ইংরেজিতে একটি কথা চালু আছেÑ‘মর্নিং শোজ দ্য ডে’ অর্থাৎ ‘সকালের সূর্য দেখলেই বোঝা যায় দিনটি কেমন যাবে।’
বিএনপি ষষ্ঠবারের মতো রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কয়েক দিনের কার্যক্রম দেখে ইংরেজি এই প্রবাদের কথা মনে পড়ছে। তেমনি মনে পড়ছে আরেকটি উক্তিও। উক্তিটি ছিল তারেক রহমানের বাবা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের। ১৯৭৮ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগে জিয়াউর রহমান বলেছিলেন, ‘আই উইল ম্যাক পলিটিকস ডিফিকাল্ট ফর দ্য পলিটিশিয়ানস।’ এই উক্তির মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন, রাজনীতিকে ড্রয়িং রুম বা রাজধানীকেন্দ্রিক বলয় থেকে বের করে তৃণমূলের সাধারণ মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়া এবং যারা রাজনীতিকে ব্যক্তিগত ভাগ্য পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন, তাদের জন্য পথটি কঠিন করে তোলা। তারেক রহমান বাবার এই উক্তি তার কোনো বক্তব্যে উদ্ধৃত না করলেও অভিজ্ঞ মানুষেরা বলা শুরু করে দিয়েছেন, তারেক রহমানও সেই পথ অনুসরণ করতে যাচ্ছেন। তার কয়েক দিনের কাজ সেটারই ইঙ্গিত। তার শুরুটা বেশ ভালোই বলতে হবে।
ইতিহাসসেরা ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপিকে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী করার পর গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বাংলাদেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। তিনি ২৫ জন পূর্ণ মন্ত্রী এবং ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী নিয়ে তার মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন। মন্ত্রিসভার বাইরে কয়েকজন উপদেষ্টাও নিয়োগ দিয়েছেন তিনি। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় নিজের কাছেই রেখেছেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর তার সরকারের আজ সাত দিন হয়েছে। শুক্রবার ছাড়া বাকি দিনগুলোয় তাকে আমরা কাজে ডুবে থাকতেই দেখেছি।
প্রচলিত নিয়মে বঙ্গভবনে শপথ অনুষ্ঠান হলেও তারেক রহমান জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় খোলা আকাশের নিচে জনগণের সামনে শপথ গ্রহণ করে নতুন নজির স্থাপন করেছেন। এই শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের একটি বাড়তি আকর্ষণ ছিল গুরুত্বপূর্ণ বিদেশি মেহমানদের যোগদান। এর মধ্যে ছিলেন মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট ড. মোহামেদ মুইজ্জু, ভুটানের প্রধানমন্ত্রী দাশো শেরিং তোবগে, ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা ও পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি, পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা ও উন্নয়নমন্ত্রী আহসান ইকবাল চৌধুরী এবং কয়েকটি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ ১৩টি দেশের উচ্চপর্যায়ের আমন্ত্রিত অতিথিরা।
তারেক রহমান ১৭ ফেব্রুয়ারি বিকালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের আগে সকালে দলীয় নবনির্বাচিত এমপিদের নিয়ে ‘সংসদ সদস্য’ হিসেবে শপথ নেন। এই শপথের পর বিজয়ী দল বিএনপির সংসদীয় দলের সভা হয় এবং ওই সভায় তিনি সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচিত হন। ওই একই সভায় তিনি সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন যে, তার দলের এমপিরা শুল্কমুক্ত গাড়ি এবং সরকারি প্লট বরাদ্দের সুবিধা নেবে না। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সরকারি বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা শেষে তিনি প্রথম দুদিন বাংলাদেশ সচিবালয়ে অফিস করেন। মন্ত্রিসভায় বৈঠক করেন এবং বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতির উদ্দেশে প্রথম ভাষণ দেন। সেই ভাষণে জানিয়ে দেন, তিনি সপ্তাহে ছয় দিন কাজ করবেন। শনিবার ছুটির দিনেও অফিস করবেন। মন্ত্রীদের অপ্রয়োজনীয় ব্যয় পরিহারের নির্দেশ দেন। পবিত্র রমজান মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখা এবং সিন্ডিকেট দমনে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেন। তার প্রথম ভাষণেই তিনি সুশাসন প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি দমন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা পরিস্থিতি উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেন, যা জবাবদিহিমূলক সরকারের বার্তা দেয়। তিনি ঘোষণা দেন রাজনৈতিক আদর্শ ভিন্ন হলেও দেশের সব নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করা হবে তার কাজ, যা একটি বৈষম্যহীন আগামীর পূর্বাভাস। একই সঙ্গে তিনি রাজনৈতিক বিভাজন দূর করতে এবং দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনর্গঠনে ‘জাতীয় ঐক্য’ ও শান্তির ডাক দেন।
গতানুগতিক ভিভিআইপি প্রথা ভেঙে তারেক রহমানকে সাধারণ জনগণের মতো রাস্তায় ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে এবং কোনো রাস্তা বন্ধ না করে সচিবালয়ে যাতায়াত করতে দেখা গেছে। শুক্রবার ২১ ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারেও তাকে আমরা ব্যতিক্রমী রূপে দেখলাম। একুশের শহীদদের প্রতি ফুল দিয়ে শ্রদ্ধাই জানাননি, শহীদ মিনারের বেদিতে দাঁড়িয়ে তাদের মাগফিরাত কামনা করে দোয়া করেছেন তিনি। শপথের তিনদিন পর শনিবার তারেক রহমান তার নিজ কার্যালয়ে প্রথম যান এবং সেখানে একটি ‘স্বর্ণচাঁপা’ ফুলের চারা লাগান। অবশ্য আমার আশা ছিল তিনি কাঁঠালিচাঁপার গাছ লাগাবেন। কারণ কাঁঠালিচাঁপা ছিল তার মা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রিয় ফুল। তিনি প্রধানমন্ত্রীর অফিসে ১৯৯৩ সালে এ গাছ লাগিয়েছিলেন। কিন্তু শেখ হাসিনার প্রতিহিংসার শিকার হয়েছিল সেই গাছটি। তার নির্দেশে ওই গাছ কেটে ফেলা হয়েছিল। আশা করি, পরবর্তী কোনো এক সময়ে তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে কাঁঠালিচাঁপা ফুলের গাছ লাগাবেন এবং সেই অনুষ্ঠানে সম্পাদক শফিক রেহমানকে দাওয়াত দেবেন। কারণ কাঁঠালিচাঁপার গাছটি কেটে ফেলায় দেশনেত্রী খালেদা জিয়া দুঃখ পেয়েছিলেন এবং সেই দুঃখের কথা তিনি শফিক রেহমানের কাছে ব্যক্ত করেছিলেন।
তেজগাঁও অফিসে গিয়ে তারেক রহমান শহীদ দিবস এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে বিশেষ স্মারক ডাকটিকিট ও উদ্বোধনী খামও উন্মোচন করেন।
শনিবার নিজ কার্যালয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা করে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ঘোষণাও দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই ঘোষণা হলো ফ্যামিলি কার্ড এবং ইমাম-মুয়াজ্জিনদের সম্মানীর বিষয়ে। প্রাথমিকভাবে দেশের পাঁচ কোটি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এই কার্ড মূলত পরিবারের নারী সদস্য বা গৃহিণীর নামে ইস্যু করা হবে। এই কার্ডের মাধ্যমে প্রতিটি পরিবারকে মাসিক দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকা এবং প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী দেওয়া হবে। রমজানেই আটটি উপজেলায় পরীক্ষামূলক (পাইলট) কার্যক্রম শুরু হবে এবং পর্যায়ক্রমে সারা দেশে এটি চালু করা হবে। তাছাড়া আসন্ন ঈদুল ফিতরের আগেই দেশের বিভিন্ন এলাকায় ইমাম, খতিব ও মুয়াজ্জিনদের উৎসব ভাতা এবং মাসিক সম্মানী দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাদের সার্ভিস রুল (সেবা বিধিমালা) প্রণয়নেরও ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই প্রকল্পগুলোকে তিনি দেশের তৃণমূল পর্যায়ের অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত করার এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ‘স্বপ্ন প্রকল্প’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হচ্ছেÑতার নতুন সরকারের অগ্রাধিকার দ্রব্যমূল্যের নিয়ন্ত্রণকে শীর্ষ তালিকায় রাখা। তিনি প্রতিটি মন্ত্রণালয়কে ১৮০ দিনের একটি বিশেষ পরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন। রমজানের প্রধান খাদ্যসামগ্রী যেমন খেজুর, ভোজ্যতেল এবং ডাল আমদানিতে শুল্ক কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জেলা ও উপজেলায় বাজার মনিটরিং এবং সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখার জন্য স্বরাষ্ট্র ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে বিশেষ নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। স্বল্পমূল্যে খাদ্য সহায়তার উদ্যোগ হিসেবে তিনি ১০ লাখ নিম্নবিত্ত পরিবারকে সুলভ মূল্যে মাছ, মাংস, দুধ, ডিম সরবরাহের জন্য খাদ্য ও মৎস্য মন্ত্রণালয়কে উদ্যোগ নিতে বলেছেন। রমজানে ইফতার, সাহরি ও তারাবির সময় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, গ্যাস এবং পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়কে বিশেষ নির্দেশ দিয়েছেন।
রমজানে বিভিন্ন মুসলিম দেশে বড় আকারে ছাড়
পবিত্র রমজান মাসে বিভিন্ন মুসলিমপ্রধান দেশ সাধারণ মানুষের সুবিধার্থে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম কমানোর ঘোষণা দেয়। প্রতিবছরই এটা আমরা দেখি। কিন্তু এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভিন্ন। বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা রমজানকেই মুনাফা লাভের উপযুক্ত মাস হিসেবে গ্রহণ করে দ্রব্যমূল্য কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেন। এর বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতির উদ্দেশে তার ভাষণে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি দ্রব্যমূল্য যাতে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে না যায়, সে বিষয়ে ব্যবসায়ীদের সতর্ক থাকতে এবং দায়িত্বশীল আচরণ করতে বলেছেন। তিনি ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে বলেন, রমজান আত্মশুদ্ধির মাস। তাই ব্যবসায়ীরা যেন এই পবিত্র মাসকে মুনাফা লাভের মাসে পরিণত না করেন, সে আহ্বান জানান। তিনি বলেন, তার সরকার সব ধরনের মাফিয়া সিন্ডিকেট ও অনাচার-অনিয়ম ভেঙে দিতে সব প্রচেষ্টা নেবে। জনভোগান্তি যাতে না বাড়ে, তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন তিনি।
রমজানে এবার সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) তাদের সুপার মার্কেট চেইনগুলো যেমনÑলুলু হাইপারমার্কেট, ইউনিয়ন কো-অপ প্রায় ১০ হাজার পণ্যের ওপর ২৫ থেকে ৭৫ শতাংশ ছাড় ঘোষণা করেছে। চাল, তেল, চিনির মতো মৌলিক পণ্যের কোনো দাম বাড়বে না বলে ঘোষণা দিয়েছে। সৌদি আরব ভোজ্যতেল, চাল এবং দুগ্ধজাত পণ্যের ওপর গড়ে ২০ থেকে ৫০ শতাংশ ছাড় ঘোষণা করেছে। কাতার ও ওমান প্রায় ৫০০ পণ্যের ওপর ৩০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় ঘোষণা করেছে। মালয়েশিয়া চাল, ডাল, মাছ, মাংস এবং সবজির ওপর ৩০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় ঘোষণা করেছে। যুক্তরাজ্য ও কানাডা অমুসলিম দেশ হলেও তারা চাল, ডাল ও ফলের রসের মতো পণ্যে ২০ থেকে ৪০ শতাংশ ছাড় ঘোষণা করেছে। যুক্তরাজ্যের আসডা, মরিসনস এবং টেসকো চেইন শপগুলো রমজানের এই বিশেষ ছাড় দিয়েছে। এমনকি পাকিস্তানও বেশকিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত ভর্তুকি দিয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য আমরা এখন পর্যন্ত সেখান থেকে কোনো শিক্ষা গ্রহণ করিনি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আমাদের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়কে এ বিষয়টি অনুধাবনের অনুরোধ জানিয়েছেন। তিনি সুস্পষ্টভাবে বলেছেন যে, আগের আমলের এই অরাজকতা আর চলবে না। মুনাফা লাভের সিন্ডিকেট তিনি ভেঙে দেবেন এবং অসাধু ব্যক্তিদের আইনের আওতায় নিয়ে আসবেন।
ড. খলিল কেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান। তাকে কেন নেওয়া হলো এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পক্ষে-বিপক্ষে মন্তব্য করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, ড. ইউনূসের সঙ্গে তারেক রহমানের লন্ডন বৈঠকের নেপথ্যের কারিগর হিসেবে ভূমিকা রাখার জন্যই নাকি তাকে এ পদ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বিষয়টি এতটা সরলিকৃত নয়। যে যেভাবেই বিষয়টিকে দেখুন না কেন, তারেক রহমান যে একজন উপযুক্ত ব্যক্তিকে উপযুক্ত জায়গা হিসেবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে স্থান দিয়েছেন, এটা মানতেই হবে।
ড. খলিলুর রহমান মূলত অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং কূটনীতি বিষয়ে একজন পণ্ডিত ব্যক্তিত্ব। মেধার প্রতিফলন তার সুদীর্ঘ ক্যারিয়ারে প্রতিটি ক্ষেত্রে দেখা যায়। ১৯৭৭ সালে স্বাধীনতার পর অনুষ্ঠিত প্রথম নিয়মিত সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় (বিসিএস) প্রথম স্থান অধিকার করে তিনি ১৯৭৯ সালে পররাষ্ট্র ক্যাডারে যোগ দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে তিনি এম এ পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। এরপর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের টাফটস বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্লেচার স্কুল অব ল অ্যান্ড ডিপ্লোম্যাসি থেকে আইন ও কূটনীতিতে এমএ করেন। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কেনেডি স্কুল অব গভর্নমেন্টস থেকে অর্থনীতিতে পিএইচডি অর্জন করেন। তিনি জাতিসংঘ সচিবালয়ে দীর্ঘ ২৫ বছর অত্যন্ত জ্যেষ্ঠ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। যতটুকু জানা গেছে, ড. খলিলুর রহমানকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পেছনে বেশকিছু কৌশলগত ও পেশাদার কারণ রয়েছে। তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং রোহিঙ্গা সমস্যাবিষয়ক হাই রিপ্রেজেনটেটিভ ছিলেন। তাকে নিয়োগ দেওয়ার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি ধারাবাহিকতা বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। রোহিঙ্গা ইস্যু বাংলাদেশের জন্য একটি বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ। ড. খলিল এই ইস্যুতে সরাসরি কাজ করেছেন এবং তার এই বিশেষ অভিজ্ঞতা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কাজে লাগবে। তিনি যুক্তরাষ্ট্র, ভারতের মতো প্রভাবশালী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে ভালো ভূমিকা রাখতে পারবে। যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের সঙ্গেও কাজ করার তার গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা রয়েছে।
ড. খলিলুর রহমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করবেন। এর পেছনে গভীর রাজনৈতিক এবং কৌশলগত তাৎপর্য রয়েছে। এটি কেবল দলীয় আনুগত্য নয়, বাংলাদেশের ভূরাজনীতির বাস্তবতারও একটি প্রতিফলন। কারণ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ৭০-এর দশকের শেষ ভাগে তার পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি হিসেবে সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়Ñনীতি জনপ্রিয় করেছিলেন। ড. খলিলুর রহমান মনে করেন, বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে যেখানে আমেরিকা, চীন এবং ভারতের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ চলছে, সেখানে কোনো নির্দিষ্ট ব্লকে না গিয়ে সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখাই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ। ড. খলিল বর্তমান সরকারকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানে নিতে চান, যা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানেরও নীতি। জিয়াউর রহমান ছিলেন সার্কের স্বপ্নদ্রষ্টা। ড. খলিল ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, তিনি সার্ককে আবার সক্রিয় করার চেষ্টা করবেন। ড. খলিলুর রহমানের মতে, জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতি ছিল ‘বাস্তবসম্মত এবং দেশপ্রেমিক।’ তিনি মনে করেন, এই নীতি অনুসরণ করলে বাংলাদেশ বড় দেশগুলোর চাপের মুখেও নিজের স্বার্থ রক্ষা করতে পারবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিকে পরিকল্পনার মূল ভিত্তি ধরে ড. খলিল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ১৮০ দিনের কর্মসূচি তৈরি করছেন বলে ইতোমধ্যে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন। সেখানে কোনো দলীয় বা ব্যক্তি স্বার্থ নয়, বরং প্রতিটি কূটনৈতিক পদক্ষেপে কেবল বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এসব বিবেচনায় মনে হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সবকিছু বুঝেশুনেই ড. খলিলুর রহমানকে তার মন্ত্রিসভায় নিয়েছেন। সামনের দিনগুলোতে বিষয়গুলো আরো পরিষ্কার হবে।
লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, আমার দেশ
abdal62@gmail.com
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

