঐতিহ্যের কথা

টেঁটাযুদ্ধ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্রাহ্মণবাড়িয়া যখন ট্রলের শিকার হচ্ছে, তখন এই জেলার ঐতিহ্য বারবার মনে হচ্ছে। আশির দশকে দেশবরেণ্য কবি শামসুর রাহমান এসেছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে। কবিকে সরকারি কলেজ ও পৌর মিলনায়তনে সংবর্ধনা জানানো হয়েছিল। আবেগাপ্লুত কবি শামসুর রাহমান এ জেলার সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রাণচাঞ্চল্য দেখে মুগ্ধ হয়ে বলেছিলেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক রাজধানী।’

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস নদীর কথা উল্লেখ করে কবি সেদিন বলেছিলেন, তিতাস শুধু একটি নদী নয়, বরং এটি এই অঞ্চলের শিল্প-সংস্কৃতির প্রাণভোমরা। অদ্বৈত মল্লবর্মণের অমর সৃষ্টি ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসের কথা স্মরণ করে তিনি তিতাস পাড়ের মানুষের জীবন-সংগ্রাম ও সাংস্কৃতিক গভীরতার প্রশংসা করেছিলেন। খ্যাতিমান চলচ্চিত্রকার ঋত্বিক ঘটক এ উপন্যাস অবলম্বনে ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ শীর্ষক ছবি বানিয়েছিলেন।

বাংলা সাহিত্যের আরেক বড় কবি আল মাহমুদ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মৌড়াইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার কবিতায় বারবার উঠে এসেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও তিতাসের কথা। তিতাস পাড়ের মাছের আঁশটে গন্ধ, উঠানে ছড়ানো জাল এবং গ্রামের শৈশবের স্মৃতি বর্ণনা করেছেন তিনি। কবিতায় লিখেছেন, ‘কিছুই খুঁজিনি আমি, যতবার এসেছি এ তীরে, নীরব তৃপ্তির জন্য আনমনে বসে থেকে ঘাসে।’ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাসকে তিনি ‘শৈশবের নদী’, ‘যৌবনের নদী’ বলেছেন। কখনো তিতাসকে বলেছেন, ‘মায়াবী নদী’, ‘ঝিকিমিকি শবরী।’ কবিতায় এসেছেÑ‘মেঘনা নদীর শান্ত মেয়ে তিতাসে মেঘের মতো পাল উড়িয়ে কী ভাসে!’

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার হরিণবেড় তিতাস নদীর একটি বাঁক। কবিতায় আল মাহমুদ লেখেন, ‘বললো কেঁদে তিতাস নদী হরিণবেড়ের বাঁকে।’ তিতাসের বোয়াল মাছের বর্ণনা কবি দিয়েছেন এভাবেÑ‘হাত দিও না আমার শরীর ভরা বোয়াল মাছে।’ কবি তার মায়ের হারিয়ে যাওয়া সোনার নোলকটি খুঁজেছেন তিতাসের কাছে গিয়ে। লিখেছেনÑ‘তিতাস নদী হরিণবেড়ের বাঁকে, সাদা পালক বক যেখানে থাকে। নদীকে বলি, আমার মায়ের নোলকটি কি দিলে?’

শিল্প, সাহিত্য ও সংগীতে এক সমৃদ্ধ জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়া। নদীমাতৃক বাংলাদেশের তিতাসবিধৌত স্বর্ণগর্ভা এই জেলা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন বীরগাথায়ও সমৃদ্ধ। শুরুতে ত্রিপুরার অন্তর্গত থাকলেও ভারত বিভাগের পর ব্রাহ্মণবাড়িয়া কুমিল্লার অন্তর্গত একটি মহকুমা ছিল। ১৯৮৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এ জেলার উত্তরে তিতাস নদীর তীরে ১৯৬২ সালে আবিষ্কৃত হয় তিতাস গ্যাসের প্রথম গ্যাসক্ষেত্র। মুক্তিযুদ্ধে ছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। এ জেলার দরুইন গ্রামে মুক্তিযোদ্ধা ও পাকিস্তান বাহিনীর মুখোমুখি যুদ্ধে বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহি মোস্তফা কামাল শহীদ হন। তার কবর রয়েছে সেখানে। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিতাস গ্যাস ফিল্ডের ট্রান্সমিটার, অর্থাৎ রেডিও ট্রান্সমিশন ব্যবস্থা ব্যবহার করে স্থানীয় জনগণ রেডিও সম্প্রচারের মতো দুঃসাহসিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। ১৯৭১ সালের ৮ ডিসেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়া পাক হানাদারমুক্ত হয়।

দেশের অর্থনীতিতেও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রয়েছে অসামান্য অবদান। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তিতাস গ্যাস ছাড়াও রয়েছে দ্বিতীয় বৃহত্তম আশুগঞ্জের তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র। বৃহৎ শিল্প আশুগঞ্জ ইউরিয়া সার-কারখানা, আশুগঞ্জ নৌবন্দর ও আখাউড়া স্থলবন্দর। বাংলার বারো ভূঁইয়াদের অন্যতম মসনদ-ই-আলা ঈশা খাঁর জন্ম ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া আলেম-ওলামা এবং ইসলামপ্রিয় তৌহিদী জনতারও এক প্রসিদ্ধ এলাকা। এখানে বহু মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত আছে। মাওলানা তাজুল ইসলাম, যিনি ‘ফখরে বাঙ্গাল’ বা বাংলার গৌরব নামে সমধিক পরিচিত, তিনি নাসিরনগরের ভুবন গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি এলাকাটিতে ইসলামিক কেন্দ্রে পরিণত করেছিলেন। সরাইলের আভিজাত্য থেকে শুরু করে খড়মপুরের কেল্লা শহীদের দরগা পর্যন্তÑপ্রতিটি ধূলিকণায় মিশে আছে এক ঋদ্ধ ঐতিহ্যের ঘ্রাণ।

এই উপমহাদেশের সংগীত জগতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাম স্বর্ণাক্ষরে খচিত। এখানে জন্ম নিয়েছেন সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁ ও আফতাবউদ্দিন খাঁ। আলাউদ্দিন খাঁর ছেলে ওস্তাদ আকবর আলী খাঁ ও মেয়ে রওশন আরা অন্নপূর্ণাÑযিনি পণ্ডিত রবি শংকরের স্ত্রী ছিলেন। মহান সাধক ও মলয়া সংগীতের প্রবক্তা মনমোহন দত্ত, ভাষা আন্দোলনের অন্যতম ব্যক্তিত্ব ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ও অলি আহাদের জন্মও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সাহিত্যকর্মে যারা অবদান রেখেছেন, তাদের মধ্যে ঔপন্যাসিক অদ্বৈত মল্লবর্মণ, বিপ্লবী উল্লাসকর দত্ত, লেখক জ্যোতিরীয় নন্দী, কবি ও ছন্দের জাদুকর আবদুল কাদির, কবি সুফিয়া কামাল (পিতৃভূমি), কবি আল মাহমুদ, ব্যারিস্টার আবদুর রসুল, নওয়াব স্যার শামসুল হুদা, অন্নদা প্রসাদ রায়, ইতিহাসবিদ সিরাজুল ইসলাম, আ ক ম যাকারিয়া প্রমুখ। উচ্চ পদস্থ আমলা এবং সচিব তৈরিতেও ব্রাহ্মণবাড়িয়া শীর্ষে ছিল। পাকিস্তান আমলে সিএসপি ক্যাডারের অনেক কর্মকর্তা ছিলেন এই জেলার। সে সময় ২০৯ জন বাঙালি সিএসপি কর্মকর্তার মধ্যে ১৬ জনই ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার। অনেক কেবিনেট সচিবও হয়েছেন এই জেলা থেকে।

এ দেশের যাত্রা, পুতুলনাচ ও সার্কাসশিল্পে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রয়েছে উজ্জ্বল ভূমিকা। জনপ্রিয় যাত্রা দল জয়দুর্গা অপেরা ও নিউ স্টার সার্কাস দলের জন্মও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম পুতুলনাচের সৃষ্টি করেছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার কৃষ্ণনগর গ্রামের বিপিন পাল। শাস্ত্রীয় সংগীত এবং লোকসংগীতের জন্য সমৃদ্ধ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মেয়েলি গীত বিয়ের অনুষ্ঠানে আকর্ষণ সৃষ্টি করত। হাওর অঞ্চলের জারি গান, সারি গানও খুব চমৎকার। এছাড়া তিতাস নদীতে আকর্ষণীয় নৌকাবাইচ, বাঞ্ছারামপুরের ঐতিহ্যবাহী গরুর দৌড় এবং সরাইলের মোরগের লড়াই এলাকার ঐতিহ্যবাহী উৎসব। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মিষ্টি ও ছানামুখীর খ্যাতি এখনো দেশ-বিদেশে অক্ষুণ্ণ রয়েছে। গীতিকবি রফিক-উজ-জামানের লেখা ‘ওরে আয় আয় আয়, সাধের ব্রাহ্মণবাড়িয়া’ গানটিতে আছে এই জেলার নানা ঐতিহ্যের বিবরণ।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, আমার দেশ

abdal62@gmail.com

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...