‘আমি রাজনীতি ঘৃণা করি’ কিংবা ‘পলিটিকস আমার জন্য নয়’ বর্তমান প্রজন্মের বহু তরুণের মুখে শোনা যায় এমন পরিচিত বাক্য। চারপাশের লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি, পেশিশক্তির আস্ফালন, দলীয় সহিংসতা এবং ক্ষমতার অপব্যবহার দেখে তরুণদের এই বিমুখতা মোটেও অস্বাভাবিক নয়।
প্রথম বর্ষের একজন স্বপ্নবাজ শিক্ষার্থী যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রেখেই মেধার বদলে রাজনৈতিক মিছিলে মাথা বাড়ানোর বিনিময়ে হলে একটি সিট পায়, তখন রাজনীতির প্রতি তার বিতৃষ্ণা আসাটাই স্বাভাবিক । কিন্তু রূঢ় বাস্তবতা হলো, আপনি রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেও রাজনীতি কখনোই আপনার জীবন থেকে দূরে সরে যায় না। আপনার ক্যাম্পাসের ডাইনিংয়ের খাবারের মান, হলের নিরাপদ পরিবেশ, শিক্ষার বাজেট, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, এমনকি পড়ালেখা শেষে কর্মসংস্থান সবই রাজনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।
প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক প্লেটো শত শত বছর আগেই সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘রাজনীতিতে অংশগ্রহণ না করার শাস্তি হলো নিজের চেয়ে অযোগ্যদের দ্বারা শাসিত হওয়া।’ বর্তমান ক্যাম্পাসের প্রেক্ষাপটে এর চেয়ে রূঢ় সত্য আর কী হতে পারে! রাজনীতিতে শূন্যস্থান বলে কিছু নেই; সচেতন, মেধাবী ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা যখন রাজনীতিকে ‘নোংরা’ বলে দূরে সরে যায়, তখন অযোগ্য ও পেশিশক্তিনির্ভর লোকরাই সেই জায়গা দখল করে নেয়।
ইতালীয় চিন্তাবিদ অ্যান্টনিও গ্রামসি তার তত্ত্বে দেখিয়েছিলেন, শাসকগোষ্ঠী সবসময়ই চায় তরুণ সমাজ যেন রাজনীতি থেকে দূরে থাকে। কারণ, রাজনীতিসচেতন তরুণরাই ক্যাম্পাসের অনিয়ম, রাষ্ট্রের অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলে। আর তরুণরা যখন নীরব হয়ে যায়, সেই নীরবতার সুযোগেই গড়ে ওঠে স্বৈরতন্ত্র ও শোষণের কাঠামো।
আমরা এমন ছাত্ররাজনীতি চাই না, যেখানে শিক্ষাঙ্গন জ্ঞানচর্চার বদলে ভয় ও বিভাজনের কেন্দ্রে পরিণত হয়। গণরুম-গেস্টরুমের বিভীষিকা কিংবা রাজনৈতিক ‘বড় ভাইদের’ তোষামোদির যে সংস্কৃতি গত কয়েক দশকে গড়ে উঠেছে, তা মূলত শিক্ষার্থীদের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার একটি সুপরিকল্পিত প্রক্রিয়া। বিশ্ববিদ্যালয় শুধু চাকরিপ্রার্থী তৈরির কারখানা নয়; এটি ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির আঁতুড়ঘর।
আমরা চাই মেধাবৃত্তিক ও অধিকারকেন্দ্রিক ছাত্ররাজনীতি। যে রাজনীতি শিক্ষার্থীদের লাইব্রেরি থেকে দূরে সরিয়ে দেয় না, বরং সমাজ, রাষ্ট্র ও বৈশ্বিক নানা ইস্যু যেমন—অর্থনৈতিক বৈষম্য, জলবায়ু পরিবর্তন, ডেটা প্রাইভেসি বা মানবাধিকার নিয়ে গভীরভাবে বোঝার সক্ষমতা তৈরি করে।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, পৃথিবীর বড় বড় পরিবর্তনের কেন্দ্রে ছিল তরুণ সমাজ। ৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, ৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে সাম্প্রতিককালের প্রতিটি অধিকার আদায়ের লড়াই ও গণআন্দোলনে ছাত্রসমাজই জাতিকে পথ দেখিয়েছে। আজকের তরুণ প্রজন্মের মিশন হওয়া উচিত সেই ঐতিহাসিক ধারাকে অক্ষুণ্ণ রেখে একটি জ্ঞানভিত্তিক ও নৈতিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা।
পেশিশক্তির এই শিকড় উপড়ে ফেলে ইতিবাচক রাজনীতি কীভাবে গড়ে তোলা সম্ভব? শুধু আদর্শের বুলি আওড়ালে এই অচলায়তন ভাঙবে না, প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট কাঠামোগত পরিবর্তন।
প্রথমত, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে প্রশাসনযন্ত্রের মেরুদণ্ড সোজা করে হলের সিট বণ্টনের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিতে হবে। কোনো শিক্ষার্থী যেন মাথা গোঁজার ঠাঁইয়ের জন্য কোনো রাজনৈতিক নেতার করুণার ওপর নির্ভরশীল না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। আবাসনের অধিকার নিশ্চিত হলে জোরপূর্বক মিছিলে নেওয়ার সংস্কৃতি এমনিতেই ভেঙে পড়বে।
দেখেছি যখন ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের বৈধ ও নির্বাচিত প্রতিনিধিত্ব থাকে না, ঠিক তখনই সেখানে লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি ও সিন্ডিকেট মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের একমাত্র বৈধ ও কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হলো ছাত্র সংসদ। যুগের পর যুগ রাকসু, ডাকসু বা চাকসুর মতো ছাত্র সংসদগুলোর নির্বাচন বন্ধ থাকার কারণেই মূলত ছাত্ররাজনীতিতে যোগ্য নেতৃত্বের শূন্যতা তৈরি হয়েছে এবং অছাত্রদের দৌরাত্ম্য বেড়েছে। মেধাভিত্তিক নেতৃত্ব তুলে আনতে সব বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচন দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই।
দার্শনিক ফ্রান্তজ ফানোঁ বলেছিলেন, ‘প্রতিটি প্রজন্মকে তার নিজস্ব মিশন খুঁজে বের করতে হয়; হয় সেটি পূরণ করতে হয় অথবা তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করতে হয়।’ এখন সময় এসেছে রাজনীতিকে কাঠামোগতভাবে সংস্কার করার এবং এর নেতৃত্ব নিজেদের হাতে তুলে নেওয়ার। আমরা এমন এক ছাত্ররাজনীতি চাই, যা শিক্ষার্থীদের দলীয় ক্যাডার নয়, বরং ভবিষ্যতের দেশপ্রেমিক ও যোগ্য কান্ডারি হিসেবে গড়ে তুলবে; যা ক্ষমতার জন্য নয়, সমাজ ও দেশের কল্যাণের জন্য কাজ করবে।
লেখক : নির্বাহী সদস্য (একক স্বতন্ত্র), শহীদ জিয়াউর রহমান হল সংসদ, রাকসু
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


ইতিহাসের সর্বোচ্চ দরপতন ভারতীয় মুদ্রার