ভয়ংকর ভালোবাসা এবং একটি ঘৃণার গল্প

মিনার-রশিদ
মিনার রশীদ

ভয়ংকর ভালোবাসা এবং একটি ঘৃণার গল্প

এ সপ্তাহে ছাত্ররাজনীতি নিয়ে কিছু লেখার চিন্তাভাবনা করেছিলাম; কিন্তু হঠাৎ একটা ভয়ংকর দৃশ্য দেখে শিরোনামটিতে একটু পরিবর্তন আনতে হলো! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা গত মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীকে যেভাবে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরেছেন—এটি দেখে সত্যি প্রমাদ গুনলাম! পৃথিবীর কোনো প্রাইম মিনিস্টার এমনভাবে কোনো ক্রাউড বা ভিড়ের মধ্যে পড়েছেন কি না, জানা নেই!

ক্ষমতা মানুষকে যেমন দূরে সরিয়ে দেয়, তেমনি কখনো কখনো অন্ধ ভালোবাসা একজন নেতাকে বিপদ এবং আপদের শেষ বিন্দুতে ঠেলে দেয়। পৃথিবীর ইতিহাসে বহু নেতা জনগণের অকৃত্রিম ভালোবাসা পেয়েছেন, কিন্তু সেই ভালোবাসার আবেগঘন ভিড়ই অনেক সময় হয়ে উঠেছে মৃত্যুর ফাঁদ।

বিজ্ঞাপন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক সফরের সময় যে দৃশ্য দেখা গেল, তা দেখে তাই শুধু আবেগ নয়, আতঙ্কও কাজ করেছে। ছাত্ররা ভালোবেসে চারদিক থেকে ঘিরে ধরেছে—এ দৃশ্য নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তবতায় এ ধরনের ‘ভালোবাসার বেষ্টনী’ অনেক সময় নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে ভয়ংকর পরিস্থিতি তৈরি করে।

একজন প্রধানমন্ত্রী শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা নন; তিনি রাষ্ট্রের ধারক। তার জীবন শুধু তার ব্যক্তিগত বিষয় নয়, পুরো জাতির নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার সঙ্গে সম্পর্কিত। এ কারণেই পৃথিবীর সব সভ্য রাষ্ট্রে নিরাপত্তা উপদেষ্টার পরামর্শ প্রায় চূড়ান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।

প্রাইম মিনিস্টারের সিকিউরিটি অ্যাডভাইজার অত্যন্ত একনিষ্ঠতার সঙ্গে প্রাইম মিনিস্টারের পেছন পেছন সেই প্রচণ্ড ভিড়ে অসহায়ভাবে সাঁতার কেটেছেন! অথচ প্রাইম মিনিস্টারকে শক্তভাবে বলার কথা, ‘নো স্যার! আপনি এভাবে ভিড়ের মধ্যে যেতে পারবেন না।’ প্রাইম মিনিস্টার দেশের একজন মানুষের পরামর্শ শুনতে বাধ্য। তিনি হলেন তার সিকিউরিটি অ্যাডভাইজার।

প্রধানমন্ত্রীর আশপাশে যখন হাজারো আবেগী মানুষ ভিড় করে, তখন নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য বন্ধু ও শত্রুর পার্থক্য করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। একজন আঁততায়ী কখনো শত্রুর মুখোশ পরে আসে না; বরং সে আসে সমর্থকের ভিড়ের মধ্যেই।

ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর ঘটনা আজও দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এক ভয়াবহ শিক্ষা হয়ে আছে। ১৯৯১ সালে নির্বাচনি প্রচারণার সময় তিনি সাধারণ সমর্থকদের খুব কাছে চলে গিয়েছিলেন। একজন নারী সমর্থক ফুলের মালা পরানোর ভান করে তার কাছে এগিয়ে আসে। মুহূর্তের মধ্যে বিস্ফোরণে নিহত হন রাজীব গান্ধী। সেই নারী ছিলেন আত্মঘাতী হামলাকারী। ভালোবাসার অভিবাদনের আড়ালে লুকিয়ে ছিল মৃত্যু।

একইভাবে পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো জনতার ভালোবাসার মধ্যে দাঁড়িয়েই প্রাণ হারান। তিনি নিরাপত্তা প্রটোকল ভেঙে গাড়ির সানরুফ দিয়ে বের হয়ে সমর্থকদের শুভেচ্ছা গ্রহণ করছিলেন। সেই সুযোগেই হামলা হয়। তার জনপ্রিয়তা তাকে মানুষের খুব কাছে নিয়ে গিয়েছিল; কিন্তু নিরাপত্তার দৃষ্টিতে সেটিই হয়ে ওঠে সবচেয়ে দুর্বল মুহূর্ত।

মিসরের আনোয়ার সাদাত সামরিক কুচকাওয়াজের সময় জনগণের অভিনন্দন গ্রহণ করছিলেন। নিরাপত্তা বলয় ছিল, কিন্তু অনুষ্ঠানের স্বাভাবিকতার মধ্যেই হামলাকারীরা সুযোগ পেয়ে যায়। আবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ. কেনেডি খোলা গাড়িতে জনতার অভিবাদন নিতে গিয়ে আঁততায়ীর গুলির শিকার হন। ইতিহাস যেন বারবার একই সতর্কবার্তা দেয়—জনপ্রিয়তা যত বাড়ে, নিরাপত্তার ঝুঁকিও তত বাড়ে।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় এ বিষয়টি আরো সংবেদনশীল। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নেতাকে ছুঁয়ে দেখা, ঘিরে ধরা কিংবা কাছ থেকে ছবি তোলার প্রবণতা অত্যন্ত প্রবল। কিন্তু সরকারের প্রধান নির্বাহীর নিরাপত্তাকে অবহেলা করে এ রকম আবেগকে প্রশ্রয় দেওয়া মারাত্মক নিরাপত্তা গলদ হিসেবে গণ্য করা যায়। একজন দায়িত্বশীল সিকিউরিটি অ্যাডভাইজারের কাজ শুধু প্রধানমন্ত্রীর পাশে হাঁটা নয়; প্রয়োজনে তাকে ‘না’ বলার সাহস দেখানো। কারণ নিরাপত্তাব্যবস্থার মূলনীতি হলো—‘কোনো ঝুঁকিকেই ছোট করে দেখা যাবে না।’

রাজনীতিতে ভালোবাসা প্রয়োজন, জনসম্পৃক্ততাও প্রয়োজন। কিন্তু ভালোবাসা যখন নিরাপত্তার সীমা ভেঙে ফেলে, তখন সেটি বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। ইতিহাসের বহু ট্র্যাজেডি আমাদের শেখায়, নেতাদের সবচেয়ে বড় শত্রু অনেক সময় ঘৃণা নয়—অসংযত আবেগ। সেই আবেগের ঢেউয়ে এক মুহূর্তের ভুল পুরো জাতিকে দীর্ঘ অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিতে পারে।

২.

বিএনপি-বলয়ে রবীন্দ্র প্রেমের বাঁধভাঙা স্রোত

কয়েক দিন ধরে বিএনপির নেতা-নেত্রীদের কারো কারো রবীন্দ্রপ্রেম মারাত্মক আকর্ষণ (Fatal Attraction) হিসেবে পর্যবেশিত হয়েছে! আমি সত্যি ভয় পাচ্ছিলাম বিএনপির কোনো সুফিয়া কামাল আবার রবীন্দ্রসংগীতকে ইবাদততুল্য ঘোষণা করেন কি না। অথচ বিএনপির রাজনীতির একটা বড় সৌন্দর্য ছিল এর পরিমিতিবোধ। ধর্ম হোক, একাত্তরের চেতনা হোক, কিংবা রবীন্দ্রনাথের প্রতি অনুরাগ—সব জায়গায় এই পরিমিতিবোধ লক্ষ করা যেত—কখনো এসব নিয়ে বিএনপিকে বেসামাল হতে দেখা যায়নি!

শুধু আমাদের মতো অসুশীল চোখেই না—বিবিসির আকবর হোসেনের মতো সুশীল বা নিরপেক্ষ চোখেও বিষয়টি ধরা পড়েছে। তিনি এক ভিডিও বার্তায় জানিয়েছেন, আমি আগের বছরগুলোয় চেক করেছি; কিন্তু বিএনপির পক্ষ থেকে এ রকম রবীন্দ্র অনুরাগ আগে কখনোই দেখা যায়নি।

দেশবাসী বোধহয় আরো বড় শকটি খেয়েছে, যখন মহাসচিব জানালেন, সরকার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কৃষিভাবনা অনুসরণ করছে। কথাটি শুনতে কাব্যিক লাগলেও প্রশ্ন হচ্ছে—আদতেই কি রবীন্দ্রনাথের এমন কোনো যুগান্তকারী কৃষিদর্শন ছিল, যা বাংলাদেশের কৃষি বাস্তবতায় বিপ্লব ঘটাতে পারে? নাকি এটি মূলত সাংস্কৃতিক অভিজাতদের তৈরি একটি রোমান্টিক বয়ান?

জিয়ার কৃষিবিপ্লব বনাম রবীন্দ্রনাথের কৃষি ভাবনা

রবীন্দ্র অনুরাগের এই স্বর্ণালি সন্ধ্যায় কবি আব্দুল হাই শিকদার কিছু অপ্রিয় সত্য কথা বলেছেন। আপাতত, সেসব উপেক্ষা করে আমরা মেনে নিলাম যে জমিদার পরিবারের সন্তান হিসেবে গ্রামীণ বাংলার দুঃখ-দুর্দশা দেখেছিলেন। শিলাইদহ ও পতিসরে কৃষকদের জীবনযাত্রা উন্নয়নের কিছু উদ্যোগও নিয়েছিলেন। এর অনেকগুলো ছিল ঢাকঢোল পিটিয়ে শুধু ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মতো! জমিদার হিসেবে খাজনা আদায় নগদ হলেও এগুলো সব ছিল বাকির খাতায়! রবীন্দ্রনাথ সাম্প্রদায়িক ছিলেন কি না, তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে; কিন্তু একজন অত্যন্ত বাস্তববাদী ও হিসাবি জমিদার হিসেবে তার যে সুনাম ছিল, তাতে কোনো বিতর্ক নেই!

সমবায়ভিত্তিক কৃষিঋণ, গ্রামীণ শিক্ষা, স্থানীয় উদ্যোগ—এসব নিয়ে তার কিছু ভাবনা ছিল। ১৯০৫ থেকে শুরু করে ১৯২৫ সালের দিকে উদ্যোক্তার জীবদ্দশাতেই ক্লোজ করে দেওয়া হয়! কাজেই এটি কোনো সফল পলিসি বা মডেল ছিল না। একজন বাস্তববাদী মানুষ হিসেবে নিজের জমিদারির আর্থিক ক্ষতি মেনে নিয়ে এটাকে দীর্ঘদিন টানতে চাননি।

তিনি কৃষকের দুঃখ অনুভব করেছিলেন, কিন্তু কৃষিকে আধুনিক উৎপাদনশীল শক্তিতে রূপান্তরের বাস্তব নকশা দিতে পারেননি। এ কারণেই তার নিজ দেশ পশ্চিমবঙ্গ কিংবা ভারতবর্ষ এটাকে কৃষি মডেল হিসেবে গ্রহণ করেনি।

একজন ষোলোআনা হিসাবি মানুষ হিসেবে নিজে ফতুর হওয়ার অনেক আগেই তার মানবিক কাজ ও রোমান্টিক এক্সপেরিমেন্টটি বন্ধ করে দিয়েছিলেন! কিন্তু আমাদের নেতারা নিজেরা ফতুর (নৈতিক) হয়ে রবীন্দ্রনাথের প্রতি বেহিসাবি ভালোবাসা দেখিয়ে চলছেন! আমাদের মির্জা ফখরুল সাহেবরা রবীন্দ্রনাথকে অসাম্প্রদায়িক হিসেবে প্রতিপন্ন করার জন্য আধা জল খেয়ে লেগেছেন অথচ রবি সাহিত্যের মহাসাগর থেকে ভারতবর্ষের একজন মুসলিম শাসক বা বীরের মাহাত্ম্য বর্ণনা করে একটি লাইনও দেখাতে পারবেন না। অথচ কবি নজরুল শ্যামাসংগীতসহ এ রকম শত শত হিন্দু পৌরাণিক বীরদের মাহাত্ম্য তার কবিতা ও গানে ফুটিয়ে তুলেছেন!

নিজ দলের প্রতিষ্ঠাতার সফল কৃষিবিপ্লব রেখে মির্জা ফখরুলরা রবিঠাকুরের একটা অসফল ও রোমান্টিক ধারণাকে অনুসরণ করেন। জিয়াউর রহমানের কৃষিভাবনা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির—বাস্তবমুখী, উৎপাদনকেন্দ্রিক এবং রাষ্ট্রীয় কৌশলভিত্তিক। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে যখন খাদ্যসংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছিল, তখন জিয়াউর রহমান মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই তলাবিহীন ঝুড়ি হিসেবে গণ্য খাদ্য ঘাটতির এই দেশটিকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে ফেলেছিলেন! ভাগ্যিস! তখন কোনো আব্দুল গাফফার চৌধুরী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে রবীন্দ্রনাথের কোনো কৃষি ভাবনার কবিতা আবৃত্তি করতে শুনেননি!

রবীন্দ্রনাথের কৃষিচিন্তা ছিল মূলত একটি মানবিক আবেদন; কিন্তু জিয়ার কৃষিদর্শন ছিল রাষ্ট্র পরিচালনার কার্যকর নীতি। একজন গ্রামকে দেখেছেন পদ্মা নদীতে ভাসমান হুজরা (Yort) থেকে কিংবা জমিদারের পালকিতে বসে! অন্যজন দেখেছেন, কৃষকদের পাশে গিয়ে কোদাল হাতে তাদের কাদামাখা গায়ের গন্ধ শুঁকে! একজন গ্রামকে অনুভব করেছেন কবির হৃদয়ে, আরেকজন কৃষিকে দেখেছেন রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড হিসেবে।

কাজেই রবীন্দ্রনাথের রোমান্টিক এবং অসফল কৃষি ভাবনা ছেড়ে দয়া করে নিজ দলের প্রতিষ্ঠাতার সফল কৃষিবিপ্লবকে অনুসরণ করুন এবং তারই রাজনৈতিক দর্শন বা ফর্মুলা অনুসরণ করে অন্যান্য সেক্টরেও একইভাবে বিপ্লব ঘটান।

৩.

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী যে বিড়ম্বনায় পড়েছিলেন, এর জন্য শুধু সিকিউরিটি টিমের ব্যর্থতাই দায়ী নয়—সামগ্রিক ছাত্ররাজনীতির কালচারটিও দায়ী! ছাত্র সংগঠনটির সভাপতিকেও দলের চেয়ারম্যানের গাড়ির পেছনে দৌড়াতে দেখা যায়! কারণ বর্তমান রাজনীতির সর্বোচ্চ সফলতা হলো কোনোভাবে নেতৃত্বের কাছাকাছি পৌঁছানো। এ জন্য কে কাকে পেছনে ফেলে নিজে সামনে এগোতে পারবে, তার একটা অসুস্থ প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। সবাই মঞ্চে উঠতে চায়, নেতার পাশে থাকতে চায়, বিজলির গতিতে নিজেও নেতা হতে চায়!

আর এই ফেনোমেনার বাইরে বিশালসংখ্যক ছাত্রছাত্রী রাজনীতিকে মন থেকেই ঘৃণা করে, যাদের বলা যায়, আই হেইট পলিটিকস প্রজন্ম!

ছাত্ররাজনীতি : নিষিদ্ধ নয়, প্রয়োজন নিয়ন্ত্রণ

বাংলাদেশের ইতিহাসে ছাত্ররাজনীতি শুধু একটি রাজনৈতিক চর্চার নাম নয়; বরং এটি বহু গণআন্দোলন, গণজাগরণ ও জাতীয় সংকট মোকাবিলার অন্যতম চালিকাশক্তি। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন কিংবা সাম্প্রতিক বিভিন্ন গণদাবি—প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ছাত্রসমাজই ছিল অগ্রভাগে। অথচ আজ সেই ছাত্ররাজনীতিকেই নিষিদ্ধ করার দাবি উঠছে। কারণ, দীর্ঘদিন ধরে ছাত্ররাজনীতির নামে সহিংসতা, দখলদারিত্ব, সন্ত্রাস, টেন্ডারবাজি ও শিক্ষাঙ্গনে বিভক্তির সংস্কৃতি মানুষকে হতাশ করেছে।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—কিছু অপব্যবহার ও অশুভ কর্মকাণ্ডের কারণে কি পুরো ছাত্ররাজনীতিকেই নিষিদ্ধ করে দেওয়া উচিত? মাথাব্যথা হলে যেমন মাথা কেটে ফেলা সমাধান নয়, তেমনি ছাত্ররাজনীতির বিকৃতি দেখে পুরো ছাত্ররাজনীতিকে নিষিদ্ধ করাও কোনো সুস্থ সমাধান হতে পারে না। বরং প্রয়োজন সংস্কার, নিয়ন্ত্রণ ও ইতিবাচক ধারায় ছাত্ররাজনীতিকে ফিরিয়ে আনা।

ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবির পেছনে মানুষের ক্ষোভ ও হতাশা বাস্তব। সাধারণ শিক্ষার্থীরা চায় একটি নিরাপদ ক্যাম্পাস ও মেধার চর্চা সহায়ক শিক্ষার পরিবেশ । তারা ক্যাম্পাসে অস্ত্রের ঝনঝনানি চায় না, গেস্টরুম নির্যাতন চায় না। ছাত্ররাজনীতিকে ঘিরে কোটি কোটি টাকার সিটবাণিজ্য, দলের নেতাদের মনোরঞ্জনে জোর করে নিরীহ মেয়েদের পাঠানো (ফ্যাসিবাদের সময়ে) এ রকম বহু স্মৃতি দগদগে অবস্থায় বিরাজ করছে!

কিন্তু এ সমস্যার মূল কারণ ছাত্ররাজনীতির অস্তিত্ব নয়; বরং রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের অসহনীয় আচরণ! ছাত্র সংগঠনগুলোকে আদর্শিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার জায়গা থেকে সরিয়ে অনেক সময় ক্ষমতার লাঠিয়াল বাহিনীতে পরিণত করা হয়েছে। ফলে দোষটা রাজনীতির নয়, বরং দোষটা কলুষিত রাজনৈতিক সংস্কৃতির।

বিশ্বের অনেক উন্নত দেশেও ছাত্ররাজনীতি রয়েছে। সেখানে ছাত্র সংগঠনগুলো ক্যাম্পাসের নীতি, শিক্ষা, মানবাধিকার, পরিবেশ ও সামাজিক ইস্যু নিয়ে কাজ করে। তারা ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির ক্ষেত্র হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়কে ব্যবহার করে। গণতান্ত্রিক সমাজে রাজনীতি থেকে শিক্ষার্থীদের পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে রাখা সম্ভবও নয়। কারণ, আজকের ছাত্ররাই আগামী দিনের রাষ্ট্রনায়ক, নীতিনির্ধারক ও সমাজনেতা। তারা যদি ছাত্রজীবনে নেতৃত্ব, বিতর্ক, সংগঠন ও মতাদর্শিক চর্চার সুযোগ না পায়, তাহলে ভবিষ্যতে নেতৃত্বের জায়গা শূন্য হয়ে যাবে।

কাজেই ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ নয়; বরং প্রয়োজন ছাত্ররাজনীতির জন্য একটি কঠোর নীতিমালা—দরকার একটা Code of Conduct. প্রথমত, ক্যাম্পাসে অস্ত্র, সহিংসতা ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি থাকতে হবে। কোনো ছাত্র সংগঠন অপরাধে জড়ালে তার বিরুদ্ধে দ্রুত প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দলীয় রাজনৈতিক নেতাদের সরাসরি হস্তক্ষেপ কমাতে হবে। ছাত্র সংগঠনগুলোকে শিক্ষার্থীদের সমস্যা, শিক্ষা ও নীতিগত বিষয়ে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। তৃতীয়ত, ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিয়মিত করতে হবে। গণতান্ত্রিক চর্চা বন্ধ থাকলে সহিংসতা বাড়ে; আর নির্বাচন থাকলে নেতৃত্বের বৈধতা ও জবাবদিহি তৈরি হয়।

সবচেয়ে বড় কথা, ছাত্ররাজনীতিকে ‘ক্যাডারভিত্তিক শক্তি’ থেকে ‘বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তি’তে রূপান্তর করতে হবে। ক্যাম্পাসে বিতর্ক, গবেষণা, নীতি-আলোচনা, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নেতৃত্ব গড়ে উঠুক। যে ছাত্ররাজনীতি জাতিকে নেতৃত্ব দিতে পারে, সেটিকে ধ্বংস না করে সুস্থধারায় ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব রাষ্ট্র, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক দলগুলোর।

বিরাজনীতিকীকরণের হোতারা তাদের মিশনে অনেকটা সফল হয়েছে! নীতিভ্রষ্ট রাজনীতিবিদরা এদের মিশনকে এগিয়ে দিয়েছে। ছাত্ররাজনীতিও একই দুষ্টচক্রে পড়ে গেছে! ছাত্রদল ছাত্ররাজনীতি টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করলেও ছাত্রশিবির এ ক্ষেত্রে নীরব ভূমিকায় রয়েছে! কারণ বর্তমান প্রচলিত ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ থাকলেও ছাত্রশিবিরের কার্যক্রম বন্ধ থাকে না! ফলে ছাত্রদল প্রতিপক্ষ শিবিরের তুলনায় একটা অসম প্রতিযোগিতায় পড়ে গেছে। এটা সারা দেশে একটা অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। ছাত্রসমাজের এই ডিপলিটিসাইজড মনোভাব থেকে শিবির সাময়িক লাভবান হলেও পরিণামে তাদেরও সমূহ ক্ষতি হবে। ক্ষতি হবে পুরো ছাত্রসমাজ, তথা পুরো দেশের! কাজেই খোলা মন নিয়ে সবাইকে একসঙ্গে বসে এর সমাধান খুঁজে বের করতে হবে!

একটি জাতি তখনই দুর্বল হয়ে পড়ে, যখন তার তরুণসমাজ রাজনীতি ও রাষ্ট্রচিন্তা থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তাই ছাত্ররাজনীতিকে নিষিদ্ধ নয়, বরং নিয়ন্ত্রিত, শৃঙ্খলিত ও আদর্শিক ধারায় ফিরিয়ে আনা সময়ের দাবি। কারণ, আগুন বিপজ্জনক—কিন্তু নিয়ন্ত্রিত আগুনই আবার সভ্যতার শক্তি।

লেখক : কলামিস্ট

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন